ইন্দ্রপুরী অ্যাপার্টমেন্ট

গল্প—- ইন্দ্রপুরী অ্যাপার্টমেন্ট

লেখক– কৃষ্ণ গুপ্ত

 

 

–হ্যালো পুলিশ স্টেশন?
–নমস্কার, ঘোলা থানা। বলুন কি ব্যাপার?
–ইন্দ্রপুরী অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বলছি। — লোকটার গলা টা যেন কেঁপে উঠল।
— বলুন, কি ব্যাপার?
— একটা পচা গন্ধ! থাকা যাচ্ছে না। প্রায় দিন পনেরো ধরে। সঙ্গে কিছু ভৌতিক উৎপাত।
— ভৌতিক উৎপাত তো পুলিশ কি করবে? ব্রাহ্মণ ডেকে পূজো দিন। কেটে যাবে।
— আর পচা গন্ধ? সেটা ও কি….. লোকটার চোয়াল একটু যেন শক্ত হল।
— মিউনিসিপ্যালিটিতে খবর দিয়েছেন? কুকুর টুকুর মরে নিতো?
— সব রকম দেখেই কল করেছি স্যার।
— ঠিক আছে, সময় করে যাব। নাম টা বলুন।
— সম্রাট সাহা।

ফোন টা রেখে সম্রাট জয়শ্রীর দিকে তাকাল।
জয়শ্রী মেয়ে কে শুয়ে। সম্রাটের মনে হল, জয়শ্রী কিছু জিজ্ঞাসা করল।
— কি বলল? ওরা আর কি বলবে! বলল, ব্রাহ্মণ ডেকে পূজো দিতে। তো তাই না হয় করব। দরকার হলে ফ্ল্যাটের সবার সঙ্গে কথা বলব। সবার ই তো সমস্যা। দিনের বেলা একরকম। রাতে তো বার হওয়াই মুশকিল! তবে মিউনিসিপ্যালিটিতে একটা খবর দেব ভাবছি। এই গন্ধ কোথা থেকে যে আসছে!

দশ মিনিট পর সম্রাট জামা পরে বের হল। ওদের বিপরীত দিকে ই রাজকুমারের ফ্ল্যাট।
ও গিয়ে বার কয়েক বেল মারল, অবশেষে ঘরের ভিতর থেকে ওর মায়ের গলা ভেসে এল।
— কে-এ-এ-এ?
— কাকিমা আমি সম্রাট, রাজকুমার আছে?
— ঘুমাচ্ছে। পরে এস।
— ঘুমাচ্ছে! এই সময়?

 





অগত্যা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামা। নিচের লনে অনেকে বসে আছে। একবার সমস্যা টা বলা যাক সকল কে। যদি কোন সুরাহা হয়।

ঐ অ্যাপার্টমেন্টের অনেকেই ছিল নিচে। ওকে নামতে দেখে বৃদ্ধ বিনয় বাবু গল্প থামিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল।
— কিছু বলবেন মেসোমশাই?
–হ্যাঁ, মানে আজ ঠিক দুপুরবেলা কোন পুরুষ মানুষের চিৎকার শুনতে পেয়েছ?
— হ্যাঁ, পেয়েছি কাকু। কিন্তু কোন ফ্লোর থেকে বুঝতে পারলাম না। বড় ভয়ানক সে চিৎকার!
পাশ থেকে রিটায়ার্ড ব্যাঙ্ক কর্মী করবী সেন বললেন, — গত কাল রাতে আমি মেয়েকে নিয়ে একটু ছাদে গেছিলাম।
স্পষ্ট দেখলাম একটা চেয়ারে কে বসে আছে, ওমা সামনে গিয়ে দেখি কেউ না! আমার মেয়েও আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে!
— আমার অভিজ্ঞতা গুলো একটু অন্য রকম। দিন তিনেক আগে মেয়ে সন্ধ্যা বেলা প্রাইভেট টিউটরের বাড়ি থেকে ফিরে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে দেখে একতলা আর দোতলার সিঁড়ির মাঝের চাতালে একটা ছায়ামূর্তি! অন্ধকারে এই ফ্ল্যাটের কেউ নামছে মনে করে, ও মোবাইল থেকে টর্চ জ্বালায়। তারপর ই আর্তনাদ করে নিচে পড়ে যায়। খুব ভাগ্য ভাল যে হাত, পা ভাঙেনি বা মাথায় চোট লাগেনি। —সুধীর বাবু বললেন।
— কি দেখেছিল ও?
সম্রাটের নিচের ফ্ল্যাটের নিখিল দা, মানে নিখিল বোস প্রশ্ন টা করল। তথ্য, প্রযুক্তি দপ্তরে কাজ করেন উনি।
— একজন বৃদ্ধ। যার সারা শরীর পুরো সাদা!
— তবে আমার অভিজ্ঞতা টাও বলি।–মিসেস প্রিয়াঙ্কা ভাদুরী শুরু করল।
—প্রায় সাত দিন আগে ঠিক দুপুরে বার বার কেউ একজন বেল টিপ ছিল। কিন্তু যখনই খুলি, তখনই দেখি কেউ কোথায় ও নেই!

— তাহলে বেশ বোঝা যাচ্ছে, যে কিছু একটা আছে। কিন্তু সেটা কি?
বিনয় বাবুর কথায় সম্রাট মাথা নাড়াল। বলল– শুধু তাই না। কোন পচা গন্ধ কি আপনারা পাচ্ছেন?
সম্রাটের কথা তে সবাই মুখ চাওয়া চায়ী করল।
— না, সেরকম কিছু তো পাচ্ছি না। — করবী সেন মাথা নাড়ল। একে একে বাকিরাও।

সম্রাট ভাবতে বসল, ভৌতিক অস্তিত্ব তো সবাই স্বীকার করে নিল। কিন্তু গন্ধের ব্যাপার টা কি শুধু ওর মনের ভুল?

এমন সময় দূর থেকে রাজকুমার কে দেখল। হাতে কিছু শুকনো খাবারের প্যাকেট নিয়ে আসছে।
লনের পাশ দিয়ে কারোর দিকে না তাকিয়ে হন হন করে সিঁড়ির দিকে যাচ্ছিল।
সম্রাট অবাক হয়ে বলল, — একি, তুমি বাইরে ছিলে? এদিকে তোমার মা যে বলল, তুমি ঘুমাচ্ছ!
রাজকুমার থমকে দাঁড়াল। তারপর ঘুরে গিয়ে বলল, — আমার মা বলেছে!
— হ্যাঁ, এই আধ ঘণ্টা আগে হবে।
— মনে হয় তুমি ভুল শুনেছ।
— কিন্তু , আমি তো তাই শুনলাম মনে হল।
— জানি না। বুঝতে পারছি না, কিভাবে শুনলে। — রাজকুমার বেশ গম্ভীর হয়ে সিঁড়ির পথ ধরল।
— আচ্ছা ভাই, তুমি কি কোন ভুতের উপদ্রব টের পাচ্ছ?
— নিখিল দার ভাই অনিল বোস প্রশ্ন করল। সে ঠিক রাজকুমারের নিচের তলা তে থাকে বলে সব সময় কোন না কোন অদ্ভুত শব্দ উপর থেকে পায়।
— না সেরকম কিছু তো পাই নি। — রাজকুমার যেন একটু অন্যমনস্ক হয়ে বলল। তারপর আর না দাঁড়িয়ে হন হন করে চলে গেল।
— আশ্চর্য! কোন কিছু টের পায় নি?–বিনয় বাবুর মুখে বিস্ময়।
— আপনারা যাই বলুন, ওদের পরিবার টা কিন্তু বড়ই অসামাজিক। — প্রিয়াঙ্কা ভাদুরী মশা তাড়াতে তাড়াতে উঠে বলল।
— হ্যাঁ, তা কিছুটা সত্যি। আর একটা ব্যাপার ও আমি লক্ষ্য করেছি। ওরা খুব কম বের হয়। বিশেষ করে ওর মা, বাবা, বোন কে তো দেখতে ই পাওয়া যায় না। খুব কম বের হয়। — করবী সেন চেয়ার সরিয়ে উঠে বলল। কারণ ততক্ষণে শীতের সন্ধ্যা ঘনিয়েছে।
— ঠিক, তবে আমার পাশের ফ্ল্যাট বলে আমি অবশ্য সারাদিনই ওদের আওয়াজ শুনি। — সম্রাট হেসে বলল।

ইতিমধ্যে সন্ধ্যা হয়ে আসায় ও সবাই কে বিদায় জানিয়ে উপরে চলে এল।
সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ সম্রাট অস্থির চিত্তে পায়চারী করতে লাগল। জয়শ্রী রান্না করছে এক মনে। মেয়ে মৌ নিশ্চিন্তে পড়াশোনা করছে। পাশের ফ্ল্যাটে রাজকুমার দের ঘর থেকে এক টানা কান্নার আওয়াজ আসছে। গলা টা কি ওর মায়ের না বোনের?
মাঝে মাঝে ই রাজকুমার চিৎকার করে উঠছে।

 




 

সম্রাট মোবাইল বার করে নিচের ফ্ল্যাটের নিখিল দা কে ফোন করল। — কিছু শুনতে পাচ্ছেন?
— কি বলত?
— কান্নার আওয়াজ! রাজকুমারের ফ্ল্যাট থেকে আসছে। সঙ্গে ওর চিৎকার।
— সে কি মারধর করছে নাকি? আসব নাকি একবার? — আসলে তো ভালই হবে। — সম্রাট কাঁপা গলায় বলল। — আপনি অনিল দা কেও নিয়ে আসুন।
ঠিক দু মিনিট পর বেল বাজতে দেখল, দু ভাই চলে এসেছে। তিন জনে গিয়ে রাজকুমারের ফ্ল্যাটের বেল বাজাল।
— কে? — ভিতর থেকে রাজকুমারের গম্ভীর গলা এল।
— আমরা এসেছি। দরজা টা একটু খোল ভাই দরকার আছে। — অনিল বোস হাঁক পারল।
— এখন খুলতে পারব না। কাল সকালে বলবেন।

— দেখেছেন, ও এমনই করে। একদম অভদ্র। মা, বোন কে বোধহয় প্রতিদিন পেটায়। প্রতি দিন ওদের কান্না শুনি।
— সম্রাট বিরক্ত হয়ে বলল।
নিখিল বোস ওর কাঁধে হাত দিয়ে বলল, — দরজা না খুললে তো আর আমরা জোড় করতে পারি না। বরং পুলিশ কে জানাতে পারি।
— হুম, দাদা ঠিকই বলেছে। আমার ও তাই মত। — অনিল বোস বলল।
— তবে আজ থাক। কাল দেখে ব্যবস্থা করা যাবে। — সম্রাট কথা শেষ করে বাথরুমে এল।
দরজা খুলতেই চোখে পড়ল সাদা চাদর দেওয়া একটা মূর্তি!
— কে ওখানে? কে?
ভয়ার্ত দৃষ্টি তে তাকাল ও। তারপর অন্ধকারে হাতরে লাইট টা জ্বালাল।
— না, কেউ কোথাও নেই। তবে কি ওর মনের ভুল?

রাতে ঘুম আসতে চাইল না সম্রাটের। একটা নূপুরের শব্দ! খুব চেনা আওয়াজ। কাকে যেন দেখেছিল নূপুর পরতে?
ও উঠে পড়ল। অস্থির চিত্তে পায়চারি করতে লাগল।
পাঁচ তলা অ্যাপার্টমেন্টের চার তলায় সম্রাট দের তিন বেড রুম ফ্ল্যাট।
ও মেয়ে বড় হওয়ার পর থেকে একাই শোয়। পাশের ঘরে গিয়ে দেখে মৌ আর জয়শ্রী ঘুমাচ্ছে। বাথরুমের পাশের ঘরেও ওর মা, বাবা নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। শুধু এক অজানা আতঙ্কে ও নিজে ঘুমোতে পারছে না। পচা গন্ধ টা কেউ টের পাচ্ছে না। অথচ ও প্রতিনিয়ত পাচ্ছে! আলমারি থেকে দামী রুম ফ্রেশনার টা বার করে সারা ফ্ল্যাট জুড়ে স্প্রে করল ও। তারপর লাইট নিভিয়ে বারান্দার সামনে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট বার করল। কিন্তু লাইটার বার করার আগেই অন্ধকারে কেউ যেন ওর সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করল। চমকে ছিটকে এল ও!

কে? — কাঁপা কাঁপা গলায় প্রশ্ন করল ও।
একটা রক্তাক্ত চেনা মুখ! সেই লম্বা চুল। কপালের টিপটা এখনও উজ্জ্বল! কিন্তু মহিলা বড়ই চেনা। কিন্তু তাকে কিছুতেই মনে করতে পারল না ও।
— এখানে কি চাই? কে তুমি?
সম্রাট কিছুতেই ওই মহিলার দৃষ্টি সহ্য করতে পারছিল না।
একটা চিৎকার করে পিছনের ড্রেসিং টেবিলে টলে পড়ল। ঝনঝন করে আয়না টা ভেঙে পড়ল নিচে। ও কোন মতে উঠে লাইট জ্বালল।
না, কেউ কোথাও নেই! সবই কি ওর মনের ভুল?
আচ্ছা কাচ ভাঙার আওয়াজে পরিবারের সকলে ঘুম ভেঙে উঠে পড়েনিতো?
ও তাড়াতাড়ি দেখে নিল পাশের ঘর দুটো। না, সবাই ঘুমোচ্ছে!

ইন্দ্রপুরী অ্যাপার্টমেন্টের বাকিরা কে কোথায় থাকেন, একটু বলে দেওয়া যাক।
দোতলায় থাকেন বিনয় বাবু, সুধীর বাবু।
তিন তলা তে থাকেন নিখিল আর অনিল বাবুরা দুই ভাই ।
চার তলাতে সম্রাট আর রাজকুমার।
পাঁচ তলায় করবী সেন আর প্রিয়াঙ্কা ভাদুরী।
আর গ্রাউন্ড ফ্লোরে গাড়ি পার্কিং আর লন।

সাত দিন পর……..

করবী সেন সেদিন সন্ধ্যা বেলা তে রান্না করতে করতে গুন গুন করে গান করছিল। ডিসেম্বর মাসের পরিষ্কার আকাশ। হঠাৎ মনে হল, কে যেন পাশে বসে গান শুনছে!
বুকের ভিতর টা ছ্যাত করে উঠল। উনি আস্তে আস্তে ঘাড় ফেরালেন চেয়ার টার দিকে। না কেউ নেই। কিন্তু কেউ যে এই মাত্র বসে ছিল, তার হালকা একটা চিহ্ন চেয়ারের উপর ভালই বোঝা যাচ্ছে। গদি টা কিছু টা অবিন্যস্ত আর বসে গেছে! সেই সঙ্গে একটা পারফিউমের গন্ধ! খুব পরিচিত। মনে করার চেষ্টা করলাম করবী সেন। হ্যাঁ, মনে পড়েছে। রাজকুমারের বোন এটা ব্যবহার করত।
আতঙ্কে করবী সেনের হাত, পা ঠাণ্ডা হয়ে যেতে লাগল।

এ ঘটনার তিন দিন পর….

সকাল বেলা খবরের কাগজ টা পড়ার সময় বিনয় বাবুর মনে হতে লাগল। তিনি একা নন। আর একজন কেউ এই ঘরে আছে। খবরের পড়া কাগজ গুলো বিছানা তে রাখতে গেলেই তা যেন কেমন ঘুরে যাচ্ছে! এখন তো ফ্যান ও বন্ধ! বুড়ো হাড়ে কেমন যেন একটা শিরশিরানি টের পেলেন বিনয় বাবু।
বেশ কিছুদিন আগেও রাজকুমারের বাবার বয়সি বয়স্ক বন্ধুরা সকাল বেলা চায়ের আড্ডা দিতে ওনার ফ্ল্যাটে আসত। কাগজ ও পড়ত। এখন আর বয়সের ভারে কেউ আর নড়তে চান না। আজ যেন সেরকম ই একটা অভিজ্ঞতা হল।

তিন দিন পর….

সেদিন রাত্রি বেলা প্রিয়াঙ্কা ভাদুরী বাইরে পার্টি সেরে ঘরে ঢুকে ড্রেস পাল্টাচ্ছিল। এরপর আয়নার সামনে গিয়ে চুুল ঠিক করতে লাগল।
পাশে দেখল গুনগুন ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু গুনগুন কে তো ওর বাবার সঙ্গে বিছানাতে দেখে এসেছে। যাচাই করার জন্য একবার বেড রুমে উঁকি দিলেন।
না মেয়ে ঠিক ঠাক ই ঘুমাচ্ছে। তবে কাউকে দেখাটা মনে হয় চোখের ভুল। কিন্তু পরক্ষণেই ভুল ভাঙল। আয়নার প্রতিবিম্বের দিকে তাকাতেই হৃতস্পন্দন থেমে যাবার অবস্থা। ওর পিছনে গুনগুনেরই বয়সী একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কপালে কমলা রঙের হেয়ার ব্র্যান্ড, সঙ্গে মানান সই কমলা রঙের ফ্রক। মুখ টা ভয়ঙ্কর রকম ক্ষতবিক্ষত!
প্রিয়াঙ্কা আর কিছু ভাবার সময় পেল না। অচেতন হয়ে মেঝেতে গড়িয়ে পড়ল।

পরদিন বিনয় বাবু নিজের ফ্ল্যাটে জরুরী মিটিং ডাকলেন। যেভাবে ভৌতিক উপদ্রব বাড়ছে। তাতে প্রত্যেকের ই স্বাভাবিক জীবন যাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। তাছাড়া যে গন্ধের কথা সম্রাট বলেছে, তা সত্যিই এবার প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবাই ই ছুটে এল। একমাত্র রাজকুমার আর সম্রাট ছাড়া। আধ ঘণ্টা অপেক্ষা করে ও যখন ওরা কেউ নামল না, তখন বিনয় বাবু দুজনকেই ফোন করলেন। কিন্তু কেউ ফোন ধরল না।

করবী সেন বললেন, — আমার মনে হয় এখন ই একবার রাজকুমারের ফ্ল্যাটে যাওয়া উচিত। আমার মেয়ে বলল, গত এক মাস নাকি ওদের কাজের মেয়ে আসছে না। ব্যাপার টা কিন্তু সন্দেহজনক!

— শুধু তাই না। গত এক মাসে ঐ ফ্ল্যাট থেকে কেউ ময়লা ফেলতে বের হয় নি। এই ছোট খাট ব্যাপার গুলো কিন্তু খারাপ কিছু কেই ইঙ্গিত করছে। — প্রিয়াঙ্কা ভাদুরী বলল।
বিনয় বাবু নিখিলের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, নিখিল, তুমি বরং থানা তে একটা ফোন কর। পচা গন্ধে এর পর আর থাকা সম্ভব হবে না।

নিখিল ফোন করার এক ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ এল। সবার বক্তব শুনে রাজকুমারের ফ্ল্যাটের সামনে এল সবাই।

 




 

কয়েকবার বেল বাজাতেই রাজকুমার বের হয়ে এল। তার পর পুলিশ দেখে যেন একটু ভয় পেয়ে গেল।

— আপনি ই কি রাজকুমার দাস? — ইন্সপেক্টার কড়া চোখে তাকাল।
— আজ্ঞে হ্যাঁ, কি ব্যাপার বলুন তো?
— দেখুন এখানে তীব্র পচা গন্ধে কেউ থাকতে পারছে না। তার সঙ্গে ভৌতিক উপদ্রব। সবার অভিযোগ শুনে মনে হল আপনার ঘর টা একটু সার্চ করা দরকার।
— আমার ঘর! — রাজকুমারের মুখ টা কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সেটা দ্রুত কাটিয়ে বলল, কিন্তু কেন?
— সেটা পরে বলছি। আগে আপনি সরে দাঁড়ান।
ইন্সপেক্টারের কথা তে রাজকুমার সরে দাঁড়াল।
গোটা ঘর পুরো দস্তুর দেখে হতাশ মুখে ইন্সপেক্টার রাজকুমারের মুখোমুখি দাঁড়াল। আর কোন ভণিতা না করেই জিজ্ঞাসা করল, — আপনার মা, বাবা, বোন এরা সব কোথায়?
— ওরা আপাতত এখানে থাকে না। ওরা উত্তর বঙ্গে আমার পৈতৃক বাড়িতে আছে। এক মাস আগে ওদের রেখে এসেছি।
— সে কি, আমরা তো কেউ জানি না সে কথা! — করবী সেন বিভ্রান্ত হয়ে বলল।
— আমি ব্যাপার টা গোপন রাখতে চেয়েছি। তাই ভোর রাতের ফ্লাইটে ওদের বাগডোগরা পাঠিয়েছি।
–আশ্চর্য! এই জন্য কি কাজের মেয়েটিকে ও ছাড়িয়ে দিয়েছেন?
— প্রিয়াঙ্কা ভাদুরী র গলায় ও অপার বিস্ময়।
— হ্যাঁ, ঠিক তাই। বাড়িতে আমি একা। শুকনো খাবারে দিব্যি কাটছে। কাজের যেটুকু আছে, আমি নিজেই করে নিচ্ছি। আসলে আমার গোপনীয়তা দরকার। সবাই থাকলে তা সম্ভব না।
রাজকুমারের কথায় ইন্সপেক্টার একটু অবাক হল। — কি কাজ করেন যে এত গোপনীয়তা দরকার?
— আমি একজন সিআইডির অফিসার।
রাজকুমার একটা পরিচয় পত্র বার করে সকলের সামনে রেখে বলল, — আসলে আমার নাম রাজেশ সাহা। এই ফ্ল্যাট টা বাবার নামে কেনার সময় একটা বিশেষ সরকারী বিষয়ে তদন্ত চলছিল। যে বিষয়ে তদন্ত, তাতে আত্ম গোপন হওয়া জরুরী। তাই ছদ্মনাম নেওয়া। কিন্তু জেনে রাখুন আমি অসামাজিক নই।

ওর আই কার্ড টা দেখে তা ফেরত দিয়ে করমর্দন করল ইন্সপেক্টার।
— কিন্তু সম্রাট যে গত কাল আপনার মায়ের গলা শুনেছে স্পষ্ট! — নিখিল বাবুর যেন ঘোর কাটছিল না।
— সম্রাট ভুল বলেছে। আসলে ও বদ্ধ উন্মাদ। তাই ওর কথা বিশ্বাস না করাই ভাল।
— সম্রাট উন্মাদ! কি বলছ?
বিনয় বাবু যেন হতবাক হয়ে গেল।
— হ্যাঁ, ও উন্মাদ। মাঝে এক ডাক্তার কে দেখাচ্ছিল। সে আবার আমার বন্ধু। ফ্ল্যাটের ঠিকানা বলতেই আমরা যে একই ফ্ল্যাটের, তা আমার বন্ধু বুঝতে পারে। আর সতর্ক করে দেয়, যেন ওর থেকে সবাই দূরে থাকি। যখন তখন বিনা কারণে মানুষ খুন করার প্রবণতা আছে ওর।

ওরা যখন কথা বলছিল, সেই সময় হঠাৎ অনিল বাবু চিৎকার করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। সবাই দেখল অনিল বাবু সম্রাটের ফ্ল্যাটের সামনে ফ্যাকাসে মুখে দাঁড়িয়ে!
একটা রক্তের সরু ধারা দরজার তলা থেকে বেড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে গড়াচ্ছে!

এদিকে যখন পুলিশ রাজকুমারের ফ্ল্যাটে, সম্রাট তখন আনমনে ব্যালকনি তে বসে একটার পর একটা সিগারেট টানছিল। বিনয় বাবুর ফোন টা ইচ্ছা করেই ধরেনি। আজ আর কারোর সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছা নেই। এদিকে পচা গন্ধ যেন ক্রমশ অসহ্য হয়ে উঠতে লাগল।
বাড়িতে আর কোন রুম ফ্রেশনার ও নেই। পকেটে টাকা ও নেই, যে কিনতে যাবে।

একটা সময় শেষ সিগারেটের একে বেঁকে ওঠা ধোঁয়ার কুণ্ডলির দিকে তাকিয়ে রইল অলস ভাবে। পুলিশের গাড়িটা অ্যাপার্টমেন্টের গায়ে থামতেই হাত তালি দিল নিজের খেয়ালে।
যাক, এতদিনে পচা গন্ধ টা সবাই বুঝতে পেরেছে। ও অনেক চেষ্টা করে ছিল গন্ধ টা আটকাতে। কিন্তু পারেনি।
আর কি করেই বা আটকাবে?
এক সাথে চার, চারটে লাশ ঘরের মধ্যে!

 




 

বছর খানেক ধরেই ওর জগত টা কেমন যেন সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। চাকরী তে মন্দার প্রভাব। তারপর বেহিসাবী জীবন। অফিসে সব কাজ ভুল-ভাল। বসের কটু কথা নিত্য দিন যেন বেড়েই চলছিল।
ও যে এক ক্রিটিক্যাল সাইকো পেশেন্ট হয়ে যাচ্ছে, সেটা ও বুঝত। তার জন্য ডাক্তার ও দেখিয়েছিল।
কিন্তু সংসারের চাপ যেন সাঁড়াশি হয়ে ওর গলায় চেপে বসেছিল। মৌ বড় হচ্ছে। মা, বাবার ওষুধ বাড়ছে। বৌ এর নিত্য আবদার।
সেদিন এরকম ই কিছু একটা হয়েছিল। সঠিক ঘটনা ওর মনে পরে না। মনে করতে গেলে মাথায় কষ্ট হয়। তবে এটুকু মনে আছে, যে খুব ঝগড়া হয়ে ছিল । সন্ধ্যা বেলায় পরিশ্রান্ত শরীর নিয়ে বাড়ি আসার পর মাথা এত গরম হয়ে গেল, যে রান্নাঘরের নোড়া দিয়েই জয়শ্রীর মাথায় আঘাত করে ফেলে।
একটা চিৎকার অবশ্য করে ফেলেছিল জয়শ্রী। সেটাই আরও কাল হল।
ততক্ষণে মা চলে এসেছে ঠাকুর ঘর থেকে। সারা মেঝে তখন রক্তে ভাসছে। তা দেখে ওর মা ভয়ে কাঁপতে লাগল। ওর মার হাই ব্লাড প্রেশার। সুগার ও অনেক। জয়শ্রীর হা করে মুখ টা দেখে ওর মা বুকে হাত দিয়ে মেঝেতে গড়িয়ে পড়ল। আর উঠল না। ও দ্রুত বুঝেছিল এটা হার্ট অ্যাটাক। সময় মতন হাসপাতাল গেলে হয়তো মা বাঁচত। কিন্তু বাবার সঙ্গে বাক, বিতণ্ডা তে গোল্ডেন টাইম টা পেরিয়ে গেল।

বাবাও যেন কেমন ছেলেমানুষী করতে গেল। বার বার বারণ করা স্বত্বে ও বিনয় বাবু কে ফোন করতে গেল। এটুকু বুঝল না যে ছেলে ধরা পরে যাবে।
বাবাকে থামাতে ও একটা জোর ধাক্কা মেরে ছিল। ছিটকে গিয়ে জ্বলন্ত গ্যাসের স্টোভের উপর পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে সিল্কের পাঞ্জাবি তে আগুন ধরে গেল। না, ও আর বাঁচানোর চেষ্টা করেনি।
আটাত্তর বছরের বুড়োর বেঁচে থেকে কি হবে? উনি বাঁচলে তো ও ধরা পড়ে যাবে।

কিছুক্ষন পুড়তে সময় নিল। অশক্ত শরীরে বৃদ্ধের লড়ার ক্ষমতা ছিল না। ও এক মনে ভাবছিল, যে কি করে এই বডি গুলো কে লুকিয়ে রাখবে। এমন সময় মৌ টিউশন থেকে ফিরে এল।
দরজা টা খুলে দিয়েই ও এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার পর মৌ ঘরে ঢুকতেই এগারো বছরের শরীর টাকে তুলে মেঝেতে আছড়ে ফেলল। ঠিক কংসের মতন। মাথা ফেটে রক্ত ঝড়তে লাগল।
তার পর মৃত্যু নিশ্চিত করতে গলা টা টিপে ধরল ও। আওয়াজ করার কোন সুযোগ ই পেল না মেয়েটা!

এক ঘণ্টা পর একটু ধাতস্থ হল ও। উপরের ফ্ল্যাট থেকে করবী সেনের গানের গলা ভেসে আসছে। জয়শ্রী গান খুব ভালবাসত। মাঝে মাঝে ই যেত করবী সেনের ফ্ল্যাটে।
ও টের পেল, একটা দামী পারফিউমের গন্ধ ভেসে আসছে। নির্ঘাত প্রিয়াঙ্কা ভাদুরীর। মৌ এর খুব প্রিয়। প্রায় সময় ই সে ওদের ফ্ল্যাটে যায়। আর ঘরে এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সেই সাজগোজ নিজের উপর প্রয়োগ করে।

ওর যখন হুঁশ হল। ততক্ষণে সবাই তখন ডেডবডি। কাউকে আর বাঁচানো সম্ভব না। বাচ্চা ছেলের মতন ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদত লাগল সবার শোকে।
মাঝে মাঝে ওর মনে হত, এগুলো সব দুঃস্বপ্ন। ওদের কারোর কিছুই হয় নি। সবাই আবার বেঁচে উঠবে। তাই ঘরে সব সময় মা, বাবা, মৌ আর জয়শ্রীর ডেড বডির সাথে অনর্গল কথা বলতে লাগল। পাছে ওরা ঘুম থেকে উঠে পড়ে। ওর মনে হতে লাগল, যে ওরা যেন সব কথার উত্তর দিচ্ছে। চোখের সামনে প্রতিদিন যেন ওদের দেখতে পেত। মৌ পড়াশোনা করছে। টিউশন যাচ্ছে। প্রিয়াঙ্কা দের ঘরে যাচ্ছে। জয়শ্রী কে সব কাজ করতে দেখত। ছাদে যেতে দেখত। করবী সেনের ফ্ল্যাটে গান শুনতে যেতে দেখত। নূপুর পায়ে নাচতে দেখত। খুব ভাল নাচত জয়শ্রী। এরপর বাবা কে দেখত কাগজ পড়তে, বিনয় বাবুর ঘরে আড্ডা মারতে যেতে দেখত। মাকে ঠাকুর পূজো দিতে দেখত। তখন মনে হত, সবই স্বাভাবিক। কিছুই হয় নি। যা কিছু ও ভাবছে, সবই মনের ভুল বা দুঃস্বপ্ন। তাই বার বার সবাই কে জিজ্ঞাসা করত, যে পচা গন্ধ কেউ পাচ্ছে কিনা। ভুতের উপদ্রব কেউ টের পাচ্ছে কিনা। আস্তে আস্তে সব উত্তর ই হ্যাঁ হয়ে গেল! একটা শূন্যতা ছাড়া এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ব্যালকনি থেকে ঘরে ঢুকল ও। দুটো ঘরে চারজন মৃত মানুষ পড়ে আছে। মারা যাবার পর বডি গুলোকে ও ই বিছানা তে পর পর শুইয়ে দিয়েছিল। এই এক মাসে শরীর গুলো পচে গলে বিছানার সাথে লেগে গেছে।

মৌ এর কপালে একটা চুমু খেল ও। অবশ্য সবই পচে মাংস পিণ্ডে পরিণত হয়েছে।

ও জানে, ও এই পৃথিবী তে বড় একা। মরা বা বাঁচা কোন টাতেই কোন কিছু যায় আসে না। একজন উন্মাদ শুধু সবার উপহাসের পাত্র হয়েই থাকতে পারে।
নোট প্যাড থেকে একটা পাতা ছিঁড়ল ও। তার উপর সমস্ত ঘটনাটা গুছিয়ে লিখল। সারা ঘর, বারান্দা তে আজও রক্তের ধারা! তবে তা তার পরিবারের কারোর না। ওর নিজের। প্রায় এক ঘণ্টা আগে ব্লেড দিয়ে হাতের শিরা কেটেছে সম্রাট। জানে না কতটা রক্ত পাত হলে কেউ মারা যেতে পারে।
স্যুইসাইড নোট টা লিখে একবার দাঁড়াবার চেষ্টা করল ও। না, সম্ভব হল না। শরীরের শক্তি যেন আজ নিঃশেষিত।

—– সমাপ্ত—–

 

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 0   Average: 0/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।