আমার বাবান

আমার বাবান

আমার বাবান

✍নেহা কর্মকার

 

খন আমার কতোই বা বয়স হবে ২/৩ বছর। আমার মা মারা গেল।আমার যখন জন্ম হয়েছিল শুনেছিলাম তখন নাকি আমার মায়ের কী একটা কঠিন অসুখ করেছিল।আমাকে আমার মায়ের ধারে কাছে ঘেষতে দিতোনা কেউ।তাই কখনই আমি মায়ের সান্নিধ্য পাইনি।আর বাবা?সে তো বলতো আমি নাকি আমার মাকে গিলে খেয়েছি।আমার কারণেই মা নাকি মারা গেছে।

আমাদের ওই মস্ত বড়ো বাড়িটাতে আমার বাবা,আমি,কাকু,কাকীমা আর দাদা থাকতাম।আমাদের তিন তলা বাড়ি ছিল।কাকু,কাকীমা নীচ তলায়।বাবা,মার ঘর ছিল দোতলায়।আর ওপর তলায় আগে দাদু থাকতো।কিন্তু দাদু মারা যাওয়ার পরেই আমাকে ওই ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।দোতলায় ঘর থাকলেও সেখানে আমার থাকা বারণ ছিল।ওখানে শুধু নাকি দাদা থাকতে পারবে।

মা মারা যাওয়ার পর বাবা কীরম যেন হয়ে গেছিল।আরও বেশি করে বাইরে বাইরে থাকতো।বাড়ি থাকলে  দাদার সাথে খেলতো নয়তো নিজের কাজ নিয়েই থাকতো।আমার সাথে কথাই বলতো না।আর বলতোই বা কি করে?আমি তো শুধু মা ছাড়া আর কিছুই বলতে পারতাম না।আমার ৬ বছর বয়েস অবদি আমি মা ছাড়া পূর্ণ বাক্যে কিছুই বলতে পারিনি।আমার খুব ইচ্ছে করতো সবার সাথে কথা বলতে কিন্তু কেউ আমার সাথে কথা বলতো না।তাই বোধ হয় কথাও শিখিনি কখনও ঠিক মতো।

আমার ঘরে দাদার কম্পিউটার ছিল।দাদাকে বাবা ল্যাপটপ এনে দেওয়ার পর ওই কম্পিউটারের জায়গা হয় আমার ঘরে। ওটাই ছিল আমার সারাদিনের একমাত্র সঙ্গী।কাকিমা এসে ওতে কার্টুন চালিয়ে যেত আর আমি হা করে গিলে খেতাম ওদের কান্ড কারখানা গুলো।

আমাকে বাবা স্কুলেও ভর্তি করেছিল।কিন্তু কয়েকদিন পরেই তারাও আমায় বাড়িতে বসিয়ে দিয়ে গেছিল।বলেছিল অ্যাবনরমাল চাইল্ড। হ্যাঁ ওই নামেই পরিচিত ছিলাম আমাদের আত্মীয়-স্বজনের কাছে।
একবার বাবা আমাকে এক ডাক্তার কাকুর কাছে নিয়ে গেছিল। সে আমায় দেখে আমার বাবাকে কত রকম রোগের কথা বলেছিল। কি কঠিন কঠিন সেই সব নাম। অটিস্টিক, মেন্টাল ডিসঅর্ডার, ওয়ার্ড ডেফিসিয়েন্সি আরো কত কি।
বাড়ি আসার পর আমি বাবাকে কাকু কাকিমা কে বলতে শুনেছিলাম যে আমি নাকি প্রতিবন্ধী। আমি নাকি বোবা। তারপরে ওরা আমাকে কোথাও যেন পাঠানোর কথা বলছিল। কিন্তু আমি আর শুনিনি। ছুটে ঘরে চলে এসেছিলাম। সেই দিন রাতে আমি খুব কেঁদেছিলাম।

বাবা আমাকে দেখলেই বিরক্ত হয়ে যেত।বলতো বেঁচে গেছে ওর মা মরে গিয়ে।এই অ্যাবনরমাল চাইল্ড কে নিয়ে আমার জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে উঠছে।
বাবা বলতো এই বয়সে নাকি কতো ছেলেমেয়েরা স্টেজে উঠে কি সুন্দর আবৃত্তি করে।এমনকি আমার দাদাও স্কুলে ফার্স্ট সেকেন্ড হতো আর আমি তো কথাই বলতে পারতাম না।আমার বাবা খালি কাকা কে বলতো “অনিতা মারা যাওয়ার পর আর কিছু ভালো লাগেনা রে।টুবলুটা কেন যে এমন হল?আমাদের জিনে তো এরম কারোর কোনোদিন ছিলনা।
ওর মায়ের বংশের হিস্ট্রিতেও এরম কারোর নেই।অথচ লোকে আমার দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলে অমর বাবুর ছোটো ছেলে অ্যাবনরমাল।কেমন ফিল হয় তুই বল?”
টুবলু আমার ডাক নাম।যেটা ডাকার সুবিধার্থেই হয়তো আমায় দেওয়া হয়েছিল।আমার একটা পোশাকি নামও ছিল অম্বরীশ মুখার্জী।কিন্তু সেই নামে পরিচিত হবার সুযোগ পাইনি কোনোদিন।

কিছুদিন পরে আমাকে বাবা একটা জায়গায় নিয়ে গেল। ওইখানে গিয়ে আমার সাথে  মিতা আন্টির পরিচয় করিয়ে দিল বাবা। মিতা আন্টি আমাকে বলল যে এটাই নাকি এবার থেকে আমার নতুন বাড়ি। আমি যেন এখানে খুব শান্ত হয়ে থাকি। তারপরে দেখলাম বাবা কি সব যেন সই করল আর সেইগুলো মিতা আন্টির হাতে দিলো। তারপর কি সমস্ত কথা বলে চলে গেল। আমি বাবার পিছন পিছন যাচ্ছিলাম কিন্তু মিতা আন্টি আমার হাত ধরে আমাকে একটা ঘরে নিয়ে গেল।

ওই ঘরেই আমার দিন কাটছিল।মিতা আন্টি প্রথম প্রথম আমার খুব যত্ন রাখত।কিন্তু হঠাৎ মিতা আন্টি কেমন যেন বদলে যেতে শুরু করলো।একটুতেই মেজাজ হারাতো।আমায় মারতে আসতো।আমি খুব ভয় পেতাম।ভয়ে ঘরের এক কোণে বসে থাকতাম।আমি বাড়ি যেতে চাইলেও কেউ আমায় বাড়ি নিয়ে যেত না।আমাকে আমার কাকিমা বলেছিল যে আমার নাকি এখানে অনেক বন্ধু হবে কিন্তু কই কেউ তো আমার সাথে কথাই বলতো না।এখানে কতো বাচ্চা ছিল আমার মতোই,সবাই একসাথে খেলত।কিন্তু কেউ কোনোদিন আমায় ডাকেনি খেলার জন্য।

বেশ কিছুদিন পর ওই বাড়িতে আর এক আন্টি এল।
আন্টিটার নাম ছিল নয়নতারা।এই বাড়িটা নাকি এই নয়নতারা আন্টিই তৈরী করেছিল।

সেদিন আমি আমার ঘরে চুপচাপ বসে ছিলাম। হঠাৎ পায়ের আওয়াজ শুনে পেছন ফিরে তাকাতেই দেখতে পেলাম তাকে।কি সুন্দর দেখতে তাকে,পুরো মায়ের মতো।আমি মায়ের ছবি দেখেছিলাম আমাদের বাড়িতে।কি সুন্দর দেখতে ছিল আমার মা।এই আন্টিটার মুখেও যেন কোথাও মায়ের ছাপ দেখতে পেয়েছিলাম।বড্ড মায়াময় ছিল মুখটা।

আমাকে দেখেই নয়নতারা আন্টি আমার কাছে এসে আমার নাম জানতে চেয়েছিল। আমি অনেক চেষ্টা করেছিলাম তাকে আমার নাম বলতে। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও নিজের নাম বলতে পারিনি তার বদলে বেরিয়ে এসেছিল ”মা”। সেই শুনে হঠাৎ করে নয়ন তারা আন্টির চোখে যেন এক ফোটা জল উঁকি দিচ্ছিল আমি দেখতে পেয়েছিলাম। আমি আন্টির চোখের জল মোছাতেই আন্টি আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল। আমি বুঝতেই পারছিলাম না যে নয়নতারা আন্টি আমায় দেখে কেন কাঁদছিল। হঠাৎ করে আমায় নয়ন তারা আন্টি বলল ”আমার বাড়ি যাবি?”।
কোন এক অদৃশ্য টানে আমিও উপরে নিচে মাথা দুলিয়ে ছিলাম। তারপরে আমি দেখেছিলাম নয়নতারা আন্টিকে মিতা আন্টির সাথে কথা বলতে। তারপর সেই দিন আমি নয়নতারা আন্টির হাত ধরে এসেছিলাম আমার নতুন বাড়িতে। সেই বিশাল বড় বাড়িতে।সেখানে গিয়ে আমি এক আঙ্কেল কে দেখেছিলাম।নয়নতারা আন্টির বর। আমি বাড়ি আসার পর সেই আঙ্কেলটা নয়নতারা আন্টিকে যেন কি সব বলছিল। বুঝতে পেরেছিলাম ওই আঙ্কেলটার আমাকে পছন্দ হয়নি।
আমি আঙ্কেল কে  বলতে শুনেছিলাম “শেষমেশ তুমি আর কোনো সুস্থ বাচ্চাকে পেলে না?একটা অ্যাবনরমাল চাইল্ড নিয়ে এলে?”নয়নতারা আন্টি প্রতিবাদ করেছিল।বলেছিল আমাকে যে করেই হোক সুস্থ করে তুলবে।আঙ্কেল সেই কথা শুনে হো হো করে হেসে ফেলেছিল।

আমাকে নয়নতারা আন্টি অনেক খেলনা দিয়েছিল। সেগুলো নিয়েই আমি সারাদিন খেলতাম। নয়ন তারা আন্টি আমার থেকে আমার পারমিশন নিয়ে আমাকে নতুন একটা নাম দিয়েছিল ”বাবান ”
কত বোকা ছিল নয়নতারা আন্টি। আমিতো কত ছোট আমার কাছে আবার পারমিশন নিতে হয় নাকি?

একদিন নয়নতারা আন্টি আমায় নিজের কোলে বসিয়ে আমাকে ভাত মেখে খাওয়াচ্ছিল।আর বলছিল এটা কিন্তু বাবান সোনা খেল না খেল একটা হরিণ ছানা।আমি বেশ মজা পাচ্ছিলাম খাচ্ছি আমি আর নয়নতারা আন্টি বলছে নাকি বাঘ,সিংহ খাচ্ছে।কি বোকা আন্টিটা।ভেবেই হেসে লুটোপুটি খেতাম।কিন্তু নয়নতারা আন্টির সেইদিকে খেয়াল নেই।আবার আমাকে খাওয়াতো আর বলতো এবারে পাখিরা এসে এটা খেয়ে যাবে।বলেই চোখ বুঝতো আর আমি সেই সুযোগে টুক করে খেয়ে নিতাম।নয়নতারা আন্টি চোখ খুলে বলতো যা পাখিরা সব খেয়ে নিয়েছে দাঁড়া তো আমি আর এক থালা ভাত নিয়ে আসি আর আমি বলেছিলাম “আম্মি থেয়েছি”।সেই প্রথম আমি মা এর বদলে অন্য কিছু বলতে শিখেছিলাম।

নয়নতারা আন্টিকে আমি মামণি বলে ডাকতাম।নয়নতারা আন্টিই বলেছিল “আমাকে মা নয় মামণি বলে ডাকতে”।আমিও তাই ডাকতাম।কিন্তু মনে মনে আমি নয়নতারা আন্টিকেই মা মানতাম।

মামণি আমায় বাগানে নিয়ে গিয়ে ১ /২ করে ফুল গোনাতে শিখিয়েছিল আর আমিও মন দিয়ে শিখেছিলাম।একদিন মামণি বলল “এখানে ২০ টা ফুল আছে যদি কাল আরও ১০ টা ফুল ফোটে তাহলে কত হবে?বাবান তো জানেই না।আমিও রেগে গিয়ে বলতাম টোয়েন্টি প্লাস টেন অনলি থার্টি।মামণি জোরে জোরে হাততালি দিয়েছিল আর বলেছিল “আমার বাবান সোনা তো সব জানে।আঙ্কেলও এইসব জানেনা।আমার বাবান সোনাই বেস্ট”।
মামণি আমাকে কবিতা পড়েও শোনাতো “আমি যদি দুষ্টুমি করে চাঁপা গাছে চাঁপা হয়ে ফুটি”…এই যা এরপরে কি ছিল আমি তো ভুলেই গেলাম “।আমিও তখন বলে উঠতাম ” তবে তুমি আমার কাছে হারো,তখন কি মা চিনতে আমায় পারো?”

হঠাৎ-ই বাবি খেয়াল করলো আমি মামণির সাথে দিন রাত বকছি,গান গাইছি,বই পরছি,কবিতা বলছি।মামণি আমায় শিখিয়েছিল আঙ্কেলকে বাবি বলে ডাকতে।আমিও আঙ্কেল কে যখন বাবি বলে ডাকলাম দেখলাম বাবি আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে।তারপর মামণির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল”ও কথা বলতে পারে?” মামণি কিচ্ছু বলেনি শুধু একটু মুচকি হেসে ছিল।সেইদিন থেকে বাবিও আমার সাথে খেলতে শুরু করলো।আমিও রোজ বাবির সাথে পার্কে যেতাম।

তারপর ওরা আমায় স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিল। মামনি বলেছিল যে যতই বয়স বাড়ুক আমাকে লোয়ার ক্লাসেই ভর্তি করাবে। আমাকে ভর্তি করা হলো স্কুলে। সবাই যখন লোয়ার ক্লাসের পড়া পড়ছে আমার তখন সব কমপ্লিট। যথারীতি আমি ক্লাসের ফার্স্ট বয়। সবাই তখন আমার সাথে কথা বলতে আসতো। কত  গল্প করত আমার সাথে।কত বন্ধুও হয়ে গেছিল আমার। রোজ স্কুল থেকে ফেরার পথে মামনি আমায় জিজ্ঞেস করত স্কুলে আজ কি কি হয়েছে? আমায় বকিয়ে বকিয়ে সব গল্প শুনতো।কথা বলতে বলতে হাঁপিয়ে উঠতাম আমি।

এইভাবেই কতগুলো বছর কেটে গেছিল। আমি তখন ডক্টর।  সাইকিয়াট্রিস্ট। মনের ডাক্তার। কত পেশেন্ট আসতো আমার কাছে। তাদের সব সমস্যার কথা শুনতাম আর সেই ভাবেই সলভ করার চেষ্টা করতাম ঠিক যেমন মামনি করত।

একদিন বাড়ি ফিরে মামণির মুখের চিন্তার ভাঁজ দেখে আমি মামনি কে জিজ্ঞেস করেছিলাম কি হয়েছে?মামনি  আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল একটা জায়গায় যাবি?আমিও বলেছিলাম হ্যাঁ। তারপরে মামনি আমাকে নিয়ে একটা জায়গায় নিয়ে গেল। জায়গাটা খুব চেনা চেনা লাগছিল। আরে এটা তো সেই জায়গা যেখানে আমি ছোটবেলায় থাকতাম। সেই পুরনো বাড়ি, সেই  পুরনো রাস্তা। হঠাৎ মামনি আমাকে এখানে কেন নিয়ে এলো এতগুলো বছর পর? মনে সংকোচ নিয়েই উঠছিলাম বাড়ির সেই চেনা সিঁড়িগুলো দিয়ে। সেই চেনা ঘরের সামনে দাঁড়াতেই দেখলাম ঘরের ভেতর বিছানায় একটা বয়স্ক লোক শুয়ে রয়েছে। মামনি আমায় তার কাছে নিয়ে গেল। আমিও গেলাম তার সাথে। দেখলাম বুড়ো  মানুষটা ধীরে ধীরে চোখ খুললো তারপর আমার দিকে তাকাতেই তার চোখ ভিজে উঠলো জলে। আমি যখন এসব কিছুই বুঝতে পারছি না তখন মামনি আমায় সব কথা বলল ”প্রায় ৫ বছর আগে দাদা বিদেশে একটা চাকরি পায় কিন্তু বাবা চাইনি ছেলে বিদেশে চলে যাক। কিন্তু দাদা বাবার কথা শোনেনি বাবাকে একলা রেখে বিদেশে চলে গেছিল আর ফেরেনি। কাকু কাকিমাও অনেক বছর আগে আলাদা হয়ে গেছিল। বাবার বছর ২ হল ক্যানসার ধরা পড়েছে। এখন লাস্ট স্টেজ। আর বেশি দিন বাঁচবে না। বেশ কয়েক মাস আগে বাবার সাথে মিতা আন্টির দেখা হয় আর তার থেকেই বাবা জানতে পারে যে আমি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ একজন মানুষ এবং একজন সফল ডাক্তার। মিতা আন্টির কাছ থেকে বাবা আমার ঠিকানাও জোগাড় করেছিল কিন্তু আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারেনি হয়তো লজ্জায় । শেষে বাবার কথা ভেবে মিতা আন্টি নিজেই মামনি কে বাবার খবর দেয়। বাবা শেষবারের মতো আমাকে একবার দেখতে চায় তাই শুনেই মামনি আজকে আমায় এখানে নিয়ে এসেছে”সব শোনার পর আমি আর দাড়িয়ে থাকতে পারলাম না। বাবার হাতদুটো বুকের কাছে নিয়ে বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম। বাবার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। বাবা আমাকে বলল ”পারলে আমায় ক্ষমা করে দিস। সত্যি আমি তোকে ভুল বুঝেছিলাম। একমাত্র তুই পারলি তোর মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে। একজন মানুষের মতো মানুষ হতে। তোর মায়ের একটা স্বপ্ন ছিল জানিস। আমি তো আর পূরণ করতে পারলাম না, তুই করবি? ”আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম কি স্বপ্ন?” তোর মায়ের স্বপ্ন ছিল ছোটো ছোটো ছেলে মেয়েদের জন্য একটা স্কুল বানাবে। সমস্ত গরিব বাচ্চারা যারা পড়ার সুযোগ পায় না তাদের বিনা পয়সায় পড়াবে”। আমি বললাম” ঠিক আছে মায়ের স্বপ্ন পূরণ করার দায়িত্ব এখন আমার।
এই কথা শুনে বাবার মুখে হাসি ফুটে উঠেছিল আমায় আশীর্বাদ করে বলেছিল “আরো বড় হও”।
এর কিছুদিন পর বাবা মারা যায়। মামনি, বাবি আর আমি মিলে আমাদের মস্ত বড় বাড়িটার  নীচতলায় একটা স্কুল খুলেছিলাম। প্রথমে কুড়ি জন তারপর চল্লিশ জন আস্তে আস্তে একশো জন স্টুডেন্ট হয়েছিল। এখন দুশো জন স্টুডেন্ট আর কুড়ি জন টিচারকে নিয়ে গড়ে উঠেছে আমাদের স্কুল। বাবি বলেছিল এবার একটা বাড়ি ভাড়া করতে হবে এই ছোট জায়গায় নাকি আর হবেনা।

এতকিছু বলার পর অম্বরীশ মুখার্জি চুপ করলেন।  “ওহ আমি অনেকক্ষণ ধরেই স্মৃতির সরণী বেয়ে পৌঁছে গেছিলাম আমার শিশু বেলায়। আজ যেটা বলতে আমি এই মঞ্চে উঠেছি তা হল আমি শুধু একজন ভালো ডক্টর নই আমি একজন ভালো মানুষ হতে চাই। শুধু পাশ করা বিদ্যে  দিয়ে নয় আমার মামনির মত মনের গভীরে গিয়ে মনের সব কটা দরজা খুলে দেখতে চাই মূল সমস্যাটা কি, অ্যাবনরমাল বলে দাগিয়ে দেওয়ার আগে শেষ চেষ্টাটুকু অন্তত করতে চাই। আজ অনেকের কাছেই হয়তো আমি একজন আদর্শ। সেই জন্যই পাড়ায় ক্লাবের মঞ্চে আমাকে পুরস্কৃত করা হবে আজ।কিন্তু আমি বলতে চাই যে আমার শুরুটাও আর চার পাঁচটা বাচ্চাদের মত ছিল না। আমি আজকে একবারের জন্যও হলেও আমার মামনি আর বাবি কে মঞ্চে ডেকে নিতে চাই যারা না থাকলে আজ আমি হয়তো একজন অ্যাবনরমাল চাইল্ড থেকে সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ হতে পারতাম না।আজ আমি যা কিছু সবই আমার মামনির জন্য যে একজন পেশাদার চিকিৎসক না হয়েও মনের গভীরে ডুবুরীর মত ডুব দিয়ে খুঁজে এনে ছিলেন আমার মনের মূল সমস্যা। আপনারা আমাকে আশীর্বাদ করুন যাতে আমিও আমার মামনির মত একজন ভালো মনের মানুষ আর চিকিৎসক হতে পারি”।

সমীর (বাবি) কানে কানে নয়নতারা কে বলল দেখো তুমি হয়তো বাবান কে জন্ম দিতে পারোনি ঠিকই  কিন্তু ওকে মানুষের মত মানুষ করেছ একজন মায়ের মতোই। তুমিই ওকে নবজন্ম দিয়েছো।

হাত তালির আওয়াজে নয়নতারার গলার আওয়াজ চাপা পড়ে গেল।নয়নতারা কান্না মাখা গলায় বলল “আমার বাবান”।

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 1   Average: 5/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।