অনন্যা

গল্পের নাম-অনন্যা

লেখক-ভিক্টর ব্যানার্জী

 

বিত্ব আমার আসে না। যতবারই কবিতা লেখার চেষ্টা করেছি সেটা বিচ্ছিরি রকমের ছন্দমার্কা একটা কিম্ভূতকিমাকার প্রবন্ধ হয়েছে গেছে। যেটা পড়লে লোকে ‘ওয়াক্ থু’ বলে লোকে ডাস্টবিনে ফেলে দেবে। তাই কবিদের আমি ভীষণ সম্মান করি। আমি যা পারি না অন্য কেউ সেটা পারলে  তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়ে যায়।
সে যাইহোক, আসল ঘটনা বলি। কলেজের প্রথমদিন প্রথম ক্লাসেই  আমি দেরী করে ঢুকলাম।
প্রফেসর ইন্দ্রানী ম্যাডাম বললেন—“আসার কি দরকার ছিল।”
বললাম—“সরি ম্যাডাম। জীবনে অার লেট হবে না।”
তিনি বললেন—“ক্লাস তো অর্ধেক হয়ে গেছে। ঠিক আছে এসো।”
যাইহোক,আমি লাস্ট বেঞ্চে গিয়ে বসলাম। দেখলাম পাশে একটা ভালো দেখতে মেয়ে বসে আছে। ক্লাসে তার মন নেই,পুরো আমার মতো।
ক্যাবলার মতো বললাম—“আমি বসন্ত,তোমার নাম?”
সে তো পুরো চেটে দিল—“বাহঃ। ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত।”

 




 

চুপ করে গেলাম। বুঝলাম এ নাম বলবে না। যাক গে, পরে ঠিক জেনে যাব,এই ভেবে একটা খাতা বার করে প্রফেসরের মুখের দিকে এমন ভাবে চেয়ে রইলাম যেন সব বুঝে গেছি। আর মাঝেমধ্যে আড়চোখে বঙ্গললনাটির দিকে তাকাচ্ছি। সে যে অত্যন্ত ছ্যাবলা তা পরে জানলাম।
ক্লাস শেষে সব বন্ধুদের সামনে বলল—“দ্যাখো সবাই, এই কাঠফাটা গরমে আমি ঘামিনি কেন জানো?”
সকলে বলল—“কেন?”
সে বলল—“আমার পাশে বসন্ত বসে আছে।”
আমি বুঝলাম নিজের সহপাঠী প্রথমদিনই কাঠি করছে। আমি কিছু বললাম না। তারপর থেকে মাঝেমধ্যেই আমার নাম নিয়ে মস্করা করত। মেয়েটির নাম অনন্যা। সুতরাং কিছু বলার নেই।
এই ভাবেই চলছে। তো একদিন ক্যান্টিনে বসে চা খাচ্ছি,অনন্যা এসে হাজির।
বললে—“এই যে বসন্ত কুমার একটু সময় হবে আপনার?”
বললাম—“কি দরকার?”
সে মিষ্টি করে হেসে বললে—“বেড়াতে যাবো।”
আমি অবাক হয়ে বললাম—“আমার সাথে?”
—“না তো কি আমার বাবার সাথে।”
চায়ের ভাঁড় ফেলে ব্যাগ কাঁধে কলেজ কাট মেরে বেড়িয়ে পড়লাম।
অনন্যার পাশে আমি! যেন নায়িকার পাশে পেমেন্ট না পাওয়া ক্যামেরাম্যান। মন্থর গতিতে হাঁটতে হাঁটতে কলেজের পিছনে একখানা কৃষ্ণচূড়া গাছের তলায় গিয়ে দুজনে বসলাম। এদিকটা কেউ তেমন আসেনা। অনন্যা বলল—“অ্যাই তুমি কবিতা পড়ো?”
বললাম—“হুমম্ পড়ি।”
—“কার কবিতা সবচেয়ে ভালো লাগে?”
—“সুকুমার রায়ের।”

 




 

—“ধ্যাত্,কি সব আবোল তাবোল পড়ো! কোথায় জীবনানন্দ পড়বে! জয় গোস্বামী পড়বে! তা না, যতসব রামগরুড়ের ছানা!”
বললাম—“হঠাৎ কবিতার কথা বলছো? তুমি বুঝি কবিতা লেখো?”
সে আমার দিকে বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল—“কি করে বুঝলে?”
—“জীবনানন্দ শুনেই বুঝে গেছি।”
—“এক মিনিট দাঁড়াও।”
বলে ব্যাগ থেকে একখানি ডায়রী বার করে বলল—“আমার নিজের লেখা,পড়ে দ্যাখো। নাকি আমি শোনাবো?”
এই বলে তিনি উত্তরের অপেক্ষা না করেই কবিতাগুলো শোনাতে আরম্ভ করল। প্রথমটা একটু বোরিং মার্কা লাগছিল,কিন্তু মন দিয়ে শোনার পর মুগ্ধ হয়ে গেলাম। কি অসাধারণ সমস্ত লাইন তার কলমের ডগা থেকে বেরিয়েছে।
বললাম—“বাহ্। কি ভালো লেখো গো তুমি! এই আমায় রোজ একটা করে কবিতা শুনিও।”
সে বললে—“আমি কিন্তু রোজ লিখি না। মাঝেমধ্যে মুড হলে লিখি।”
এই ভাবে বেশ ভালোই কাটছিল। সময় পেলেই তার ডায়রীর পাতা থেকে দু চার কলি শুনতে পেতাম। ধীরে ধীরে অনন্যার সাথে একটা মিষ্টিমধুর প্রেমের সম্পর্ক তৈরী হয়ে গেল। তবে দেখলাম কবিতা যারা লেখে তারা সরাসরি মুখ ফুটে ভালোবাসার কথাটা বলতে পারে না। অগত্যা আমিই তাকে বলে ফেললাম। কাঠখোট্টা রকমের প্রোপস হয়ে গেল। আসলে মনের কথাটা তো কোনদিনই গুছিয়ে বলতে পারিনি। তাই কেমন যেন বেখাপ্পা শোনাল। অনন্যা তো  হেসেই খুন।
বলল—“এই জন্যই তোমার কিছু হল না।”
প্রোপস তো করলাম,কিন্তু কবির কাছে দু কলি দুর্বোধ্য কবিতার লাইন ছাড়া কোনো সদুত্তর পেলাম না। বুঝলাম আমার প্রেমের প্রদীপ নিভে গেল।
মুখ ফুটে ভালোবাসার কথাগুলি না বলায় বুঝলাম,হয় তার মনে কোনো প্রেম নেই, নয়তো আমিই ভালোবাসতে জানিনা। তাই একবার খিল্লি হয়ে গেছে বলে আর এগোলাম না।
দেখতে দেখতে কলেজের গন্ডি পেরিয়ে বাবার ব্যবসায় যোগ দিলাম। কলেজ পাশ করার পর অনন্যার সাথে আর কোনো যোগসূত্র রইল না। কদাচিৎ বন্ধু বান্ধবের সাথে দেখা হয়। কিন্তু অনন্যার সাথে হয় না। এই ভাবে পাঁচটা বছর কখন যে নিমেষের মধ্যে কেটে গেছে তা টেরই পাই নি। আমি তো নিশ্চিত, কবিস্বভাবা অনন্যা আমায় ভুলে কোনো ধনী পুরুষের বুকে মাথা রেখেছে।
যাইহোক,একদিন হঠাৎ করে কলেজের বন্ধু বীরেশ্বরের সাথে দেখা। বললাম—“কি রে ভাই,কেমন আছিস।”
সে আমায় চিনতে পেরে বুকে জড়িয়ে ধরল। বলল—“কতদিন পর দেখা ভাই। তোর ফোন নম্বর দে।”
কলেজে পড়ার সময় আমাদের কারো ফোন ছিল না,তাই যোগসূত্রগুলোও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। আমি পকেট থেকে মোবাইল খানা বার করে ওকে মিসড্ কল দিলাম। ও আমার নম্বর সেভ করে রাখল। বললাম—“হ্যাঁরে অনন্যার খবর জানিস?”
বলল—“না রে ভাই। তবে ওর বাড়িটা জানি। যাবি?”

 




 

বললাম—“সে কি আর ওই বাড়িতে আছে!দ্যাখ গে যা,বিয়ে টিয়ে হয়ে গেছে,শ্বশুরবাড়ি চলে গেছে।”
বীরেশ্বর বলল—“চল না,গিয়ে তো দেখি।”
রাজি হয়ে গেলাম। মনের মধ্যে কেমন একটা ব্যাপার হচ্ছে,যেটা বীরেশ্বরকে বোঝাতে পারছি না। অটোয় চড়ে বেলুড়ে গেলাম। তারপর অনেকগুলো অলি গলি পেরিয়ে একটা পুরোনো একতলা বাড়ির কাছে এসে বীরেশ্বর কলিংবেল টিপল। সঙ্গে সঙ্গে একজন ভদ্রমহিলা দরজা খুলে বললেন—“কি চাই?”
বীরেশ্বর বলল—“অনন্যা আছে?”
তিনি বললেন—“হ্যাঁ আছে,ভেতরে আসুন।”
এরপর জুতো খুলে ভেতরে যেতেই উনি আমাদের কোণের দিকের একটা ঘরে নিয়ে গেলেন। যা দেখলাম,তা স্বপ্নেও ভাবিনি! একখানা আধময়লা নাইটি পড়ে আলু থালু চুলে জানলার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে সে। মুখের সেই লাবণ্য কোথায় মিলিয়ে গেছে! চোখদুটো কেমন ঘোলাটে ধরণের হয়ে গেছে। আমাদের দেখে চিনতেই পারল না। ভদ্রমহিলা বললেন—“গত পাঁচ বছর ধরে ওর চিকিৎসা চলছে। একটুও সুস্থ হল না। শুধুই একটা গান গায়—

“তুমি মনে করো আমি নেই
বসন্ত এসে গেছে
কৃষ্ণচূড়ার বন্যায়
চৈতালি ভেসে গেছে—-”

হঠাৎ খেয়াল করে দেখলাম,বিছানার একপাশে তার কবিতার সেই ডায়রীখানা ওল্টানো অবস্থায় রয়েছে।

———–

১৩ই বৈশাখ ১৪২৭
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ©ভিক্টর ব্যানার্জী

 




গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 0   Average: 0/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।