অলকা

গল্পের নামঅলকা

লেখক—ভিক্টর ব্যানার্জী

 

বিনি মা-মরা মেয়ে। ছোটো থেকেই দিদির কাছে মানুষ। বাপের একখানা ছোটোখাটো মুদির দোকান আছে। বিনি এবার আট পেরিয়ে ন’য়ে পড়েছে। ক্লাস ফোরে পড়ে। দিদির বয়স ষোলো। বিনি হতে গিয়েই ওর মা মরে গেল। মায়ের মুখখানা সে শুধু ছবিতেই দেখেছে। আসলে মায়ের স্নেহ ভালোবাসা এগুলো সব দিদির থেকেই পায়।
সেদিন বাড়ির উঠোনে একা একাই এক্কা-দোক্কা খেলছিল। এমন সময় একটা লোক এসে বিনিকে জিজ্ঞেস করল—“আচ্ছা এটা কি দীনদয়াল বাবুর বাড়ি?”
বিনি চট্ করে খেলা থামিয়ে লোকটাকে বলল—“আমার বাবা তো। আপনি দাঁড়ান আমি ডেকে দিচ্ছি।”
তারপর দৌড়ে গিয়ে বাবাকে ডাকতে চলে গেল। এই লোকটা আজ প্রথম এ গ্রামে এসেছে। বছর কুড়ি-একুশ বয়েস। লোক না বলে ছোকরাই বলা চলে। গ্রামীণ ব্যাঙ্কে চাকরি জুটিয়ে এ গ্রামে পোস্টিং হয়েছে। বেশীক্ষণ দাঁড়াতে হল না। দীনদয়াল বাবু নিজেই এসে উপস্থিত হলেন। তারপর বললেন—“কি চাই মশাই?”

 




 

ছেলেটি একগাল হেসে বলল—“আমার নাম তীর্থঙ্কর। এই গ্রামীণ ব্যাঙ্কে নতুন চাকরি নিয়ে এসেছি। শুনলাম নাকি আপনি বাড়ি ভাড়া দেন।”
দীনদয়ালবাবু যেন ভাড়াটেই খুঁজছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ছেলেটিকে ভেতরে নিয়ে গেলেন।যাইহোক থাকার বন্দোবস্ত হয়ে গেল। বিনির দিদি অলকা দরজার আড়াল থেকে নতুন ভাড়াটেকে দেখল।মাঝারি গড়ন, ফর্সা গায়ের রং আর মুখের মধ্যে একটা কেমন হাসি-খুশি ব্যাপার রয়েছে ছেলেটার।

 

 

আজ তিনদিন হল তীর্থ’র কাছে পড়তে আসে ছোট্ট বিনি। দীনদয়ালবাবু তীর্থকে অনুরোধ করেছিলেন তার দু-মেয়েকে যেন তীর্থ টিউশন পড়ায়। সেও রাজি হয়ে গেল। বিনি এসেছে কিন্তু তার দিদি আসেনি একদিনও। কিন্তু সেদিন হঠাৎ করেই অলকা এসে ঢুকল তার ঘরে। হাতে একখানা খাতা অঙ্কের বই আর পেন। তীর্থ হেসে বলল—“এসো, বসো। তারপর বল পড়াশোনা কেমন চলছে?” এই বলে চেয়ারটা বাড়িয়ে দিল। অলকা মাথা নিচু করে বলল—“ভালো।” তারপর অঙ্কের বইটা খুলে দুটো দাগ মারা অঙ্ক দেখিয়ে বলল—“এগুলো একটু করে দেবেন মাস্টারমশাই।”
তীর্থ ভালো করে দেখে নিয়ে খুব তাড়াতাড়ি অঙ্কগুলো সলভ্ করে দিল। তারপর ধীরে ধীরে অলকাকে স্টেপ বাই স্টেপ বুঝিয়ে দিল। অলকা মনে মনে ভাবে—‘কই এত ভালো করে তো স্কুলের দিদিমণিরাও বোঝায় না।’

 




 

তারপর দু খানা একই রকম অঙ্ক দিয়ে তাকে বলে—“ নাও এখন এগুলো কর তো দেখি।”
এমন সময় বিনি ঢোকে পড়ার ব্যাগটাকে দোলাতে দোলাতে। দিদিকে পড়তে দেখে সে আশ্চর্য হবার ভান করে বলে—“দিদি তুইও পড়বি আমার সাথে?” তারপর আনন্দে নেচে উঠে বলে—“বাহ্। কি ভালো হবে দুজনে একসাথে পড়ব।”তীর্থ হেসে ফেলে ওর কান্ড দেখে। তারপর ছোট্ট বিনিকে কোলে বসিয়ে আদর করে ফোর ক্লাসের বিজ্ঞান পড়াতে শুরু করে। অলকা অবাক হয়ে দেখতে থাকে তীর্থ কেমন আদর করে নিজের মতো করে বিনিকে পড়াচ্ছে। মনটা খুশিতে ভরে ওঠে তার। বিনিকে কেউ আদর করলে অলকার খুব আনন্দ। আগের জন্মে ওর মা ছিল হয়তো।

 

 

সরস্বতী পুজোয় শাড়ী পড়ে বিনি এল তীর্থকে প্রণাম করতে। পরের সপ্তাহে বদলি হয়ে যাবে তীর্থ। বিনি জানে না। বদলির খবরটা দীনদয়ালবাবুকে জানিয়ে দিয়েছে তীর্থ। ছোট্ট বিনিকে শাড়ী পড়ে কি মিষ্টি লাগছে! বিনিকে কোলে তুলে নেয় তীর্থ। বলে—“কত্ত সুন্দর লাগছে তোমায়! কোথায় যাচ্ছ?”
বিনি বলে—“স্কুলে যাচ্ছি। জানো মাস্টারমশাই আজ স্কুলে খাওয়াবে।”
—“তাই নাকি!”
তারপর কোল থেকে নামিয়ে টেবিলের ওপর রাখা একটা লজেন্স দেয় বিনির হাতে। বিনি চলে যায়। আজ দুদিন হল অলকা আসেনি। খোলা জানলার দিকে দাঁড়িয়ে তীর্থ ভাবতে থাকে—‘আবার নতুন জায়গা আবার নতুন মানুষ।’

 




 

এইসব ভাবতে ভাবতে এমন সময় দীনদয়ালবাবু ঢুকলেন তার ঘরে। তীর্থ আলনায় ঝোলানো প্যান্টের পকেট থেকে গুনে গুনে দশটা একশো টাকা নোট তার হাতে দিয়ে বলল—“এ নিন এ মাসের বকেয়া ভাড়াটা মিটিয়ে দিলাম।”
দীনদয়ালবাবু জিজ্ঞাসা করলেন—“কবে যাচ্ছেন মাস্টারমশাই?”
তীর্থ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—“পরের বুধবার চলে যাব। বৃহস্পতিবার থেকে আবার জয়েনিং।”
দীনদয়ালবাবু ভেতর থেকে একবাটি পায়েস এনে তীর্থ’র হাতে দিয়ে বলল—“এই নিন বড় মেয়েটা পায়েস বানিয়েছে। একটুখানি খান।”
তীর্থ পায়েসের বাটিটা আস্তে করে টেবিলে রেখে বলল—“আচ্ছা অলকাকে দেখলাম না তো?”

 

 

বারো বছর কেটে গেছে। বিনি ক্লার্কসিপ পরীক্ষায় পাশ করেছে। আজ তার জয়েনিং। পোস্টিং হয়েছে লেবুতলার গ্রামীণ ব্রাঞ্চে। একটা হালকা কমলা রঙের শাড়ী পড়ে ব্যাঙ্কে ঢুকল সে। ম্যানেজার সকলের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। হঠাৎ করে লোন ডিপার্টমেন্টে তীর্থকে দেখে সে চমকে উঠল। তারপর কাছে গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল।
তীর্থ প্রথমটায় ঠিক চিনতে পারল না। তারপর পরিচয় দিতে অবাক হয়ে বলল—“ আরে তুমি! বলো কি খবর?”
ব্যাঙ্কের সকলে অবাক হয়ে গেল। বিনি সকলের সামনে বলল—“আমার মাস্টারমশাই! ছোট বেলায় কত আদর করে পড়াতেন। আমি তো ভাবতেই পারছি না আমি আপনার সাথে চাকরি করব।”আস্তে আস্তে সকলে যে যার কাজে চলে গেল। বিনি ম্যানেজারের কাছে কাজের দায়িত্ব বুঝে নিয়ে আবার এসে বসল তীর্থর টেবিলে। তীর্থ এখন আর ছেলে নেই একটা লোক সে। কিন্তু আগের মতোই হাসি-খুশি।
তীর্থ কৌতূহলের সাথে বলল—“বাড়ির সবাই কেমন আছে? অলকার খবর কি?”
বিনি কেমন যেন চুপ করে গেল, তারপর মাথানিচু করে বলল—“গেল বছরে বাবা মারা গেলেন। আর দিদি এখন মেন্টাল হসপিটালে। আপনি চলে যাবার পর থেকেই কেমন গুম্ হয়ে বসে থাকত! শেষদিকটায় বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে গিয়েছিল। জানেন মাস্টারমশাই খালি আপনার নাম ধরে ডাকত!”

____

২০শে চৈত্র ১৪২৬
সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত © ভিক্টর ব্যানার্জী

 




গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total:    Average: /5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।