ওরা এসেছিল

ওরা এসেছিল

অভিষেক দেবরায়

 

“এই পথ যদি না শেষ হয়……তবে কেমন হত তুমি বলো তো ?”
গাড়ি চালাতে চালাতে গানটা গুনগুন করে চলেছে আবীর । রাত তখন আটটা পেরিয়েছে । হাইওয়ে দিয়ে একের পর এক গাড়ি শোঁ শোঁ করে বেরিয়ে যাচ্ছে । অন্ধকার রাস্তা । এদিক ওদিক সব ধাবা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে । আছে পান বিড়ির ঘুমটি, মিষ্টির দোকান, চপের দোকান । এইসব । মাঝে মাঝে ডিপার না দিয়েই জোরাল আলো ফেলছে এক একটা গাড়ি । আবীর বিরক্ত হচ্ছে, আবার কাটিয়ে সামলে উঠছে । আসলে আবীর এমনিতে খুব ঠাণ্ডা মাথার মানুষ । আর সবসময় একটু রোম্যান্টিক । একটা ফুরফুরে মেজাজ লেগেই আছে সবসময় ।
পাশের সীটে বসে শ্রেয়া বলল – “এখনো বুঝি রোমান্স একটুও কমেনি ?”
“রোমান্স কে লিয়ে পুরি জিন্দেগি কম পড় জায়েগি ! না জানে কব বুলাওয়া আ জায়ে, উসসে পেহলে হর পল কো জী লেনি চাহিয়ে !”
“বাবা কি ব্যাপার ? আজ যে একেবারে মুডে আছো !”
হাসল আবীর । গাড়ি চলছে নিজের গতিতে ।
চারপাশে দেখছে শ্রেয়া ।
“আবীর – চারপাশটা একবার দেখেছ ? কেমন যেন অন্ধকার – লোকজন নেই – এটা কোন জায়গা ?”
আবীর ভাল করে দেখার চেষ্টা করল । এখন চারপাশে কোনও দোকানপাটও চোখে পড়ছে না । একেবারেই যেন পাণ্ডব বর্জিত এলাকা ।
“কি জানি । অন্ধকারে কিছুই বুঝতে পারছি না !”
“কেমন যেন গা ছমছম করছে দেখে !”
“কোলকাতা আর বেশি দূর নয় । চিন্তা কোরো না । আমি আছি তো !”
এমন সময় এক ফোঁটা দু’ ফোঁটা করে বৃষ্টি শুরু হল । গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনে এক এক ফোঁটা দাগ রেখে গেল যেন ।
আবীর ওয়াইপার চালাল । এগিয়ে চলল গাড়ি অন্ধকার রাস্তা চিরে…..কোলকাতার দিকে……….

 




 

(১)
“বাবা ! কি অন্ধকার চারপাশে !…..মোবাইলের আলোটা একটু ফ্যালো না !”
আবীর মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট ফেলল রাস্তায় । জায়গাটা একটু কাদা কাদা । বৃষ্টি বেশিক্ষণ না হলেও বেশ ভালই হয়েছে । দূর থেকে ব্যাঙ ডাকার শব্দ আসছে । কাঁচা রাস্তা । রাত এখন প্রায় দশটা । এখনই চারপাশ এত অন্ধকার ! লোকজন নেই ! কোলকাতা শহরে বেড়ে ওঠা দুজনের কাছে এরকম একটা পরিবেশ সত্যি খুব অস্বস্তির । খুব অচেনা ।
আচমকা পা স্লিপ করে পড়ে যাচ্ছিল শ্রেয়া । আবীর সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে ধরে ফ্যালে । শ্রেয়া পড়ে না ঠিকই তবে একটু মোচড় লাগে পায়ে । হাঁটতে অসুবিধে হয় ।
আবীর দাঁড়িয়ে পড়ল । চারপাশে দেখতে চেষ্টা করল । যতদূর চোখ যাচ্ছে অন্ধকার । ফাঁকা চারপাশ । কিছু বাড়িঘর চোখে পড়ছে কিন্তু কোথাও কোনও লোকজন নেই । কেমন জায়গা এটা ? এখানে কি কোনও মানুষ থাকে না ? নাকি সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে ? এত তাড়াতাড়ি ! সবাই একসঙ্গে ঘুমিয়ে পড়েছে ? আজকাল তো অজ গাঁয়েও স্মার্ট ফোন আর ইন্টারনেট চলে এসেছে, কেউ কি জেগে নেই ? নাকি –
একটা অজানা আশঙ্কায় আবীরের বুক কেঁপে উঠল ।
শ্রেয়া বলল – “কি ভাবছ ?”
আবীর একটু ভেবে বলল – “আমার মনে হয় আমাদের একটু প্ল্যানটা বদলাতে হবে !”
“কি রকম ?”
“তোমার পায়ের যা অবস্থা তাতে এইভাবে হাঁটলে আরও পা ফুলে যাবে । তোমার একটু রেস্ট দরকার ।”
“রেস্ট ! কিন্তু কীভাবে ? গাড়ি না সারালে তো আমরা কোলকাতাতেই ফিরতে পারব না !”
“কোলকাতাতে এভাবে ফেরা যাবেও না । আমরা অন্ধকারে হেঁটে যাচ্ছি লোক নেই জন নেই – এখানে মেকানিকই বা পাব কোথায় ! রাতটাও তো হয়েছে । এদিকে মনে হচ্ছে – আবার বৃষ্টি আসবে ।”
আকাশের দিকে তাকাল শ্রেয়া । মেঘের একটা হাল্কা চাদর আকাশের গায়ে । ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে । ব্যাঙ ডাকছে এখানে ওখানে । কে জানে, হলে হতেও পারে । শ্রেয়ার এখন একটু অসহায় লাগল নিজেকে ।
“এখন কি হবে ?”
“রাতটা কোথাও একটা থাকার ব্যবস্থা করতে হবে । দুজন না হলেও অন্তত তুমি । এভাবে ঘুরে বেড়ানোটা বুদ্ধিমানের কাজ নয় !”
“আমাদের গাড়িটা যদি কেউ চুরি করে ! বা অন্যকিছু –”
“একটা খারাপ গাড়ি চুরি করে চোরের খুব একটা লাভ হবে না । তাছাড়া যেখানে একটা মানুষ চোখে পড়ছে না সেখানে চোর আছে বলে তো আমার মনে হয় না !”
“কিন্তু থাকব কোথায় ?”
“সেটাই তো ভাবছি !”
হঠাৎ একটু দূরে একটা আলো চোখে পড়ল আবীরের । ভাল করে দেখল । ভুল দেখছে না তো ?
না – ভুল নয় । সত্যি আলো । কিন্তু বেশ দূরে । কতটা দূরে এখন বোঝা মুশকিল ।
“আমাদের ওদিকে যেতে হবে । কিছু করার নেই । একটু হাঁটতে হবে । আমার মনে হচ্ছে ওখানে কেউ আছে । কিছু একটা ব্যবস্থা নিশ্চয়ই হবে !”
আবার দু এক ফোঁটা বৃষ্টি আরম্ভ হল । বেশ বয় পেয়ে গেল শ্রেয়া ।
“আমার হাত ধরো শ্রেয়া । আর দেরী করলে চলবে না !”
“বেশ !”

 




 

(২)
অন্ধকার হাতড়ে কোনোমতে আলোর দিকে এগোল দুজনে । অনেকক্ষণ পর । কতক্ষণ জানা নেই, নিজেদের একটা বাড়ির সামনে আবিষ্কার করল আবীর আর শ্রেয়া । বেশ পুরনো বাড়ি, দোতলা । মনে হয় এক কালে বেশ বর্ধিষ্ণু পরিবার বসবাস করত এখানে । অন্ধকারে চোখ অনেকটা সয়ে গেছে । ভাল করে বোঝা না গেলেও যেটুকু বোঝা যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে বেশ রুচিসম্পন্ন ছিল বাড়ির মালিক ।
ভেতরে আলো জ্বলছে । কারেন্ট আছে বলে মনে হল না । কি করা উচিৎ কি করা উচিৎ নয় সেটাই ভাবছে আবীর । দুম করে চলে তো এল । কিন্তু এভাবে যুবতী স্ত্রী নিয়ে একেবারে অচেনা অজানা একটা লোকালয়ে এসে…..তাহলে কি ভুল করল ? গাড়ির কাছে ফিরে যাবে ? গাড়িতেই নাহয় অপেক্ষা করবে রাতটুকু । কোনও ট্রাক বা অন্য গাড়ি যদি সুবিধে বোঝে তাহলে দাঁড় করাবে । এত সহজ বিষয়টা এতক্ষণ মাথায় আসেনি কেন ? এখন কি আর যাওয়া সম্ভব ? না না – শ্রেয়ার পায়ে লেগেছে তার ওপর বৃষ্টি হয়ে কাদামাটি জমে রাস্তার খুব খারাপ অবস্থা । এদিকে আবার ঝিরঝির করে বৃষ্টি হয়েই চলেছে । না, একটা বড় ভুল হয়ে গেছে । আর ফেরার রাস্তা নেই । নিজের ওপর নিজেরই রাগ হল আবীরের । মনে হচ্ছে একটা অদৃশ্য শক্তি যেন তাঁকে এই বাড়ির দিকে টেনে নিয়ে এসেছে ।
“কি হল হাঁ করে কি দেখছ ?”
সম্বিৎ ফিরল আবীরের । তারপর এগিয়ে গিয়ে দরজার কড়া নাড়তে লাগল । বড় মোটা লোহার কড়া, বেশ পুরনো । দরজাটাও বেশ বড় উঁচু আর ভারী । বেশ মজবুত । আজকাল এসব ব্যবহার হয়না । বাড়িটা কম করেও মনে হয় প্রায় একশো বছর তো হবেই……..
কেউ দরজা খুলল না । বিপদে পড়া গেল তো বেশ – আবার দরজার কড়া নাড়তে লাগল আবীর । জানালার দিকে চেয়ে দেখল আলোর মধ্যে কোনও নড়াচড়া লক্ষ্য করা গেল না ।
আবীর দরজায় এবার আওয়াজ করতে করতে ডাকতে লাগল –
“কেউ আছেন ? বাড়িতে কেউ আছেন ? একটু দরজাটা খুলবেন প্লীজ ?……খুব বিপদে পড়ে এসেছি যদি একটু খোলেন……..”
না । যথারীতি কেউ সাড়া দিল না । তাহলে কি বাড়িটায় কেউ থাকে না ? কিন্তু তাহলে ভেতরে আলো জ্বালবে কে ? ভেতরে আবার কোনও চোরাচালানকারী কিংবা কোনও সমাজবিরোধী সংগঠনের ডেরা নেই তো ? শিরদাঁড়া দিয়ে কেমন একটা হিম বয়ে গেল যেন । এ তো আচ্ছা বিপদে পড়া গেল দেখছি !
না না যা হবে দেখা যাবে – গাড়ির দিকেই এগোবে দুজন । আর কিছু করার নেই । এই ভেবে ঘুরে দাঁড়াতে যাবে এমন সময় দরজাটা খুলে গেল । বুকটা কেমন কেঁপে উঠল আবীরের । শ্রেয়াও যেন একটু চমকে উঠল । দরজায় দাঁড়ানো কেউ একটা, হাতে কাচের টেবিলল্যাম্প । অনেকদিন পর এই ল্যাম্প দেখল আবীর । ল্যাম্পের আলোয় দেখা গেল একটি লোক দাঁড়ানো । বয়স পঞ্চান্ন ছাপ্পান্ন মনে হল । ব্যাকব্রাশ করা চুল, চাপদাড়ি । চোখ গুলো গভীর আর রহস্যময় । হাল্কা আলোয় আরও রহস্যময় দেখাচ্ছে ।
গমগমে গলায় বলল লোকটি – “কি চাই ?”
আবীর কথা হাতড়াতে লাগল । তারপর বলল – “আমরা কোলকাতা যাচ্ছিলাম । গিয়েছিলাম গোপালপুর স্টেট জেনারেল হসপিটালে । পেশায় আমরা দুজনই চিকিৎসক । আমার নাম আবীর রায় আর ও আমার ওয়াইফ শ্রেয়া ।”
“আলাপ করে ভাল লাগল । তবে এত রাতে কি কারণে আমার বাড়িতে এসেছেন সেটা জানতে পারলে ভাল লাগত !”
আবীর যেন একটু ঘাবড়ে গেল । অগত্যা শ্রেয়া হাল ধরল ।
“আমাদের গাড়িটা খারাপ হয়ে গেছে । ইঞ্জিনের কোনও প্রবলেম নাকি অন্য কিছু – বোঝা যাচ্ছে না । মেকানিক খুঁজতে গিয়ে আমরা অনেকটা দূর চলে আসি । এদিকে বৃষ্টি শুরু হয় । আমায় পায়ে মোচড় লাগে । তাই…….”
“রাতটা কি একটু থাকা যাবে ? মানে – আসলে – বুঝতেই পারছেন । আমি একা হলে সমস্যা হত না কিন্তু এখন এ অবস্থায় –”
আবীর প্রায় কাকুতি মিনতি করে বলল কথাগুলো । শ্রেয়াও ওর তালে তাল মেলাল । সব ভয় সব দ্বিধা কোথায় যেন মিলিয়ে গিয়েছে । এখন ওদের চাই আশ্রয়, চাই বিশ্রাম । রাতটা কাটলে বাঁচোয়া ।
লোকটি একটু ভাবল । তারপর বলল – “ভেতরে আসুন !”
আবীর আর শ্রেয়া ভেতরে ঢুকল । লোকটি দরজা বন্ধ করে দিল । ঠিক এমন সময় বাইরে একটা প্রচণ্ড জোরে বাজ পড়ল । কানে তালা লেগে গেল । আচমকা শ্রেয়া চমকে উঠে জড়িয়ে ধরল আবীরকে । তারপর হুঁশ ফিরতেই লজ্জায় সরে দাঁড়াল ।
আবীর ভাল করে দেখল ভেতরটা । বিজলিবাতির কানেকশন আছে কিন্তু ঘরে একটা শ্বেতপাথরের টেবিলের ওপর দুটো মোমবাতি জ্বলছে । আশেপাশে আছে বেশ কিছু আসবাব – কাঠের আরামকেদারা, টানা গদি আঁটা চেয়ার, একটা ডিভান – সেইসঙ্গে বেশ কিছু দামী শৌখিন শো পিস । মনে হল আবীরের অনুমানই সঠিক । এই বাড়ির মালিকের রুচির কদর করতে হয়, সেই সঙ্গে এককালে যে এই বাড়ির বেশ জমকালো ব্যাপার ছিল তা বোঝা যায় । এখন তো মনে হয়না সেরকম কিছু আছে বলে । লোকটির পরনে সাদা পাজামা পাঞ্জাবী । সবসময় যেন কেমন বিরক্তি লেগে আছে মুখে চোখে । আর কেমন একটা রহস্যময় যেন ।
“আপনাদের এখানে বুঝি লোডশেডিং ?”
“না । এমনিতে ঝড় বৃষ্টিতে সমস্যা হয় তবে আজ সেসব হয়নি !”
“ও । তাহলে কি মানে –”
“বিল দিতে না পারার জন্যে লাইন কেটে দিয়েছে কীনা ? সামন্তবাড়ির বংশধরের কাছে কেউ এক পয়সা পায় না, সেটা কোনও ব্যক্তি হোক বা সরকার । প্রকাশ সামন্তর যা অর্থ আছে তাতে সারাজীবন বসে খাওয়ার ক্ষমতা আছে !”
বোঝা গেল লোকটির নাম প্রকাশ সামন্ত ।
“তাহলে অন্ধকার – আলো জ্বালানো যায় কি ?”
“না !”
আবীর অবাক হয় – “কেন ?”
“মেইন সুইচ অফ করা আছে । আজ রাতে আর আলো জ্বালা সম্ভব নয় । নইলে –”
“নইলে ?”
প্রকাশ সে কথার উত্তর না দিয়ে বলল – “আমার সঙ্গে আসুন ।”

 




 

 

(৩)
“এখানে রাতটা কাটিয়ে দিন । আশা করি খুব অসুবিধে হবে না ।”
একটা কাঠের ছোট আলমারির ওপর বাঁ হাতের হ্যারিকেন নামিয়ে রাখল প্রকাশ । ডান হাতে জ্বলছে এখনো সেই ল্যাম্প ।
ঘরটা ভাল করে দেখল আবীর । বেশ বড় ঘর । মাঝখানে একটা বড় পালঙ্কের মত খাট পাতা । কালো পালিশ এখনো চকচক করছে । দেওয়ালে নানারকম ওয়াল হ্যাঙ্গিং লাগানো, একদিকে একটা ছবি । অয়েল পেইন্টিং । Portrait ! চুনোট করা ধুতি আর ফিনফিনে পাঞ্জাবী পরনে এক প্রৌঢ়, আরাকেদারায় বসা – হাতে গড়গড়া । মনে হচ্ছে এক কালে বাবু কালচারের ফসল ।
আবীর কৌতূহল বশতঃ জিজ্ঞেস করেই ফেলল – “ইনি কে ?”
প্রকাশ ভাবলেশহীন গলায় বলল – “রাধিকা রঞ্জন সামন্ত । আমার পূর্বপুরুষ । উনিশ শতকের শেষদিকে এই বাড়ি উনিই তৈরি করেন । তখন চারপাশে ছিল গভীর জঙ্গল । এটি ছিল ওনার বাগানবাড়ি ।”
আবীর পেশায় চিকিৎসক হলেও ইতিহাস খুব পছন্দ করে । বিশেষ করে বেঙ্গল রেনেসাঁ । উত্তর কোলকাতা আর ভবানীপুরের অলিতে গলিতে দাঁড়ালে এখনো যেন শুনতে পায় মেহফিলের শব্দ, নাকে আসে আতরের গন্ধ, কানে আসে ঘোড়ার গাড়ির আওয়াজ ।
প্রকাশের চোখ গেল শ্রেয়ার দিকে । ভিজে গিয়েছে শ্রেয়ার কিছুটা কাপড় ।
“কিছু মনে করবেন না । আমি ব্যাচেলার । বাড়িতে আপনাকে দেওয়ার মত কোনও পোশাক নেই । ছিল কোনও এককালে – কিন্তু –”
শ্রেয়া মাঝপথেই থামিয়ে দেয় । হেসে বলে – “একদম চিন্তা করবেন না । আমাদের অভ্যেস আছে । সেরকম বুঝলে একটা ক্যালপল খেয়ে নেব । রাতটুকু যে থাকতে দিয়েছেন এর জন্য আমরা কৃতজ্ঞ মিঃ সামন্ত !”
এতক্ষণে প্রকাশের ঠোঁটে একটা হাসি খেলে গেল ।
“রাতটা ভালোয় ভালোয় কাটলে হয় !”
বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল শ্রেয়ার । আবীরও কেমন চমকে উঠল । মানেটা কি ! কি বলতে চায় লোকটি ? লোকটি কি তাহলে কোনও অসৎ উদ্দেশ্যে এখানে পড়ে আছে ? লোকটি যা বলল তা আদৌ সত্যি তো ? নাকি লোকটা গুন্ডা বা খুনি যে পুলিশের ভয়ে এখানে লুকিয়ে আছে ? নইলে লোডশেডিং না হলেও কোন সুস্থ মানুষ মেইন সুইচ অফ করে রাখে !
আবীর বলল – “বুঝলাম না । কি বললেন আপনি ?”
“রাতটা সাবধানে থাকবেন । জানালা খুলবেন না । আর দরজার বাইরেও বেরোবেন না । নিশির ডাক বড় ভয়ঙ্কর !”
আবীরের মাথায় যেন বিদ্যুতের ঝিলিক খেলে গেল । প্রকাশ বেরোতে যাবে এমন সময় আবীর বেশ দৃঢ় ভাবে বলল, “মিঃ সামন্ত – কিছু কথা ছিল !”
প্রকাশ ঘুরে দাঁড়াল ।
“বলুন !”
ল্যাম্পের আলোয় প্রকাশকে কেমন কুটিল মনে হচ্ছে । চোখ দুটো যেন গভীর কিন্তু অনেকটা ভেতরে ঢুকে আছে । আবীর এখন নিশ্চিত লোকটির উদ্দেশ্য ভাল নয় । আর নইলে লোকটির মাথায় ছিট আছে । কথা শুনে তো বেশ শিক্ষিতই মনে হচ্ছে ফলে কুসংস্কারাচ্ছন্ন বলেও তো মনে হচ্ছে না । অবশ্য শিক্ষার সঙ্গে কুসংস্কারের সবসময় যোগাযোগ যে থাকবেই তার কোনও মানে নেই ।
“নিশির ডাক মানে ? বুঝলাম না !”
প্রকাশ রহস্যময় ভাবে হাসল ।
“রাতের যে ডাক এড়ানো যায় না । এ এক আকর্ষণ !”
“আপনি কি ভূতের গল্প শোনাতে চান নাকি ?”
“আমি তো কিছুই শোনাতে চাইনি ডঃ রয় । আপনি জানতে চাইছেন তাই বলছি । অবশ্য সময় হলে আপনি নিজেই সব জেনে যাবেন !”
প্রকাশের ঠোঁটে আর চোখে একটা রহস্যময় কৌতুক । কণ্ঠস্বর গমগমে গম্ভীর হলেও লোকটি যে একেবারে রাগী নয় সেটা বোঝা যায় বেশ । যদিও দেখলে বেশ অন্যরকম মনে হয় । কিন্তু লোকটির উদ্দেশ্য কি ? কি বলতে চাইছে ? জানতে হবে সবকিছু । আবীরের মাথায় রোখ চেপে গেছে । শ্রেয়া কেমন অবাক হয়ে শুনছে শুধু ।
“আপনার পূর্বপুরুষ – কি যেন নাম –”
“রাধিকা রঞ্জন সামন্ত !”
“রাইট ! উনি কি জমিদার ছিলেন ?”
“না । তেজারতির কারবার ছিল । ইংরেজদের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন । কাজেই ঠাটবাটে কিংবা অর্থে প্রতিপত্তিতে জমিদারের মত না হলেও খুব কম ছিলেন না ।”
আবীর চারপাশে দেখল । বেশ একটা উত্তেজিত অনুভব করছে । রেশটাকে বেশ উপলব্ধি করা যেত কিন্তু সব গোলমাল করে দিচ্ছে এই প্রকাশ সামন্ত লোকটি ।
“কোন নিশির ডাকের কথা বলছেন আপনি ?”
প্রকাশ হাসল ।
“ম্যাডাম ভয় পাবেন !”
শ্রেয়ার সত্যিই কেমন একটু ভয় ভয় করছিল । ভূত আছে না নেই তা জানা নেই তবে এই রকম একটা পরিবেশে আচ্ছা আচ্ছা নাস্তিকেরও বুক কাঁপবে, গা ছমছম করবে ।
ঠিক এই সময় বাইরে তুমুল বৃষ্টি আরম্ভ হল । সেইসঙ্গে ঝোড়ো বাতাস ।
“আবীর, থাক না – উনি যখন বলছেন –”
“না শ্রেয়া । আমাকে জানতে হবে । I am curious, you know !……..বলুন প্লীজ ।”
“আজ কত তারিখ জানেন ?”
আবীর মনে করতে পারল না । শ্রেয়া মোবাইল দেখল । বলল – “ 20th June !”
প্রকাশ হাসল ।
“ওটা ইংরেজি । আর বাংলা ?”
বলা বাহুল্য এটা কেউ বলতে পারল না । যদিও আজকাল অনেক অনলাইন অ্যাপ আছে কিন্তু দুজনের কারো মোবাইলেই সেসব নেই ।
“পাঁচই আষাঢ় ! শনিবার !”
হতে পারে । কিন্তু তাতে কি হল এটা বুঝল না কেউ ।
“তার সাথে নিশির ডাকের কি সম্পর্ক ?”
“আজ ভরা অমাবস্যা । আর বছরে এই একটি অমাবস্যা আসে যা অন্য সব অমাবস্যার চেয়ে আলাদা । এই অমাবস্যায় নিশির ডাক আসে ।”
শ্রেয়ার রীতিমত গা ছমছম করছে । ডাক্তার হলে কি হবে, শ্রেয়া এমনি বেশ ভীতু । ওর একটাই ভয় – সেটা হল ভূতের ভয় । আবীরের চাপে কিছু বলতে পারে না । আর কোলকাতা শহরে কাজকর্মের মধ্যে এমনিতেও কিছু মনে হয়না । তবে এখনো মর্গে মৃতদেহ দেখলে কেমন হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যায় । কোনও রোগী চোখের সামনে মারা গেল ভয় করে । আবীরের এই অত্যাধিক প্রশ্নে প্রকাশ কিছু মনে করুক, না করুক, শ্রেয়ার সত্যি রাগ হচ্ছে । কি দরকার এত কিছু জেনে ? কোনোরকমে রাতটা কাটাতে পারলেই হল । ঘড়ির দিকে তাকাল শ্রেয়া । সবে সাড়ে এগারোটা । সময় যেন এগোচ্ছেই না । কোলকাতায় এই সময়ে সবে সন্ধ্যে, আর এখানে – মনে হচ্ছে যেন গভীর রাত । একটা নিস্তব্ধতা একটা অন্ধকার যেন গিলে খাচ্ছে চারপাশটাকে ।
“আবীর – বাদ দাও না ! একটা রাতের তো ব্যাপার –”
আবীরের বেশ মাথা গরম হয়ে আছে । নেহাত লোকটি ওদের আশ্রয় দিয়েছে তাই অভদ্র আচরণ করতে ভদ্রতায় বাধে । কিন্তু যেভাবে এসব গালগল্প শোনাচ্ছে তাতে সত্যি পুরোটা না শুনলে চলবে না । একটা নেশা চেপে গেছে যেন ।
“শ্রেয়া প্লীজ !”
শ্রেয়া বুঝল আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই । আবীরকে ও চেনে । মাথায় কিছু চেপে গেলে ও সেটা করবেই ।
“কি হল – বলুন ?”
অত্যন্ত শান্ত গলায় প্রকাশ বলল – “এই অমাবস্যার রাতে পৃথিবীতে তৈরি হয় একটা আকর্ষণ বিন্দু । সমস্ত অতৃপ্ত আত্মাদের টেনে আনে এই লগ্ন । বছরে একবারই এমনটা হয় । এ বড় সাংঘাতিক রাত । একটু সাবধান না হলে সর্বনাশ অবশ্যম্ভাবী ।”
আবীর একটু বিদ্রুপের হাসি হাসল ।
“আপনি কি করেন বলুন তো ? মানে আপনার পেশা ? নিশ্চয়ই আপনি শিল্পী ?”
“আমার উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনা – তাই ভাবছেন তো ? সে আপনার ব্যাপার । তবে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব আপনার ভুল ভাঙাতে । যতই হোক, আজ রাতে আপনারা এসেছেন – বিশেষ অতিথি – তাই – আমি কিছুই করি না । টাকার অভাব আমার নেই । তবে একটা জিনিস আমি শিখেছি আর সেটা করি । আর আজ রাতে তো করতেই হয়, নইলে যে আমি বাঁচব না – এই গ্রামের কেউ বাঁচবে না – অভিশাপ !”
“কি করেন আপনি ?”
“প্রেতচর্চা !”
শ্রেয়ার বুক কেঁপে উঠল । যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে । আবীর এবার হেসে ফেলল । সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নিল ।
“আমরা প্রেতচর্চা শুনলে নাক সিটকোই আর বিদেশে কিন্তু paranormal psychology নিয়ে রীতিমত পড়াশোনা করা হয় ।”
“আমার এ দেশ ও দেশ কোনও দেশের ভূতের প্রতিই ইন্টারেস্ট নেই কোনও । আমার কাছে একটাই ভূত খুব ইন্টারেস্টিং – আর সেটা হল ইতিহাস – অতীত – তাই এসব আমার জাস্ট cheesy লাগে । কিছু মনে করবেন না মিঃ সামন্ত, আমি ও রসে বঞ্চিত ।……..আচ্ছা একটা কথা বলুন তো, এখানে চারপাশে কি কেউ থাকে না ?”
“থাকবে না কেন ? গ্রাম আছে আর মানুষ থাকবে না ?”
“তাহলে চারপাশ এত অন্ধকার কেন ? কোনও মানুষের দেখাও পেলাম না !”
“আজকের রাতে কেউ বাড়ি থেকে বেরোয় না । সূর্য অস্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই যে যার বাড়ি ঢুকে পড়ে । যত তাড়াতাড়ি পারে শুয়ে পড়ে । আপনি যদি আমার বাড়ির বদলে অন্য কোথাও যেতেন তাহলে মরে গেলেও দরজা ওরা খুলত না !”
আবীর চুপ করে রইল ।
“অবশ্য আপনি যেতেনও না – আপনাকে এখানেই আসতে হত –”
“কেন বলুন তো ?”
“নিশির ডাক !”

 

 




 

(৪)
প্রকাশ সামন্ত বেরিয়ে যেতেই দরজা বন্ধ করে দিল আবীর ।
“লোকটি কিন্তু interesting…..কি বল ?”
শ্রেয়া কি বলবে বুঝতে পারল না । কেমন যেন মনটা খচখচ করছে । লোকটি ওদের কোনও ক্ষতি করবে না তো ? শেষের কথাগুলো কেমন যেন কানে বাজল শ্রেয়ার । সেটাই বলল আবীরকে ।
আবীর বলল – “বিষয়টা আমিও নোটিস করেছি । কিন্তু বুঝতে পারছি না কি করতে চায় লোকটা ।”
“হ্যাঁ গো – কাপালিক টাপালিক নয় তো ?”
“উফ – তুমি ওই চিপ থ্রিলারগুলো পড়া থামাও তো ! ওইসব পড়েই তোমার মাথা বিগড়েছে । লোকটাকে দেখে কোন অ্যাঙ্গেল থেকে তোমার কাপালিক মনে হল কে জানে ! লোকটি ক্রিমিনাল হোক আর না হোক – লোকটি শিক্ষিত । সেটা তার কথাতেই স্পষ্ট । এরকম লোক অহেতুক কাপালিক হতে যাবে কেন ?”
“ওভাবে বোঝা যায় না সবসময় । তন্ত্র সাধনা বিভিন্ন রকমের হয় !”
“অত জানি না । তবে এ বাড়ির যেটুকু চোখে পড়েছে কোথাও কোনও কালী বা ওই রকম কোনও শক্তির দেবীর ছবি চোখে পড়েনি । শুধু তাই কেন, কোনও দেবতার ছবিই দেখিনি । ওরা যদি হিন্দু না হয়ে ব্রাহ্ম বা খ্রিষ্টান হয় তাও অবাক হব না । ফলে ওই তন্ত্র সাধনাটা তুমি ডিলিট করতে পারো !”
এই বলে আবীর চুপ করে কিছু একটা ভাবতে লাগল ।
“কি ভাবছ ?”
“যদি বুঝি যে এখানে কোনোরকম ক্রাইম চলছে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে কোলকাতায় সব্যসাচীকে একটা ফোন করতে হবে !”
“সব্যসাচী – মানে সব্যসাচী বসু ?”
“হ্যাঁ । ভবানী ভবন । ভাবছি – আগাম ওকে জানিয়ে রাখব কীনা !”
“সেই ভাল । তুমি এখনই একটা ফোন করো !”
মোবাইল বের করে নাম্বার খুঁজতে লাগল । কিন্তু কি আশ্চর্য – নাম্বারটা খুঁজেই পেল না । অথচ আজ দুপুরেই সব্যসাচীর সাথে কথা হল – স্পষ্ট মনে আছে । তাহলে নাম্বারটা গেল কোথায় ? বেশ অবাক হল আবীর ।
শ্রেয়া জিজ্ঞেস করল – “কি হয়েছে ?”
আবীর বললে শ্রেয়া বলল – “নিশ্চয়ই কোনও ভাবে হাত লেগে ডিলিট হয়ে গেছে ! তুমি যা বেখেয়ালি !”
আবীর বুঝতে পারল না কিছু । কথা বাড়াল না আর ।
“বাদ দাও । একটা রাতের তো ব্যাপার । দরজা ভেতর থেকে লক করে দিয়েছি । বাইরে যা ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে তাতে মনে হয়না এত দুর্যোগে কিছু হবে বলে ।”
“যদি কোনোরকম কিছু হয় ! I mean – you know what I mean……”
“চিন্তা নেই । আমার ঘুম তো এমনি পাতলা । যদি কিছু টের পাই আমি দেখব ।……এই ওখানে ওটা কি – দেখি তো –”
একটা কোণার দিকে এগিয়ে গেল আবীর । একটা প্রায় সাড়ে তিন ফুট লম্বা শক্ত লাঠি দাঁড় করানো । মাথাটা মনে হয় আইভরি । মনে হয় প্রকাশ সামন্তর কোনও পূর্বপুরুষের হবে । এই ধরনের লাঠির চল একশো বছর আগেও ছিল । যাই হোক, ভাল হল । একটা অস্ত্র পাওয়া গেল । রাতে যদি সেরকম কিছু হয় তাহলে অন্তত শত্রুকে ঠেকানো যাবে এটা দিয়ে । লাঠিটা খাটের কাছে রাখল আবীর ।
“তোমার পায়ে কি খুব ব্যথা করছে ?”
“না সেরকম নয় । তবু ভাবছি একটা ওষুধ খেয়ে নিই । একটু ঘুম দরকার ।”
“That’s better !”
ব্যাগ খুলে ওষুধ খেয়ে নিল শ্রেয়া । কিছু এমারজেন্সি ওষুধ আর জল সবসময় শ্রেয়ার ব্যাগে থাকে । বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে । কাল কি হবে কে জানে । গাড়িটা সারিয়ে কখন যে বাড়ি ফিরবে কে জানে । কাল দুজনেরই চেম্বার আছে বিকেলে । আগে থেকে রোগীদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া আছে । কোলকাতা শহরে আবীরের মত নামী কার্ডিওলজিস্ট আর শ্রেয়ার মত নামী নিউরোলজিস্ট কমই আছে । তাই কাজ বেশি । ব্যস্ততাও বেশি । বছর তিনেক হল বিয়ে হয়েছে কিন্তু এখনো কোনও ইস্যু নিতে রাজী হয়নি শ্রেয়া । আবীরও জোর করেনি ।
প্রকাশ সামন্তকে জিজ্ঞেস করা হল না যে আশেপাশে গ্যারেজ আছে কীনা । অবশ্য অসুবিধে নেই – একবার দিনের আলো ফুটলে অনেক কিছুই করা যাবে । রাতের বেলা সব সমস্যা যেন ডালপালা মেলে ধরে । বিশেষ করে এরকম দুর্যোগের রাত । বাবা – আজ যেন মনে হচ্ছে আকাশের বুকে কোনও জল থাকবে না । বৃষ্টি থামার লক্ষণ নেই কোনও । গ্রাম দেশ, আবার বন্যা না হয় । না না – ওসব ভেবে কোনও লাভ নেই । বরং –
আচমকা একটা চোখ ধাঁধানো বাজ পড়ল কাছেই ।
জামাটা খুলে দেওয়ালে লাগানো ব্র্যাকেটে টাঙ্গিয়ে রাখল আবীর । তারপর শ্রেয়ার পাশে গিয়ে শুল । ঘরে হ্যারিকেন জ্বলছে । জ্বলুক ।
হ্যারিকেনের আলোয় শ্রেয়ার মুখটা খুব মিষ্টি লাগছে । কোলকাতায় থাকলে প্রতি রাতে সংসারের হিসেবনিকেশ আর পরের দিন কার কোথায় চেম্বার কোথায় ও.টি কোন পেশেন্টের কি কেস হিস্ট্রি এসব নিয়ে কথা বলেই রাত কেটে যায় । কতদিন যে শ্রেয়াকে আদর করেনি আবীর । মাঝে মাঝে মনে হয় হিসেবের বাইরে কিছু ঘটনার প্রয়োজন পড়ে আমাদের, নইলে জীবনটা বড় একঘেয়ে হয়ে যায় । মানুষ আর মেশিনে একটা বিস্তর পার্থক্য থাকা প্রয়োজন ।
শ্রেয়া তাকাল আবীরের দিকে ।
“কি দেখছ ?”
“তোমাকে !”
“দ্যাখোনি নাকি আগে ?”
“কতদিন দেখিনি !”
শ্রেয়া দেখছে আবীরকে । আবীরের বুকের লোম, চওড়া কাঁধ, টানটান ঠোঁট – সবকিছু যেন আজ নতুন করে আবিষ্কার করছে শ্রেয়া । কবে শেষ দেখেছে আবীরকে ? কবে শেষ ওর ছোঁয়া পেয়েছে ? কবে আদর করেছে দুজন দুজনকে ?
কিছু কিছু জিনিস হয়তো সময়মত না হলে জীবনে অনেক কিছু অপূর্ণ থেকে যায় ।
শ্রেয়ার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল আবীর । একে অপরের ঠোঁটের উষ্ণ রসে নিজেদের ডুবিয়ে দিল । শ্রেয়ার গলার কাছে একটা চাপা শীৎকার ! আবীরের মাথার চুল আঁকড়ে রেখেছে শ্রেয়া । আবীর এক টানে খুলে দিল শ্রেয়ার পরনের শার্টের বোতাম । কালো ব্রার আড়াল থেকে উন্মুক্ত করে দিল এক জোড়া শঙ্খমালা – এক জোড়া তামার পয়সা – শ্রেয়ার অতল বিভাজিকায় মুখ ডুবিয়ে দিল আবীর ।
পৃথিবী কাঁপিয়ে বয়ে চলেছে উষ্ণ লাভার স্রোত !
বৃষ্টি পড়ছে ঝমঝম করে ।
নীচের ঘরে ঢং ঢং করে রাত বারোটা বাজল !

 




 

 

(৫)
চারপাশে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার । দূরে কোথাও যেন একটা মাদল বেজে চলেছে । এতটাই দূরে যে ক্ষীণ শব্দ শোনা যাচ্ছে । সামনে দিয়ে যেন অনেকে হেঁটে চলেছে – প্রত্যেকের হাতে যেন মশাল । মশাল নিয়ে কোথায় যাচ্ছে সবাই । ওরা কারা ? হেঁটে এগিয়ে গেল আবীর । কোথায় যাচ্ছে জানা নেই কিন্তু একটা অজানা আকর্ষণ যেন ওকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে ।
লোকগুলোকে দেখতে পাচ্ছে না তবু আন্দাজে ওদের পেছন পেছন হাঁটতে লাগল । ওদের যেন কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই । লোকগুলো চুপচাপ মশাল নিয়ে এগোচ্ছে । মাদলের শব্দ আসছে । আরে – সামনে ওই দুটো কি ? দু দিকে দু জায়গায় আগুন যেন দাউদাউ করে জ্বলছে । কীসের আগুন ? লোকগুলো একে একে গিয়ে মশাল দিয়ে আগুন জ্বেলে দিয়ে চলে যাচ্ছে আবার দূরে – অন্য কোথাও !
ওগুলো কি ধানের গোলা ? নাকি –
চিতা ?
তাহলে কি এটা শ্মশান ?
কোথায় এল আবীর ? কেনই বা এল ? এসবের মানে কি ?
এমন সময় কেউ একজন পেছন থেকে আবীরের কাঁধে হাত রাখল ।

চোখ খুলে গেল আবীরের ।
দুঃস্বপ্ন !
আস্তে আস্তে উঠে বসল আবীর । কি ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন । সত্যির মত । হাতের ছোঁয়াটা যেন এখনো কাঁধে লেগে আছে । কি হাড় হিম করা ঠাণ্ডা হাতের স্পর্শ ।
পাশে দেখল – শ্রেয়া ঘুমোচ্ছে । ঘরের ভেতর বেশ ঠাণ্ডা লাগছে । শ্রেয়ার আবার অল্পেতেই ঠাণ্ডা লাগার ধাত । চাদর টেনে ঢেকে দিল নগ্ন শ্রেয়াকে । যেন ঘুমন্ত কোনও রাজকন্যা – কিংবা গ্রীক দেবী ! কি নিষ্পাপ মুখখানি শ্রেয়ার । আবীর ঘামছে । গলা শুকিয়ে গেছে । জাঙিয়া পরে খাট থেকে নেমে শ্রেয়ার ব্যাগ থেকে বোতল বের করে গলা ভেজাল । একটু হাল্কা লাগছে । বাইরে তখনো বৃষ্টি হয়ে চলেছে । তবে অনেকটা কম । মোবাইল তুলে দেখল – রাত দুটো দশ । না – মনে হয়না আর ঘুম হবে বলে । একটু ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগলেও আর কিছু পরতে ইচ্ছে করছে না আবীরের ।
চোখ গেল রাধিকা রঞ্জন সামন্তর ছবির দিকে । কি জীবন্ত ! চোখ দেখলে মনে হয় বেশ দাপুটে আর মেজাজী লোক ছিলেন । একটা চাপা ঔদ্ধত্য তার চাহনিতে । বেশ ধারালো ব্যক্তিত্ব । এই রকমই একটা ছাঁচ রয়েছে প্রকাশ সামন্তর মধ্যেও । মনে হয় ভদ্রলোকের স্বভাব চরিত্র খুব একটা –
চমকে উঠল আবীর । যেন মনে হল হঠাৎ কেমন একটা – যেন মনে হল কেউ একটা তার ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলল । কি ঠাণ্ডা সেই নিঃশ্বাস । সঙ্গে সঙ্গে পেছন ফিরল আবীর । কই ! কেউ নেই তো ! তাহলে কি মনের ভুল ? ওই তো শ্রেয়া ঘুমোচ্ছে । তাহলে ! কেমন যেন একটা গা ছমছম করে উঠল আবীরের । সঙ্গে সঙ্গে খাটের ওপাশে গিয়ে লাঠিটা হাতে নিল । লাঠিটা বেশ ভারি । বেশ মনে জোর আনে । কেমন যেন মনে হচ্ছে এই ঘরে কেউ একটা আছে । যাকে দেখা যাচ্ছে না কিন্তু উপলব্ধি করা যাচ্ছে ।
আবীর কি ভয় পাচ্ছে ?
ভূত বলে যে কিছু নেই সেটা তো আবীর নিজেও জানে । কলেজ লাইফ থেকে বাজি ধরে কত হানাবাড়িতে রাত কাটিয়েছে কিন্তু কোথাও ইঁদুর-চামচিকে-সাপ-ব্যাঙ-বাদুড় ছাড়া আর কিছু চোখে পড়েনি । তাহলে আজ কেন ভয় পাচ্ছে ? প্রকাশ সামন্তর কথাগুলো কি ওর মাথা খারাপ করে দিয়েছে ? লোকটা কি সম্মোহন জানে ?
আবার নিঃশ্বাসের শব্দ পেল আবীর । এবার আরও জোরে । যেন কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলছে । কে ? এসব কি হচ্ছে ? তাহলে কি সত্যি এমন কিছু আছে যার ব্যাখ্যা ভাষায় করা যায় না ? এ কি আদৌ সম্ভব ?
আবীরের বুক কাঁপছে এক অজানা আশঙ্কায় ।
এমন সময় মনে হল জানালায় কেউ টোকা দিচ্ছে ! কে ? বাইরে বৃষ্টির মধ্যে কে ? জানালা খোলা কি উচিৎ হবে ? প্রকাশ সামন্ত বারণ করেছে । কিন্তু কেন ? কি হবে জানালা খুললে ?
জানালায় সমানে টোকা পড়ছে । একটা হাড় হিম করা ভয় যেন আবীরকে গ্রাস করছে । কোথায় গেল ওর যুক্তি আর বিজ্ঞানচেতনা ? আবীর রীতিমত বিভ্রান্ত !
জানালার কাছে এগিয়ে গেল আবীর । কে আছে বাইরে ? যে আছে সে কি এই পৃথিবীর কেউ…..নাকি……এসব ভাবতেই বুকটা কেমন ছ্যাঁৎ করে উঠল যেন । জানালাটা যেন এখন আবীরের কাছে ইহলোক আর পরলোকের মাঝের দেওয়াল । কয়েক মুহূর্ত অবসন্ন হয়ে রইল আবীর ।
কয়েক মুহূর্ত কাটল । আবীর কিছু ভাবল । সঙ্গে সঙ্গে নিজের ওপর নিজেরই লজ্জা করল । এসব কি ভাবছে আবীর ? একটা আষাঢ়ে গল্প শুনে ভূতের ভয় পাচ্ছে ডাঃ আবীর রায় ? এসব শুনলে তো হাসপাতালের ওয়ার্ড বয়রা পর্যন্ত খিল্লি করবে । কিছু একটা রহস্য আছে এই বাড়িতে । কিছু একটা । এমন কোনও রহস্য লুকিয়ে আছে যা বাইরে এলে অনেক কিছুই এলোমেলো হয়ে যাবে । এখন দৃঢ় ধারণা জন্মাচ্ছে যে প্রকাশ সামন্ত লোকটা কোনও না কোনও অন্যায় বা বেআইনি কাজের সঙ্গে যুক্ত । আজ রাতে আবীর এর শেষ দেখে ছাড়বে । গায়ের জোরে আবীরের সঙ্গে পেরে ওঠা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য – অগত্যা সেই ভরসাতেই এগোনো । জানালা খুলতে বারণ করেছে প্রকাশ । করুক । জানালা খুলে আবীর দেখবে ওপারে আছেটা কি !
টোকা থেমে গেল হঠাৎ । আবীর অবাক হল । ভাল করে শোনার চেষ্টা করল কিছু একটা । তারপর আস্তে আস্তে জানালা ধরে টানতে লাগল । ছিটকিনি একটু জ্যাম । তবে বেশি সময় লাগল না । ভারী জানালার পাল্লা দুটো খুলে গেল । এক ঝাপটা ভিজে বাতাসের ঝাপটা লাগল গায়ে । বাইরে বৃষ্টি অনেক কম । অন্ধকার । তার মধ্যেই যেন একটা কীসের শব্দ পেল আবীর । ভাল করে ঠাহর করতে বুঝল – বেশ দূরে একটি অল্পবয়সী ছেলেকে গাছের সাথে হাত পা বেঁধে প্রচণ্ড মার মারছে একজন । কে সে ? ইংরেজ পুলিশের পোশাক না গায়ে ? কে ছেলেটি ? ইংরেজ পুলিশ এল কোথা থেকে ? তাহলে কি………
নিমেষে সব অন্ধকার । সব চুপচাপ । শুধু দূরে একটা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে । অনেক দূরে । কিন্তু দেখা যাচ্ছে না কিছু । এবার বেশ ভয় পেল আবীর । বুঝল না কি হচ্ছে । কেউ নির্ঘাত কোনও চক্রান্ত করেছে । কোনও ষড়যন্ত্রের শিকার হতে চলেছে ওরা !
হঠাৎ জানালার সামনে…আবীরের ঠিক এক হাত দূরে……একটা মুখ ভেসে উঠল । কি নিষ্ঠুর হাসি । অন্ধকার কোটর – চোখ বলতে কিছু নেই – এক বীভৎস মুখ – আবীরের আতঙ্কে প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার জোগাড় হল । নিমেষে মুখটা হাওয়া । আবীর দ্রুত জানালা বন্ধ করে দিল ।
পেছন ফিরে শ্রেয়াকে দেখল । সব ঠিক আছে । যাক । না – শুয়ে রাতটা কাটিয়ে দেবে কোনোমতে – শুতে গিয়ে শ্রেয়ার মুখের দিকে তাকাল আবীর । ঘুমোচ্ছে কীনা দেখার জন্যে । হ্যাঁ – ঘুমোচ্ছে – কিন্তু –
আবীর কি ঠিক দেখল ?
শ্রেয়ার কাছে চলে গেল আবীর । মুখের দিকে ঝুঁকতেই –
এ কি দেখছে আবীর ? শ্রেয়ার মুখ রক্তে ভর্তি ! কি বীভৎস ! ওর নগ্ন শরীরের এখানে ওখানে রক্ত – চুইয়ে পড়ছে – এসবের মানে কি !
চোখ বন্ধ করে মুখ ঢেকে বসে পড়ল আবীর । চিৎকার করে ফেলছিল কিন্তু নিজেকে সামলায় । ঘেমে অস্থির । আবীর আর নিতে পারছে না । আস্তে আস্তে মুখ থেকে হাত সরাল । বুক কাঁপছে । শ্রেয়ার দিকে তাকাল আবার –
কোথায় রক্ত ? শ্রেয়া যেমন ঘুমোচ্ছিল তেমনই ঘুমোচ্ছে । ফর্সা মুখ, ফর্সা শরীর – অন্ধকারে চাঁদের মতন জ্বলজ্বল করছে । চাঁদ – এই অমানিশায় এক খণ্ড চাঁদকেই খুব আপন মনে হচ্ছে আবীরের ।
কিন্তু তাহলে কি দেখল একটু আগে ? এতটা ভুল দেখবে ? শ্রেয়াকে দেখে কেমন যেন বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল । কেন জানা নেই কিন্তু মনে হচ্ছে যেন দুনিয়া শুদ্ধু কষ্ট মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে আচমকা ।
কেন এমন হচ্ছে ? তাহলে কি সত্যি আত্মার অস্তিত্ব আছে ? কোন অভিশাপের কথা বলছিল প্রকাশ সামন্ত ? এই বাড়িতে কী এমন রহস্য লুকিয়ে আছে যা কীনা –
কানে একটা জিনিস ভেসে এল আবীরের । অনেক লোকের হুল্লোড়, গানবাজনার শব্দ । এসব কি !
লাঠি নিয়ে একটা অদম্য আকর্ষণে ভর করে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল আবীর । কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে, আদৌ যাওয়া উচিৎ হবে কীনা – কিছুই ভাবল না ।
নিশির ডাক !…………..

 




 

 

(৬)
বাইরে বেরিয়ে এল আবীর । বারান্দা পেরোতেই দেখল এক অদ্ভুত দৃশ্য । নীচের বিশাল হলঘর আলোয় ভরে গেছে । সে কি ! প্রকাশ সামন্ত না বলেছিল আলো আজ রাতে আর জ্বলবে না ? তাহলে কি মিথ্যে বলেছিল ? এত রাতে কে জ্বেলেছে আলো ? কাদের কথা ভেসে আসছে ! এগিয়ে গেল আবীর ।
দূর থেকে যে দৃশ্য আবীর দেখল তা দেখে সব যুক্তি বুদ্ধি অসাড় হয়ে গেল । হলঘরে জ্বলছে ঝাড়বাতি । বিলিতি মদ আর দামী আতর-গোলাপজলের গন্ধ ভেসে আসছে । অনেক লোক সেখানে । একজন নর্তকী সবে নাচ থামাল – সবাই ধন্য ধন্য করে উঠল – সবার পোশাক পরিচ্ছেদ সব দেড় দুশো বছর আগের মত । ওই তো ওখানে একজন ইংরেজ আধশোয়া অবস্থায় মদ খাচ্ছে আর টাকা লুটিয়ে দিচ্ছে । আর তার পাশে – ওকি ! ওটা রাধিকা রঞ্জন সামন্ত না ? একেবারে যেন ছবি থেকে নেমে এসেছে !
আবীরের বুক কাঁপছে ! সহ্য করতে পারছে না কিছু । এমন সময় আবীর দেখল রাধিকা রঞ্জনের চোখ পড়ল ওর দিকে । চোখ জোড়া কেমন জ্বলে উঠল । কি লোভ ওই চোখ দুটোয় ! অসহ্য ! সবাই আবীরের দিকে ফিরে তাকাল । সবার চোখেই কেমন একটা যেন চাহনি – যেন একটা ক্ষোভ – লোভ – ঈর্ষা – হিংস্রতা –
ঢং ! ঢং !! ঢং !!!………
রাত তিনটে । আচমকা সব অন্ধকার হয়ে গেল । ভোজবাজির মত মিলিয়ে গেল সব যেন । অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রয়েছে আবীর । হ্যারিকেনটা ঘরেই রেখে এসেছে । কিন্তু এসব হচ্ছেটা কি ! আবীর কি আবার কোনও দুঃস্বপ্ন দেখছে !
সামনে কেউ একটা বসে আছে অন্ধকারে । সামনে জ্বলছে আলো । টেবিলের ওপর দুটো মোমবাতি । শ্বেতপাথরের টেবিল । তার মানে ওরা যেখানে ঢুকেছিল প্রথম সেটা এমনি বসারঘর ছিল না – সেটাই ছিল সেই বিশাল হলঘর, যা হয়তো এককালে ছিল জলসাঘর – নাচঘর – কম আলোয় বুঝতে পারেনি আবীর – কিন্তু ওটা কে ? ওটা তো –
প্রকাশ সামন্ত । মোমবাতির মাঝে মুখটা দেখা যাচ্ছে । মুখে হাসি ।
“আমি জানতাম আপনি আসবেন । তবে এভাবে যে এসে পড়বেন ভাবিনি !”
নিজের দিকে খেয়াল করল আবীর । জাঙিয়া পরেই চলে এসেছে এখানে । ইশ ! কেমন একটা লজ্জা করছে ! এতক্ষণ খেয়াল করেনি বিন্দুমাত্র ।
“প্রত্যেক বছর আজকের রাতে নেমে আসে সব অতৃপ্ত আত্মারা । এই বাড়ির আনাচে কানাচে লেগে আছে রক্ত, কালি, ক্লেদ । রাধিকা রঞ্জন সামন্তর পাপ । ইংরেজদের খাস লোক রাধিকা রঞ্জন সামন্ত কত স্বদেশীদের যে এখানে অকথ্য অত্যাচার চালিয়েছে তার ঠিক নেই । সবাইকে পুঁতে দেওয়া হয়েছে মেরে । কেউ খোঁজ পায়নি কোনোদিন । তার বদলে ইংরেজ বাহাদুর রাধিকা রঞ্জনকে ভরিয়ে দিয়েছিল । হয়তো জমিদারও হয়ে যেত – এমন সময় একদিন ওই সিঁড়ি দিয়ে পড়ে মারা যায় রাধিকা রঞ্জন । অনেক রক্ত বেরিয়েছিল সেদিন । অনেক । কিন্তু তাতেও তৃপ্ত হয়নি ওরা । সেই থেকে আমাদের সব পূর্বপুরুষের অকালমৃত্যু এবং অপঘাতে মৃত্যু । কে জানে – হয়তো আমারও – জানি না । তবু চেষ্টা করি পাপস্খালন করতে ।
কত ভদ্রঘরের মেয়েদের জোর করে এনে এখানে আটকে রাখা হত । রাধিকা রঞ্জন, এবং তারপর তার উত্তরপুরুষেরা একইরকম ভাবে মেয়েদের ভোগ করত আর ভোগ করা হয়ে গেলে একই ভাবে লাশ পর্যন্ত লোপাট করে দিত । কেউ টিকিটিও ছুঁতে পারেনি । স্থানীয় জমিদার থেকে ইংরেজ বাহাদুর সবাই ছিল এই ধূর্ত তেজারতি পরিবারের ঘনিষ্ঠ । তাই কিছু হয়নি । আমার এই অন্ধকারে দম বন্ধ হয়ে আসে । কত অতৃপ্ত কামনা বাসনা চোখের জল অভিশাপ এইখানে জমা হয়ে আছে । পারি না । কষ্ট হয় !
রাত এখন তিনটে । কথায় বলে – Devil’s Hour ! এই সময়টা হল অশরীরী আত্মার সবথেকে মোক্ষম সময় । খারাপ আত্মারাও এই সময়েই আসে । তাই তাঁদের রুখে দিতে হয় । মন্ত্রোচ্চারণ আর ধ্যানের মাধ্যমে তাঁদের হাত থেকে রক্ষা করি এই গ্রামকে, রক্ষা করি নিজেকে । কিন্তু………”
“কিন্তু ?”
এতক্ষণ ধরে পাথরের মূর্তির মত সব শোনার পর অস্ফুটে বেরিয়ে এল আবীরের মুখ থেকে ।
প্রকাশের কণ্ঠে হতাশা, ক্ষোভ ।
“প্রতিবছর ওরা কাউকে না কাউকে নিজেদের দলে শামিল করে । প্রতি বছর । আর সব আত্মারা এইখানে এই বাড়িতে ফিরে ফিরে আসে । প্রতিবছর । সেই মাহেন্দ্রক্ষণে অতৃপ্ত আত্মার এলাকায় পা দিলে কেউ বেঁচে ফেরে না । এ এক মৃত্যুপুরী । এ এক নিশির ডাক !”
বুক কেঁপে উঠল আবীরের ।
“কি বলছেন কি এসব ? এসবের মানে কি ? Have you gone mad ?”
আবীরের শরীরে যেন জোর নেই । হাতের লাঠি নাড়াতে পারল না কিছুতেই । কেমন একটা অসাড় হয়ে গেছে শরীর । এক চুল নড়ার ক্ষমতা নেই । যেন পাথর বনে গেছে বিলকুল ।
এমন সময় দোতলা থেকে ভেসে এল শ্রেয়ার আর্তনাদ ।
আবীর কিছু করতে পারল না । হঠাৎ আবীর লক্ষ্য করল সে নিজেও নগ্ন শরীরে দাঁড়িয়ে আছে, জাঙ্গিয়াটা কোথায় গেল ?
সামনে দুটি মোমবাতির মাঝে বসে বিড়বিড় করে চলেছে প্রকাশ সামন্ত । আচমকাই প্রচণ্ড কনকনে ঠাণ্ডা বাতাসে যেন আবীরের ভেতর পর্যন্ত জমিয়ে দিল । আবীরের ইচ্ছে হচ্ছে চিৎকার করে, কিন্তু পারছে না । শ্রেয়ার চিৎকার তখনো ভেসে আসছে । চারপাশে যেন অজস্র অতৃপ্ত অশরীরী হাত পেতে ডাকছে । অসহ্য ! অসহনীয় ! দুর্বিষহ !!!
আবীরের আর কিছু মনে নেই ।

 

(৭)
চোখ খুলল প্রকাশ সামন্ত । আরামকেদারা থেকে উঠে দাঁড়াল । সকাল হয়েছে । শরীরের ওপর দিয়ে যেন ঝড় বয়ে গিয়েছে । আবার একবার…..আর কতবার ?
ফাঁকা হলঘর দিয়ে হেঁটে আস্তে আস্তে দোতলায় গেল প্রকাশ । যে ঘরে শ্রেয়া শুয়েছিল সেখানে এখনো জ্বলছে হ্যারিকেন । জানালা খুলে হ্যারিকেন নিভিয়ে দিল । বাইরে ঝলমলে রোদ । প্রতি বছর ওই রাতে দুর্যোগ হবেই । তারপর সব আবার আগের মতন ।
বিছানার দিকে একবার তাকাল প্রকাশ । না, একটাও ভাঁজ পড়েনি বিছানার চাদরে । একদম টানটান – যেমন ছিল তেমন –
কপালে হাত ঠেকিয়ে যেন প্রার্থনা করল প্রকাশ । তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে ।

(৮)
“আর ইউ শিওর স্যার ?”
“হুম !”
“Unfortunate ! আপনার নাম্বার কল লগে লাস্ট কল হিসেবে ছিল, তাই আপনাকেই –”
“খবর পাঠানোর ব্যাপারটা আমি দেখছি ।……..এটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ অফিসার !”
বাইরে বেরিয়ে এসে গাড়িতে বসে একটা নাম্বার ডায়াল করল মধ্য তিরিশের যুবকটি । বিষণ্ণ মন যেন পাথর হয়ে গেছে ।
“হ্যালো – হ্যাঁ – সব্যসাচী বলছি – সব্যসাচী বসু – বলছিলাম……না আসলে আপনি ঠিকই শুনেছেন । গতকাল সন্ধ্যেবেলা – এই প্রায় সাতটা সাড়ে সাতটা নাগাদ হাইওয়েতে ঝড়বৃষ্টির মধ্যে একটা অ্যাকসিডেন্টে……..আবীর আর শ্রেয়া দুজনেই স্পট ডেড !………….হ্যাঁ আমি মর্গে গিয়ে বডি identify করেছি…….হ্যাঁ….আসলে……এখনো কেউ ধরা পড়েনি তবে পুলিস চেষ্টা করছে…..গাড়িটার কিছু নেই…..না আমি এখন আবীরের বাড়িতে খবর দিতে যাব…..সেটাই সবচেয়ে tough……yet…………………”
আবীরের বন্ধু হিসেবে এখন অনেক প্রিয় কাজ করাই বাকি সব্যসাচীর ।…………..

 

 




গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total:    Average: /5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।