#একটুকরো_ভালোবাসা

#একটুকরো_ভালোবাসা❤
#লেখাঃস্মৃতি নূর অভনী ❤
#পর্বঃ০১

 

ড়ির কাঁটা তিনটের ঘরে ছুঁই ছুঁই। কালো রঙের একটি মাইক্রোবাস থেকে আহম্মেদ বাড়ির সামনে একটি মেয়েকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে রেখে গেছে কয়েকজন লোক।কিন্তু এতে মেয়েটির কোনো হেলদোল নেই,জ্ঞান হারিয়ে আছে মেয়েটি।গাঁয়ের গাঢ় হলুদ রঙের জামাটির দুই হাত সহ বেশ কিছু জায়গা ছেঁড়া। গাড়ি থেকে জোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলায় কপাল ফেঁটে রক্ত ঝরছে অনবরত। ঘড়ির কাঁটা তিনটে পাড় হয়ে গেলেও রাস্তা দিয়ে গাড়ি ছুটছে মিনিট কয়েক পর পরেই।আহম্মেদ বাড়ির মেইন গেটের ডান পাশের এক কর্নারে উপুড় হয়ে অগোছালো হয়ে পরে আছে মেয়েটি।।দুহাত ভর্তি লাল টকটকে মেহেদী গুলোতে রক্তের ছিপছিপে লেপ্টে আছে।মেইন রাস্তা দিয়ে মিনিট কয়েক পর পরে কয়েক টা গাড়ি ছুটে গেলেও মেয়েটির দিকে কারো খেয়াল নেই।ব্যাস্ত এই শহরে নিস্তব্ধ রাতে ব্যস্ত হয়ে আছে সবাই গাড়ির গতিতে।।কিন্তু সময় গড়িয়ে চলছে।”

সময় নদীর স্রোতের ন্যায় বয়ে চলছে নীরবধি।বাম পাশের বড় মসজিদ থেকে ফজরের আজানের সূর ভেসে আসছে।সেই সাথে ভেসে আসছে ভাঙা গলায় আজানের সাথে পাল্লা দিয়ে ডাকতে থাকা বেশ কয়েকটি কুকুরের ঘেউঘেউ শব্দ।মেয়েটির জ্ঞান ফেরেনি এখনো। আগের মতোই অগোছালো হয়ে গোলগাল চেহারাটা পিচঢালা রাস্তায় লেপ্টে দিয়ে পরে আছে সে। মাথা এবং শরীরের বিভিন্ন জায়গা থেকে রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে রাস্তায় ও শরীরে জমাট বেঁধে আছে রক্তগুলো।।

ফজরের আজানের শব্দে দুহাত মুষ্টি বদ্ধ করে মাথা নিচু করে বারান্দার এক কোনে বসে থাকা ফারহানের ঘোর কাঁটলো।পুরনো কথা ভাবতে ভাবতেই গভীর ঘোরে নির্মিত হয়েছিল সে।।মাথা উঁচু করে উঠে দাঁড়ালো।বাইরের এই নিস্তব্ধ পরিবেশ বড্ড বিষাক্ত লাগছে আজ তার কাছে।সারারাত নির্ঘুম কাঁটানোর পরেও ঘুমের কোনো রেশ নেই তার চোখেমুখে।সারা শরীর জুড়ে বিরাজ করছে বিষাক্ত এক বিষন্নতা,তার সাথে ভর করে আছে একরাশ অভিমান।

(বিশিষ্ট শিল্পপতি নীহাল আহম্মেদের ছেলে ফারহান আহম্মেদ নীল।।ফারহান,আর নিশু দুই ভাই বোন।আমেরিকা থেকে স্টাডি শেষ করে কিছুদিন আগেই বাসায় এসেছে ফারহান।ফারহানের চাচা মিজান আহম্মেদের একমাত্র মেয়ে স্মৃতি নূর অভনীর সাথে বিয়ে ছিলো আজ ফারহানের।।পরিবারের ইচ্ছেতে বিয়ে হলেও দুজনের মনেই ভালোলাগা-ভালোবাসা ছিলো।।অভনীর ইচ্ছা আর জেদের কাছে পরাস্ত হয়ে আপাতত ঘরোয়া ভাবেই বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে তাদের।অতি নিকট আত্নীয় ছাড়া তেমন কাউকেই বলা হয়নি।অভনীর সিদ্ধান্তে প্রথমে রাগ হলেও প্রিয় মানুষটার ইচ্ছে বিধায় রাগ চুপসে গিয়েছিলো ফারহানের।।বুধবার রাত ১ টা পর্যন্ত নিজেরা নিজেরা খুব আনন্দের সাথেই মেহেদী অনুষ্ঠান শেষ করেছিলো।।কিন্তু গায়ে হলুদের দিন সকাল থেকেই অভনী কে দেখা যাচ্ছিলো না।হলুদের কাজে সবাই খুঁজতে খুঁজতে পুরো বাড়িতে কোথাও যখন ওকে পেলো না তখন অভনীর রুম থেকে একটি চিঠি হাতে বেরিয়ে এলো মিতু(ফুপাতো বোন)।।চিঠি নিয়ে হুরমুড়িয়ে রুম থেকে বের হয়ে সবার কাছে গিয়ে বললো,,,,,

—-“মামা মামি দেখো অভনী কি করছে।দেখো চিঠি তে কি লিখে চলে গেছে বাড়ি থেকে।”

বাড়ি থেকে চলে গেছে কথাটা শুনতেই চমকে উঠলো সবাই।নির্নিমেষ চোখে চিঠির দিকে তাকিয়ে থেকে মনে মনে ভাবতে লাগলো ফারহান,,,”ঘুম পরী কি তাহলে রাজি ছিলো না এই বিয়েতে?”

চটপটে ভঙ্গিতে আবারো বলে উঠলো মিতু,,,,

—দাঁড়াও চিঠি তে কি লিখা আছে আমি তোমাদের পড়ে শুনাই।

বলেই চিঠি খুলে পড়তে শুরু করলো মিতু।বড় বড় অক্ষরে চিঠি তে লিখা ছিলো,,,”বাবা মামনি আমি এই বিয়ে করতে পারবো না।আমি একজন কে ভালোবাসি,তাই আমি তার হাত ধরেই চলে যাচ্ছি।তোমরা আমাকে খুঁজো না প্লিজ।”

প্রচন্ড রাগে রি রি করতে করতে সোফায় বসে পরলেন মিজান আহম্মেদ।চারদিকে নিস্তব্ধ গুমোট পরিস্থিতি। অভনী এমন করবে কারোর ধারনা ও ছিলো না।বিয়ে ঠিক করার আগে বার বার জিজ্ঞাসা করার পরেও একবার না করেনি সে।তাহলে এখন পালিয়ে গেলো কেনো? বুঝতে পারছে না সবাই।।সিড়ির অদূরে ঝিম দরে দাঁড়িয়ে আছে ফারহান।নীহাল আহম্মেদ এগিয়ে গিয়ে বললেন,,,,,

—-“মামনি না বুঝে একটা ভুল করে ফেলেছে,আমাদের উচিত ওদের খুঁজে বের করা।তারপর না হয় সবাই মিলে ওর পছন্দ অনুযায়ী ওদের বিয়েটাই পরিয়ে দিবো।”

সবার চোখেমুখে অবিশ্বাসের ছায়া।শাহেরা বেগম টলমল চোখে তাকিয়ে আছে মিতুর দিকে।।গম্ভীর ও কর্কশ গলায় তারস্বর করে বলে উঠলো ফারহান,,,,,,

—-“এ বাড়ি থেকে একটা লোক ও যেনো অভনী কে খুঁজতে বের না হয়।ও যেখানে গেছে, যার কাছে গেছে ভালো থাক।”

ফারহানের সমস্বরে বলে উঠলো মিতু,,,,

—-“ঠিকই তো বলেছে ফারহান।যে চলে যাবার চলে গেছে তাকে আবার খুঁজতে বের হতে হবে কেন?মেয়ের কি অভাব পরছে নাকি ফারহানের জন্য।”

পেছন ফিরে সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নিজের রুমে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলো ফারহান।নিশ্বাসরুদ্ধ করা মুহূর্ত মনে হচ্ছে তার কাছে।”এই জন্যই কি একবারের জন্য ও ভালোবাসি কথাটি বলেনি ঘুম পরী আমাকে?”
ভাবতে ভাবতেই হাঁটু মুড়ে চোখ নিমীলিত করে বসে রইলো সে।।

ফারহানের কর্কশ গলার কথায় কেউই আর খুঁজতে বের হলো না অভনী কে।কিন্তু নীহাল আহম্মেদ লুকিয়ে লোক লাগিয়েছিলেন অভনী কে খোঁজার জন্য।
নিকটাত্মীয় হলেও মেয়ে পালিয়েছে বিয়ে হবে না বিধায় একে একে চলে গেলো সবাই।।শুধু ফুপ্পি মনিরা বেগম,তার মেয়ে নিতু আর ফারহানের আপু নিশু রয়ে গেছেন।”)

আকাশে চাঁদ নেই।হেলিয়ে পরেছে সূর্যের আগমনী বার্তায়।।শূন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল ফারহান।সেই দীর্ঘশ্বাসের ভারী শব্দে গড়িয়ে পরলো দুফোটা নোনাজল।ডানহাতের শাহাদাত আঙুল দিয়ে চোখের কোনঘেঁসে থাকা পানি গুলো মুঁছে মূহুর্তেই চেহারায় কঠিন ভাব নিয়ে আসলো সে।ধীর পায়ে রুমে এগিয়ে অজু করে টুপি হাতে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো নামাজের উদ্দেশ্যে।

ড্রইংরুমে গিয়েই কয়েক সেকেন্ডের জন্য দাঁড়িয়ে গেলো ফারহান। মা নীলিমা আহম্মেদ আর চাচি শাহেরা বেগম সোফার এক কোনে গুটিসুটি মেরে বসেই ঘুমিয়ে আছেন দুজন।।চাচির চোখের কোনের চিকচিক করা জলগুলো দৃষ্টিগোচর হলো না ফারহানের।।হয়তো কারো ফিরে আসার অপেক্ষায় কাঁদতে কাঁদতে সোফায় ই ঘুমিয়ে গেছেন দুজন।আনমনে একটি দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসলো ফারহানের।সেই দীর্ঘশ্বাসের সাথে বেরিয়ে এলো প্রিয় মানুষের প্রতি সুপ্ত ঘৃনা।
টুপি হাতে দ্রুত গতিতে বাইরে বেরিয়ে গেলো সে। উদ্দেশ্য এখন মোড়ের সামনের বড় মসজিদে।।বাইরের হিম হিম হাল্কা বাতাস।সকালের স্নিগ্ধ বাতাসের সাথে তার মনে নাড়া দিচ্ছে বার বার একটি কথা, ”কেন করলি তুই এমন ঘুম পরী?কেন?”

জামাল(দাড়োয়ান) চাচা কে গেট খুলতে বলে পুরো বাড়ির দিকে তাকালো একবার ফারহান।ছোটখাটো ঘরোয়া অনুষ্ঠানের বিয়ে হলেও নানান রঙের লাইট লাগানো হয়েছে বাড়িটায়।।বিভিন্ন লাইটের বিভিন্ন রঙের আলো ছড়ানোর কাজ টা এখন পৃথিবীর সবথেকে বৃথা কাজ বলে মনে হচ্ছে ফারহানের।অবশ্যই আলো দেয়াও একটি কাজ!সেই আলো ছড়ানোর মতো ভয়ংকর কাজটা এই মূহুর্তে বৃথা হয়ে আরো অন্ধকার করে দিচ্ছে যেন চারপাশ।।

জামাল চাচার মুখটাও কেমন চুপসে আছে,,জামাল চাচার দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসলো ফারহান।সেই হাসির বিপরীতে অসহায় এক চাহনি ফেরত দিলো জামাল চাচা।ফারহান কিছু না বলে রাস্তার সামনে এগুলো।ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলোর সাথে পুরো বাড়ির আলোতে রাস্তার প্রায় অনেক টুকু জায়গায় আলো ছড়িয়ে আছে।
বাম পাশে মসজিদের উদ্দেশ্য হাঁটা দিতেই চোখের আঁচে পেছনে কিছু একটা দেখেছে বলে মনে হলো ফারহানের।কঁপাল কুচকে বার কয়েক চোখের পাতা ফেলে চট করে পেছনের দিকে তাকালো সে।গেটের ডানপাশের অদূরে একটি মেয়েকে উল্টে পড়ে থাকতে দেখে চমকে উঠলো সে।

“ভালোবাসার মানুষটা যে পরিস্থিতি,যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন একপলক দেখলেই তাকে চেনা যায়”।ফারহানেরও মেয়েটি কে চিনতে সময় লাগেনি।।স্তব্ধ নয়নে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে ধীর পায়ে মেয়েটির দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো সে।চোখ দুটো বড্ড জ্বলছে তার।হার্টবিট প্রতিনিয়ত বাড়ছে।।ঝাপসা হয়ে উঠা চোখ দুটো তে একদৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থেকে অশান্ত মন শুধু বার বার একটি কথাই বলছে, ” আল্লাহ আমার মন আর চোখ যেন ভুল বলে থাকে,ও যেন আমার ঘুম পরী না হয় আল্লাহ,ঘুম পরী যেখানে থাকে যেন ভালো থাকে”।

মেয়েটির কাছে আসতেই হাটুঁ গেড়ে বসে পরলো ফারহান।লম্বা লম্বা চুলে লেপ্টে থাকায় মুখের উপরের অংশ টুকু ঢেঁকে আছে মেয়েটির।।হার্টবিটের চলন গতি হাই স্প্রিটে বাড়ছে ক্রমাগত ফারহানের।মনের মাঝে প্রিয় মানুষ টাকে নিয়ে সুপ্ত এক ভয় না থাকলে এতোক্ষনে মেয়েটিকে নিয়ে হসপিটালের পথে রওনা হয়ে যেতে পারতো সে।।মনের সাথে তীব্র যুদ্ধ চালিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে মেয়েটিকে উপুড় করে মুখ থেকে চুল গুলো সরিয়ে দিলো সে।।নাহ তার মন ভুল বলেনি!ভালোবাসার মানুষ টার এমন অবস্থা দেখে নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে অভনীর দিকে তাকিয়ে রইলো ফারহান।টলমল চোখে তাকিয়ে থেকে বার কয়েক অভনীর গালে হাত দিয়ে ডাকতেই চাইলো সে।কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো কথা বের করতে পারছে না।।’আকস্মিকতা’ শব্দটা বড্ড বিষাক্ত!আকস্মিকতা সুখ দুঃখ কোনোটাই সহজে মেনে নিতে পারেনা মানুষ।।আচমকা অভনী কে শক্ত করে বুকের সাথে চেপে ধরে ‘পরী’ বলে চিৎকার করে উঠলো সে।।ফারহানের চিৎকারে জামাল চাচা বেঘোর ঘুম কাটিয়ে ছুটে আসলেন রাস্তায়।।অভনী কে কোলে নিয়ে সামনের দিকেই আপ্রাণ ছুটছে ফারহান।ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ফারহানের কোলে থাকা মেয়েটি কে চিনতে ভুল হয়নি জামাল চাচার।ছুটে ফারহানের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলতে লাগলেন ওনি,,,,
“ছোট আব্বা তুমি ছোট মারে কই পাইলা?কি হইছে ছোট মার?”

ফারহান কিছু না বলে গেইট পেরিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে অসহায় দৃষ্টিতে তার কোলে নিথর হয়ে পড়ে থাকা অভনীর দিকে তাকালো।জামাল চাচার চেঁচামেচির শব্দে ততক্ষনে বাসার সবাই ড্রইংরুমে এসে হাজির হয়েছেন।মেয়ের কথা শুনতেই দরজার দিকে হালকা দৌঁড় দিলেন শাহেরা বেগম, মেয়েকে জ্ঞানহীন আধছেঁড়া কাপড় পড়া অবস্থায় ফারহানের কোলে দেখে মাঝপথেই দাঁড়িয়ে গেলেন উনি।।ফারহান অভনী কে সোফায় শুয়াতেই সবাই দৌঁড়ে অভনীর কাছে আসলো,শাহেরা বেগম ছুঁটে এসে অভনীর মাথা নিজের কোলে নিয়ে বারবার ডাকতে লাগলেন ওকে।কিন্তু অভনীর জ্ঞান ফেরার কোনো ধাঁচ এখনো দেখা যাচ্ছে না।নীলিমা আহম্মেদ নিলুফা(কাজের মেয়ে)কে বলে একটা ওড়না এনে জরিয়ে দিলেন অভনীর গায়ে।।শাহেরা বেগম হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন,চারদিকের নিস্তব্ধ পরিবেশে শাহেরা বেগমের কান্নার ভারী শব্দ দেয়ালের সাথে ভেজে ভেজে ফিরে আসছে অনবরত।মিজান আহম্মেদ নির্বোধ ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে রইলেন।।মেয়ের এমন অবস্থায় কি করা উচিত বুঝতে পারছেন না উনি।।

একগ্লাস পানি হাতে দ্রুত পায়ে অভনীর পাশে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসলো ফারহান।গ্লাস থেকে পানি নিয়ে অভনীর চোখে মুখে ছিটকিয়ে পানি দিতে দিতে ডাকতে লাগলো তাকে।কিন্তু অভনীর এতেও কোনো হেলদোল নেই।বাড়ির সবার চিন্তার মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে তীব্র গতিতে। নীহাল আহম্মেদ এগিয়ে এসে ফারহান কে উদ্দেশ্য করে বললেন,,,

—-“ডক্টরের কাছে নিয়ে যেতে হবে মামনি কে,ফারহান তুই কোলে করে নিয়ে আয় আমি গাড়ি বের করছি”।

অভনীর দিকে তাকিয়ে থেকেই আস্তে করে জবাব দিলো ফারহান,,

—-“মুরাদ আংকেল কে খবর দিয়েছি।উনি আসছেন”।

নীহাল আহম্মেদ প্রতিউত্তরে আর কিছু বললেন না।শাহেরা বেগম কাঁদতে কাঁদতে ফারহানের দিকে তাকিয়ে চিল্লিয়ে বললেন,,,

—-“কোথায় পেয়েছিস তুই ওকে?কি করে হলো ওর এই অবস্থা?”

ফারহান কোনো জবাব দিলো না।।নিস্তব্ধ দৃদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো অভনীর দিকে।পেছন থেকে ডক্টর মুরাদ ধীরে ধীরে এগুতে এগুতে বললেন,,,,

—-“কি হয়েছে ফারহান?এতো সকালে জরুরি খবর দিলে যে?”

মুরাদ আংকেলের কন্ঠে চট করে উঠে দাঁড়ালো ফারহান।ডক্টরের সামনে ছুঁটে গিয়ে অভনীর দিকে ডান হাত অগ্রসর করে সে বললো,,,

—-“আংকেল অঅভনী!অভনী কথা বলছে না আংকেল।আপনি ওকে সুস্থ করে তুলুন প্লিজ আংকেল।ও তো এতোক্ষন চুপচাপ থাকে ন।।প্লিজ আংকেল ওকে আপনি বলুন না কথা বলতে,ও কথা বলছে কেন দেখুন না প্লিজ”।

বলতে বলতেই ফ্লোরে বসে পরলো ফারহান।ড. মুরাদ কিছু না বলে দ্রুত পায়ে অভনীর দিকে এগিয়ে গেলেন।।
মিতু এক গ্লাস পানি হাতে ফারহানের কাছে গেলো,পানির গ্লাস ফারহানের দিকে এগিয়ে দিতেই হাতের ঝাড়ায় গ্লাস ফেলে দিলো ফারহান,যার ফলশ্রুতি স্বরুপ গ্লাস ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো।নীহাল আহম্মেদ এগিয়ে আসলেন ফারহানের কাছে।ফারহানের বাহুতে রাত রেখে বললেন,,,,

—“শান্ত হও ফারহান।মামনীর কিছু হবে না।”

কোনো জবাব না দিয়ে উঠে দাঁড়ালো ফারহান।অভনীর পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে শান্ত দৃষ্টিতে ডক্টর মুরাদ আংকেল কে জিজ্ঞাসা করলো,,,,

—“আংকেল এখনো জ্ঞান ফিরছে না কেনো ওর?”

—–“আমার মনে হচ্ছে মামনি কে হাই ডোজের ঘুমের ইঞ্জেকশন দেয়া হয়েছে।।তাছাড়া মাথায় আঘাত পাবার কারনে জ্ঞান হারিয়ে আছে।আমি ব্যান্ডেজ করে একটা ইঞ্জেকশন দিয়ে দিচ্ছি আশা করা যায় ১ ঘন্টার মধ্যে জ্ঞান ফিরবে।কিন্তু যদি জ্ঞান না ফেরে তাহলে মামনি কে হসপিটালে ভর্তি করাতে হবে।”

মুরাদ আংকেল অভনীর মাথায় ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছেন।সবাই শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন অভনীর দিকে।।অভিমানী দৃষ্টিতে অভনীর দিকে একনজর তাকিয়ে দৌঁড়ে নিজের রুমে চলে গেলো ফারহান।সবাই একনজর ফারহানের দিকে দৃষ্টি দিলো,ফারহানের দিকে তাকিয়ে ডাকতে গিয়েও থেমে গেলো।প্রচন্ড রেগে আছে এখন সে,এই মুহূর্তে ওর ইচ্ছের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললে পুরো বাসায় কুরুক্ষেত্র বয়ে যাবে তা বেশ ভালো করেই জানে সবাই।।সিড়ির ডান পাশে দাঁড়িয়ে থেকে বাঁকা হাসলো মিতু,পরক্ষনেই ফারহানের পিছু পিছু যেতে লাগলো।কিন্তু দরজার কাছে যেতেই ফারহানের দরজা লাগানোর শব্দে আঁতকে উঠলো সে।।
ফারহানের রুমের ভিতর থেকে একের পর এক ভাঙার আসছে।নিজের উপর প্রচন্ড রাগ লাগছে এখন তার।ভিতরে ভিতরে একরাশ অসহায়ত্ব এসে ভীর জমিয়েছে।
আলমারির কাপড়,,বিছানার চাদর,তোশক,কোশন সব কিছু ছোড়াছুড়ি করেও রাগ কমছে না তার।খুন করে ফেলতে ইচ্ছে করছে এখন,প্রচন্ড খুনের নেশা চেপে ধরছে তাকে।ফুলের বাজ,একুরিয়াম সব ভেঙে একাকার।পুরো রুম জুড়ে শুধু ভাঙা ভাঙা টুকরো ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না।তবুও রাগ কমছে না,,এই ভয়ানক রাগ জ্বালিয়ে শেষ করে দিচ্ছে তাকে।দরজায় ধাক্কার শব্দ আসছে,,,,কিন্তু সেদিকে ফারহানের নজর কই?তার নজর ড্রেসিং টেবিলের কোনে পরে থাকা কাঁচের টুকরোর দিকে।কাঁচটা হাতে নিয়েই একের পর এক হাতে আঁচর কাটতে লাগলো সে।।নাহ্…মৃত্যুর আশায় নয়,রাগ কমানোর আশায়।।বাম হাতে কাঁচের টুকরো টা শক্ত করে চেপে ধরে চিৎকার করে বলে উঠলো সে,,,,

—-“কি করে পারলাম আমি আমার ঘুম পরী কে ছেড়ে দিতে?কেনো পারলাম না ওর হৃদয় আমার হৃদয়ের কুটিরে শক্ত করে বেঁধে রাখতে?আমি বেঁচে থাকতে কেমন করে কেউ পারলো আমার ঘুম পরী কে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে এতো কষ্ট দিতে?ছাড়বো না আমি,আমার ঘুম পরীর প্রতিটা কষ্টের হাজার গুনে ফেরত দিবো আমি তোকে। i will kill you.আমি জাস্ট খুন করে ফেলবো তোকে। just wait and watch.”

হাতে থাকা কাঁচের টুকরো টা দেয়ালে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে কাউকে ফোন দিলো সে।।

🌿
প্রায় দু ঘন্টা পর রুম থেকে বাইরে আসলো ফারহান।।উপর থেকেই নিচে সোফার দিকে তাকালো সে।জ্ঞান ফিরেছে অভনীর।শাহেরা বেগমের কাঁধে মাথা হেলিয়ে দিয়ে মায়ের হাত শক্ত করে চেপে ধরে বসে আছে সে।বুকের বাম পাশ টা মুচোড় দিয়ে উঠলো ফারহানের।তীব্র ব্যাথা অনুভূত হচ্ছে সেথায়।প্রিয় মানুষটার কষ্ট হাতুড়ি দিয়ে পেটাচ্ছে তার বুকে।এই মুহূর্তে অভনীর পাশে গিয়ে বসার তীব্র ইচ্ছা থাকলেও পরক্ষনে ওর সামনে যেতে ইচ্ছে করছে না ফারহানের।।

ডাইনিং টেবিল থেকে এক গ্লাস পানি নিয়ে অভনী কে খাইয়ে দিয়ে কপাল কুঁচকে প্রশ্নোওর স্বরে বলে উঠলেন মনিরা বেগম,,,,

—-“হে রে কি হইছিলো বল তো?সকাল সকাল চিঠি লিখে চলে গেলি প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়ে গেছোছ। বাবা মার কথা না ভেবে চুলকানি মাইক্কা প্রেমিকে হাত ধরে পালাইলি,,একবার ফারহানের কথা টাও তো ভাবতে পারতি নাকি?তোর সুখের লাইগা ছেলেটা তোরে খুঁজে বের করতেও যায় নাই,আরো বলছে ও যেখানে যাক ভালো থাক।কেউ যেনো তোরে না খুঁজে।।পালাইছোছ ভালা কথা তাইলে এমন অবস্থা হইলো কেমনে বল তো?”

অভনী আপসিপানা মুখে কপাল কুঁচকে তাকালো ফুপ্পির দিকে।।ঋজুভঙ্গিতে বললো,,,

—“কিসের চিঠি?কিসের প্রেমিক ফুপ্পি?”

উপস্থিত সবাই অনিবর্চনীয় নয়নে তাকালো অভনীর দিকে।আড়চোখে একবার সকল কে দেখে চঞ্চল গলায় বলে উঠলো মিতু,,,,

—-“এখন বয়ফ্রেন্ড ধোকা দিয়েছে বলে নেকামি করছিস অভনী?কালকে সকালে তো তুই নিজেই চিঠি তে বড় বড় করে লিখে গেলি তুই এই বিয়ে করতে চাস না তাই তোর প্রেমিকে হাত ধরে পালয়ে যাচ্ছিস।”

শক্তিহীন দেহ টাকে টেনে হুট করে দাঁড়িয়ে গেলো অভনী।চোখ ধারালো দৃষ্টিতে সকলের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,,,,,

—হোয়াট? আআমি কখন চিঠি লিখলাম?আমি চিঠি লিখবো কেন?আমার তো অন্য কারো সাথে সম্পর্ক নেই তাহলে পালিয়ে যাবো কিভাবে? ”

সকলের চোখে মুখে গুমোট ভাব।কপাল কুঁচকে গাম্ভীর্য ভাবে তাকিয়ে আছে সবাই।দুর্বল শরীর নিয়ে বেশিক্ষন দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না অভনী।খানিক পরে আবারো সোফায় বসে পরলো সে।

পাশ থেকে বাজখাঁই সূরে বলে উঠলেন মিজান আহম্মেদ,,,,,

—-“এখন তুমি মিথ্যা বলতেও শিখে গেছো?অবশ্য আমাদের কোনো শিক্ষাই তো কাজে লাগেনি।কাজে লাগলে কি আর আজকে এমন দিন দেখতে হতো?”

বলেই পাশের সোফায় বসে পরলেন উনি।ক্রন্দনরত চোখে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো অভনী।ডক্টর মুরাদ মিজান আহম্মেদের দিকে তাকিয়ে হালকা ঝাড়ির সূরে বললেন,,,,,

—-“আহ মিজান এইসব নিয়ে কি তোরা পরে কথা বলতে পারিস না?মেয়েটার শরীরের অবস্থা ভালো না।এখন একটু রিলেক্স থাকতে দে মামনি কে।মামনি তুমি হাইপার হইয়ো না এখন, পরে সব ঠিক হয়ে যাবে। (অভনী কে)।”

অভনী ডুকরে কেঁদে উঠলো।অভনীর মাথায় হাত দিয়ে নীলিমা আহম্মেদ বললেন,”কাঁদে না মা,সব ঠিক হয়ে যাবে।ভুল তো মানুষ ই করে তাইনা।

নীলিমা আহম্মেদের কথায় অভনীর কান্নার বেগ আরো বাড়লো।।”সত্য কথা বলার পরেও যখন সেই সত্য কেউ বিশ্বাস করতে চায়না,তার থেকে অস্বস্তিকর,অসহাত্ববোধ সময় আর নেই।”
ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে শক্তিহীন মিনমিন কন্ঠসূরে নিছক শক্তি টেনে বলে উঠলো অভনী,,,,,

—-“বিশ্বাস করো মামনি আমি পালিয়ে যাইনি।আমি কোনো চিঠিও লিখিনি।আমি কেনো পালাবো বলো “আমি তো ফারহান ভাইয়া কে ভালোবাসি”। সেদিন রাতে দেরি করে ঘুমানোর জন্য আমি সকালে কখন উঠেছি জানিনা,কিন্তু ঘুম থেকে উঠে দেখি আমি বিশাল বড় এক রুমে ছিলাম।আশেপাশে তাকিয়ে দেখলাম আমি আমার রুমে নেই।ওখানেই আমাকে আটকে রাখা হয়।।সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমি কাউকেই দেখিনি,,শুধু খাবার পাঠিয়ে দিতো।কিন্তু আমি না খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে এদিক ওদিক শুধু ফারহান ভাইয়া কে ডাকলাম,কিন্তু ফারহান ভাইয়া যায়নি আমায় আনতে।খুব ভয় লাগছিল আমার।রাতে কয়েকজন এসে জোরাজুরি করে আমায় কি একটা ইঞ্জেকশন দিলো তারপর থেকে আমার আর কিছু মনে নেই মামনি।বিশ্বাস করো আমি কিছু করিনি।আমি পালিয়ে যাইনি বাবা।আমি ফারহান ভাইয়া কে ভালোবাসি, ভালোবাসি আমি ফারহান ভাইয়া কে। ”

সকাল ৭ টা বেজে গেছে।সূর্য নিজের তেজ নিয়ে নেমে গিয়েছে ইতিমধ্যে।
অভনীর কথায় পুরো বাসায় শুনশান নীরবতায় অভনীর ডুকরে কাঁদার শব্দ টাই ভেসে আসছে।

তির্যক ভঙ্গিতে অভনীর দিকে তাকিয়ে মিতু বললো,,,,,

—-“শুন অভনী তোর এই সিনেমাটিক নাটক ফাটক কেউই বিশ্বাস করবে না। কোন সিনেমা থেকে শিখেছিস বলতো?বয়ফ্রেন্ড এর সাথে গিয়ে এখন জামার হাতা,নিজের মাথা ফাটিয়ে এসেছিস বলে এইসব বলে বুজাতে চাচ্ছিস সবাই কে?তুই ভুল করেছিস শিকার কর।তোর ঘরে তো আর অন্য কেউ চিঠি লিখে যাবে না।মামি তুমি ওকে ঘরে নিয়ে যাও।”

অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো অভনী মিতুর দিকে।সবার চোঁখে মুখে অভনীর কথায় বিশ্বাসের ছায়া দেখা গেলেও মিতুর কথায় আবারো পুরোদমে অবিশ্বাস এসে ভীর জমিয়েছে ওদের মনে।।

দোতলায় দাঁড়িয়ে থেকে এতোক্ষন যাবৎ সবার সব কথাই শুনেছে ফারহান।অন্য সবার মতো তার চোখে মুখেও ছিলো বিষ্ময়কর এক চিহ্ন।কিন্তু অভনীর লাস্ট কথাতেই বুকের ব্যাথা হাজার গুন বেড়ে গেলো তার।

“আমি ফারহান ভাইয়া কে ভালোবাসি”
এতোদিনের জমানো না বলা কথাটি অসহাত্ববোধে পরে এক নিমিষেই বলে দিলো অভনী।”আচ্ছা!!অভনী কি জানে?তার এই নরম সূরে বলা কথাটিই তীব্র আগুন নিয়ে জ্বালিয়ে দিচ্ছে কারো বুক?ধ্বংস করে দিচ্ছে তার উপর জমে থাকা সমস্ত রাগ অভিমানের ঝুলি?”

শ্যেন দৃষ্টিতে অভনীর দিকে একনজরে তাকিয়ে থেকে ভাবছে ফারহান,,,

—-“ঘুম পরীর কথায় মিথ্যের ছিটেফোঁটাও লাগছে না আমার কাছে।।তাহলে চিঠি লিখেছে কে?কে কিডনাপ করিয়েছে আমার ঘুম পরী কে?কে করেছে আমার ঘুম পরীর এমন অবস্থা?? কেনই বা করেছে সে?হুয়াই?তাছাড়া চিঠি?চিঠি টাই বা কিসের??”

.

.#চলবে?

(ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন,ভালো লাগলে কন্টিনিউ করবো)

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 1   Average: 3/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
close