অবুঝ মন

অবুঝ মন

অবুঝ মন
– মুক্ত বিহঙ্গ

শীতকাল, রবিবারের নিস্তব্ধ অলস দুপুর৷ বহুতল আবাসনের ছোট ফ্ল্যাটের বেডরুমের জানলা দিয়ে ফালি ফালি রোদ ঢুকে ঠান্ডা বিছানাটায় উত্তাপ ছড়িয়ে দিচ্ছে অল্প অল্প। ছেলেটা একা একা শুয়ে কী একটা বাংলা উপন্যাস পড়ছে৷ না, একা নয়৷ মেয়েটা পাশেই বালিশে হেলান দিয়ে বসে ল্যাপটপ নিয়ে কী করছে যেন! বোধহয় Netflix বা primevideo দেখছে। অনেকক্ষণ ধরেই খুব চুপচাপ ওরা, কোনো কথা বলেনি কেউই বেশ কিছুক্ষণ হয়ে গেছে৷

বহুবছর পরে কোলকাতায় শীতটা এরকম জাঁকিয়ে পড়েছে৷ ভোরবেলা ঘুম ভাঙ্গার পর থেকেই মনটা একটু বেড়িয়ে পড়তে চাইছিল ছেলেটার, তাই মনে মনে একটা রোম্যান্টিক লংড্রাইভের পরিকল্পনা করে বেশ খুশিই ছিল। মেয়েটাও শুনে খুব খুশি। চটজলদি ফ্রেশ হয়ে নিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বেড়িয়ে পড়বে ওরা, সকালের চা’টাও বাইরে কোনো ধাবায় বসে খাবে।

কিন্তু বাধ সাধল মেয়েটার অফিসের কাজ।

Information Technology নিয়ে engineering পাশ করে পরবর্তীকালে MBA করা মেয়েটা একটি বেসরকারি বহুজাতিক সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মচারি। শনি – রবি ছুটি থাকলেও বিদেশী ক্লায়েন্টের চাহিদা পূরণ করতে অনেক সময়েই ছুটির দিনেও কাজ করতে হয়, এমনকী কখনো কখনো বিনা নোটিশে। সেরকমই একটা কারণে হঠাৎ উপরমহল থেকে চাপ এসে যাওয়ায় সকাল আটটা নাগাদ কাজে বসতে বাধ্য হয় মেয়েটা। সেই থেকেই ছেলেটার মুখ গোমড়া।

মেয়েটা কাজে বসার পরে ঘরের কিছু টুকটাক কাজ সারা, ব্রেকফাস্ট বানিয়ে মেয়েটাকে খেতে দেওয়া, নিজে খাওয়া – সেসব করেও সময় কাটেনা ছেলেটার। আগের দিনের ডাল, তরকারী ফ্রিজ থেকে বের করে রেখে ভাত বসিয়ে স্নানে যায়। এসে ভাতটা নামিয়ে তরকারি আর ডালটা গরম করে।

“বেলা সাড়ে বারোটা বাজে, এখনো কাজ শেষ হয় না!” – মনে মনে বেশ বিরক্ত হয় ভদ্রস্থ বেতনের সরকারী চাকরীজীবি ছেলেটা। “সপ্তাহের শেষে ছুটির দিনেও কাজ কিসের কে জানে! শালা, সব প্ল্যান মাটি।” – মনে মনে গজগজ করতে থাকে ও; খুব রাগ হতে শুরু করে মেয়েটার উপরে – “চাইলে কি কাটিয়ে দেওয়া যেত না?!”

অবশেষে আরো ঘন্টাখানেক পরে যখন মেয়েটার কাজ শেষ হল, হাঁফ ছেড়ে বাঁচল ও। একটানা প্রায় পাঁচ-ছ’ঘন্টা ধরে কাজ করতে হলো রবিবার সকালে, মাথাটা ঘেঁটে রয়েছে। উঠে চোখেমুখে জলের ঝাপটা দিয়ে একটু হালকা লাগছে তাও, জোর করেই মুড ভালো করার জন্যে ছেলেটার কাছে গিয়ে আব্দারের সুরে বলল – “চল, লাঞ্চটা বাইরে কোথাও করে আসি। তুই জলদি চেঞ্জ করে নে, আমি এক্ষুনি রেডি হয়ে নিচ্ছি।”

ছেলেটা ইতিমধ্যে দুপুরের খাবার তৈরী করে অপেক্ষা করছিল কখন মেয়েটার কাজ শেষ হবে, আর ওরা খেতে বসবে। মেজাজ এমনিতেই বিগড়ে রয়েছে, এখন বাইরে লাঞ্চের কথা শুনে হঠাৎ করে বিশ্রীভাবে খেঁকিয়ে উঠলো – “এতো বেলায় বেরিয়ে খেতে গেলে খেতে খেতে ক’টা বাজবে জানিস? আর বাড়ির খাবারগুলো কি কুকুর বেড়ালকে খাওয়াব?”

“এইভাবে কথা বলছিস কেন তুই!!” – অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে মেয়েটা। ছেলেটা আরো কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে যায়, মুখে একরাশ বিরক্তি আর রাগ নিয়ে খাওয়ার আয়োজন করতে শুরু করে।

তারপর থেকেই কথা বন্ধ দুজনের। চুপচাপ খেয়ে উঠে যায় দুজনেই; টেবিল মোছা, এঁটো বাসন গুছিয়ে রাখা ইত্যাদি কাজগুলো স্বভাব মতোই করে ফেলে ওরা। সব কাজ সেরে ছেলেটা চুপচাপ একটা বই নিয়ে শুয়ে পড়ে, আর মেয়েটা কী করবে ঠিক করে উঠতে পারেনা। হঠাৎ করেই মনটা খুব ভারী হয়ে আসে ওর। ছেলেটাকে কিছু একটা বলতে চেয়েও বলতে পারেনা, বিছানায় গিয়ে ছেলেটার পাশে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে বসে থাকে। একটু পরে একটা বই নিয়ে পড়ার চেষ্টা করে, কিন্তু মন বসছে না কিছুতেই। আবার ল্যাপটপ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায় ও।

“এরকমভাবে react করাটা মোটেই উচিত হয়নি। একসাথে লংড্রাইভে যাবার কথা শুনে ওর খুশি কি একটুও কম হয়েছিল? বরং সারাসপ্তাহের কাজের চাপ সামলে রবিবারের সকালে এরকম একটা প্ল্যান – ও হয়তো আরো বেশীই খুশি ছিল। যেতে তো পারলো না, তার উপরে এতক্ষণ ধরে মাথা গুঁজে কাজ করতে হল বেচারীকে।” – হঠাৎ করেই নিজের উপর খুব রাগ হয় ছেলেটার। বইটা বন্ধ করে পাশে রেখে মেয়েটার দিকে তাকায়। মেয়েটা একবার ওর দিকে তাকিয়ে চোখ ঘুরিয়ে নেয়, আবার মনোনিবেশ করে ল্যাপটপে। ছেলেটা কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে মৃদুস্বরে ডেকে ওঠে – “গোদলু…”

মেয়েটা না শোনার ভান করে, চোখ সরায় না ল্যাপটপ থেকে। ছেলেটা আরো কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকে, ওর বুকের মধ্যে একটা চাপা কষ্ট শুরু হচ্ছে এবার। কোল থেকে ল্যাপটপটা নিয়ে বন্ধ করে পাশে রেখে মেয়েটার বুকে মুখ গুঁজে শুয়ে পড়ে ও। অস্ফুটে একবার বলে ওঠে – “I’m truly sorry, গোদলু।”

মেয়েটা ওর ঘন কোঁকড়া চুলের মধ্যে হাত বোলাতে বোলাতে মাথাটা টেনে নেয় মুখের কাছে, কপালে একটা ছোট্ট চুমু খায়।
– “হেবলু একটা! চল, এখন বেরোই দুজনে। এখনো অনেক সময় আছে।”
– “একটু পরে। এখন একটু এইভাবে শুয়ে থাকি তোর বুকে মাথা দিয়ে… আদর কর আমাকে আরেকটু।”

চারিদিকে অন্ধকার হতে শুরু করেছে। শীতকালে একটু আগে আগেই সন্ধ্যা নামে অবশ্য। তা নামুক, ক্ষতি কী! শীতের সন্ধ্যায় আলো ঝলমলে মহানগরীও তো কম রোম্যান্টিক নয়…

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 2   Average: 4/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
close