কলকাতায় প্রথম ক'দিন

কলকাতায় প্রথম ক’দিন

কলকাতায় প্রথম ক’দিন

সব্যসাচী সেন

বাবা যখন ট্রান্সফার হয়ে কলকাতায় এলেন,বাবার আর আমার খুব মনখারাপ হয়েছিল।তবে মা খুব খুশি হলেন।ঘন ঘন বাপের বাড়ি যেতে পারবে এই ভেবে।সালটা ১৯৭১,সেই সময় একটা কথা খুব কানে আসতো। নকশাল। বুঝতাম না।কেউ বলত নকশালে মেরেছে,কেউ বলত,নকশালে বোমা রেখে গেছে।সবটা না বুঝলেও আঁচ করতে পেরেছিলাম ব্যাপারটা বেশ ভয়ের।এটাও বুঝতে পারলাম যে এদের ক্ষমতা ভুতেদের থেকে বেশি।এরা রাম নামে পালায় না। পাইপগান,বোমা,ভোজালি এইসব শব্দগুলোর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল সেই সময়।
বাবার অফিস বাগবাজারে।তাই কাছাকাছি বরানগরে একটা বাড়ির এক তলাটা বাবা ভাড়া করলেন।এখন আমিও বাল্যকাল ছেড়ে কৈশোরে পা রেখেছি।পাড়ায় বেশ কটা বন্ধু জুটে গেল। আমার বয়সী ক’জন আর প্রত্যেক পাড়ায় টেনিদা মার্কা একটা ছেলে ঠিকই জুটে যায়। আমারও জুটে গেল। ওই টেনিদা মার্কা বন্ধুটাই সেদিন নতুন একটা কথা শোনালো।
পূর্নদার চপের দোকানের সামনের রকটায় বসে সবাই চপমুড়ি খাচ্ছি।বেশ সন্ধ্যে হয়ে আসছে,এমন সময় সে এসে উপস্থিত।এসেই বিজ্ঞের মত বলল,”তোরা এখানে পুর্নর চপ চেবাচ্ছিস? জানিস কাল রাতে রেললাইনের ধারে নকশালদের মিটিং ছিলো।গোপন মিটিং।ওরা জানিস খারাপ লোক নয়,ওরা রেভেলিউশান চায়।”
“কি চায়?” সমস্বরে জিজ্ঞেস করলাম। কারন রেভেলিউশনটা কি, তেলেভাজা না লাক্স সাবান,আমরা কেউই তখন জানতাম না।
—- গাধার দল।রেভেলিউশান,মানে হচ্ছে বিপ্লব।
সন্তু ক্লাসে ভালো রেজাল্ট করত সে বলল,”বিপ্লব দিয়ে কি হবে,দেশ তো কবেই স্বাধীন হয়ে গেছে।”
—- এ বিপ্লব সে বিপ্লব না। দেশের গরীব আরো গরীব হচ্ছে, বড়োলোক, গরীবের রক্তচুষে আরো বড়োলোক হচ্ছে।এরা বড়লোকদের মেরে তাদের টাকা লুঠ করে গরীবদের বিলিয়ে দেবে।
বুঝলাম ব্যাপারটি বেশ জটিল। আমাদের বোঝার সাধ্য নেই,তাই পড়া আছে,পড়া আছে বলে সবাই যে যার মত কেটে পড়লাম।
একদিন সকালে যুগান্তর পত্রিকার হেডলাইন গুলোয় চোখ বোলাচ্ছি,যদিও খেলার পাতা ছাড়া অন্য কিছু আমি বিশেষ পড়তাম না।কানু হাঁফাতে হাঁফাতে এসে বলল নদুকাকু খুন হয়েছে।দৌড়ে আয় দেখতে যাব।তেড়ে দৌড় দিলাম কানুর পেছন পেছন।খানিকটা গিয়ে দেখি সামন্তদের কোক কয়লার কারখানাটার সামনে বেশ ভিড়।ভিড়টার মধ্যে মাথা গলিয়ে যে দৃশ্য দেখলাম,ভাবতেও পারিনি জীবনে কোনোদিন এ দৃশ্য দেখতে হবে। চারিদিকে চাপচাপ রক্ত।নদুকাকুর শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। ভালো করে কিছু বোঝার আগেই ছিটকে বেরিয়ে পড়লাম ভিড়টার মধ্যে থেকে।গা গুলোতে লাগলো।মনে হচ্ছিল এই বুঝি হড় হড় করে বমি করে ফেলব। একটুখানি ধাতস্থ হয়ে বাড়ি এলাম। সেদিন পড়ায় আর মন বসলো না।
সেদিন দুটো নতুন শব্দ শিখলাম।একটা “লাশ” অন্যটা পুলিশের দালাল।
নদুকাকু পুলিশের দালাল ছিল, নকশালদের সব গোপন খবর পুলিশের কাছে বলে দিত।তাই নকশালরা নদুকাকুকে মেরে ফেলেছে।লাশটা এখন পোস্টমর্টেম হবে।
সন্ধ্যায় বাবাকে জিজ্ঞেস করে জেনেছিলাম পোস্টমর্টেম মানেটা কি।
এ পাড়ায় পুলিশের আনাগোনা শুরু হল।রাত বিরেতে লোকের বাড়িতে পুলিশ ঢুকতো।বড় দাদাদের মাঝেমধ্যে ধরে নিয়ে যেত।সবাই আস্তে আস্তে পালাতে লাগলো,যার যেখানে আত্মীয় স্বজন আছে।আমরা ছোট বলে থেকে গেলাম।তবে যখন তখন রাস্তায় বেরোনো বন্ধ হয়ে গেল।পুর্নদার চপের দোকানের গুলতানি বন্ধ হয়ে গেল।এর মধ্যে একদিন বি টি রোড ধরে আমি আর সন্তু ইস্কুল থেকে ফিরছি, হঠাৎ দেখি একটা বাস থেকে সব লোক কাঁচুমাচু মুখ করে নেমে আসছে।বাস থেকে নেমেই যে যেদিকে পারলো ছুট লাগলো।মেয়ে,বৌ,জোয়ান,বুড়ো সবাই প্রানের ভয়ে ছুটছে। অনেকটা দূরে একটা বড় বট গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আমরা দেখতে লাগলাম।একদল ছেলে আস্ত বাসটায় পেট্রল ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দিল। একটা বাস দাউ দাউ করে জ্বলছে।আমরা ছুটছি। উল্টো দিকে,প্রানের ভয়ে।

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 0   Average: 0/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।