এভাবেও ভালোবাসা যায়

এভাবেও ভালোবাসা যায়

ট্রেন কটায় ? প্রশ্ন করে অরীন ।

3.25 p.m উত্তর দেয় অনীকা।

অরীন : intercity?

অনীকা : হ্যাঁ।

অরীন : ওকে, স্টেশন এ পৌঁছে ফোন করবো, রিসিভ করিস।

অনীকা : সেদিন যখন ৫ বার ফোন করলাম রিসিভ করেছিলি?

অরীন : আরে বাড়িতে ছিলাম, রাতে ফোন রিসিভ করি না, তাছাড়া মা বাবা ছিল, আমি কি কথা বলতে কি বলে ফেলবো তাই রিসিভ করিনি ।

অনীকা : বেশ আমাকেও আর ফোন করবি না, বাই গুড নাইট ।

এভাবেই চলতে থাকে অরীন অনীকার ঝগড়া, মান অভিমান, ভুল বোঝাবুঝি, আবার একে অপরকে মানানো। তবে সবটাই ইন্টারনেটের ভার্চুয়াল মাধ্যম ফেসবুক আর হোয়াটসঅ্যাপ –এ। ফোনে কথা খুব কম হয় , এ ফোন করে তো ও রিসিভ করে না আবার ও ফোন করে তো এ রিসিভ করে না। দুজনের কেউ-ই কম যায় না।

স্কুল জীবন শেষ করে কেউ যোগাযোগ রাখতে পারেনি, কারণ স্কুলে দুজনের দেখা হলেও কথা প্রায় হতোই না। তারপর দু-বছর আগে হঠাৎ-ই ফেসবুকে খুঁজে পেলো দুজন দুজনকে। কখনো গাঢ় থেকে গাঢ়তর আবার কখনো লঘু থেকে লঘুতর হচ্ছে এই বন্ধুত্ব।

ঝগড়া হলে অরীন প্রায়-ই ফেসবুকে Feeling alone লিখে স্ট্যাটাস পোস্ট করে। আর ঝগড়া না করে এরা থাকতেই পারে না। অনীকা খেয়াল করে ব্যাপার টা কিন্তু বেশি গুরুত্ব দেয় না। তবে কখন যে ঝগড়া শুরু হয় আর কখন যে শেষ হয়ে গল্প শুরু হয় তা তারা নিজেরাই জানে না।

অরীন মালদায় ব্রাঞ্চ ম্যানেজার , হেড অফিস কলকাতায় ।তাই তাকে প্রায়-ই কলকাতায় আসতে হয় ।অনীকার মাসির মেয়ের বিয়ে ছিল তাই সে বাবা মায়ের সাথে কলকাতায় এসেছিল । বাবা আগেই ফিরে গেছেন বাড়ি। অনীকা আর ওর মা কিছুদিন থাকলো মাসির বাড়ি, এবার তাদের বাড়ি যাওয়ার পালা। এমনিতে মাসির বাড়ি খুব কম আসা হয় এতটা দূর বলে। পরের দিন ট্রেনে উঠে সিট খুঁজতে থাকে অনীকা আর অনীকার মা, অনীকা খেয়াল করেনি যে অরীন আগের সিট-এই বসেছিল ,অনীকা কে দেখতে পেয়ে অরীন বলল “দেরি করে স্টেশন-এ পৌঁছেছিস নাকি?”

অনীকা বলল” হ্যাঁ রাস্তায় জ্যাম ছিল, দেরী হলো তাই।

“কাকিমা ভালো আছেন?” অরীন জিগ্যেস করলো।

অনীকার মা বললেন “ হ্যাঁ ভালো আছি, তুমি ভালো আছো?”

মনে মনে অরীন বলল “আপনার এই ঝগড়ুটে মেয়ের সাথে ট্রেন যাত্রা, ভালো কি থাকা যায়! মুখে বলল হ্যাঁ ভালো আছি।”

তারপর টুকরো টুকরো কিছু কথা হলো।কিন্তু দুজনকে দেখে বোঝাই যাচ্ছে যে এরাই সেই দুজন মানুষ যারা কারনে অকারণে ম্যাসেজে ঝগড়া করে। অনীকা ভাবছে “শান্ত ভদ্র ছেলেটা স্কুল এ এতো শান্ত তো ছিল না, ম্যাসেজে কথা বলে যে মানুষটা তাকে ঠিক এই ব্যাক্তি বলে মনে হচ্ছে না। দুই বছরে অনেকটাই চিনেছে দুজন দুজনকে, ভালোলাগাও জন্মেছে অনীকার। স্কুল জীবনের এতো বছর পর দেখা। ভালো লাগছে অনীকার ।

অরীন এর-ও প্রায় এক-ই অবস্থা, স্কুল থেকেই ভালো লাগতো অনীকাকে আর এই দু-বছরে অনীকার প্রতি তার ভালোলাগাটা আরও বেশি জন্মেছে। ভালোবাসার কথা জানিয়েওছে অনীকাকে কিন্তু অরীনের ইয়ার্কি করার অভ্যাস টা এতো বেশি যে সেই ভালোবাসার কথা ইয়ার্কির মধ্যেই তলিয়ে গেছে।

ট্রেন যাত্রা শেষ, ট্রেন গন্তব্য স্থলে পৌঁছে গেছে। ট্রেন থেকে নামার সময় অনীকা ২০ টাকার একটা নোট দিয়ে বলে” এটা সেই রিচার্জ-এর টাকা, আমার ফোনে নেট রিচার্জ করেছিলি।

“ অরীন বলল” এটার কি খুব দরকার ছিলো, বন্ধু হয়ে কি এইটুকু করতে পারি না ?”

অনীকার উত্তর “তুই গিফট দিলে নিশ্চয় নিতাম, কিন্তু এটা তো আমি ধার হিসেবে নিয়েছিলাম।”

অরীন আর কিছু বলল না।

 





দুজনেই ফিরে গেলো যে যার বাড়ি। সাথে নিয়ে গেলো এক রাশ স্মৃতি। এরপরেও তাদের ঝগড়া, গল্প কখনো থামেনি, দেখাও হয়েছে অনেক বার, একসাথে অনেক সময় কাটিয়েছে তারা। পুরনো স্মৃতি গুলোকে সঙ্গে নিয়েই দুজনে একসাথে পারি দিলো জীবনের অনেকটা পথ । প্রায় ৬মাস পর তারা তাদের ভালোবাসাকে স্বীকৃতি দিলো, দুই পরিবারের সম্মতিতেই বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হলো ।

বিয়ের পর তারা দার্জিলিং, গ্যাংটক ঘুরতে গেলো, বরফ শীতলতায় সেলফির পর সেলফি। দারুন আনন্দে কাটলো তাদের সময়। অরীন ঠাণ্ডা হাত নিয়ে অনীকার গালে ছুঁইয়ে বলে” দ্যাখ কেমন ঠাণ্ডা লাগে, অনীকা বলে”আরে কি করছিস, ঠাণ্ডা লাগছে যে”। অরীনের ঠোঁটে দুষ্টু হাসি “আমার আরও কাছে আয়, আমার উষ্ণ চুম্বনে তোর ঠাণ্ডা দূর করে দিচ্ছি।”

অনীকা মিষ্টি হেসে বলল “তুই আগের মতোই আছিস, ম্যাসেজে এরকম সব কথা বলে কতো ঝগড়া করতিস।”

অরীন : ও আমি ঝগড়া করতাম নাহ! আর তুই তো ধোয়া তুলসি পাতা, সব মেয়ে গুলোই ঝগড়া করে আর ভাব দেখায় যেন কতো ভদ্র শান্ত।

অনীকা : অ্যাই কটা মেয়ের সাথে তুই ঝগড়া করেছিস শুনি, আমি ছাড়া আর কতো জনের সাথে সম্পর্ক আছে তোর?

অরীন দেখলো কেস টা হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে, চটপট বলে উঠলো “তুই কি বেড়াতে এসেও ঝগড়া করবি নাকি।”

অনীকা : “আবার বলছিস আমি ঝগড়া করছি?”

অরীন : ok ok , I am sorry, আমি-ই ঝগড়া করছিলাম, ভুল হয়ে গেছে আর করবো না। খুশী।”

মনে মনে অরীন বলল “ উফঃ কি জ্বালা রে ভাই, অন্যকে ভালো সাজাতে শেষে নিজেকে ঝগড়ুটে হতে হলো।”

বেড়ানো শেষে বাড়ি ফিরে এলো দুজনে। সময় আপন গতিতে পথ চলতে লাগলো। সব-ই যেন ঠিক আছে কিন্তু কোথাও যেন কিছু একটা খামতি, অরীন অনীকার মধ্যে ধীরে ধীরে বাড়তে লাগলো সম্পর্কের ব্যবধান। অরীন অনীকাকে সময় দিতে পারতো না , কাজের চাপ দিন দিন বাড়তেই থাকলো অরীনের । অনীকার বায়নাও দিন দিন বাড়তে থাকে, হয় বলে বেড়াতে নিয়ে যেতে হবে নয়তো বলে শপিং করতে যাবে, কিংবা বাইরে খেতে যেতে চায়, মনের মতো কিছু না করতে পারলেই দু- চারটে কথা শুনিয়ে দেয় অরীনকে , অরীনও থেমে থাকে না, কথায় কথা বাড়ে, এরকম ভাবে প্রায়-ই ঝগড়া হয় । একদিন তো অরীন এতো রেগে গেছিল যে অনীকাকে মারতে হাত পর্যন্ত তুলেছিল, পড়ে নিজের ভুল বুঝতে পারে, ক্ষমাও চেয়ে নেয় সে। আপাত দৃষ্টিতে এটা কোন বড় প্রবলেম নয়, সব স্বামী স্ত্রীর মধ্যে এরকম মনমালিন্য হয়ে থাকে কিন্তু অনীকা যে খুব নরম মনের মানুষ, মন টা তার বড়ই অভিমানী। একটু থেকে একটু তাচ্ছিল্যও মনে ক্ষতের সৃষ্টি করে ।

অরীন এর সাথে অনীকার কথা বলাও খুব কম গেছে।অনীকা নিজেকে ব্যস্ত রাখতে সখের নানা রকম রান্না করতে থাকে, শ্বশুর শাশুড়ির সাথে গল্প করে কিংবা নিজের বাবা মায়ের বাড়িতে চলে যায়। মাঝে মাঝে অরীন ভাবে বিয়ে করে কি কিছু ভুল করে ফেলল! অনীকার ভাবনা “ বিয়ের আগের মানুষটার সাথে এই মানুষটার মিল যে বড্ড কম লাগছে।”

এর মধ্যে কলকাটায় অরীনের ট্র্যান্সফারের অর্ডার আসে। যদিও সে চাইলে অনীকাকে সঙ্গে রাখার ব্যবস্থা করতে পারতো কিন্তু অনীকা নিজেই যেতে রাজি হয়নি, সে জানে কাজের চাপে অরীন ব্যস্ত থাকবে আর অনীকা ঘরে বন্দী থাকবে। তার চেয়ে এখানে থাকাই ভালো।

এখন অনীকা থাকে শ্বশুর বাড়িতে আর অরীন কলকাতায় । অরীন মাঝে মধ্যে ফোন করে বাবা মায়ের সাথে কথা বলে, কিন্তু অনীকার সাথে কথা হয় খুব-ই কম হয় ।

উদাস মন নিয়ে অনেক দিন পর অনীকা ফেসবুক খুলল, নোটিফিকেশন গুলো দেখছিলো সে, ম্যাসেজ এলো অরীনের “হাই , কি করছিস? কেমন আছিস?” অনীকা ভাবলো রিপ্লাই দেবে না কিন্তু থাকতে পারলো না।

অনীকা : হাই, আমার একটা বন্ধু ঋক এর সাথে কথা বলছি, কাল আমরা ফুচকা খেতে যাবো, তুই কি করছিস?”

অরীন : আমি একটা মেয়ের সাথে গল্প করছি, পুরনো বান্ধবী। কিন্তু আমি তোর বন্ধুকে চিনি না, কোথায় থাকে সে? আর তুই আমাকে ছেড়ে অন্য ছেলের সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছিস, কি সাহস!”

অনীকা : “তুইও তো অন্য মেয়ের সাথে কথা বলছিস তার বেলায়।”

অরীন : “তাতে কি , আমি তো কোথাও যাচ্ছি না কারোর সাথে।”

অনীকা : “যাবো তো বেশ করবো ,তাতে তোর কি ?”

অরীন : ” আমার-ই তো সব, তুই তো শুধু আমার-ই , তুই কারোর সাথে কোথাও যাবি না, আমি ফিরে তোকে বেড়াতে নিয়ে যাবো।”

অনীকা : “না আমি কাল আমার বন্ধুর সাথেই যাবো ।”

অরীন : “বেশি বকবি না একদম, একটা থাপ্পর খাবি ।”

অনীকা : “তুই দুটো থাপ্পর খাবি শয়তান ছেলে কোথাকার।”

অরীন এবার হেসেই ফেলল , এই আমি তোর বর , পতি পরমেশ্বর , আমাকে শয়তান বলছিস আবার থাপ্পর দিবি, দিতে হলে ভালো কিছু দে নইলে পাপ হবে যে।

অনীকা : একদম চুপ থাক।

অরীন : ঠিক আছে, টাটা।

ফেসবুকের দুই প্রান্তে দুইজন ঠিক আগের মতো, অনেক দিন পর পুরনো ফর্ম-এ ফিরে এসে দুজনেই যেন তৃপ্তির স্বাদ পেলো।

পরের দিন দরজার বেলের আওয়াজ –এ ঘুম ভাঙলো অনীকার। দরজা খুলে দেখলো অরীন।

অনীকা বলল” পতি পরমেশ্বর কাল বললেন না তো যে আপনি আসছেন।”

অরীন বলল “ বলে ফেললে যদি তোর প্রেমিকের সাথে ফুচকা খেতে যাওয়াটা ক্যানসেল হয় যায় তাই বলিনি।”

অনীকা কিছু না বলে ঘরে চলে গেলো।

অরীন বলল “ বিকেলে তোকে একটা জায়গায় নিয়ে যাবো।”

অনীকা বলল “বেশ।“

বিকেলে অরীন আর অনীকা সেই বকুল তলায় এসে বসেছে যেখানে তারা বিয়ের আগে দেখা করতো।

অরীন বলল” এই দ্যাখ তোর চুলের প্রজাপতি ক্লিপ, একটা পেন , ৫০ পয়সার কয়েন এসব স্কুলের মাঠে তোর ব্যাগ থেকে পড়ে গেছিলো , আমি তুলে রেখেছিলাম, ভেবেছিলাম ফেরৎ দেবো কিন্তু সময় আর পাইনি এতদিন, তবে আজ সময় হলো।

অনীকার চোখে জল” এতো ভালোবাসিস?”

অরীন : কেন তুই বাসিস না? নাকি ফুচকা খাওয়া প্রেমিককে পেয়েছিস ।

অনীকা : আবার বলছিস এসব। আচ্ছা তুই বুঝে গেছিস নাকি যে আমি তোকে জ্বালাতে এসব বলেছি?

অরীন : তা আর বুঝবো না, তুই যা মেয়ে, তোকে হারে হারে চিনি আমি। তবে তোকে রাগিয়ে জ্বালিয়ে যা মজা পেতাম ভোলা যাবে না।

অনীকা : ও আচ্ছা তাই না, এখনও তেমন-ই শয়তান আছিস। তবে মাঝে কিছুদিন মনে হয়েছিল তুই আগের মতো নেই বদলে গেছিস, অচেনা লাগতো তোকে।

অরীন : এখন চেনা লাগছে তো? অনীকা জড়িয়ে ধরল অরীনকে। হয়তো তুই দূরে থাকছিস বলেই আমাদের সম্পর্কের মিষ্টতা আরও বাড়ল। রোজকার অশান্তির মধ্যে আমাদের ভালোবাসাটাই হয়তো হারিয়ে যেতো ।

অরীন বলল “ তুই খুব ভালো রে, আসলে আমি তোকে সত্যি কথাটা বলতে পারিনি, সেই সময়ে বেশ কয়েকমাস আমি মাইনে পাইনি, জমানো টাকায় যে কতদিন চলবে সেই চিন্তায় আমার মাথার ঠিক ছিলো না, তাই খুব খারাপ ব্যাবহার করেছি তোর সাথে, আমাকে মন থেকে ক্ষমা করেছিস তো রে ?”

অনীকা : খুব খারাপ লেগেছিল সেদিন, খুব কেঁদেছিলাম, ভালো যে বাসি তোকে তাই ক্ষমা করেছি, প্রমিস কর আর কোনদিন এরকম করবি না।

অরীন : প্রমিস করলাম পাগলি আমার ঝগরুটি ।অনীকা কিছু বলল না চোখ বন্ধ করে পুরনো অরীনকে অনুভব করলো।অরীন ভালোবাসার চুম্বন এঁকে দিলো অনীকার কপালে। গাছ থেকে কিছু বকুল ফুল ঝরে পড়ল দুজনের গায়ে মাথায়। সাক্ষী রইল শুধু আকাশ বাতাস আর বকুল গাছ।

***********************************************************************************************************************************************************************************************

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 0   Average: 0/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।