আত্মীয়-অনাত্মীয়

গল্পের নাম: আত্মীয়-অনাত্মীয়

লেখক: অভিজিৎ ঘোষ

 

ছোটবেলা থেকেই আমাদের চিন্তনের গণ্ডীটাকে বেঁধে দেওয়া হয়। আর বড় হয়ে তা একটা সংকীর্ণ আবর্তে ঘুরপাক খেতে থাকে। আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হয় কে চেনা, কে অচেনা; কে আপনজন, কে পর; কে আত্মীয়, কে অনাত্মীয়। তবে আত্মীয় বলা হয় সেই মানুষটিকে, যার সাথে আত্মার মিল হয়। তাই কখনো কখনো লিখিত বাঁধনের বাইরে গিয়ে আপন করে নেই সেই আত্মীয়কে।
কর্মসূত্রে আমার প্রথম পোস্টিং হয়েছিল বিহারের আরা জেলাতে। জেলা সদর শহর আরা একটি মফঃস্বল বিশেষ। এখানকার অধিকাংশ মানুষই দেহাতি। কয়েকটা বাঙালি পরিবারও অবশ্য আছে — তবে তাদের চলন-বলন দেখে চেনা বড় দায়। শহরটা বেশ ছোট। উচু উচু গগনচুম্বী অ্যাপার্টমেন্টের আতিশয্য নেই। থাকার মতো ঘর খুব একটা চোখে পড়ে নি। কোম্পানিও থাকার জন্য তেমন কোনো ব্যবস্থা করেনি — শুধু HRA-টুকু দিয়েই খালাস। অবিবাহিতদের কেউ ঘরভাড়া দিতে চায় না এখানে। ফলে লাগেজ নিয়ে আমি পড়লাম ফ্যাসাদে। শেষমেষ এক সজ্জন ব্যক্তির অশেষ দয়ায় তাঁর পূর্বপুরুষের ভিটের একটি ঘরে ঠাঁই পেলাম।

 




 

বাড়িটা বেশ পুরনো। একশো বছরেরও বেশি হবে হয়তো। রক্ষণাবেক্ষণ করে কোন ভাবে জিইয়ে রাখা হয়েছে আর কি! দেওয়াল গুলো প্রায় দেড় ফুট পুরু; ক্রমাগত চুন ও রঙের প্রলেপে লোলচর্ম কলপিত-কেশ বৃদ্ধের দশা প্রাপ্ত হয়েছে। একতলা বাড়ি। চারধারে অন্ধকারাচ্ছন্ন, স্যাতস্যাতে খুপরির মত চারটি ঘর। ঘর গুলিতে হাওয়া বাতাস চলাচলের জন্য একটি মাত্র জানালা। মাঝখানে বড় চাতাল। উত্তর পূর্ব দিকে প্রবেশদ্বার। আমি থাকতাম প্রবেশদ্বারের বাঁ হাতের অর্থাৎ পূর্বদিকের ঘরটায়।
আমার পড়শীরা ছিল সুধীর নামের এক রাজমিস্ত্রি ও ধনীরাম। সুধীর, স্ত্রী এবং দু বছরের ছেলেকে নিয়ে থাকতো। আর ধনীরাম একা। নামে তার ‘ধনী’ থাকলেও আদতে একজন গরিব দিনমজুর। ধনীরামের বাড়ি ভাগলপুরে, তাই অল্পস্বল্প বাংলাটাও জানে। বহু বছর আগে ভাগলপুর ছেড়ে পশ্চিম বিহারের শোন নদীর পাড়ের এই শহরে চলে এসেছিল কর্মসূত্রে। সুধীর ভাইয়ার কাছে শুনেছিলাম ওর স্ত্রী ও একমাত্র সন্তান পথ দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিল। তারপরই সে এদিকে চলে এসেছিল। কিন্তু তখনও হয়তো সেই শোক ভুলতে পারেনি। তাই প্রতিদিন কাজ থেকে ফেরার সময় গলা পর্যন্ত তারির নেশায় বুদ হয়ে জড়ানো গলায় গাইতে থাকতো—

” মোর লাল্লা মোরে পাশ না হে….
ঘর না হে, সংসার না হে, তো জিনা কাহে…”
এক সন্তানহীন বাপ, এক সংসারবৈরাগী পুরুষের বুকফাটা আত্মবিলাপ চারদিক বন্ধ বাড়িটাতে যেন প্রতিধ্বনিত হতে থাকত।
সারাদিনে অফিসে ক্লায়েন্টদের সামলাতে গিয়ে মাথা খারাপ হয়ে যেত। তারপর ঘরে ফিরে অমন গগন বিদারি আত্মবিলাপের গান শুনে আমার খুব বিরক্তি বোধ হতো। আরো বিরক্ত হতাম যখন সুধীর ভাইয়া আর ধনীরাম দুজনেই সকালে কাজে যাওয়ার আগে আবার সন্ধ্যায় কাজ থেকে ফিরে আমার খবর নিত। আমি অফিসের দু- একজন কলিগকে অন্য ঘর দেখার জন্য বলেছিলাম। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।

 




 

একদিন অফিস থেকে ফিরে আমার ধুম জ্বর এলো। বাইরে খুব ঝড় বৃষ্টি হচ্ছিল। অফিস কলিগদের জানাতে তারা বলল, বৃষ্টি থামলে আসবে। আমার যখন জ্বরে কাঁপতে কাঁপতে চৈতন্য লোপ হয় হয় অবস্থা তখনই বাইরে শুনতে পেলাম ধনীরামের জড়ানো গলা — তবিয়ত কেমোন আছে, বাবু?
কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে প্রাণপণ চেষ্টা করলাম উত্তর দেওয়ার — জ্বর..

মুহুর্তের মধ্যে ধনীরাম ঘরে ঢুকে আমার কপালে, গলায় হাত দিয়ে বলে উঠলো— আরে রাম! রাম! আভি ডক্টরের পাশ লিয়ে যেতে হবে।
সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ওর শীর্ণ হাত দুটো দিয়ে বিছানা থেকে তুলে ফেলে কাঁধে ভর রেখে আমার শরীরটাকে টেনে হিঁচড়ে ঘরের বাইরে নিয়ে এলো। ততক্ষনে সুধীর ভাইয়াও এসে গেছে। ধনীরামের তারির নেশা যেন কর্পূরের মত উবে গেছে। তারপর আমাকে রেইনকোট পরিয়ে সুধীর ভাইয়ার সাইকেলের পেছনে বসিয়ে দিল। সুধির ভাইয়া সাইকেল চালিয়ে নিয়ে এলো হসপিটালে। পেছন থেকে ঠেকনা দিয়ে আমার শরীর টাকে ধরে সাইকেলের সাথে গতি মিলিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে দৌড়াচ্ছিল ধনীরাম।

ডাক্তারের ওষুধে দুদিনের মধ্যে সেরে উঠেছিলাম। তারপর আর বেশিদিন থাকতে হয় নি আরাতে। মাস চারেকের মধ্যে ট্রান্সফার হয় হায়দ্রাবাদে। সেখানে ছয় মাস কাটিয়ে আবার ট্রান্সফার হল দিল্লিতে। দিল্লিতে গিয়ে কিছুটা স্বস্তি পেলাম। এখানে আমার পরিচিত অনেকেই আছে। আমার নিজের পিসি থাকে। এক দুঃসম্পর্কের মামাও আছে। কাজের সুবিধার্থে আমি সাকেতে একটি ফ্ল্যাট নিয়ে থাকি। অফিসটা কাছে পড়ে। কিন্তু এখানে পরিচিত লোকগুলোর মাঝেও নিজেকে খুব একা মনে হয়।

 




 

এখন জ্বর হলেও কেউ আমাকে হসপিটাল নিয়ে যাওয়ার মতো নেই। পিসির শরীর খুব খারাপ, তাই আসতে পারে না। আমিই যাই দেখা করতে। পিসতুতো দাদা দিল্লিতে বড় একটা কোম্পানিতে চাকরি করে। তার সময় হয়না আমাকে দেখতে আসার। অসুখ-বিসুখ হলে বড় জোর ফোন করে কয়েকটা সতর্ক বাণী শুনিয়ে দেয়। ফ্ল্যাটের লোকেরা নিজেদের সমস্যাই মেটাতে ব্যস্ত। অন্যের দিকে নজর রাখার সময় নেই তাদের।

তাই এখন যখন একাকী থাকি তখন আরাতে কাটিয়ে আসা দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে সেই অচেনা শহরের অনাত্মীয় লোকগুলোর ভিড়ে। সেখানকার মানুষের জীবনে চাহিদা হয়তো অতি সামান্য, সমস্যাও রয়েছে বিস্তর। অথচ এসবের মাঝেও তারা মানবিকতা হারায়নি।
সুধীর ভাইয়ার সাথে এখনো আমার যোগাযোগ আছে। মাঝেমধ্যেই ফোনে কথা হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় ধনীরাম আর নেই। ইহজগতের সমস্ত মায়া ত্যাগ করে তার পঞ্চত্বপ্রাপ্তি হয়েছে।

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © অভিজিৎ ঘোষ

 




গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total:    Average: /5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।