একফোঁটা ঘাম

গল্পের নামএকফোঁটা ঘাম

লেখক—ভিক্টর ব্যানার্জী

 

কুন্তল দত্তের এমনিতেই অল্পদিনে চুল বেড়ে যায়। অার এই গরমে মাথার চুল ঘেমে ভিজে জবজবে হয়ে যাচ্ছে। টস্ টস্ করে ঘাড় বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। অফিসে ঝুঁকে লেখালিখি করতে গেলে চুঁইয়ে চুঁইয়ে ঘাম ঝরে। আর তাতেই হয়ে গেল সব্বোনাশ! হিসেবের খাতায় সৌখিন কালি ঢালা কলমে সুন্দর হাতের লেখায় হিসেব করে রেখেছিল ক্যাশিয়ার ভজহরি বাঁড়ুজ্যে। সেই হিসেব মেলাতে গিয়ে কুন্তলের ঘাড় বেয়ে টপ্ করে এক ফোঁটা ঘাম গিয়ে পড়ল ব্যালেন্স সিটের ক্রেডিটের ঘরে। লেখা গেল জেবড়ে। হিসেবের টোটালের ঘরের অঙ্কগুলো কালো স্পট হয়ে গেল।
কুন্তল বলল—“এই মেরেচে। যাঃ ভজহরি দেখলেই হয়ে গেল!”

 




 

সে ভাবলো এক্ষুণি হোয়াইটনার জোগার করে ওইটুকু জায়গা ম্যানেজ করে দেবে। কিন্তু যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধ্যে হয়! ড্রয়ার খুলে হোয়াইটনারটা বার করে তাপ্পি মারছে, এমন সময় চায়ের কেটলি নিয়ে দশরথ হাজির।
কুন্তলের জোড়াতালির শিল্পকর্ম দেখে বলল—“বাহ্ বাহ্ দারুণ তো। কালির দাগ গায়েব! হেবি বুদ্ধি!”
ব্যাটাচ্ছেলে দশরথের এত খ্যাড়খ্যাড়ে গলা যেন গলায় চোঁঙা বাঁধা আছে।
অফিসের সক্কলে শুনে নিল। বিশেষ করে ভজহরি বাঁড়ুয্যে।
কুন্তল বিড়বিড় করে বলল—“আজ আমার পেছন সেঁকে দিল রে!”

দশরথের গলা শুনে ভজহরি কাউমাউ করে চেঁচিয়ে বলল—“দিল রে দিল! আমার গুষ্টির ক্যাঁতায় আগুন জ্বেলে দিল!”
কুন্তলের টেবিলে দুষ্কর্মের প্রমাণ জ্বলজ্বল করছে। কুন্তল মুখে এমনই একটা ভাব আনার চেষ্টা করল যেন কিছুই হয়নি।
সে বলল—“ও ভজহরিদা কিছু হয়নি গো। তুমি তোমার কাজ করো।”
ভজহরি টেবিলের সুমুখে এগিয়ে এসে বলল—“হারামজাদা! নোংরাপোনা করে এখন ঘোমটা দিচ্ছো!”
কুন্তল রেগে গিয়ে বলল—“কি যা তা বলছ?”
—“তবে রে, চোরের মায়ের বড় গলা! আমার ব্যালেন্স সিটটায় তো পুরো রস মেরে দিয়েচো। এখন সাদা কালি মেরে শিল্প মারাচ্চো!”
—“একি ভাষা! মারাচ্চো! মুখে যা আসছে তাই বলছো!”
কুন্তলের কথায় ভজহরির বয়ে গেল। এমনিতেই মুখপাতলা, তার ওপর ওর খাটুনির ব্যালেন্স সিটের ওপর উৎপাত করেছে। ওর পিত্তি জ্বলে গেছে কুন্তলের ওপর। এদিকে কুন্তলের রোষানলে পড়ে গেল কেটলিধারী দশরথ।
কুন্তল বলল—“হ্যাঁরে তোকে অফিসের ব্যাপারে কে ফোঁপড় দালালি মারতে বলেছে।”
স্টোরকিপার যদু ঘোষাল দশরথের ওপর এমনিতেই হাড়েচটা।

 




 

সে ছন্দ মিলিয়ে বলল—
“চায়ের ভাঁড়ে চা দাও,
কেটলি নিয়ে বাড়ি যাও।”
দশরথও কম যায় না। সে যদু ঘোষালকে বলল—“কাল দেখো তোমার চায়ে চিনি দিয়ে দেবো। সুগার বেড়ে গ্যাঁজলা উঠে যাবে।”
যদু চিনি ছাড়া চা খায়, হাই সুগার! তার ওপর এরকম হুমকিতে তার মেজাজ গেল চড়ে।
ছন্দ মিলিয়ে বলল—“চিনি যদি পড়েছে চায়ে
পাঠিয়ে দেবো দেশের গাঁয়ে।”
একফোঁটা ঘামের জন্য এত কান্ড ঘটে গেল। কুন্তল ভাবলো, ‘দুত্তোর নিকুচি মেরেছে অফিসের। এক সপ্তাহ কামাই মেরে দেবে। ভজহরি থাকুক ওর মরার ব্যালেন্স সিট বুকে আগলে।’
কুন্তল সেইদিন বাড়ি ফিরে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল আজ থেকে দশদিন সে অফিসের পথে পা মারাবে না। বুঝুক সব্বাই ‘কতধানে কত চাল’।
পরের দিন কুন্তলের বউ বলল—“কি গো অফিস যাবে না।”
সে বানিয়ে বলল—“না, ছুটি দিয়েছে। মালিকের দাদু মরে গেচে না, ওই জন্য ছাদ্দো অবধি বন্ধ।”
তার বউ বলল—“সে কি গো! বলি এই কদিন তুমি ঘরে থাকবে?”
এই কথায় কুন্তল খ্যাঁকখেঁকিয়ে বলল—“—“কেনো তোমার কি?”
—“আ মরণ! বলি তোমার বাড়ি তুমি থাকবে, তাতে আমার কি!”
কুন্তলের এমনিতেই মেজাজ বিগড়ে ছিল। সে বলল—“যত্ত নষ্টের গোড়া এই চুল। আজ শালা নেড়াই হয়ে যাবো। না থাকবে বাঁশ, না বাজবে বাঁশি!”
যেই ভাবা সেই কাজ। বেলার দিক করে সেলুনে গিয়ে মাথা মুড়িয়ে নেড়া হয়ে গেল সে। বাড়ি আসতেই ওর বউ বলল—“একি গো সত্যি সত্যি নেড়া হয়ে গেলে যে!”

কুন্তল বলল—“কেমন নিমাই ঠাকুরের মতোন দেখতে লাগছে বলো?”
—“বলি নেমাই হবার সখ হলো কেনো?”
কুন্তল বলল—“সখ নয়, সখ নয় দায়ে পড়ে।”
কিসের দায়ে পড়ে যে কুন্তল নেড়ামুন্ডি হয়ে গেল তা ওর বউয়ের ঘটে ঢুকলো না। এদিকে কুন্তল নেড়া হয়ে বেশ ফুরফুরে আছে। আঃ, কানের পাশ দিয়ে হাওয়া ঢুকছে। উফফ্ কি আরাম।
আয়নার দিকে তাকায় আর টাকে হাত বোলায়। মাঝে মাঝে বিড়বিড় করে বলে,‘দ্যাখ কেমন লাগে।’
কুন্তল ভজহরির অ্যাসিস্ট্যান্ট। ও অফিস কামাই করায় ভজহরি পড়ল মহাফাঁপড়ে। একসাথে হাজার খানা কাজের চাপ। তার ওপর মালিকের ধ্যাঁতানি। তার অবস্থা দেখে যদু ঘোষাল ছন্দে ছন্দে বলল—
“ওরে আমার ভজহরি
খেয়ে নে তুই ঘুমের বড়ি।”
ভজহরিও কম যায় না। সেও সুর মিলিয়ে দাঁতখিচুনি দিয়ে বলল—

 




 

“আমায় মরছি আমার জ্বালায়,
হনুমানে দাঁত ক্যালায়।”
কাজ আর কাজ। কাজ যেন শেষ হয় না।
অন্যদিকে কুন্তল বেশ মজায় আছে। ‘দরকার নেই দশদিনের মাইনে,বুঝুক ভজহরিটা।’ এই ভেবে দিন দশেক ঘরে পড়ে রইল। অফিসের সকলে বার বার ফোন করেছে। কুন্তলের ফোন সুইচ অফ।
দশদিন পর কুন্তল অফিসে ঢুকল। ব্যস্ সঙ্গে সঙ্গে দশরথের মুখোমুখি। কুন্তল বিড়বিড় করে বলল,‘সক্কাল সক্কাল কালামুকোটার মুখ দেখলুম। যাঃ আমার পেছন সেঁকে দিল।’
দশরথ ওকে দেখে চমকে উঠে বলল—“কি গো কবে মারা গেল!”
অমনি যেন মাইকের মতো ওর কথাগুলো অফিসের হলঘরে ইকো হয়ে শোনাল। ভজহরি বাঁড়ুয্যে ওকে ওই অবস্থায় দেখে বলল—“সে কি গো কুন্তল! বাবা না মা?”
যদু ঘোষাল চেয়ার ছেড়ে উঠে এল। বলল—“ঘাট কাজ মিটে গেছে?”
ভজহরি দুঃখ দুঃখ মুখ করে বলল—“তাই বলি অফিস আসে না কেন!”
এইসব কথায় কুন্তল তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বলল—“ওরে আমায় শান্তি দিলোনি রে!সব্বোনাশীর দল, আমার গুষ্টিশুদ্ধু সব্বাই বেঁচে আছে!”
যদু ঘোষাল ছন্দে ছন্দে বলল—
“একি তোর হাল,
ভজহরির জ্বালায় তুই উড়িয়ে দিলি…….”
পরক্ষণেই জিভ কেটে সে বলল,‘নাহ্ ওটা বলা যাবে না।’

__

১১ই বৈশাখ ১৪২৭
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ©ভিক্টর ব্যানার্জী




গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total:    Average: /5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।