আহ্লাদি মণি

গল্পের নাম – আহ্লাদি মণি

লেখিকা – মালতী বিশ্বাস

 

   একসময় এক শহরে এক ধনী ব্যবসায়ী বাস করত। তার নাম ছিল সামন্তকুমার চৌধুরী এবং তার স্ত্রী ছিল মোহিণীদেবী চৌধুরী। তারা দুজনে মিলে একটি সংসার গড়ে ছিল। কিন্তু বিধাতার কি নিয়ম, তাদের ধন দিলেও কোনো সন্তান দেয়নি। এইকারণে তাদের সংসারে সামান্যতম সুখ ছিল না। এমন দুশ্চিন্তা যখন সামন্তের মাথায় আসে তখন বাঁচার চেয়ে মৃত্যুকে শ্রেয় বলে গ্রহণ করে। আবার ভাবে জীবনের পথ পাড়ি দিতে হলে দুঃখ নিশ্চিত তবুও চলতেই হয়। ভাবনায় ক্লান্ত হয়ে পরে মোহিণী। স্ত্রীর সন্তান বিরহ সহ্য করতে না পেরে সামন্ত মোহিণীকে নিয়ে যায় এক সাধুবাবার কাছে এবং সব কথা তাকে খুলে বলে। সাধুবাবা সারাদিন তন্ত্রমন্ত্র পাঠ করে একখানা ফল মোহিণীকে খেতে দিলেন আর বললেন তোমার ঘরে অবশ্যই সুখ আসবে। পরে তাকে নিয়ে এসো এই বলে বিদায় জানালেন।

এক বছর পরে জানা গেল মোহিণীর ঘরে রাজকন্যার মত একটি সন্তান জন্ম নিল। মোহিণীর ঘর উজ্জ্বল করে এসেছিল বলে তার নাম রাখা হয় আলো। কিন্তু সামন্ত তার মেয়েকে আদর করে ডাকত মণি বলে। আনন্দ ভরা প্রাণ নিয়ে সামন্ত মণিকে নিয়ে আসে সেই সাধুবাবার কাছে। সাধুবাবা মণিকে দেখে অবাক হয়ে যায় আর মণির চোখে একদৃষ্টে তাকিয়ে বলে,এত সুন্দর রাজকন্যার মত মেয়ের কপালে ভগবান কষ্ট লিখল কেন? সামন্ত এমন কথা শুনে বলল -বাবা আমার মেয়ের কপালে কষ্ট! এ কখনও হতে পারে না। হ্যা সামন্ত আমি ঠিকই বলছি। হতে পারে সে তোমার মেয়ে তাই খারাপ লাগছে কিন্তু আমার বিদ্যা সবসময় সত্য কথাই বলে। সামন্ত তখন রাগে গম্ভীর হয়ে বলে আমার মেয়ের চোখে জল তো দুরের কথা  একটি ফুলের আঁচড়ও লাগতে দেবনা আর কষ্টও ছুঁতে দেব না, বলে চলে যায়।

পরে এইসব শুনে মোহিণীদেবী পুরোপুরিভাবে    ভেঙে পড়ে। পাগলের মত হয়ে যায়। দুশ্চিন্তায় মাথা ঘুরতে থাকে মণির জীবন নিয়ে। অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকে, তারপর কিছুদিন পর মারা যায়। তা সত্ত্বেও সামন্ত ভেঙে পড়েনি কেননা মেয়েকে তার মানুষের মত মানুষ করে তুলতে হবে। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মানো মণি দিনে দিনে বাড়তে থাকে। যখন সে পাঁচ বছরের নাবালিকা তখন তাকে একটি বিদ্যালয়ে ভরতি করে দেওয়া হয়। মণি ছিল বড়ো ঘরের মেয়ে প্রাসাদের মত নীড়ে সে থাকত। তবুও তার মনে কোনো হিংসা ছিল না। সে ছিল খুবেই সরল। একদিন বিদ্যালয়ে গেলে একজন দিদিমণি জিজ্ঞাসা করল মণি তোমার বাড়িতে কে কে আছে? আমার বাড়িতে বাবা আছে, কাজের লোক দিদি আছে যে আমাকে দেখাশোনা করে, আমার খেলার জন্য বন্ধুরা আছে। আর মা নেই তোমার। মা,আমি তো জানিনা।

আজকে বাবাকে জিজ্ঞাসা করব। বিদ্যালয় ছুটি হওয়ার পর মণি বাড়িতে গিয়ে বাবা বাবা বলে সামন্তের গলায় জড়িয়ে ধরে আর বলে বাবা আমার মা কোথায়? আমার মা নাকি আকাশের তারা হয়ে গেছে তবে চলোনা বাবা আমাকে ঐইখানে দিয়ে এসো। আমি মাকে দেখব। সামন্ত এখন কি করবে কিছু ভেবে না পেয়ে মণিকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে মা মণি তোমার মায়ের কাছে যেতে হলে তোমাকে অনেক বড়ো হতে হবে, লেখাপড়া শিখতে হবে তবেই তুমি তোমার মায়ের কাছে যেতে পারবে। ঠিক আছে বাবা আমি এখন থেকে আরও ভালো করে পড়াশোনা করব। এই বলে সে হাসতে হাসতে খেলা করতে চলে যায়। পরে একদিন বিদ্যালয় যাওয়ার পথে মণি রাস্তায় একটি তোতা পাখি দেখতে পেল। সে যতই পাখিটাকে ধরতে এগোয় ততই পাখিটি উড়ে গিয়ে অন্য কোথাও বসে। অবশেষে তোতাপাখিটাকে ধরতে না পেরে রাগে বিদ্যালয় যাওয়া বাদ দিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। তাকে দেখে সামন্ত আদরের কন্ঠস্বর দিয়ে বলে মা মণি আজ বিদ্যালয় গেলে না যে। রাগে মণি জোরে আওয়াজ করে বলে আমার তোতা পাখি চাই। সে ছিল তার বাবার একমাত্র মেয়ে। যখন যেটা চাইত সেটাই পেত তাই তার চাওয়ার অজুহাত ছিল বেশি।

সামন্ত মেয়ের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য খুব সুন্দর দেখে একটি খাঁচায় বন্দি তোতা পাখি মণিকে এনে দিল। ফলে তার মুখে হাসি ফুটল। এইভাবে দিনের পর দিন যেতে যেতে মণির বয়স হয়ে গেল আঠারো। তারপর আঠারো পেরিয়ে হয়ে গেল উনিশ। মণি তখন সম্পূর্ণ  সাবালিকায় পরিণত হয়ে গেল। উঁচু ক্লাসে পড়তে শুরু করে আর যেন মনে হয় সুখী মণি পরীদের মতই উড়ে বেড়ায়। কখনও কখনও সে সুখের ছোঁয়ায় ভুলে যায় ধান থেকে হয় চাল আর চাল থেকেই যে হয় ভাত। কিন্তু এ সময় মণি রাস্তা দিয়ে চলাচল করলে এমনকি পড়াশোনা করতে গেলে বন্ধুরা, পাড়ার লোকেরা মণিকে  একটা কথাই বলত ” আহ্লাদি মণি শ্বশুরবাড়ি যাবে না”? এইভাবে দিন দিন সবাই এসব কথা বলতে থাকলে মণি কিছু বুঝতে পারত না বলেই একদিন সে তার বাবাকে গিয়ে বলে “বাবা শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যাবে না আমাকে”? মেয়ের কথায় সঠিকভাবে কান না দিয়েই সামন্ত হেসে বলে, কি বলছো মা মণি এসব? আমি তো কবেই শ্বশুরবাড়িতে চলে গেছি। না বাবা আমি তোমার কথা বলিনি, আমি তো নিজেই নিজের কথা জিজ্ঞাসা করছিলাম। কারণ আমাকে  সবাই বলে ” আহ্লাদি মণি শ্বশুরবাড়ি যাবে না” ?  এই বাঁকা পেছানো কথা শুনে সামন্ত এক্কেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল। সে বুঝতেই পারেনি কীভাবে সেই ছোট্ট মণি আজ এত বড়ো হয়ে পড়ল। শ্বশুরবাড়িতে মেয়েকে দিয়ে দিলে সে একা কী করে থাকবে ? এই ভেবে অনেক কষ্ট পায়। দিনের পর দিন সে খাওয়া দাওয়া বাদ  দিয়ে শুধু মণির কথাই চিন্তা করে। কিন্তু এইভাবে ভেঙে পড়লে চলবে না।

এরপরে কিছুদিন গেলে সামন্ত প্রথম সম্বন্ধতেই মণির বিয়ে ঠিক করে ফেলে। খুব ধুমধামে মেয়ের বিয়ে দেয়। তারপর মণি চলে আসে শ্বশুরবাড়ি। শ্বশুরবাড়িতে সবারই একটি করে খারাপ বৈশিষ্ট্য ছিল। তার স্বামী ছিল হাবাগোবা, কেউ কোনো অপরাধ করলে প্রতিবাদটুকু করার সাহস পেত না। শ্বাশুরিমা ছিলেন কালনাগিনী। শ্বশুরমশাই ছিলেন এককথায় বললে পাগলা কুকুরেই হবে কেননা কোনো কাজে একটু ভুল ধরতে পারলেই পাগলা কুকুরের মতই ঘেউঘেউ করে কামড়ে ধরে। আর পরে রইল কাকিশ্বাশুরিমা, তিনি ছিলেন গোসাইনি। গোসাইনি তো না মনে হয় যেন দুনিয়ার হারামি। মণি ছিল সহজ সরল আর তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন ছিল শয়তানের কলকারখানা। বাড়িতে চাকর বাকর থাকা সত্ত্বেও কোনো কাজ না জানা মণিকে দিয়ে বাড়ির সব কাজ করাতো তার শ্বাশুরি । আর কাজ না পারলে ঠাশ ঠাশ করে গালে চর মারত। যে আঘাত মণিকে ভুলেও কোনোদিন স্পর্শ করেনি।

গোসাইনি একদিন পুজায় বসে মণীকে পূজার সব জিনিস যোগাড় করে দিতে বলে।কিন্তু হাত ফসকে পুজার সব ফুল মেজেতে পরে গেলে গোসাইনি জ্বলন্ত প্রদীপে মণির হাতটা ঠেকিয়ে দেয়। তবুও পাশে এসে দাঁড়ানোর মত কেউ নেই। এরকম কেউ ছিল না যেন যে একটু ঔষধ এনে মণির পুঁড়ে যাওয়া হাতটিতে লাগিয়ে দেবে। পরেরদিন সকালে সে চা করে শ্বশুরমশাইয়ের জন্য নিয়ে যায়। শ্বশুরমশাই চা-য়ে চিনি খেত বেশি কিন্তু মণি তা জানত না বলেই চায়ের কাপটা শ্বশুরমশাইয়ের হাতে দিল। এক চুমক পান করেই চায়ের কাপটা মণির মুখে ছুঁড়ে ফেলে দেয় আর চিল্লাহাল্লা করতে থাকে। গরম চায়ের যন্ত্রণায় সে কাঁদতে কাঁদতে তার স্বামীর কাছে গেল। হাবাগোবা স্বামী  কোনো সোহাগ না দেখিয়ে সব কাজ গুছিয়ে করতে পারো না,বলে মণির পাশ থেকে চলে যায়। মণি খুব কষ্টে এইখানে দিন কাটাত তার কাছে এক একটা দিন  কাটানো মানে বছর খানেকের মত।

হঠাৎ একদিন মণির বাবা মেয়েকে দেখবে বলে একখানা মিষ্টির হাঁড়ি, একখানা দইয়ের হাঁড়ি এবং নানা ধরনের ফলমূল নিয়ে মণির বাড়িতে এলো। মণি তার বাবাকে দেখে আত্মহারা হয়ে যায়। বাবা বাবা বলে সামন্তের বুকে মাথা রেখে তাকে জড়িয়ে ধরে। তখনি তার শ্বাশুরি পেছন পেছন এসে বলল,এই আহ্লাদি বাড়ির কাজগুলো কে করবে শুনি? আমি নাকি। ওহ তোমার তো দেখছি বাবা এসেছেন। অনেক কিছুই তো এনেছেন দেখছি। মিষ্টির হাঁড়ি,দইয়ের হাঁড়ি আরও কত কি। তা দেখি বেয়াইমশাই মিষ্টির  হাঁড়িটা,এই বলে সামন্তের হাত থেকে হাঁড়িগুলো নিয়ে বাড়ির বাইরে ফেলে দেয় আর মণিকে চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে নিয়ে যায়। এইসব দেখে সামন্ত হতভম্ব  হয়ে যায়।

তার দেহে যেন প্রাণ নেই। মনে মনে ভাবে যে মণিকে আমি সাধুবাবার কথা ভেবে একফোঁটা জল তার চোখ থেকে পড়তে দেইনি আর সেই মণি-ই আজ এত কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। এ কখনও হতে পারে না, এ কখনও হতে পারে না। তখন সে আবার ছুটতে ছুটতে সাধুবাবার কাছে গেল আর মণির সব দুঃখের কথা কাঁদো কাঁদোস্বরে খুলে বলল। সামন্তের কথা সাধুবাবা বুঝতে পারল। মণির ঘরে সুখ  ফিরিয়ে আনার জন্য তন্ত্রমন্ত্র পাঠ করে শান্তির জল সামন্তের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, যাও পুত্র এই তন্ত্রমন্ত্রে ভরা শুদ্ধ জল তোমার কন্যার বাড়ির চতুর্পাশে ছড়িয়ে দাও। তবেই ধীরে ধীরে তোমার কন্যা  সুখী হতে পারবে। সামন্ত তক্ষনি চলে যায় মণির বাড়িতে আর সাধুবাবার কথা মতই পবিত্র জল ঘরের প্রতিটি কোণায় কোণায়,বাড়ির চারপাশে ছিটিয়ে দেয়। দিনে দিনে মণি সুখী হয়ে উঠে। শ্বশুরবাড়ির লোকজনেরা মণিকে ভালোবাসতে আরম্ভ করে। তাদের খারাপ আচার আচরণ পরিবর্তন করতে শুরু করে। হাবাগোবা স্বামীও এখন মণিকে বড্ড ভালোবাসে।

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 3   Average: 2.3/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।