উপহার

গল্পের নাম— উপহার

লেখক—ভিক্টর ব্যানার্জী

 

বিবিধভারতীতে গানের অনুষ্ঠান শুনতে শুনতে সুনন্দা প্রত্যুষকে বলল—“আহা,কি অপূর্ব গেয়েছে বলো।”
সে সেভিং ক্রিমটা অল্প করে গালে লাগিয়ে ব্রাশ দিয়ে ঘষতে ঘষতে বলল—”ওটা মান্না দে! ভালো করে শুনে দ্যাখো,গলায় কোনো খাদ নেই।”
—“এই তুমি তো গান শিখতে পারতে,কত দরাজ গলা তোমার।”
এ কথায় প্রত্যুষ মুচকি হেসে বলল—“তাহলে রেডিতে মান্না দে’র জায়গায় প্রত্যুষ সেনের গান শুনতে।”
সুনন্দা রেডিওটা অফ করে বলল—“এই ওই গানটা শোনাও না।”
—“কোনটা বলতো?”
—“সেই গানটা গো,উত্তম কুমারের সিনেমার। এই দ্যাখো,পেটে আসছে মুখে আসছে না। আরে ওই যে গো, মাধবীর সাথে বোটে যেতে যেতে গাইছিল না?”
—“এবার বুঝেছি।”
এই বলে দাড়ি কাটতে কাটতে সে খালি গলায় মান্না দে’র সেই বিখ্যাত কলিটা গেয়ে ওঠে—

 




 

“কে প্রথম কাছে এসেছি, কে প্রথম চেয়ে দেখেছি
কিছুতেই পাই না ভেবে, কে প্রথম ভালোবেসেছি।”

সুনন্দা গলা মিলিয়ে বলে—

“তুমি, না আমি।”

প্রত্যুষ বলে—“এই তোমায় বলা হয়নি,কাল অফিসের মিত্রবাবু মেয়ের বিয়েতে আমাদের নেমন্তন্ন করছে। ব্যাগের মধ্যে কার্ডটা আছে দ্যাখো।”
সুনন্দা চট্ করে উঠে দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখা অফিসের ব্যাগটা খুলল। তা থেকে লাল-সোনালী রঙের সুন্দর বিয়ের কার্ডখানা বার করে বলল—“দারুণ দেখতে করেছে গো কার্ডটা!”
—“হুম্। জেনারেল ম্যানেজারের মেয়ের বিয়ে বলে কথা।”
সুনন্দা বলল—“এই কি দেওয়া যায় বলোতো?”
প্রত্যুষ ফটকিরিটা জলে ডুবিয়ে আলতো করে গালে ঘষতে ঘষতে বলল—“দেখছি। আমার কাছে শ’দুয়েক টাকার মতো পড়ে আছে। তাতে আর কি হবে !”
—“জানি। এই,ছেড়ে দাও আমরা যাবো না।”
—“তা কি হয়! অফিসের ব্যাপার বোঝোই তো,না গেলে কথা হবে। চিন্তা করো না আমি দেখছি।”
এই বলে ফ্রেশ হয়ে স্নান সেরে দুটিখানি আলুপোস্ত-ভাত খেয়ে সে বেরিয়ে পড়ে অফিসে।
কম টাকা মাইনের কেরাণীর চাকরি,তাতে কোনোমতে সংসারটা চলে যায়। সখ আহ্লাদের মধ্যে রয়েছে রবিবার সিনেমায় যাওয়া আর দুটো চারটে সখের জিনিস কেনা। সুনন্দা ভীষণ মানিয়ে চলার মেয়ে। এই তো সেবারে সিনেমা দেখে ফেরার পথে দোকান থেকে একটা সৌখিন বাহারী কাপ প্লেটের সেট কিনেছিল। দামটা একটু বেশী নেওয়ায় সে রাগ করে বলেছিল,‘কি দরকার ছিল অত দাম দিয়ে জিনিস কেনার!’ প্রত্যুষ হেসে বলেছিল,‘এ আর এমন কি।’
সে যাইহোক,অফিস থেকে ফেরার পথে পুলকের কাছে শ পাঁচেক টাকা ধার নিয়ে একখানা খুব সুন্দর বালুচরী শাড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরল প্রত্যুষ। সুনন্দা ওর হাতে নতুন শাড়ির প্যাকেটটা দেখে বলল—“বাহ্ নিজে নিজে গিয়ে টুক করে প্রেজেন্টেশনটা কিনে নিলে,বলো। আমায় তো সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারতে!”
প্রত্যুষ জানে এত দাম জানলে কখনোই সে কিনতে দিত না। সে বলে—“দ্যাখো তো পছন্দ হয় কিনা।”
সে প্যাকেট থেকে শাড়িখানা বার করে দেখে চোখ বড় বড় করে বলে—“ওরে বাবা এ তো অনেক দাম গো!”
—“কোথায় অনেক দাম! আমি তো ভাবছি সস্তা হয়ে গেল কিনা!”
—“কি যে বলো,এত সুন্দর শাড়িটা নিশ্চয়ই পছন্দ হবে।”
এই বলে সুনন্দা একখানা রংচং-এ চিকচিকে কাগজ বার করে খুব সুন্দর করে শাড়িটা প্যাকিং করে ফেলে। তারপরে একটা ছোট্ট কাগজে সুন্দর করে লেখে—

 




 

‘পারমিতার শুভবিবাহে প্রীতি উপহার’
নিচে প্রত্যুষের নাম লিখে সেটা শাড়িটা আলমারিতে তুলে রাখে।
পারমিতার বিয়ের দিন সন্ধ্যেবেলা অফিস থেকে ফিরে প্রত্যুষ দেখল,সুনন্দা একটা নীল রঙের সিন্থটিক শাড়ি পড়ে আয়নার সামনে বসে মুখে ফেস পাউডার লাগাচ্ছিল।
তাকে দেখেই বলল—“এত দেরী করলে, বেরোবো কখন গো?”
—“তুমি এখন থেকেই সাজতে বসে গেছো?”
—“কতদিন পর বিয়েবাড়ি যাচ্ছি বলো তো। নাও বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসো। আমি ততক্ষণ আলমারি থেকে তোমার পাঞ্জাবীটা বার করে রাখছি।”
প্রত্যুষ চেঞ্জ করে তোয়ালেটা কাঁধে নিয়ে বাথরুমে ঢুকে যেতেই সে ওর ইস্ত্রি করে রাখা পাজামা পাঞ্জাবীটা বার করে বিছানায় রেখে দিল। তারপর ন্যাচারাল কালারের লিপস্টিকটা নিয়ে ঠোঁটে ভালো করে লাগিয়ে বলল—“এই পারফিউমটা কোথায় রেখেছো গো?”
সে বাথরুম থেকে বলল—“দ্যাখোই না, ড্রয়ারে ট্রয়ারে হবে হয়তো।”
তারপর ফ্রেশ হয়ে এসে ভালো করে সেজেগুজে সুনন্দা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
মিত্রবাড়ির মেয়ের বিয়ে বলে কথা। এলাহি আয়োজন করা হয়েছে। চারিদিকটা আলো দিয়ে সাজানো। ফুলের গেটখানা দেখলেই মনে হয় প্রচুর টাকা খরচ করে বানানো। সুনন্দা কনের হাতে শাড়িটা দিয়ে বলল—“এটা তোমার প্রত্যুষ আঙ্কলের তরফ থেকে।”
এরপর মিত্রবাবু তার স্ত্রী’র সাথে সুনন্দার আলাপ করিয়ে দিয়ে বললেন—“ও হলো আমাদের প্রত্যুষের ওয়াইফ।”
ওনার স্ত্রী কয়েকজন আত্মীয়দের সাথে গল্প করছিল। মিত্রবাবু চলে যেতেই তিনি সুনন্দাকে শুনিয়ে আত্মীয়দের বললেন—“লজ্জাও করে না,দ্যাখো দ্যাখো কেমন নেড়া বোঁচা হয়ে বিয়ে খেতে চলে এসেছে। গায়ে একটা সোনাও নেই গো,ছ্যা করো।”
সকলে হি হি করে হেসে উঠল। তাদের মধ্যে একজন বলে উঠল—“খুব গরীব হয়তো।”

 




 

অন্যজন বলল—“গরীব না, বলো ভিখিরি।”
কথাগুলো সুনন্দার কানে শ্লেষবাক্যের মতো শোনালো। সে চুপচাপ এসে ধীরে ধীরে প্রত্যুষকে বলল—“শরীরটা ভালো লাগছে না গো,বাড়ি চলো।”
সে বলল—“কেন?কি হয়েছে নন্দা?”
—“কাউকে কিছু বলতে হবে না,চলো না।”
প্রত্যুষ সুনন্দাকে নিয়ে বিয়েবাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা বাড়ি চলে এলো। বাড়ি এসে সুনন্দা চুপচাপ বসে রইল।
প্রত্যুষ বলল—“কি হয়েছে গো তোমার?”
—“সবকথা তোমার না শুনলেও চলবে।”
এই বলে সে প্রত্যুষের জন্য রান্না চাপালো। ঘন্টাখানেক পর হঠাৎ প্রত্যুষের কলিংবেলটা বেজে উঠল। তাড়াতাড়ি করে দরজা খুলে সে দেখল—মিত্রবাবু তার স্ত্রীকে নিয়ে বিয়ের মন্ডপ থেকে সোজা তাদের বাড়িতে এসেছেন। সে বলল—“আপনি?”
মিত্রবাবু একটু গম্ভীরস্বরে বললেন—“তোমার স্ত্রী কোথায় প্রত্যুষ?”
সুনন্দা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই তিনি তার স্ত্রীকে বললেন—“এক্ষুণি ক্ষমা চাও ওর কাছে। নইলে এ বিয়েই আমি ভেঙে দেব। আমায় ভালো করেই চেনো।”
প্রত্যুষ হকচকিয়ে বলল—“কি হয়েছে মিত্রবাবু?”
তিনি বললেন—“ছোটোপিসির মেয়ে ঝুমা না বললে তো জানতেই পারতাম না যে,তোমার স্ত্রীকে এত বিশ্রীভাবে ও অপমান করেছে।”
ওনার স্ত্রী সুনন্দার হাত দু খানি ধরে বলল—“ভীষণ ভুল হয়ে গেছে ভাই আমার, এবারের মতো মাপ করে দাও। নইলে আমার মেয়েটা যে লগ্নভ্রষ্টা হবে।”
সুনন্দা বলল—“এ কি করছেন কি! আপনি বড়,না হয় দুটো মন্দকথাই বলেছেন, কিচ্ছু মনে করিনি আমি। তবে আপনার আত্মীয়দের বলবেন,ভিখারি আমি নই,ওর মতো স্বামী যার আছে তার মতো ধনী এ পৃথিবীতে কেউ নেই।”

_____

১৬ই বৈশাখ ১৪২৭
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ©ভিক্টর ব্যানার্জী

 




গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total:    Average: /5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।