অতৃপ্ত মাতৃত্ব ( অন্তিম পর্ব )

অতৃপ্ত মাতৃত্ব ( অন্তিম পর্ব )

।। অতৃপ্ত মাতৃত্ব ।।

। অন্তিম পর্ব।

। কলমে : দেবজিৎ ঘোষ ।

 

 

বাস্তব জগতের একদম সমান্তরালে অপর একটি দুনিয়া রয়েছে, সেখানে এমন অনেক কিছু প্রতিনিয়ত ঘটে চলে যার কোনো যথোপযুক্ত ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব নয়। বিজ্ঞান তাকে অতিপ্রাকৃত আখ্যা দিয়ে অস্বীকার করলেও সেইসব অলৌকিক ঘটনাগুলো সত্যিই সংঘটিত হয় মানসচক্ষুর অন্তরালে। কখনো কখনো কোনো অতৃপ্ত বাসনা পূরণের উদ্দেশ্যে এই দুই বিপরীত অথচ সমসাময়িক জগতের মধ্যে সংঘাত ঘটে যায় যার ফলে কোনো প্রতিহিংসা পরায়ন দুষ্ট আত্মার প্রবেশ ঘটে আমাদের দুনিয়ায়। তারা যে কোনো উপায়ে তাদের কার্যসিদ্ধি করতে বদ্ধ পরিকর যার করাল গ্রাস উপেক্ষা করা খুবই কষ্টসাধ্য।

সেরকমই এক অন্ধকার ছায়া ধীরে ধীরে গ্রাস করে ফেলেছিল গ্রামপ্রধানের বাড়িটাকে। হঠাৎ খুব শীত লাগায় ঘুমটা হঠাৎ ভেঙ্গে যায় আমার। সারা শরীর অবশ হয়ে গেছে, হাত পায় কোনো বল নেই। কোনোরকমে চোখ খুলে তাকাতেই যা দেখলাম তাতে আমার রক্ত হিম হয়ে গেল। আমার ঠিক মুখের ওপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে এক নারীমূর্তি আর সারা ঘর কালকের সেই মিষ্টি আতরের গন্ধে ভরে উঠেছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে আমার, চিৎকার করার সাধ্যটুকু নেই। আমাকে তাকাতে দেখে নারীমূর্তি হেসে উঠল, কি সাংঘাতিক সেই হাসির স্বর। সেই শব্দে ক্রমশঃ আমার ইচ্ছাশক্তি লোপ পেতে থাকে, আমার নিজের ওপর থেকে সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়।

সেই রহস্যময়ী নারীমূর্তি এবার ধীরে ধীরে আমাকে টেনে দাঁড় করিয়ে দেয়, বরফের থেকেও ঠান্ডা সেই স্পর্শ। আমার হাত ধরে এগিয়ে যায় দরজার দিকে, দরজা খুলে বারান্দা, তারপর সিড়ি ও ফটক পেড়িয়ে রাস্তায় টেনে আনে। পূর্ণিমার চাঁদের উজ্জ্বল আলোয় আমাকে নিয়ে সে চলতে থাকে আর আমিও সম্মোহিতের ন্যায় এক পা এক পা করে এগোতে থাকি আমার ভয়াবহ পরিণতির দিকে।




“তারপর কি হল দাদুভাই, কোথায় গেলে তোমরা?” আত্রেয়ী উত্তেজিত কন্ঠে প্রশ্ন করে। সেই রাতের কথা ভেবে আজও সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল আমার। নিজেকে সামলে নিয়ে আবার বলতে শুরু করলাম।

কতক্ষণ যে সেই অচেনা ছায়ামূর্তির সাথে পথ চলেছি তার কোনো হিসেব ছিল না আমার। এ পথ সে পথ করে যখন সে তার হাঁটা থামাল বুঝলাম আমরা রাজবাড়িতে চলে এসেছি। আমার হাত যখন তার হাতের থেকে শিথিল হল, তখন ঠাওর করতে পারলাম একটা মস্ত ঘরে এসে উপস্থিত হয়েছি আমি। এ ঘর আমার চেনা, প্রথম দিন এ ঘরেই রাত কাটিয়েছিলাম, রাজা রূদ্র নারায়ণের শয়নকক্ষ।

“কি রূদ্র নারায়ণ, অনামিকার আতিথেয়তা ভালো লাগলো না, চলে গেলেন যে বড় !”

আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না, মাটিতে বসে পড়ে কোনোরকমে বললাম,
“আমি রূদ্র নারায়ণ নই, তাঁকে তো আপনি শাস্তি দিয়েছেন। আমার কি দোষ বলুন তো! আমাকে মুক্তি দিন, আমাকে দয়া করে মারবেন না, আমি হাত জোড় করছি আপনার কাছে।”

এক বিকট অট্টহাসিতে সারা ঘর কেঁপে উঠল। আমার চারিদিকে প্রদক্ষিণ করতে করতে অত্যন্ত তীক্ষ্ণকন্ঠে ভর্ৎসনা করে উঠল নারীমূর্তি,
“সেই দিনের কথা মনে পড়ে রূদ্র নারায়ণ? আমি ঠিক এইভাবে প্রাণভিক্ষা চেয়েছিলাম তোর কাছে, তোর পা ধরে কত কাকুতি মিনতি করেছিলাম অন্তত আমার সন্তানের জন্য আমাকে রেহাই দিতে। তুই কি মুক্তি দিয়েছিলিস আমায়, তোর কি ক্ষতি করেছিলাম আমি? চিনতে পারিস এই ঘরটা, মনে আছে মদের নেশায় সেদিন এ ঘরে কি নিদারুণ অত্যাচার করেছিলিস আমার ওপর। তুই শুধু আমার সর্বনাশ করেই ক্ষান্ত হোসনি, পাশবিক উল্লাসে আমার প্রাণটাও কেড়ে নিলি, ফলে জন্মের আগেই শেষ হয়ে গেল আমার সন্তান। বল কি দোষ করেছিল সে যে তুই তাকে পৃথিবীর আলো দেখতে দিলি নি।”

তার গলা বুজে এলো, বুঝলাম ভয়াবহ অতীতের বেদনায় কুঁকড়ে উঠছে সে। এই সুযোগটা নিতে চাইলাম আমি, বাঁচার আশায় সোজা নারীমূর্তির পায়ে লুটিয়ে পড়লাম। কিন্তু এতে ফল হল হিতে বিপরীত। এক ক্রুদ্ধ গর্জনের সাথে সাথে আমায় ছিটকে ফেলল দুহাত দূরে। প্রচন্ড আতংকে দেখলাম তার দেহের সমস্ত আবরণ ধীরে ধীরে অপসারিত হচ্ছে, চামড়া মাংস খসে পড়ছে। ক্রমে অনামিকা নরকঙ্কালে পরিণত হল আর তার উদরস্থির সাথে জুড়ে আছে আরও একটি কঙ্কাল, তার সন্তান। এক তীব্র মড়াপচা গন্ধে চেতনা লোপ পেতে থাকে আমার। হাড়ের সাথে হাড়ের ঠোকাঠুকিতে তীব্র খটখট শব্দ হতে থাকে। প্রবল আক্রোশে আমার বুকের ওপর চেপে বসে অনামিকা। একজোড়া অস্থিসার হাত এগিয়ে আসতে থাকে আমার গলার দিকে।




খনখনে গলায় চিৎকার করে ওঠে, কন্ঠে তার ক্ষোভ উপচে পড়ছে, “দেখেছিস আমার সন্তানের দশা, এরপর তুই কেমন করে ভাবিস আমি তোকে ক্ষমা করবো। মরতে তো তোকে হবেই কিন্তু তোকে আমি একবারে মারবো না, তুই যে কষ্ট আমাকে আর গ্রামের সব মেয়েদের দিয়েছিস তা সুদে আসলে আদায় করবো। তিলে তিলে মরবি তুই।”

আবারও সেই হাড়হিমকরা নারকীয় হাসি, আমার চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসে, অন্যের পাপের দায়ে আজ আমি মরণাপন্ন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেই নরকঙ্কাল উঠে দাঁড়ায় আর আমার চুলের মুঠি ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে চলে, প্রতিশোধ স্পৃহায় সে উন্মত্ত। সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত হতে থাকে আমার। অসংখ্য ঘর অলিন্দ পেরিয়ে অবশেষে একটা কাঠের দরজার ওপর ছুড়ে ফেলে আমায়। সারা দেহ ঝনঝন করে ওঠে, মাথা ফেটে চৌচির, প্রচন্ড যন্ত্রনায় ক্রমশঃ চেতনা লুপ্ত হয়ে যেতে থাকে আমার।

টানা এগারো দিন যমে মানুষে টানাটানির পর জ্ঞান ফেরে আমার। তখনও বিছানা থেকে ওঠার শক্তি নেই, সারা শরীরে অসহ্য যন্ত্রনা। জ্ঞান ফিরতে জানতে পারি যে পরদিন সকালে পেখম আমার ঘরে চা নিয়ে এসে দরজা খোলা দেখে ঢুকে আমায় না দেখে বাড়ির সবাইকে ডেকে আনেন। ওনারা প্রথমে ভেবেছিলেন ঘুরতে বেড়িয়েছি কিন্তু দুপুর অব্দি না ফেরায় তারা অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে আমায় খুঁজতে বের হন। সারা গ্রামে আমার কোনো সন্ধান না পেয়ে তারা দল বেঁধে হাজির হন রাজবাড়িতে। অনেক খোঁজাখুজির পর ঐ বাড়ির পরিত্যক্ত কালকুঠুরীর সামনে থেকে অচৈতন্য অবস্থায় উদ্ধার করেন আমায়, রক্তে সারা শরীর ভিজে গিয়েছিল, অবস্থা সংকটজনক। অনেক রক্তের দরকার হয়ে পড়েছিল, আমার রক্তের গ্রুপ ‘ও নেগেটিভ’ যা অতি বিরল। এগিয়ে এসেছিলেন স্বয়ং পেখম। একমাত্র তার সাথেই আমার রক্তের গ্রুপ মিলে যাওয়ায় নিজের জীবন বিপন্ন করে রক্ত দিয়ে আমাকে বাঁচিয়ে তোলেন তিনি আর শুধু রক্তদানই নয়, রাতদিন সেবা শুশ্রুষা করে আমায় সুস্থ করে তুলেছিলেন পেখম।

হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর প্রায় প্রতি রাতেই অনামিকা এসেছিল আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য, কিন্তু আমার সামনে ঢাল হয়ে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন পেখম, তার ভালোবাসা ও মমতার কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছিল অনামিকা। সবটা জানার পর আমার মনে হয়েছিল তিনি যেন স্বর্গ প্রেরিত কোনো দেবী যিনি সমস্ত অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে আমার প্রাণরক্ষা করলেন।




এদিকে আমার মা ও ঠাকুমা এখানে এসে উপস্থিত হয়েছেন। দীর্ঘদিন আমার কোনো খবর না পাওয়ায় অস্থির হয়ে উঠেছিলেন হৈমন্তী দেবী। আমার মাও অত্যন্ত দুঃশ্চিন্তার মধ্যে ছিলেন, আমায় ফোনে তিন চারদিন না পেয়ে পাগলের মত সব কথা ঠাকুমাকে জানিয়ে দেন। আমার যে কিছু একটা বিপদ হয়েছে তা অনুমান করে বিচক্ষণ হৈমন্তী দেবী কালবিলম্ব না করে আমার মাকে নিয়ে চলে আসেন প্রতাপগড়। সব বৃত্তান্ত শুনে আমার অচৈতন্য শরীরের দিকে তাকিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ওঠেন আমার মা, আমার এই অবস্থার জন্য বারবার নিজেকে দোষারোপ করতে থাকেন।

তাকে শান্ত করে হৈমন্তী দেবী গম্ভীর গলায় বলেন, “আমি ঠিক এই ভয়েই এই জায়গার কথা তোমাদের থেকে গোপন করেছি এতদিন, ঐ পিশাচিনির হাত থেকে কারোর নিস্তার নেই। ওই আমার দাদুভাইকে এতদূর টেনে এনেছে, এতে তোমার কোনো দোষ নেই বৌমা। আমি বুঝতে পেরেছি এই অভিশাপের থেকে পালিয়ে নিস্তার পাওয়া অসম্ভব, এর থেকে বাঁচার একমাত্র পথ ঐ পিশাচিনির সাথে মোকাবিলা করা।”

এরপর তিনি উঠে এগিয়ে যান দরজায় দাঁড়ানো পেখমের দিকে, ওকে বুকে টেনে নিয়ে ছলছল চোখে বলেন, “পেখম মা, তুই আমার দাদুভাইয়ের প্রাণ বাঁচিয়েছিস। আমি জানি তুই একমাত্র পারবি আমার দাদুভাইকে ঐ পিশাচিনির করাল গ্রাস থেকে বাঁচাতে। বল পারবি না মা, পারবি না আমার দাদুভাইকে তোর ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখতে, বল মা?”

“পারবো”, দৃঢ়কন্ঠে বলে ওঠে পেখম।

তারপর হৈমন্তী দেবীকে প্রণাম করে বলে, “রাজা রূদ্র নারায়ণ যে পাপ করেছিলেন তার শাস্তি তিনি পেয়েছেন। এবার এই মৃত্যুর খেলা বন্ধ হওয়া উচিত তা না হলে আমাদের পরিবার চিরকাল অপরাধী হয়ে থেকে যাবে আর তা আমি হতে দেব না। আগামী অমাবস্যাতেই অনামিকার অতৃপ্ত আত্মাকে মুক্তি দিয়ে আপনাদের বংশকে শাপমুক্ত করবো আর ওনাকে বাঁচাবো, তার জন্য যে বিপদই আসুক, কিছুতেই পিছুপা হবো না আমি।”

সেদিন রাতে প্রচন্ড তেষ্টায় ঘুম ভেঙ্গে যায় আমার। খাট থেকে নামতে যাব ঠিক তখনই,
“নামবেন না, আপনার শরীর এখনও ঠিক হয়নি। কি দরকার, জল খাবেন?” পেখম উঠে আসে।




আমি অবাক চোখে দেখছিলাম তাকে। চাঁদের আলোয় তাকে অপরূপ সুন্দরী লাগছিল। সেদিনের সেই লাজুক মেয়েটা যেন অনেকখানি বড় হয়ে গেছে। এক পরিপূর্ণা নারী হয়ে উঠেছে সে, তার মাতৃসত্ত্বা উজার করে আমাকে সুস্থ করে তুলেছে আবার রাত জেগে বসে আমার পরিচর্যা করছে। কারোর জন্য এতোটা আত্মত্যাগ যে সম্ভব তা পেখমকে না দেখলে বিশ্বাসই হত না। মা, ঠাকুমার পর আমার এত যত্ন কেউ কোনোদিন করেনি, তার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসায় মনটা ভরে উঠলো। কেউ যেন আমার মনে বলতে লাগলো একমাত্র এই মেয়েই তোমার জীবনসঙ্গী হিসেবে উপযুক্ত। একটু জল খেয়ে তাকে আমার মাথার পাশে বসতে বললাম, তারপর দুজনে মিলে কত যে গল্প করেছিলাম সেরাতে তার ঠিক নেই। একসময় আস্তে আস্তে আমার মাথায় হাত বোলাতে থাকে পেখম, আমি ঘুমিয়ে পড়ি আর সেও আমার মাথায় মাথা রেখে স্বপ্নের জগতে হারিয়ে যায়।

“আচ্ছা দাদুভাই, পেখম কে গো?” আমার নাতনি ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করে।

ওর ঠাম্মীর ছোটোবেলার নামই যে পেখম আর তার কোলেই যে আমি সে রাতে ঘুমিয়েছিলাম তা নাতনির কাছে বলতে লজ্জা পাই, চুপ করে থাকি আমি।

“ও দাদু বলো না কে পেখম?”

“দিদিভাই এই যে আমিই তোমার দাদুর সেই পেখম।”

“ঠাম্মু তুমি পেখম! তুমিই তালে সেই বাজে ভূতটার সাথে ফাইট করে দাদুকে বাঁচিয়েছিলে।” আত্রেয়ী তার ঠাম্মীর কোলে উঠে গলা জড়িয়ে ধরে বসে।

“হ্যাঁ সোনা আমি সেই। কিগো বলো শেষটা আমিও শুনি। রাত হয়ে যাচ্ছে খেতে যেতে হবে তো! ”

একটু হেসে আবার শুরু করলাম আমি।

অবশেষে এল সেই ভয়ংকর অমাবস্যার রাত। শরীর তখনও সম্পুর্ণ সুস্থ না হওয়ায় আমাকে কিছুতেই যেতে দিতে চাইছিলেন না বাড়ির সবাই, কিন্তু আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, এখানে ফিরে আসায় যে অভিশাপের ঘৃতাহুতি হয়েছে তার সমাপ্তি আমার হাতেই হবে। আমার দেহের শিরা উপশিরাতেও রাজ রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে, নিজের কথা ভেবে অন্যদের বিপদের মধ্যে ঠেলে দেওয়া মানে রাজধর্মের বিরোধিতা করা যা আমার পক্ষে অসম্ভব। মা ঠাকুমাকে প্রণাম করে পেখম ও পঞ্চানন বাবুর সাথে নির্দিষ্ট সময়ে বেরিয়ে পড়লাম রাজবাড়ির দিকে, উদ্দেশ্য সকল অপশক্তির বিনাশ করে আমাদের পরিবারের অভিশাপ মোচন করা।




অনামিকার হারিয়ে যাওয়ার দিনটিও ছিল ঠিক এরকমই এক ফাল্গুনী অমাবস্যা। তাই হৈমন্তী দেবী বলেছিলেন যে এই রাতটাই উপযুক্ত তাকে শেষ করার জন্য। অনামিকাকে মুক্তি দেওয়ার একমাত্র উপায় তার কঙ্কাল খুঁজে সেটিকে নষ্ট করে দিতে হবে। আমার মন বলছিল সব রহস্য লুকিয়ে আছে ঐ কালকুঠুরীর অভ্যন্তরে। আমি, পেখম আর পঞ্চানন বাবু হাজির হলাম রাজবাড়ির সামনে। রাজবাড়িতে ঢোকার সাথে সাথেই আমাদের সারা দেহ ভার হয়ে যায়, কিছু একটা চেপে বসতে চাইছে যেন। সেদিন যে দরজার সামনে আমাকে পাওয়া গেছিল সেই দরজার সামনে এসে দাঁড়ালাম আমরা। কিভাবে ঢুকবো ভাবছি সহসা দরজাটা দড়াম করে খুলে গেল, দেখলাম শতাধিক সিড়ি নীচের অন্ধকারে নেমে গেছে, কালকুঠুরীর রাস্তা। দরজা খুলে যাওয়ার সাথে সাথে তীব্র আতরের গন্ধে ভরে উঠল চারিদিক, অনুভব করলাম সে উপস্থিত হয়েছে। এক নারকীয় হাসিতে নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে খানখান হয়ে গেল।

পেখম চিৎকার করে উঠল, “আমরা আপনাকে মুক্তি দিতে এসেছি, আপনার প্রতিশোধ অনেক আগেই পূর্ন হয়েছে। নির্দোষ মানুষদের হত্যা করে নিজের পাপ আর বাড়াবেন না। ”

“আমার কাজ শেষ হওয়া না অব্দি আমি কোথাও যাবো না আর আমাকে যে আটকাতে আসবে তার পরিণতি হবে মৃত্যু।” গর্জন করে ওঠে অনামিকা।

“আপনি অর্কর কোনো ক্ষতি করতে পারবেন না। ওনাকে আমি বাঁচাবো, আমি ভালোবাসি ও-না……….”

পেখমের কথা শেষ হল না, আচমকা কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক প্রবল ঘূর্ণিঝড় উঠে এল নীচের অন্ধকার থেকে, সেটা আমাদের ছিটকে ফেলে দিয়ে পেখমকে টেনে নিয়ে গেল নীচে। এসব দেখেশুনে পঞ্চানন বাবু অজ্ঞান হয়ে গেছেন কিন্তু আমার সেদিকে ভাবলে চলবে না, ওনাকে এক জায়গায় শুইয়ে রেখে আমি দৌড়ে গেলাম কালকুঠুরীর দিকে। আমাকে অনামিকাকে শেষ করে পেখমকে সুস্থ শরীরে ফিরিয়ে আনতে হবে আর সবটা করতে হবে খুব দ্রুত ও একাকী। আমাকে পারতেই হবে, একটা রোখ চেপে গেল আমার।

সিড়িগুলো ক্রমশঃ এঁকেবেঁকে নেমে গেছে নীচের দিকে। যত নামছি এক অজানা বিভীষিকা ঘিরে ধরছিল আমায়। প্রত্যেক বাঁকের মুখে আমার জন্য এক একটি বিপদ অপেক্ষা করে ছিল। কখনো এক বিশাল ময়াল সাপ, আর কখনো বা জ্বলন্ত আগুনের গোলা, কয়েকবার তো পা পিছলে পড়ে গিয়ে যথেষ্ট চোট পেলাম। সবই অনামিকার মায়া, কিন্তু দমে যাওয়ার পাত্র আমি নই। ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে নীচে নেমে দেখলাম এক নীলাভ আভায় কালকুঠুরী উদ্ভাসিত হয়ে আছে আর কুঠুরীর ঠিক মাঝখানে একটা বিশাল মজে যাওয়া কুঁয়োর পাশে পেখম অচৈতন্য হয়ে পড়ে আছে। আমার স্বপ্নের মত এই কুঁয়োর ভেতর থেকে অসংখ্য নারীর সম্মিলিত আর্তনাদ উঠে আসছে। বুঝতে পারলাম এই কুঁয়োর গহ্বরেই লুকিয়ে আছে সব রহস্য আর তাই প্রতি রাতে আমি এই স্বপ্ন দেখেছি। হঠাৎ এক প্রচন্ড ধাক্কায় বেশ কিছুটা এগিয়ে গেলাম, এক চুলের জন্য কুঁয়োয় পড়ার থেকে বেঁচে যাই আমি। পিছনে তাকিয়ে দেখি অনামিকা, কি হিংস্র তার রূপ, আমাকে মারতে সে বদ্ধ পরিকর।

“কি চিনতে পারিস এই জায়গা। নির্দোষ মেয়েদের সর্বনাশের পর খুন করে ফেলে দিতিস ঐ কুঁয়োতে, আর আমাকে তো জীবন্ত ফেলে দিয়েছিলিস। আজ তোরও একই পরিণতি হবে হা হা হা।”




ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে থাকে সে আমার দিকে, তার হাতে একটা লম্বা লাঠি, উদ্দেশ্য আমাকে মেরে কুঁয়োতে ফেলে দেওয়া। এক পা এক পা করে পিছোতে লাগলাম কুঁয়োর দিকে। নাহ আর মনে হয় বাঁচার কোনো আশা নেই, মা ঠাকুমা আর পেখমের মুখটা ভেসে উঠলো, ঝাপসা হয়ে উঠল চোখজোড়া। মৃত্যু এখন আমার সামনে, লাঠিটা উদ্যত যে কোনো সময় নেমে আসবে আমার মাথায়। আর সহ্য করতে পারলাম না, চোখ বুজে ফেললাম।

কিন্তু এ কি মাথায় আঘাতের বদলে হাতে সজোরে টান অনুভব করলাম আমি আর ছিটকে গিয়ে পড়লাম কুঁয়োর ধার থেকে বেশ কিছুটা দূরে। চোখ খুলে তাকিয়ে বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে যাই আমি, পেখম উঠে দাঁড়িয়ে আছে সামনে। অনামিকার হাত থেকে লাঠিটা কেড়ে নিয়ে তার পথ রোধ করেছে, দুষ্টের দমনে মহিষাসুরমর্দিনী রূপ তার। তীব্র রাগে তার দিকে দৌড়ে আসে অনামিকার কঙ্কাল, একটু পাশে সরে গিয়ে তার পা লক্ষ্য করে সজোরে এক আঘাত হানে পেখম। টাল সামলাতে না পেরে সোজা গিয়ে পড়ে কুঁয়োয়।

এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল পেখম, তড়িৎ গতিতে শাড়ির আঁচল ছিড়ে জড়িয়ে নেয় লাঠির মাথায়। দেশলাই ছিলই তার সাথে, অগ্নিসংযোগ করে কাপড়খন্ডে, জ্বলে ওঠে মশাল। সাথে সাথে সেটা ছুঁড়ে মারে কুঁয়োর গহ্বরে, দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে অনামিকার পার্থিব জীবনের শেষাংশ, একটা হাহাকার অনেক নীচ থেকে উঠে এসেই মিলিয়ে যায়, তারপর সব শান্ত। এর সাথেই সমাপ্ত হয় সমস্ত প্রতিশোধ, রাগ, ঘৃণা ও অভিশাপ।

উঠে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম পেখমকে, আরও একবার আমার প্রাণরক্ষা করল সে। আমার বুকে মাথা গুজে দিল সে, মুখে তার যুদ্ধজয়ের হাসি। সব অন্ধকার পিছনে ফেলে পেখমের হাত ধরে উপরে উঠে এলাম আমি। পূবাকাশ তখন লালচে হতে শুরু করেছে, এক নতুন দিনের সুচনায় আবারো অশুভশক্তির বিনাশে শুভশক্তির জয়গান ধ্বনিত হয়।

কয়েক মাস পর সেই রাজবাড়িটা সংস্কার করে এক সরকারি হাসপাতাল তৈরি করা হয়। এতদিন প্রতাপগড় গ্রামে উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে অনেক প্রসূতি মারা গিয়েছেন নয়তো বা সন্তানের ক্ষতি হয়েছে। আজ থেকে সেই চিন্তা দূরীভূত হল। একদিন যে রাজবাড়িতে এক মা তার সন্তানকে হারিয়েছিলেন আজ সেই বাড়ি সকল মাকে তাদের সুস্থ সন্তান ফিরিয়ে দিচ্ছে। অনামিকার অতৃপ্ত মাতৃত্ব যেন আজ এতো সন্তানের মধ্যে পরিপূর্ণতা লাভ করেছে আর উনি যেখানেই থাকুন আশির্বাদ করে চলেছেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে।

 

।। সমাপ্ত।।

 

অতৃপ্ত মাতৃত্ব ( দ্বিতীয় পর্ব )

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 2   Average: 4/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।