কাটাকুটি

কাটাকুটি

কাটা কুটি

 

কাল থেকেই বেশ ঝোড়ো হাওয়া দিচ্ছে। খবরে বলেছে দুদিন নিম্নচাপের সম্ভাবনা আছে। দুপুরে খাওয়া সেরে একটু ঘুমোতে গেলাম। একটু এদিক ওদিক করে উঠে পরলাম। “আজ মনে হয় ঘুম হবে না।” ঘড়িতে সবে চারটে বাজে। “যাই ছাদে বসে একটু গান শুনি। হাওয়া টাও বেশ ভালই দিচ্ছে।”

বৈশাখ মাসের পরিষ্কার নীল সাদা আকাশ। সূর্য তখনও ঝলমল করছে। “অস্ত হতে এখনও দেড়-দু ঘণ্টা বাকি।” পাশের বাড়ি গুলোর ছাদে বেশ অনেকেই উঠেছে। কেউ জামা কাপড় তুলছে, কেউ পাশের বাড়ির সাথে আড্ডা মারছে আবার কেউ এমনি পাইচারি করছে। একটু ছাওয়া দেখে গিয়ে বসলাম একটা উঁচু স্লাবের ওপর। পাঁচিলের ওপর পা তুলে হেলান দিয়ে বসলাম ট্যাঙ্কির গায়ে। মিষ্টি ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে। হাওয়ায় বেশ নতুন ফুলের গন্ধ অনুভব করলাম। মোবাইলে একটা আলতো সুরে গান চালিয়ে গাইতে লাগলাম।
“কতবার ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া, তোমার চরণে দিব হৃদয় খুলিয়া। চরণে ধরিয়া তব কহিব প্রকাশি
গোপনে তোমারে, সখা, কত ভালোবাসি।” হঠাৎই চোখ গিয়ে পরলো আকাশপানে।





শুধুমাত্র দুটো ঘুড়ি। আকাশের দুদিকে নিজের মতো উড়ছে। একদিকে ঘোষ বাবুর নাতি। রং হলুদ। অন্য দিকে ব্যানার্জী বাবুর ছোট ছেলে। তার রং নীল। হালকা একটা সরগম চালিয়ে তাকিয়ে রইলাম আকাশপানে। “আচ্ছা এরা এইরকম আলাদা আলাদা উড়াচ্ছে কেনো? নিজেদের মধ্যেই খেলতে পারে তো।”

আকাশের সাথে হাওয়ার রূপেও বদল এসেছে। কালো মেঘে ঢেকে যাচ্ছে সূর্যের আলো। “আক্রমণ।”
ঝোড়ো হাওয়া দিচ্ছে। ঘুড়ির আওয়াজ যেনো মিশে আছে ওই হাওয়ার মধ্যেই। হলুদ ঘুড়ি এগিয়ে যাচ্ছে নীলের শিবিরে। নীল ও দেখি ঝাঁপিয়ে পরলো হলুদের ওপর। শুরু হলো লড়াই। “কাটাকুটি।” ওদিকে কালো মেঘ গ্রাস করেছে আকাশের পশ্চিম প্রান্ত। “এখন নীচে নামবনা। এটাই দেখি। Looks exciting!”

হাওয়ার জোর বেড়ে চলেছে। বসন্তের বিকেলে বেশ ভালই লাগছিল। লক্ষ্য লক্ষ্য পাখি ঝাঁকে ঝাঁকে বাড়ি ফিরছে। তখনও সন্ধ্যে হতে বেশ কিছু সময় আছে। “একটা তো কেটে যাবেই এইবার।” পেঁচিয়ে গেছে দুটো ঘুড়ি। “আমি নীল কেই support করবো।” ঘুড়ি দুটো একবার এই আকাশ একবার ওই আকাশে ঘুরছে। আমি দাড়িয়ে দাড়িয়ে গোল গোল ঘুরছি। যদি ঘুড়ি সাথে রঙের তুলি লাগানো থাকতো, হইতো রাঙিয়ে দিতে পারতো গোটা আকাশ।




মেঘের ঘনত্ব বাড়ছে। বাড়ছে হাওয়ার জোর। ছাদে যত লোকজন ছিল, এখন আর কেউ নেই। আমি একা দাড়িয়ে আর সঙ্গে দুই যোদ্ধা। নীলাকাশের দিকে ভালোই যুদ্ধ চলছে। কেউ ই হার মানতে রাজি নয়। “হলুদ ও ভালই লড়ছে। তাহলে কি হলুদের পক্ষ নেবো? না থাক! নীল রং ছিল ভিষন প্রীয়।” কাটবে কাটবে করে কেটে গেলো ৩০ মিনিট। লড়াই চলছে। এগিয়ে যাচ্ছে নীল। পেঁচিয়ে গেলো হলুদ। “লে টান মার” বলে চিৎকার করলাম। কোন লাভ নেই। এখনও এগোচ্ছে নীল। হলুদ কেবল defense করছে। একটু আধটু ছোটবেলায় লাটাই ধরেছি। তাও এদের ছল চাতুরী বুঝলাম না। নীলের সুতো এখন হলুদের কবলে। অনেক দূর চলে গেছে নীল। এইবারই টানের খেলা।

টিপ টিপ করে যে বৃষ্টি পরছে তার খেয়ালই নেই। “শেষটা দেখেই নীচে যাবো।” আকাশ ভাগ হয়ে গেছে – কালো ঘন মেঘ, অন্যদিকে সাদা পরিষ্কার আকাশ – যেন দুটো যুদ্ধ একসাথে চলছে। কে কাকে ছাপিয়ে যাবে! বোঝাই যাচ্ছে আকাশ এইবার কালো মেঘে ঢেকে যাবে। হলুদ এইবার সুতো ছাড়ছে। নীল টানছে। বেশ জোরেই টানছে। “ভোকাট্টা”। নীল জিতেছে। নুইয়ে পড়ল হলুদের সুতো।




আকাশ সম্পূর্ণ ঢেকে গেলো কালো মেঘে। ঝিলিক দিয়ে উঠলো মেঘের আড়ালে। বাজের পর বাজ। নীল বিজয়ী হয়ে হলুদ কে নিয়ে বাড়ি ফিরছে। মুসলধারে বৃষ্টি নামলো। থমথমে হয়ে গেলো গোটা পরিবেশ। যুদ্ধ শেষ।

সকল ঝড়, বজ্রপাতকে শান্ত করে নেমে আসে বৃষ্টি। যুদ্ধ শেষে বৃষ্টি যেমন সব রক্ত ধুয়ে দেয়, সমাপ্তির ঘোষণা করে, ঠিক তেমন ই ছিল এই বৃষ্টি। কেবল দুই প্রান্তে দুটো আওয়াজ ভেসে এলো কানে। একদিকে বিজয় রথের শঙ্খধ্বনি, অন্যদিকে পরাজিত রাজ্যের হাহাকার। দরজা বন্ধ করে নেমে এলাম নীচে।।

 

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 1   Average: 5/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
close