কি রে দিদি চিনতে পারিস?

কি রে দিদি চিনতে পারিস?

যখন সেই তিন দিনের শিশুকে মেখলার মা অনিন্দিতার কোলে তুলে দিল অভিনবর  ঠাকুমা, ঠিক সেই দিন থেকেই  ওই ফুটফুটে  জ্যান্ত  পুতুলটাকে  খুব ভালোবেসে ফেলেছিল ৭ বছরের মেখলা।টুকটুকে  ফর্সা গায়ের রঙ,টানা টানা দুটো ছবির মত চোখ,ঠাট দুটো যেন লাল লিপিস্টিকের রঙে রাঙানো। এমন শিশুকে ছেড়ে তার মায়ের মানে মেখলার রাঙা মাসীর
এই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে যাওয়াটা  বোধহয়  খুব সহজসাধ্য  হয়নি।আসলে বাচ্চাটা হওয়ার সময় তার মা মানে রাঙামাসী অ্যাকলেমসিয়ায় আক্রান্ত  হয়ে মারা যান।অভিনবর বাবা সে পেটে থাকতেই এক রোড অ্যাকসিডেন্টে মারা যান।ফলে ছেলে বৌমা দুজনের মৃত্যুতে এতই ভেঙে পড়েন অভিনবর ঠাম্মি, যে ঐটুকু শিশুর  দায়ভার  নেওয়া উনার পক্ষে সম্ভব ছিল না।তাই তিনি তাঁর আত্মীয়া অনিন্দিতাকেই দায়িত্ব  দেন।সামনের ফ্ল্যাটেই থাকেন তাঁরা।  ফলে সবসময়  দেখতেও পাবেন নাতিকে।এইভাবেই  একের পর এক দিন কেটে যেতে থাকে।বড্ড ন্যাওটা  হয়ে পড়ে  ছেলেটা দিদি মেখলার।মেখলার  হাতে,খাওয়া,স্নান করা,বাইরে যাওয়া সমস্তটাই  তার দিদির কাছেই করতে হবে।ধীরে ধীরে  অভিনব বড় হয়ে উঠে। নিজের ভায়ের চেয়ে বেশি  বই কম মনে করে না তাকে মেখলা।ভায়ের এতটুকু  যত্নের অভাব সে সহ্য করতে  পারে  না। কোনোকিছুর অভাব  সে ভাইকে বুঝতে  দেয় না।
অভিনব যখন ইঞ্জিনিয়ারিং এর প্রথম বর্ষের ছাত্র তখনই  মেখলার বিয়ের ঠিক হয় এক হাইস্কুলের  শিক্ষকের সঙ্গে।উনার নাম বৈভব চট্টোপাধ্যায়। শ্বশুর  বাড়ি  কলকাতা থেকে অনেক দূরে, সেই নিশ্চিন্দিপুর গ্রামে।আসলে মেখলার গায়ের রঙ সামান্য  চাপা না বলে কালোই বলা যেতে পারে।তাছাড়া  তার বাবাও তেমন  বিত্তশালী ছিলেন না।ফলে একটু গ্রামের দিকে হলেও ছেলের স্বভাব চরিত্র  ভালো দেখে,চাকরি  ছাড়াও  নিজস্ব  বাড়ি,জমি,পুকুর দেখে, তিনি মেয়েকে বৈভবের হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত  নেন।বৈভবও দেখতে খুব সুন্দর  হওয়ায়  মেখলারও কোনো আপত্তি ছিল না।শ্বশুর  বাড়ি যাওয়ার  সময়  ভাইকে ধরে খুব কাঁদল সে।ভাইকে বলল,” ভাই,তুই  কিন্তু  আমাকে প্রত্যেকদিন ফোন করবি।” অভিনব বলে,” হ্যাঁ আর জাম্বুর কাছ থেকে ফোন রিচার্জের পয়সাটাও  নিয়ে নেব।” মেখলা বলে, ” আমি থাকতে তোকে অন্যের কাছ থেকে  পয়সা  নিতে হবে,কক্ষনো  না।” যাই হোক
শেষ পর্যন্ত বিদায়কাল এসে পড়ে।
বছর কেটে যায় একের পর এক।কয়েকদিন  ধরেই মেখলা খুব চিন্তিত।বারবার বাড়িতে  ফোন করেও ভাই অভিনব সম্পর্কে  কেমন যেন এড়িয়ে  যাওয়া উত্তর  পায় সে তার মায়ের কাছ থেকে।অথচ আগের বছরই অভিনব এসেছিল।ক্যাম্পাস ইন্টারভিউ  দিয়ে দুটো  কোম্পানি  তাকে মনোনীত  করেছে।কয়েক দিন আগে সে যে সল্টলেকে চাকরিতে জয়েন করেছে তাও সে ফোন করে জানিয়েছে দিদিকে।তাহলে কী এমন হ’ল যাতে মা ও-ই নামটাকেই যেন এড়িয়ে যেতে চাইছে।তাহলে কি চাকরি  পেয়ে অভিনবর  মধ্যে কোনো  পরিবর্তন  এসেছ? এমন নানা প্রশ্নের ভিড় মনে ঠেলাঠেলি  করলেও সে কিছুতেই  তার ভাই কোনো ভুল করতে  পারে,এটা মেনে নিতে পারে না।ইতিমধ্যে  মেখলারও একটা ছেলে হয়েছে।ছেলের জন্যই বিশেষ করে  বাবার বাড়ি যাওয়া হয়ে উঠেনি  তার কয়েক বছর। তবে ফোনে যোগাযোগ  আছেই।

হঠাৎ  কয়েকদিন ধরেই মাঝ রাতে তাদের পুকুরে যেন ঝপাৎ  ঝপাৎ করে শব্দ হচ্ছে।কিন্তু সমস্যাটা  হ’ল একমাত্র মেখলা ছাড়া আর কেউ সেই শব্দ শুনতে পাচ্ছে না।ফলে সে তার স্বামীকে  ঘুম  থেকে  তুলে  বারবার  খুঁচিয়ে মারছে বলে বৈভবও বিরক্ত হচ্ছে।
কিন্তু  সমস্যার সমাধান কিছু হচ্ছে না।একবার রাতেই বৈভব  মেখলাকে নিয়ে পুকুরপাড়ে  চারপাশে  ঘুরিয়ে  দেখিয়ে নিয়ে এসেছে।কোথাও কিছু নেই।পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে স্নান করার আওয়াজ অব্যাহত  রয়েছে। ফলে মেখলার মনটা খুব বিষন্ন  হয়ে রয়েছে।
সেদিন রবিবার দেখে বৈভব বলে,”আজ একটু আমার বোনের বাড়ি যাব ভাবছি।তোমার একলা থাকতে কোন অসুবিধা  হবে না তো?”
মেখলা বলে,” আমার কোনো অসুবিধা  হবে না।তুমি যাও।”বৈভব  সকাল সকাল  খেয়ে বোনের বাড়ি রওনা দেয়।
রবিবার, রাত্রি তখন প্রায় একটা  হবে।আবার পুকুরে  সেই ঝপাৎ ঝপাৎ  শব্দ  শুরু  হয়েছে।ভয়ে ভয়ে ঘুমোবার  চেষ্টা করে মেখলা।কিন্তু  কিছুক্ষণের  মধ্যেই  দরজা ধাক্কানোর   আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায় তার।সে উঠে পড়ে  দরজার  দিকে এগোতে  যাবে এমন সময়  কেমন এক অদ্ভুত  চাপা গলায় আওয়াজ ভেসে আসে,” এই দিদি দরজা খোল,তোর সাথে দেখা করতে এসেছি।” চমকে গিয়ে দরজার  বাইরে ভাইকে দেখে প্রচণ্ড অবাক হয়ে অসংখ্য প্রশ্ন শুরু করে দেয় মেখলা।কোথায়  থেকে এত রাত্রে এল সে? কেন এতদিন ফোন করেনি এমন নানান প্রশ্ন।
অভিনব শুধু বলে,” আমি বড্ড ক্লান্তরে দিদি।অনেকদিন ঘুমায় নি।একটু ঘুমাবার  জায়গা  দিবিরে দিদি?”
মেখলা খাওয়ার কথা বলাতে খেতে রাজি হয় না অভিনব।বলে সে,” নারে,দিদি কাল খাব,তোর পুকুরের মাছ আর ভাত।”
মেখলা তখন তার স্বামীর  একটা  পায়জামা  পাঞ্জাবি  বের করে ভাইকে  দিয়ে পোশাক পরিবর্তন  করতে বলে আর বৈভবের ঘরে তার ঘুমাবার জন্য বিছানা করে দেয় ।অভিনব ঘুমিয়ে পড়ে।

রাত্রি তিনটা বাজে তখন,হঠাৎ  ঘুমটা ভেঙে  যায়  মেখলার কেমন এক অস্বস্তিতে।সে দেখে এক বীভৎস  ভাবে থ্যাৎলানো রক্তাক্ত মুখ বিকৃত  যন্ত্রণায় তার দিকে ঝুঁকে  পড়ে বলছে,” দেখত,দিদি,এই মুখটা চিনতে পারিস?আমার মাথায় বড্ড যন্ত্রণা  দিদি,একটু হাত বুলিয়ে  দিবি?”কিন্তু  মাথার অর্ধেক  খুলিটাই তো নেই।কোথায় হাত বুলিয়ে  দিবে মেখলা?
অনুভবের ও-ই মুখ দেখে ভয়ে বিকট চিৎকার  করে  অজ্ঞান  হয়ে  যায়  মেখলা।পাড়া প্রতিবেশীরা এসে দেখে দরজা খোলা রয়েছে।তারাই মেখলার মুখে চোখে জল দিয়ে তাকে সুস্থ করে তোলে।পরেরদিন  মেখলার মা বাবা আসেন এসে বলেন,” কয়েকদিন  আগে একটা দশ চাকার লরি পিষে  দিয়ে যায় অনুভবকে ।”সে নাকি তার দিদির সঙ্গে দেখা করতে আসছিল মিষ্টি  হাতে নিয়ে।রাস্তা পার হতে গিয়েই দুর্ঘটনা  ঘটে।  ধীরে ধীরে উঠে বৈভবের বিছানার কাছে গিয়ে সে দেখে তার ভাইকে পরার জন্য দেওয়া পায়জামা  পাঞ্জাবিটা বিছানাতে এমনভাবে রাখা আছে যেন সদ্য কেউ খুলে রেখে গেছে।পুরোহিত  এসে বলেন ওর মাথায় সত্যিই খুব জ্বালা।যজ্ঞ করে তার আত্মার শান্তির ব্যবস্থা  করতে হবে।কান্নায়  ভেঙে পড়ে  মেখলা।ভোর হয়।কিন্তু  ভাইয়ের  সেই বীভৎস  যন্ত্রনাদায়ক মুখ আজও  যেন তাড়া করে বেড়ায় মেখলাকে।

সমাপ্ত।
ছবির সৌজন্যে  গুগল।
লেখিকা লোপামুদ্রা ঝা
কপিরাইট লোপামুদ্রা ঝা

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 2   Average: 2.5/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।