অশরীরী প্রেম

#গল্প —- #অশরীরী_প্রেম

#লেখক — #কৃষ্ণ_গুপ্ত

 

সেদিন সিঁথির মোরের সামনে সিগনালে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে হল জুঁই কে দেখলাম। চোখের ভুল ও হতে পারে। সঙ্গে একজন স্বাস্থ্যবান পুরুষ। বোধহয় ওর স্বামী হবেন।
একটা ডায়গোনস্টিক সেন্টার থেকে বেড়িয়ে দমদমের অটো ধরতে যাচ্ছে। নিশ্চিত হবার জন্য সিগনাল সবুজ হতে বাইক টা স্লো করে দিলাম। বেশ কিছু টা এগিয়ে গিয়ে আয়না তে দেখে নিশ্চিত হলাম যে, ওটা জুঁই ই।

মনের মধ্যে হঠাৎ একটা যন্ত্রণা দলা পাকিয়ে উঠতে লাগল। বাইক টা আর স্টার্ট দিতে পারলাম না। হাত কাঁপতে লাগল। ইচ্ছা হল সামনে গিয়ে দাঁড়াই। এত দিনের অনেক কথা জমা হয়ে আছে। কিন্তু মন সায় দিল না। আফটার অল, সে এখন অন্য লোকের স্ত্রী।

অটো টা পুরো যাত্রী হয়ে যাওয়ায় ছেড়ে দিল। নিজের অজান্তে যেন আমার বাইক ও এগিয়ে চলল। না, গড়িয়া হাটে নিজের বাড়ির অভিমুখে না, জুঁই এর অটোর পিছন পিছন। এ যেন এক অমোঘ মানসিক টান, যা আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কেমন যেন সম্মোহিত হয়ে আমি এগিয়ে চললাম।

সাউথ সিঁথি রোডের একটা একতলা বাড়ির সামনে অটোটা থামল। ওরা দুজন নেমে ভিতরে চলে গেল। আমি দূর থেকে বাইক ঘুরিয়ে আমার গন্তব্যে চললাম।
সে দিন রাতে আর ঘুমাতে পারলাম না। পুরানো স্মৃতি এসে মনকে ভারাক্রান্ত করতে লাগল। মনে পড়ে গেল কলেজ জীবনের কথা। সেই জয়পুরিয়া কলেজ, হেদোয়ার বাঁধানো পাড়, কলেজ স্ট্রিটের বই পাড়া কিংবা ময়দানের বই মেলা। সেই এক সঙ্গে ফুচকা খাওয়া, গা ঘেঁষাঘেঁষি করে পথ চলা। ছোট ছোট মান অভিমান কিংবা নন্দন চত্তরে একটু উষ্ণতার খোঁজে দুজনের মিলিত হওয়া। যত ভাবছি, তত বুকটা দুমড়ে মুচরে যেতে লাগল। ঘুম আসল না।

কলেজ পাশ করার পর মাঝে মাঝে দেখা হত দুজনের। কখনো সিনেমা হল, কখনো কফি হাউসে দিন কাটছে। মোবাইল চ্যাটিং তো ছিলই। সুযোগ বুঝে দুজন দুজন কে বাইরে বের হয়ে ফোন ও করতাম। আমি তখন একটা কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টারে ‘ও’ লেভেল নিয়ে পড়াশোনা করছি। সেই সঙ্গে ছোটখাটো কিছু কাজ কর্ম করে রোজগারের চেষ্টা। বাবা ইতিমধ্যে বেসরকারী একটা অফিস থেকে অবসর নিয়েছে। ব্যাঙ্কে গচ্ছিত টাকার সুদে তে দিন যায় না। অভাব টা স্পষ্ট বুঝতে পারছি। বোনের বিয়েও বাকি। মা ও বাতের রোগে পঙ্গু প্রায়। আমি তখন রোজগারের আশায় পাগলের মতন শুধু স্ট্রাগল করছি।
একদিন সন্ধ্যা বেলায় হঠাৎ জুঁই ফোন করল। — মা, বাবা তোমাকে আর্জেন্ট দেখা করতে বলেছে। প্লিজ এস।

শুনে ঘাবড়ে গেলাম। — সে কি! কেন? তোমার বাড়ির লোক কি আমাদের সম্পর্কের কথা জানে?
— হ্যাঁ, আজ জানল, আমিই বলেছি। বাকি কথা সামনা সামনি হবে, কেমন?
মোবাইল টা রেখে চিন্তায় পড়লাম। কি বলবে কে জানে।

পর দিন সকাল দশ টার সময় জুঁই এর দেওয়া ঠিকানা ফলো করে বাগবাজারের একটা দোতলা বাড়ির সামনে গিয়ে কলিং বেল টিপলাম।
বারান্দা থেকে জুঁই ই হাত নাড়ল। তার পর নেমে এসে দরজা খুলে শুকনো হাসি মুখে টেনে দাঁড়াল। থমথমে মুখ টা দেখে বুক টা ধড়ফড় করতে লাগল। প্রায় মাস তিনেক কোন রকম দেখা হয় নি দুজনের। এর মধ্যে কি হল মেয়েটার, যে এরকম বিবর্ণ হয়ে গেছে!
ওর হাত টা ধরলাম সিঁড়ি তে উঠতে গিয়ে। ও আলতো করে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, — বাবার ক্যানসার ধরা পড়েছে। তাই এত আর্জেন্সি।
— ক্যান্সার! — একটা সক খেলাম যেন।

 




 

 

ড্রয়িং রুমে বসলাম গিয়ে গুটি গুটি পায়ে। মিনিট তিনেক পর জুঁই আর ওর মা ওর বাবা কে ধরে ধরে নিয়ে এল।
আমি ওর বাবা, মা কে এই প্রথম দেখলাম, আর প্রণাম ও সারলাম। ওরাও এই প্রথম বার দেখছিল আমাকে। বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে।
দু একটা পরিবার গত প্রশ্নের পরই আসল প্রসঙ্গ এল।
ওর মা ই শুরু করল, — দেখ, তুমি আমার ছেলের মতন। জুঁই এর মুখে সবই শুনেছি। তবে তুমি হয়তো আজকের আগে জানতে না, যে ওর বাবার প্রস্টেট গ্ল্যান্ডে ক্যান্সার ধরা পড়েছে। এর মধ্যে ফোর্থ স্টেজ রানিং। কেমো শুরু হয়েছে। তবে সব টাই ভগবানের হাতে। এ দিকে আমাদের অর্থনৈতিক অবস্হাও বর্তমানে খুব ভাল না। ওর বাবার ডিস্ট্রিবিউটারশিপের ব্যবসা ছিল। নজরদারির অভাবে তা বন্ধ প্রায়। তাই আমরা উঠে পড়ে চাইছি জুঁই এর বিয়েটা কোন মতে তাড়াহুড়ো করে দিয়ে দেবার। জানি না এর পর কোন সিচুয়েশান আসবে।– জুঁই এর মার কথা শুনে মনে হল, বেশ স্পষ্ট কথা বলেন।

আমি শুকনো গলায় বললাম, — ভাল করছেন। ঠিকই তো।
আমার কথায় জুঁই শোকার্ত দৃষ্টি তে আমার মুখের দিকে তাকাল।
— আমি জানতাম, তুমিও এই প্রস্তাবে সায় দেবে। কারণ তুমি জুঁই কে ভালবাস।
জুঁই এর মার কথায় আমি মাথা নিচু করে রইলাম।
— আমি অবশ্য চেয়েছিলাম তোমার হাতে মেয়েকে তুলে দেবার জন্য। কিন্তু তোমার বাড়ির যা কন্ডিশান শুনলাম, তাতে সাহস হল না। আমি অবশ্য খুব ভাল একটা পাত্র পেয়েছি। ব্যাঙ্কে চাকরী করে। মুম্বাই এ পোস্টিং।
জুঁই এর মার কথায় আমার চোখ দুটো ছল ছল করে উঠল।
ভদ্রমহিলা বলতে থাকলেন চিবিয়ে চিবিয়ে। — তো দেখ বাবা, কম বয়সে এরকম প্রেম, প্রীতি সবার জীবনেই আসে। সেটা মনে না রাখলেই ভাল। আশা করি আমি কি বলতে চাইছি, তা তুমি বুঝতে পারছ?
আমি চোখে জলোচ্ছ্বাস নিয়ে মাথা নাড়লাম।
— বেশ খোকা, আশা করি আমার মেয়ের সঙ্গে আর কোন রকম যোগাযোগ রাখবে না। তাতে দুজনেই খুব ভাল থাকবে কেমন?
আমি মাথা নাড়িয়ে উঠে পড়লাম। তারপর মাথা নিচু করেই বেড়িয়ে এলাম। আমার কান্না কাউকে দেখতে দিলাম না।

ফ্ল্যাশ ব্যাকে পুরানো ঘটনা গুলো মনে পড়তেই সে রাত্রে আর ঘুম এল না। বারান্দা তে একটার পর একটা সিগারেট শেষ করে ভোর বেলা বিটি রোডের ধারে আমার নিজস্ব অফিসে চলে এলাম। হ্যাঁ আমি এখন অনেক টাকার মালিক, প্রচুর কর্মচারী, সেলস ম্যান রয়েছে। জুঁই এর বাবার থেকেও বড় একটা ডিলারশিপ নিয়েছি আমি। এখন আমি ইচ্ছা করলে জুঁই এর মার মত দশজনের দশটা আবদার মেটাতে পারি। যদিও বিয়ে টা আর করে উঠতে পারি নি।
ব্যাপার টা কাকতালীয় কিনা জানি না, আজই একটা বিশেষ দরকার পড়াতে আমাকে সাউথ সিঁথি রোডের বড় এক ডিস্ট্রিবিউটারের বাড়ি যেতে হল। ফেরার সময় কেন জানি না, আমার শরীর টা ক্রমশ ভারি হয়ে যেতে লাগল। চোখে মুখে গভীর ক্লান্তি। এর সঙ্গে যেন অদ্ভুত একটা আকর্ষণ আমাকে জুঁই এর বাড়ি পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে চাইছে।
অনেক চেষ্টা করে ও জুঁই এর সঙ্গে প্রায় দশ বছর পর দেখা করার লোভ আমি ছাড়তে পারি নি। তাই আমি রওনা দিলাম। বেলা এগারোটা নাগাদ ওর বাড়ির কাছে পৌঁছে বাইক টা পার্ক করে দুরুদুরু বুকে গিয়ে কলিং বেল টিপলাম। মুহূর্ত খানিক পর দরজা টা খুলল। দেখলাম জুঁই অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে!
–আরে সৌমেন, তু-তুমি এখানে…
— কেমন আছ? গত কাল তোমাকে দেখে নতুন করে আলাপ করার লোভ সামলাতে পারলাম না।
আমার কথায় জুঁই অতি সন্তর্পণে চারদিকে তাকিয়ে দেখে ইশারা তে ভিতরে ডাকল।
সাজানো, গোছানো ড্রয়িং রুমে গিয়ে বসলাম। খেয়াল করলাম জুঁই এই দশ বছরে বেশ মোটা হয়েছে। তবে সৌন্দর্যে ভাটা পড়েনি।
আমাকে বসতে বলে জুঁই মাথার দুপাশে থাকা অবিন্যস্ত চুল গুলো গুটিয়ে খোপা বাঁধল। তারপর চেয়ার টেনে মুখোমুখি বসল। তারপর আমি ওকে সেই থেকে দেখছি দেখে মৃদু শাসন করল।
— কি দেখছ অমন করে?
— তোমাকে, এখন ও তেমন ই আছ সোনা।
— প্লিজ, আমার একটা নাম আছে সৌমেন। এখন আমরা দশ বছর এগিয়ে এসেছি।
— সরি, অনেকদিন পর দেখা হওয়াতে আবেগ টা সামলাতে পারিনি। — আমি ক্ষমা চেয়ে বললাম।
–ছাড় ওসব, যাই হোক, বল তোমরা কেমন আছ? বৌ, বাচ্চা কেমন আছে?
আমি হো হো করে হাসতে লাগলাম। বললাম, –বিয়ে করিনি, আবার বৌ, বাচ্চা!
তোমরা কেমন আছ? বড় কি মুম্বাই থেকে কলকাতা ট্রান্সফার হয়ে এসেছে?
আমার কথায় জুঁই চুপ করে রইল। তারপর বলল–
আমার ঐ বিয়েটা হয় নি সৌমেন। তুমি যেদিন এলে, তার এক মাস পরই বাবা মারা যায়। মা আর আমি অনেক চেষ্টা করেও বাবাকে বাঁচাতে পারিনি। পারিনি বাবার ব্যবসা টাকে ও ধরে রাখতে। ঐ সময় খুব ঝড় গেছিল আমাদের উপর দিয়ে। তোমায় তখন অনেক চেষ্টা করেছি খোঁজার। কিন্তু তুমি বোধ হয় সব পুরানো নাম্বার গুলো নষ্ট করে ফেলেছিলে।
আমি সব শুনেও চুপ করে থাকলাম। তবে এটা সত্যি, জুঁই এর সঙ্গে বিচ্ছেদ যন্ত্রণা সহ্য করতে পারব না বলেই সে বার সব পুরানো সিম নষ্ট করে ফেলি। তার মানে তখনও জুঁই এর বিয়ে হয় নি! তাহলে……
আমি চুপ করে আছি দেখে ওই শুরু করল। — ঐ দুঃসময়ে মামা আমাদের আশা, ভরসা হয়ে উঠল। তিন মাসের মধ্যে মামা আমার বিয়ে ঠিক করল। একজন স্কুল শিক্ষক। তবে বয়সে আমার চেয়ে দশ বছরের বড় আর ডিভোর্সি।
— তারমানে গত কাল যাকে দেখলাম, তিনিই তোমার স্বামী?
— হ্যাঁ, তাই। উনি হার্টের কিছু সমস্যা তে ভুগছেন। তাই কাল ইকো করাতে গেছিলাম।
কথা বলতে বলতে চা নিয়ে এল জুঁই। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, — তুমি বিয়ে করনি কেন?
হেসে বললাম, — মন কে এক জায়গায় গচ্ছিত রেখে কাউকে আর গ্রহণ করা সম্ভব হয় নি।
— খুব ভুল করেছ। শেষ জীবনে একজন সঙ্গীর খুব দরকার সৌমেন। মানুষ খুব অসহায় হয়ে যায়।
আমি চা খেতে খেতে ওর কথা শুনে কিছুটা আবেগ মথিত হয়ে পড়লাম। কিছু মুহূর্তের জন্য চোখ দুটো ভিজে উঠেছিল।
সেদিকে খেয়াল হতেই জুঁই বলল, — নিজেকে বাস্তবে আন সৌমেন। আমরা কিন্তু অনেক গুলো বছর পেড়িয়ে এসেছি। এখন আর কষ্ট পেয় না প্লিজ। আমি কিন্তু আমার স্বামী কে ভীষণ ভালবাসি। সে ও ঠিক তোমার মতনই আমাকে ভালবাসে, আকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। আমরা কিন্তু সুখি দম্পতি।
— আমার মতন! আমি আশ্চর্য হয়ে তাকালাম। আমি কাউকে ভালবাসতে পারি নি জুঁই। যদি তাই হত, তবে তোমাকে পাবার জন্য সেদিন যে ভাবেই হোক একটা বড় রোজগার ঠিক করতাম। ঐ ভাবে অসহায়ের মতন হাত গুটিয়ে চলে আসতাম না। কিছু অন্তত করতাম।
— প্লিজ থাম সৌমেন, এটাতে আর কষ্ট পেয় না। — আচমকা আমার একটা হাত ধরে বলল জুঁই। অনেক দিন পর আমি চেনা স্পর্শ টা পেলাম। তবে মুহূর্তের মধ্যেই ও হাত টা ছাড়িয়ে নিল।
— কি হল, ছাড়িয়ে নিলে?
আমার কথায় জুঁই কোন উত্তর করল না।
আর বিশেষ কথাবার্তা হল না। শুধু আমি উঠতে যাওয়ার সময় ফোন নাম্বার আর হোয়াটস্যাপ নাম্বার টা চেয়ে নিল ও।
সে দিনের পর আমি আর কষ্ট বাড়াতে ঐ মুখো হই নি। মাঝে মাঝে অবশ্য হোয়াটস্যাপে গুড মর্নিং আর গুড নাইট উভয় তরফে আসা-যাওয়া করত। ব্যাস ঐ পর্যন্তই।
তবে ওদের বাড়ি থেকে আসার পরই আমার কাজে কর্মে মন রইল না। ব্যবসা পত্রও নজরদারির অভাবে বন্ধ হয়ে পড়ে থাকল। স্টাফরাও সব চাকরী ছেড়ে এদিক ওদিক চলে গেল। আমি নিজেও বাড়ি যাওয়া ছেড়ে দিলাম। বাবা, মা গত হয়েছিল আগেই। বোনের বিয়ে দেবার পর গড়িয়াহাটের বাড়ি টা খা খা করতে লাগল। তাই আমি সিঁথির মোরের কাছে আমার অফিসেই পরে থাকলাম।
জুঁই কে না পাওয়ার যন্ত্রণা যেন আর ভুলতে পারছি না। স্মৃতি সব সময়ই বেদনার হয়। কিন্তু বেদনা ভোলাতে ও কিছু বন্ধু- বান্ধব, এন্টারটেইনমেন্ট দরকার। আমার যেন ওসব কোন কিছুতেই আর আগ্রহ নেই। শুধু জুঁই এর সঙ্গে মাঝে মাঝে চ্যাট করা ছাড়া আর কিছু ভালোও লাগে না।
তাও চেষ্টা করেছিলাম সব কিছু থেকে ই নিজেকে দূরে রাখব। কিন্তু পারি নি।
পর পর সাত দিন সম্পূর্ণ যোগাযোগ বন্ধ করার পর একদিন জুঁই আমাকে ফোন করল। বলল যেন এক বার অবশ্য ই আসি।
এক প্রকার অনিচ্ছা সত্ত্বেও
সেদিন দুপুরে ওদের বাড়ি যেতে গিয়ে মাঝখানে বিটি রোডে একটা বেশ বড় জটলা দেখলাম। বোধহয় কোন বাইক দুর্ঘটনা ঘটেছে।
আমি অন্য রাস্তা দিয়ে ঘুর পথে ঠিক দুপুর বারোটার সময় ওদের বাড়ির সামনে পৌঁছলাম। । আগের দিনের মতন টেবিলের দু প্রান্তে দু জন বসলাম। দেখি জুঁই হঠাৎ কাঁদছে!
— কি হল, হঠাৎ কাঁদছ কেন?
ও আমার একটা হাত ধরে বলল, — সেদিন তোমাকে মিথ্যে বলেছি সৌমেন। আমি হাঁপিয়ে উঠছি ক্রমশঃ। আর নিজের সঙ্গে লড়াই করতে পারছি না সৌমেন। আমি ক্রমশ হাঁপিয়ে উঠছি। — কথা বলতে বলতে
জুঁই ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল।
— অসীম, আমাকে কোন দিনই ভালবাসেনি। শুধু আমার শরীর টা নিয়ে খেলেছে। জান, ওর পুরানো স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে এখনও।
আমি ওর হাত থেকে আমার হাত টা ছাড়িয়ে আনতে গেলাম। কিন্তু ও দিল না।
— প্লিজ জুঁই, তোমরা স্বামী-স্ত্রী। আমাকে এর মধ্যে টেনে এন না। আমি তো বাইরের লোক।
— প্লিজ তুমি আমাকে এত টা পর করোনা সৌমেন। ভাগ্য আমাদের কে আলাদা করে দিয়েছে বলে কি আমরা আর এক হতে পারি না?
আমি মেঝের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, –অনেক দেরি হয়ে গেছে জুঁই। এখন আর এসব কথার কোন অর্থ নেই।
সেদিন এক প্রকার জোড় করেই জুঁই দের বাড়ি থেকে চলে এলাম। ওকে দেখে খুব কষ্ট ও হচ্ছিল, যেন বন্দী হয়ে আছে ওখানে।
মাঝখানে কোন রকম যোগাযোগ রাখলাম না। কারণ নতুন করে আমি আর সম্পর্কের টানে আটকা পড়তে চাই না। এমনি করেই দিন কাটছিল। তারপর একদিন রাত এগারোটার সময় হঠাৎ ফোন করল জুঁই। কি ব্যাপার? হঠাৎ এত রাতে ফোন কেন?
তড়িঘড়ি ফোন টা ধরলাম।
— হ্যাঁ বল, কি ব্যাপার? এত রাতে হঠাৎ?
— তুমি কি একটু তাড়াতাড়ি আমাদের বাড়ি আসতে পারবে?- ওর গলায় পরিস্কার দুশ্চিন্তা ধরা পড়ল।
— তা পারব, কিন্তু কি হল এত রাতে?
— অসীমের শরীর ভীষণ খারাপ হয়েছে। এখনই কোথাও ভর্তি করতে হবে। প্লিজ এস তাড়াতাড়ি।
— ঠিক আছে, তুমি টেনসান করো না। আমি মিনিট পনেরোর মধ্যেই আসছি।

 




 

কথা শেষ করে জামা, প্যান্ট গলিয়ে তাড়াতাড়ি বের হলাম। কি মনে হল, বাইক না নিয়ে, অফিসের নিচে দাঁড়ানো আমার ওয়াগনার টা নিলাম।
মিনিট পনেরোর মধ্যেই চলে এলাম।
এই প্রথম আমি অসীমের মুখোমুখি হলাম। বুকের তীব্র যন্ত্রণা তে ছটফট করছে অসীম। জ্ঞান আছে, তবে চোখ বন্ধ। সেই সঙ্গে শ্বাসের টান প্রবল। দু জনে ধরাধরি করে অসীম কে গাড়িতে তুললাম। তারপর নিজেই ড্রাইভ করে জুঁই এর বাপের বাড়ির কাছাকাছি বাগবাজারের একটা বড় নার্সিংহোমে নিয়ে এলাম।

গাড়িতে অসীম কে বসানোর পরই অবশ্য জুঁই ওর প্রথম পক্ষের স্ত্রী কে ফোন করে ডাকার কথা বলে। ভদ্রমহিলার নাম হৈমন্তি। থাকেন শ্যামবাজারের কাছেই। আমি এত রাতে ফোন করতেই উনি নানা প্রশ্ন শুরু করল। আমি অবশ্য জুঁই এর পীড়াপীড়িতে জুঁই যে আমাকে ডাকিয়েছে আর আমার পরিচয় বা জুঁই এর সঙ্গে সম্পর্ক কিছুই বললাম না। বেশ বুঝতে পারছি জুঁই নিজেকে ঐ পরিবার থেকে ক্রমশ গুটিয়ে নিচ্ছে। এখন যে কাজ টুকু ও করছে, তা ওর দায়িত্ব থেকে। এর পর হয়তো সেটাও ও করবে না। তবে কি জুঁই-অসীমের সম্পর্ক ভেঙে যাবে? না কি পুরানো স্ত্রী হঠাৎ কাছে চলে আসাতে জুঁই এর প্রয়োজন ফুরিয়েছে?
আচ্ছা, এটাও তো হতে পারে, যে আমাকে পেয়ে জুঁই ওর স্বামীর থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে? তবে সেরকম হলে আমি অন্তত চাইব না একটা দশ বছরের সম্পর্ক এ ভাবে ভেঙে যাক। আমি না হয় আবার দূরে চলে যাব। অনেক দূরে, যেখান থেকে আর কেউ ফিরে আসতে পারবে না।
নার্সিংহোমের কাছে পৌঁছতেই জুঁই আমার হাত ধরে টানল।
অবাক হয়ে বললাম, — একি টানছ কেন? ওনাকে ভর্তি করতে হবে। অবস্হা যা দেখছি, তাতে…
— তুমি দেখছ না, হৈমন্তি চলে এসেছে। আর আমরা এখানে থাকব না।
—থাকব না মানে? তবে ওনার ভর্তির কি হবে?
— ওটা হৈমন্তি সামলে নেবে। ও অসীমের সমস্ত সমস্যা গুলো জানে। তাছাড়া এর মধ্যে যত টেস্ট হয়েছে, সব রিপোর্ট ই গাড়িতে রাখা।
— কিন্তু জুঁই, কেন তুমি এমন নিষ্ঠুরতা দেখাচ্ছ? তুমি তো এমন ছিলে না? — আমি দরজা খুলে নামতে নামতে বললাম। ততক্ষণে ও নিজেও নেমে পড়েছে।
— এটা নিষ্ঠুরতা নয় সৌমেন। যদি তাই হত, তবে এত রাতে তোমাকে ডেকে অসীম কে নার্সিংহোমে আনতাম না।
আমি ওর জীবন থেকে সরে আসার চেষ্টা করছি। সেই সঙ্গে প্রবল ভাবে চাইছি হৈমন্তি আর অসীম কাছাকাছি আসুক। আমি তাহলে নিশ্চিন্তে বেড়িয়ে আসব।

গাড়িটা পার্ক করে নেমে আসতেই হৈমন্তি কে দেখলাম আর দু জন ভদ্রলোকের সঙ্গে একজন সিকিউরিটি গার্ড কে সঙ্গে নিয়ে এল। তারপর সবাই চারদিক টা আমাদের খুঁজে বেড়াতে লাগল। কিন্তু জুঁই আর আমি অন্ধকারে দাঁড়ানোতে কেউ খুঁজে না পেয়ে ধরাধরি করে অসীম কে ভিতরে নিয়ে গেল।

আমার খুব খারাপ লাগছিল লোকটার জন্য। যা কন্ডিশন দেখলাম, তাতে বাঁচলে হয়।
জুঁই বোধহয় মনের কথা পড়তে পারে। বলল, — এত চিন্তা করো না সৌমেন, অসীম ভাল হয়ে যাবে। ও মরতে পারে না। সামনে ওর নতুন জীবন অপেক্ষা করছে। তাছাড়া ওর রিপোর্ট খুব একটা খারাপ না। সমস্যা একটাই, ও খুব আতঙ্কে থাকে। আর সেটা আমাকে আর তোমাকে নিয়ে।
অন্ধকারে ওর গা ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে থমকে দাঁড়ালাম। তার মানে? অসীম দা কি তোমার আর আমার আগের সম্পর্ক টা জানে?
–আগে জানত না, পরে জেনেছে। আর তাই এত আতঙ্ক।
জুঁই এর কথার মাথা মুণ্ডু কিছু বুঝতে না পেরে দাঁড়িয়ে পড়লাম। যেখানে দাঁড়ালাম, সেটা একটা ছোট পার্ক। তবে অন্ধকার।
জুঁই আমার হাত টা ধরে ভিতরে টেনে নিয়ে যেতে লাগল। আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে ও কিসের একটা অমোঘ টানে ক্রমশ অন্ধকারে গিয়ে একটা চেয়ারে বসলাম। জুঁই আমাকে জড়িয়ে গা ঘেঁষে বসল। যে ভাবে আমরা কলেজ পরবর্তী দিন গুলোতে নন্দন কিংবা সেন্ট্রাল পার্কে গিয়ে বসতাম।
মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। হঠাৎ ও এত সাহসী হয়ে উঠছে কেন? ও কি অসীম কে ডিভোর্স দেবে?
কিন্তু এখন তো আমি নিঃস্ব, সব কিছু থেকে বেড়িয়ে এসেছি। কাজ, কর্ম, সম্পর্ক সব কিছু থেকে নিজেকে ক্রমশ মুক্ত করে চলেছি। তা আমার প্রতি কিসের এত টান অনুভব করছে জুঁই?
একটা মিষ্টি গন্ধ পাচ্ছি অনেকক্ষণ থেকে। গন্ধ টা বড় চেনা। জুঁই এর চুলের গন্ধ।
পাশাপাশি দু জনে বেশ কিছুক্ষন চুপচাপ বসে। হঠাৎ অনুভব করলাম, ও আর ও নিবিড় হয়ে জড়িয়ে রেখেছে আমাকে।
আমি ফিস ফিস করে বললাম, — তোমার কষ্ট হচ্ছে না, আমার জন্য একটা সংসার ভেঙে দিচ্ছ?
— আমি কোন সংসার নষ্ট করি নি। হৈমন্তি কে ডিভোর্স করে অসীম সুখি ছিল না। আমি সে জায়গা কোন দিনই নিতে পারি নি। হ্যাঁ, আমার মনে হয়েছিল, যে অসীম বোধহয় শুধু আমাকেই ভালবাসে। কিন্তু পরে বুঝলাম সেটা ভুল।
ফিসফিস করে বললাম, — তবে এখন কি করবে? তোমার দিন কিভাবে চলবে?
জুঁই আমার কলার টা টেনে ওর ঠোঁট টা আমার ঠোঁটে চেপে ধরল। যেমন ও আগে করত। তারপর নিচু স্বরে বলল, — আমি তোমাকে নিয়ে ঘর বাঁধব সৌমেন। প্লিজ আমাকে দূরে ঠেলে দিও না। আমি কিছুক্ষন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে জড় পদার্থের মতন বসে রইলাম। কিন্তু ওর আবেদনে সারা না দিয়ে বেশী সময় থাকতে পারলাম না। ওর কপালে একটা চুমু খেয়ে চুলে বিলি কেটে দিতে লাগলাম। ওর চুলের গন্ধ টা বেশ মিষ্টি। আমি তাতে মোহিত হয়ে গেলাম ক্রমশ।

সেদিন রাতে হৈমন্তিরা গাড়ি তে ড্রাইভার কাউকে না দেখে যথেষ্ট অবাকই হয়েছিল। তবে ভাগ্য ভাল, গোল্ডেন আওয়ারের মধ্যে ই অসীম কে ভর্তি করিয়ে চিকিৎসা শুরু করানো গেছিল। এর মধ্যে দু দিন কেটেছে। অসীম দ্রুত সুস্থ ও হয়ে গেছে। আজ ডাক্তার অপূর্ব মুখার্জী ওকে ডিসচার্জ করবে। হৈমন্তি ওকে নিতে এসেছে। তবে তার আগে একজন বিখ্যাত মনোবিদ ওকে দেখবেন। তিনি হলেন ডাক্তার সুমন সরকার ।

ডাক্তার মুখার্জীই ওনার চেম্বারে ডাক্তার সরকারের সঙ্গে অসীম আর হৈমন্তির পরিচয় করালেন ।
ডঃ মুখার্জী চেয়ার টেনে বসে বললেন, — অসীম আমার অনেক দিনের পরিচিত। আমি ওর সব রিপোর্ট গুলো দেখেছি। প্রায় সব নর্মাল। তবে যে কারণে ওর হঠাৎ হঠাৎ ব্লাড প্রেশার বাড়ে। বা ও অসুস্থ হয়ে পরে। তা আপনিও নিজে শুনুন। জানি না চিকিৎসা বিজ্ঞানে কিভাবে এর থেকে ওকে মুক্ত করবেন।
ড: মুখার্জীর কথায় ডঃ সরকার অবাক হয়ে তাকালেন। — কি ব্যাপার বলুন তো?
অসীম ডাক্তারের কথায় শুকনো হাসল। বলল, — আমি আমার দ্বিতীয় স্ত্রী কে ওর মারা যাবার এত দিন পরও অনুভব করি।
ডাক্তার সরকার হেসে বললেন, — এগুলো সব এক প্রকার দৃষ্টি বিভ্রম। চিকিৎসা নিয়মিত করলে সেরে যাবে।
ডঃ সরকারের কথায় অসীম হাসল। বলল, — ডাক্তার বাবু, যদি পুরো গল্প টা শোনেন, খুব ভাল হয়।
ডঃ সরকার কিছু টা বিরক্ত হয়েই বললেন, ঠিক আছে, বলুন সব। আমি শুনছি।
ডঃ সরকারের অনুমতি পেয়ে অসীম এক নতুন কাহিনী শুরু করল।
আজ থেকে প্রায় বারো বছর আগে আমার হৈমন্তুির সঙ্গে বিয়ে হয়। এক বছরের মাথায় এক পুত্র সন্তান হয়। ভালই চলছিল সব। তারপর আমার মায়ের সঙ্গে বিভিন্ন কারণে হৈমন্তির মনোমালিন্য শুরু হয়। হৈমন্তি ও একটা অফিসে চাকরী করে। আর ও একটু স্বাধীন চেতা । নিত্য অশান্তি তে আমি মাঝখান থেকে খুব সমস্যা তে পড়লাম। দু পক্ষ কে নিয়ে একই বাড়িতে সংসার করা আমার সম্ভব হল না। অথচ আমার পক্ষে মা, বাবাকে ছেড়ে অন্যত্র যাওয়া সম্ভব ছিল না। তাই শেষ পর্যন্ত এই সমস্যা ডিভোর্স অবধি গেল। আর অন্য উপায় না থাকায় সেটা দু জনে পেয়ে ও গেলাম। অথচ আমরা দুজন দুজন কে এক সময় পাগলের মতন ই ভালবাসতাম।
অসীমের কথা শেষ হতেই হৈমন্তির চোখ দুটো ভিজে উঠল।
ওখানে ডিভোর্স হয়ে যেতেই মা আমার অন্যত্র বিয়ে ঠিক করল। সে হল জুঁই। ওর বাবা তখন সদ্য মারা গেছেন।
প্রথম প্রথম হৈমন্তির জায়গা তে জুঁই কে মেনে নিতে খুব কষ্ট হত। কিন্তু সময় মানুষ কে আস্তে আস্তে বদলে দেয়। আমার ও তাই হল। এর মধ্যে মা, বাবা মারা গেলেন। তখন খুব একা হয়ে গেলাম। কোর্টের আইনানুযায়ী ছেলের দায়িত্ব হৈমন্তি পেয়ে ছিল। মাসে একবার করে দেখা করতে যাবার অনুমতি ছিল। ওতে মন ভরত না। মিথ্যে বলব না, আমার দায়িত্ব জুঁই খুব ভাল করে নিল। আমার প্রতিটি কষ্ট, যন্ত্রণা কে ও খুব ভাল খেয়াল রাখত। তাই শেষ পর্যন্ত ওকে আঁকড়ে ধরলাম। বলা বাহুল্য আমার আর কোন সন্তানের ঝোঁক ছিল না। তাই জুঁই আর মা হতে পারে নি। ভালই চলছিল সব। তারপর হঠাৎ ই আমি জুঁই এর অতীত ইতিহাস জানতে পারি। বিয়ের আগে ও সৌমেন বলে একটা ছেলে কে ভালবাসত। সেই ছেলেটি গত মাস খানেক আগে হঠাৎ আমার বাড়িতে আসে। আর তারপর পুরানো যোগাযোগ টা আবার শুরু হয়। আমি বিভিন্ন সোর্স থেকে এই খবর গুলো পাই। তারপর বাড়িতে এ নিয়ে তুমুল অশান্তি শুরু করি।
জুঁই আমাকে অনেক বুঝিয়েছিল, যে ও শুধু আমাকেই ভালবাসে। সৌমেন তার অতীত। কিন্তু আমি ওর কোন কথা সেদিন বিশ্বাস করি নি। যদি করতাম তবে জুঁই সুইসাইড করত না।




অসীমের কথায় পুরো চেম্বার টা হঠাৎ নিশ্চুপ হয়ে গেল। তার মধ্যে ই ডঃ সরকার চোখ বন্ধ করে সব শুনতে শুনতে মাথা নাড়লেন। — বলে যান, সব শুনছি। তাহলে বলছেন, জুঁই আত্মহত্যা করে?
— হ্যাঁ স্যার, গলায় দড়ি দেয়।
অসীম আবার শুরু করল। —
তারপর থেকে শুধু ঘরময় ওর উপস্থিতি টের পেতে লাগলাম। কখন ও চেয়ার টেনে বসত। কখন রান্নাঘরে বাসন পত্রের আওয়াজ পেতে লাগলাম। হঠাৎ হঠাৎ করে গ্যাস জ্বলে উঠত। টেবিলে কেউ যেন চা বানিয়ে রাখত। এমন কি আমি শুলে আমার গালে কেউ যেন চুমু খেত। চাদরে তার শোওয়ার দাগ থাকত। আমি তখন দিশাহারা হয়ে গেলাম। এমন কি আমি চেক আপে গেলে তার উপস্থিতি টের পেতাম ডায়াগনোসিস্ট সেন্টারে ও। এই অবধি বলে অসীম থামল।
সবাই মন্ত্র মুগ্ধের মতন ওর কথা শুনতে লাগল।
— তাহলে অসীম বলতে হবে, জুঁই তোমাকে সত্যি খুব ভালবাসত? যে মৃত্যুর পরও তোমাকে ছেড়ে যেতে পারে নি।— অনেকক্ষণ সব চুপ করে শুনতে শুনতে ডঃ মুখার্জী জিজ্ঞাসা করল।
— হ্যাঁ ডাক্তার বাবু, সত্যিই ও আমাকে খুব ভাল বাসত। তবে ওর মৃত্যুর পর যখন আমি নিঃসঙ্গতা কাটাতে আবার হৈমন্তির সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। তখন থেকে জুঁই এর বাকি অ্যাক্টিভিটি গুলো ঠিক থাকলেও বিছানা তে ওর অস্তিত্ব আর পাই নি। যেমন বালিশে চুল পড়ে থাকা, চাদর কুঁচকে থাকা, আমার গালে চুমু খাওয়া ইত্যাদি সবই বন্ধ হয়ে যায়। বরঞ্চ একটা নতুন জিনিস আবিষ্কার করি। ওর কান্নার আওয়াজ, যা আগে পেতাম না।
— আশ্চর্য! কি বলছেন?
ডঃ সরকার মাথা চুলকালেন সব শুনে।
— তবে আমি জানি, ও আমার আর হৈমন্তির মাঝখান থেকে এবার আস্তে আস্তে সরে যাবে। কারণ ওর জন্য সৌমেন অপেক্ষা করছে।
— সৌমেন মানে সেই ছেলেটি? যে ওকে এক সময় ভালবাসত?
ডঃ মুখার্জীর কথায় অসীম মাথা ঝাঁকাল। — হ্যাঁ, সেই। আমার সংসার ভাঙানোর নেপথ্য কারণ আর পরম শত্রু হলেও সে আমার রক্ষাকর্তা।
— রক্ষা কর্তা মানে?
ডঃ সরকার হা করে অসীমের মুখের দিকে তাকাল।
— হ্যাঁ স্যার। যদি কাল জুঁই এর সাহায্যে সৌমেন ওর গাড়ি করে আমাকে সঠিক সময়ে এখানে না আনত, তবে হয়তো এতক্ষণে আমি ছবি হয়ে যেতাম।
— কিন্তু অসীম, সৌমেন বাবু কাল আমাকে ফোন করে নার্সিং হোমে আসতে বলে তোমাকে নিয়ে এসে হঠাত বেপাত্তা হয়ে যায়। আমি অনেক খুঁজেও ওনাকে পাই নি। পেলে অবশ্য ই একটা ধন্যবাদ জানাতাম। ও না থাকলে তোমাকে হয়তো ফিরে পেতাম না।
হৈমন্তির কথায় অসীম হেসে উঠে বলল, — দাঁড়াও দাঁড়াও, তাকে তুমি কোথায় পাবে? আত্মা কে তো দেখা যায় না। শুধু অনুভব করা যায়।
— আত্মা মানে? — হৈমন্তি যেন আকাশ থেকে পড়ল।
ডঃ সরকার আর ডঃ মুখার্জি ও যেন চেয়ার থেকে পড়ে যাবার উপক্রম।
অসীম বেশ কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বলল, — হ্যাঁ, সৌমেন আর জীবিত নেই। জুঁই মারা যাবার সপ্তাহ খানেক পর আমার বাড়িতে ওর (জুঁই এর আত্মা) সঙ্গে দেখা করতে আসার সময় বাইক দুর্ঘটনা তে মারা যায়।
আমি যেদিন অসুস্থ হই, সেদিন ও জুঁই এর ডাকে আমার বাড়ি আসে। হৈমন্তি কে ফোন করে। তারপর আমাকে নিয়ে নার্সিংহোমে আসে। আমি তীব্র যন্ত্রণার মধ্যে ও ওদের দুজনের উপস্থিতি টের পেয়েছি।
— আমার যে কিছুই মাথায় ঢুকছে না অসীম বাবু। এ কি সব শোনালেন আপনি!
ডঃ সরকার মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন।
— আমি জানতাম, অসীমের শরীর খারাপের পিছনে কিছু অপ্রাকৃতিক কারণ আছে। কিন্তু তা যে এরকম বৈচিত্র্য পূর্ণ, তা স্বপ্নে ও ভাবি নি।
— ডঃ মুখার্জী হাসতে হাসতে বললেন।

আমি আর জুঁই কাছেই ছিলাম। হৈমম্তি আর অসীমের মিল মিশ হয়ে যাবার পর জুঁই কে বললাম, চল তবে, এবার যাওয়া যাক। এবার আর তোমার আর আমার মাঝে কোন বাধা বিপত্তি থাকল না।
আমার কথায় জুঁই এর মুখে একটা হাসি ফুটে উঠল। ওর মাথার চুলে আজও সেই মিস্টি গন্ধ টা ভালই টের পাচ্ছি।

 

—— সমাপ্ত ——

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 3   Average: 5/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।