গজেন মিস্ত্রির কারখানা

গজেন মিস্ত্রির কারখানা

গজেন মিস্ত্রির কারখানা

দেবাশিস দাশগুপ্ত

 

লসেপুর গ্রামের নাম আলসে দিয়ে শুরু হল কেন তার কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায় নি। সবচাইতে চালু মতবাদটা হল, এখানকার কোন রাজা, সারা বাংলা থেকে খুঁজে খুঁজে অনেক অলস প্রকৃতির মানুষ এখানে ধরে এনে বসত করিয়েছিলেন, এবং তাদের তিনি লালন পালন করতেন। রাজাগজাদের খেয়াল যেমন হয় আর কি। তবে প্রকৃতির নিয়মে, আর পেটের তাড়নায় সেই আলসের দলের পরবর্তী প্রজম্ম ধীরে ধীরে কর্মঠ হয়ে উঠে আলসেপুর গ্রামকে বর্ধিষ্ণু করে তুলেছে।

তা, আজকে আলসেপুরের সকালটা বেশ মনোরম, ঝকঝকে রোদ উঠেছে, বেশ মিঠে একটা বাতাস বয়ে চলেছে, কয়েকটা প্রজাপতি ডানা চটপট করতে করতে ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়াচ্ছে, গলুদের বাড়ীর হুলো বিড়াল চোরু, নিমগাছের গাছের গোড়ায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছে, আর তাতে ভীষণ অসুবিধা হয়েছে, গাছে বাসা করে থাকা কাঠবিড়ালিদের, তারা তারস্মরে চিক চিক করে চিৎকার করে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। আলসেপুরের কুকুরদের সর্দার ভোলু গগনবাবুদের বাড়ীর সামনে বসে লেজ নাড়ছে। নিতাই কীর্তনিয়ার বাড়ীর সামনের কৃষ্ণচুড়া গাছে পেল্লাই একটা মৌচাক হয়েছে, তাতে মৌমাছিরা ব্যস্তসমস্ত হয়ে মধু সঞ্চয় করছে। আলসেপুরের একমাত্র উকিল গগনবাবু বারান্দায় বেতের চেয়ারে প্রসন্নমুখে বসে চায়ে মেরি বিস্কুট ডুবিয়ে খাচ্ছেন, আর খবরের কাগজে মুখ রেখে চারপাশে নজর রাখছেন। নিতাই কীর্তনিয়া কাল রাতে একটি নতুন গান বেঁধেছে সেটি গুনগুন করতে করতে একতারার ছেঁড়া তার সারাচ্ছে। নিমাই পালোয়ান তার চ্যালাদের সামনে রোজই ডন মারে, কিন্তু আজকে সে একটানা দেড়শ ডন মেরে, নিজের কৃতিত্বে নিজেই অবাক হয়ে বাক্যহারা হয়ে গেছে। মোদ্দা কথা চারিদিকে একটা বেশ মন ভাল করা চনমনে ব্যাপার।

 




 

প্রাণকিশোর আর রাধাকিশোর দুজনেই নিজেদেরকে নিমাই পালোয়ানের চ্যালা বলে মনে করে, সকাল হলেই দুই ভাই মালকোঁচা মেরে নিমাই পালোয়ানের আখড়াতে এসে হাজির হয় কুস্তি শিখতে। কিন্তু সমস্যা হল, দুজনেরই স্বাস্থ্য খুব খারাপ, নিমাই তাদের রোজ বোঝায় যে এই চেহারাতে কুস্তি শিখতে গেলে প্রানসংশয় অনিবার্য, কিন্তু দুই ভাই তা মানতে নারাজ, দুজনেই রোজ গোলগোল চোখ করে কুস্তির নানা প্যাঁচ দেখে মুগ্ধ হয়ে থাকে, বাড়ি এসে দুই ভাইয়ে এমন কুস্তি লড়ে যে মাঝে মাঝে তাদের বাবা ব্রজকিশোরকে লাঠি নিয়ে মাঠে নামতে হয়। কিন্তু আজ যখন নিমাই পালোয়ান একসাথে দেড়শ ডন মেরে ব্যোমকে গেল, তখন সুযোগ বুঝে দুই ভাই ঝাঁপিয়ে পড়ল নিমাইয়ের পায়ে। আজকের দিনটাই এমন যে নিমাই আর আপত্তি করতে পারল না , দুই ভাই নিমাইয়ের আখড়াতে ভর্তি হয়ে গেল।

গজেন মিস্ত্রির কারখানাটা আলসেপুরের শেষপ্রান্তে। দুই মানুষ পাঁচিল ঘেরা কারখানায় গজেন নাকি হরেকরকম যন্ত্রপাতি বানিয়ে থাকে। গজেন মিস্ত্রিকে নিয়ে আলসেপুরে একটা ভাগাভাগি আছে। কেউ মনে করেন গজেন আসলে একজন বৈজ্ঞানিক, অন্যদের মতবাদ হল, বৈজ্ঞানিক না ছাই, গজেন নেহাতই মিস্ত্রি, তবে একটু উচ্চমানের। তবে তার পাঁচিল দিয়ে ঘেরা কারখানাতে সে সারাদিন নানারকম কাজ করে, মাঝে মাঝে দুম দাম আওয়াজও হয় , কিন্তু সে ঠিক কি বানায়, তা গ্রামের লোকেরা জানে না। গজেন বিশেষ কারোর সঙ্গে মেশেও না। তাছাড়া তার কারখানাতে সে গোটাচারেক কুঁদো কুঁদো কুকুর পুষে রেখেছে, তারা নাকি রীতিমত মানুষখেকো।

গজেন মিস্ত্রির কারখানার পিছনে একটা ঝাঁকড়া জামগাছে দুটো ডালের ফাঁকে পা ঝুলিয়ে চিন্তিত মুখে সমু বসে আছে। এটা তার চুপচাপ চিন্তা করার জায়গা, কারণ একে তো গ্রামের শেষপ্রান্তে বলে লোকজন এদিকে বেশি আসে না, আর অন্যদিকে মানুষজন গজেন মিস্ত্রির কারখানাকে এড়িয়েই চলে। কদিন ধরে সমুর মনটা বড় উচাটন হয়েছে। বেশ কয়েকটা ঘটনা থেকে তার মনে হচ্ছে কিছু একটা গোলমাল হচ্ছে বা হতে চলেছে। ব্যাপারটার শুরু গত বুধবার থেকে, সমু পড়াশুনায় ভাল, অঙ্কে সে প্রতিবাররই নব্বই এর ঘরে পায়, কিন্তু বুধবার তার অঙ্ক খাতা পেয়ে সে বেশ অবাক হয়ে গেল, যে দুটি অঙ্ক সে ভুল করেছিল, সেদুটি কোন মন্ত্রবলে ঠিক হয়ে তার নম্বর একশোতে একশ হয়ে গেছে। অঙ্কের স্যার মদনবাবু তার পিঠ চাপড়ে দিলেন, বাড়ীতে দাদু তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন, মা মুরগির দুটো ঠ্যাং -ই তার পাতে তুলে দিলেন, কিন্তু তবু সমুর মনে খুশি নেই। দুটো ভুল অঙ্ক কি করে ঠিক হয়ে গেল, তা সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না। তারপরের ঘটনাটা ঘটল বৃহস্পতিবার রাতে, অনেক রাতে কি রকম একটা অস্বস্তিতে সমুর ঘুম ভেঙ্গে গেল, মনে হতে লাগল ঘরের মধ্যে একটা ফিসফাস আলোচনা চলছে, আওয়াজটার উৎস খুঁজতে গিয়ে যা দেখল তাতে তার মাথা ঘুরে যাবার জোগার, কদিন আগে বাবা তাকে একটা স্মার্ট ওয়াচ কিনে দিয়েছিল, সেটা ঘুমোবার আগে সে পড়ার টেবিলে খুলে রেখে শুয়েছিল, সেই ঘড়ি টেবিল থেকে বেশ কিছুটা ওপরে উঠে শূন্যে ভাসছে, আর তার থেকে যে আওয়াজ টা আসছে সেই আওয়াজেই তার ঘুম ভেঙ্গেছে। তাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে ঘড়িটা বাধ্য ছেলের মত টেবিলে নেমে নিজের জায়গার স্থির হয়ে গেল। সমু ভুতপ্রেতে বিশ্বাস করে না, কিন্তু এই ব্যাপারটার কোন ব্যাখ্যা সে পেল না, সকালে উঠে সে ঘড়িটা নিয়ে গেল বিপুলকাকুর ঘড়ি সারাবার দোকানে, কিন্তু বিপুলকাকু ঘড়িতে কোন সমস্যা দেখতে পেলেন না। সময় ঠিক দিচ্ছে বাকি ফাংশন ও ঠিকই আছে। অবশ্য সমু আসল কথাটি বিপুলকাকুকে বলে নি।

 




 

সমু গাছে বসে আকাশ পাতাল এইসবই ভাবছিল, এমন সময় তার কনের পাশে কে যেন ধাতব স্মরে বলে উঠল , “ সমু, সমু।“ চমকে উঠে সমু গাছ থেকে প্রায় পড়েই যাচ্ছিল, কোনরকমে সামলে নিয়ে এদিক ওদিক তাকাতে লাগল। তারপর অবাক হয়ে দেখল তার হাতের ঘড়ি থেকেই এই আওয়াজটা আসছে। সমু ভিতু নয়, কিন্তু এবার তার বেশ ভয় ভয় করতে লাগল। হটাৎ ঘড়ি টা বলে উঠল ,” তাড়াতাড়ি, পালাও” । সমু তড়িৎ গতিতে গাছ থেকে নেমে পড়তেই, গাছের ওপরে যেন একটা ঝড় বয়ে গেল, আর মড়মড় করে সমু যে ডালটায় বসেছিল তার ওপরের ডালটা মাটিতে ভেঙ্গে পড়ল। ঘড়ি বলতে লাগল “পালাও , পালাও”। সমু বিদ্যুতগতিতে বাড়ীর দিকে ছুট লাগাল।

হরেকৃষ্ণ ঘোষের, আটটা জার্সি গরু আছে। তারা এক একজনে সকাল বিকেল মিলিয়ে প্রায় ষোল থেকে কুড়ি লিটার দুধ দেয়। তাদের খোরাক ও তেমনি । গজেন মিস্ত্রির কারখানার পাশে একটা বেশ বড় মাঠ আছে, হরেকৃষ্ণ ঘোষের ছেলে রামকৃষ্ণ সেখান থেকে রোজ বেশ কয়েক বস্তা ঘাস কেটে এনে গরুগুলোর ভুসির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়। সেদিনও রামকৃষ্ণ একমনে ঘাস কাটছিল, কিন্তু গোল বাঁধাল একটা দমকা হাওয়া , কেটে রাখা ঘাসগুলোকে সামলাতে পারছিল না রামকৃষ্ণ, আকাশে একফোঁটা মেঘ নেই, গাছের পাতার দাপাদাপি নেই, কিন্তু মাঠের ঘাসে এত হাওয়া কোথা থেকে আসে। রামকৃষ্ণ রণে ভঙ্গ দিয়ে তিন বস্তা ঘাস তার সাইকেলের পিছনে চাপিয়ে বাড়ীর দিকে রওয়ানা দিল। সেদিন বিকেল থেকে তাদের বাড়ীতে একেবারে অনাসৃষ্টি কাণ্ড। গরুগুলো বিকেলের দিকে মোটামুটি ছয় থেকে আট লিটার দুধ দেয়। তারা সেদিন সবাই কুড়ি থেকে পচিশ লিটার করে দুধ দিল। হরেকৃষ্ণ তার কাস্টমারদের পাঁচ পাঁচ লিটার করে দুধ বেশি দিল, তাও ফ্রিতে। সারা আলসেপুর সদিন বিকালে পায়েসের গন্ধে ম ম করতে লাগল, সেই দুধের পায়েসের স্বাদ নাকি অমৃতের মত।

রাতে খাওয়া দাওয়া শেষ করে , সমু ঘড়িটা নিয়ে বসল। ঘড়ি ঠিকঠাকই চলছে। সমু ঘড়ির সঙ্গে আসা ছোট বইটা নিয়ে ঘড়ির সব অপশনগুলো এক এক করে দেখছিল। দেখতে দেখতে কখন বারটা বেজে গেছে সমু খেয়াল করে নি। খেয়াল করল যখন ঘড়িতে বারোটার বিপিং হল। সমু ঘড়ি রেখে শুতে যাবে, এমন সময়, ঘড়িটা বলে উঠল “সমু , সমু”। সমু অবাক হয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, ঘড়িটার ডায়াল রং পরিবর্তন করছে, নীল থেকে সবুজ, তারপর সাদা, আস্তে আস্তে সেখানে ফুটে উঠল একটা লোকের মুখ, লোকটার চোখদুটো খুব ধারাল, লোকটা তার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বলল, “সমু সমু”।
সমু বাক্যহারা হয়ে দেখছিল, লোকটি আবার বলল “ভয় পেও না, আমি তোমার সাহায্য চাই”।
সমুর কথা ফুটছিল না, অনেক কষ্টে বলল, “ আপনি কে?”
“আমি অনেক দূরে থাকি, আমার নাম অনেক বড়, তুমি উচ্চারণ করতে পারবে না , ধরে নাও আমার নাম জো”।
“আমি আপনাকে কি ভাবে সাহায্য করব?”
“তুমিই করতে পারবে, আমাদের খুব বিপদ, আমরা বিপন্ন, যে সমস্যার কারণে আমরা বিপন্ন, তুমি সেই সমস্যার উৎসের খুব কাছাকাছি আছ, আমাদের ওখানে যেতে অনেক সময় লেগে যাবে ,তাই আমরা তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করছি, তুমি যে যন্ত্রটার মাধ্যমে আমাকে দেখতে পাচ্ছ, আমি জানি না ওটা তোমরা কি কাজে ব্যবহার কর, কিন্তু আমরা ওটার সাহায্যে তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছি।“
“কিন্তু আমি তো ছোট, আমার শক্তি কম”।

 




 

লোকটা হাসল, “শক্তি চাই না, বুদ্ধি, সাহস চাই, তোমার তা আছে। করবে আমাদের সাহায্য?”।
লোকটার করুন মুখ দেখে সমুর বেশ দুঃখ হল, “আমি রাজী,বলুন কি করতে হবে”।
“অনেক ধন্যবাদ, এবার তোমাকে আমাদের সমস্যা টা বলি, তোমাদের পৃথিবী যেমন সূর্যের চারদিকে ঘোরে আর তেমনি আমাদের গ্রহও একটা বড় নক্ষত্রর চারপাশে ঘোরে। আমাদের সোলার সিস্টেমে বারটা গ্রহ আছে। আর তাতে পাঁচটা গ্রহতে প্রান আছে। আমরা চার নম্বর গ্রহ, আমদের গ্রহের নাম ধরে নাও “জেন” , তিন নম্বরে আছে যে গ্রহ আছে তার নাম “কেন” তারা আমাদের থেকে বিজ্ঞানে তোমাদের অঙ্কের হিসাবে পাঁচশো বছর এগিয়ে, এতদিন আমরা তাদের অধীনেই ছিলাম, মাত্র তিরিশ বছর হল আমরা অনেক লড়াই করে স্বাধীনতা পেয়েছি। কিন্তু সেই স্বাধীনতা বজায় রাখা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে”।
সমুর মুখ থেকে বেরিয়ে এল , “আমরাও তো দুশ বছরের পরাধীনতার পর স্বাধীনটা পেয়েছিলাম”।
“তাই, খুব ভাল, আমরা জানতাম না । তবে “কেনরা” তো আমাদের স্বাধীনতা দিতে চায় নি, তাই আবার ওরা আমাদের আক্রমণ করতে পারে, এমনিতে তো ওরা পারবে না, কিন্তু আমাদের কাছে খবর আছে যে তোমাদের গ্রহে এমন একটা যন্ত্রর হদিশ ওরা পেয়েছে যা ওদের হাতে গেলে আমরা বেশ বিপদে পড়ে যাব, তবে আমাদের ধারনা ওই যন্ত্র এখনও অসম্পূর্ণ, কারন “কেন” গ্রহ থেকে বেশ কিছুদিন আগে একটা স্পেসশিপ তোমাদের গ্রহের দিকে রওনা হয়েছে, যার মধ্যে ওদের একজন প্রথম সারির বিজ্ঞানীও আছে, ওরা আগামী এক-দু দিনের মধ্যে তোমাদের গ্রহে পৌঁছে যাবে, আমাদের ধারনা ওরা খুব সাবধানে কাজ করবে, যাতে তোমাদের গ্রহের কেউ টের না পায়, ওরা তোমাদের কাছাকাছি কোন সমুদ্রে ঘাঁটি করে ভোল বদলে গজেন মিস্ত্রির কারখানায় পৌঁছাবার চেষ্টা করবে”।
“ মনে হয় “কেনরা” এটা অনুমান করতে পারবে না যে আমরা তোমার সাহায্য নিতে সক্ষম হয়েছি, তুমি কালকে চলে যাও গজেন মিস্ত্রির কারখানায়। গিয়ে বুঝতে চেষ্টা করবে কোন যন্ত্রটা ওরা নিয়ে যেতে চাইছে, তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা। “কেনরা” চেষ্টা করবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজ সেরে নিতে কারণ ওরা যে জ্বালানি ব্যবহার করে তা তোমাদের গ্রহে পাওয়া যায় না। আর বেশিদিন সমুদ্রের তলায় থাকলে ওদের জ্বালানিতে টান পড়বেই, কিন্তু সাবধান কথাটা আর কাউকে বোল না”।
“কিন্তু ওই কারখানায় তো চারটে কুকুর আছে, এছাড়া আছে গজেন মিস্ত্রি, আমি ঢুকব কি করে”।
“কোন অসুবিধা নেই, “কেনরা” ওদের সবাইকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে, ওরা এসে সবাইকে জাগাবে আর সবাই ওদের কথামত কাজ করবে, তার মধ্যে আমাদের কাজ সারতে হবে। আমি আজ চলি, তুমি ওখানে পৌছাও তারপর আবার কথা হবে”।মুখটা অদৃশ্য হয়ে গেল। ঘড়িটা টেবিলে রেখে, সমু শুয়ে পড়ল, কিন্তু সারারাত ঘুম আসল না।

 




 

সুন্দরবনের কাছাকাছি, বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রে কিছুক্ষণের জন্য একটি নিম্নচাপজনিত ঘূর্ণাবর্ত দেখা গেল, উপগ্রহ চিত্রে একবার দেখা দিয়েই সেই ঘূর্ণাবর্ত উধাও হয়ে গেল। ভারী আজব ব্যাপার। ভারতীয় জলসেনার দুটি টহলদারি বোট ওদিকে ছিল, তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ কিছুক্ষণের জন্য বিছিন্ন হয়ে গেল। তারা হঠাৎ একটা কুয়াশার বলয় টের পেল, তার কিছুক্ষণের মধ্যে আবার সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেল। আশেপাশে অনেকটা টহল দিয়েও কিছু দেখতে না পেয়ে বোটদুটি ফিরে চলল। কিছুক্ষণ পরে একটি ছোটখাট চেহারার মানুষকে দেখা গেল সুন্দরবনের দুর্গম জঙ্গল এলাকা দিয়ে চলেছে। তার পিছনে শিকারের খোঁজে একটি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার গুঁড়ি মেরে এগোচ্ছে। বাঘটি তার শিকারকে হাতের নাগালে পেয়ে একটি লাফ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল, কিন্তু মানুষটি ঠিক সময় মত একটু ডানপাশে সরে গিয়ে বাঘটাকে একদম বেকুব বানিয়ে দিল। তারপর গাছের ডাল থেকে, দুটি বাঁদর, দূর থেকে এটা হরিণ আর একটা বনবিড়াল অবাক হয়ে দেখল, সুন্দরবনের রাজা, বিড়ালের মত, লোকটির পায়ে মাথা ঘষছে, লোকটি বাঘেটির মাথায় একবার হাত বুলিয়ে তার কানে কানে কি একটা বলতেই, সে হেলেদুলে অন্যদিকে রওয়ানা দিল। একটু বাদে লোকটিকে দেখা গেল খোশমেজাজে শিস দিতে দিতে গেল একটা স্টিমারে করে ক্যানিং এর দিকে চলেছে, একটি হকারের কাছ থেকে সে দুটাকার চিনাবাদাম নিল, হকারটি ভারী খুশি হয়ে তাকে বাদাম দিল কিন্তু পয়সা চাইতেই ভুলে গেল।

সকাল সকাল সমু গিয়ে মাকে ধরল “মা একটু দিদির বাড়ী থেকে ঘুরে আসি ?”
“কেন এই সাতসকালে আবার দিদির বাড়ী যাবার শখ হল কেন ?”
“এমনি, অনেকদিন যাই নি তো”।
মা সমুর দিকে তাকালেন, “যা, ঘুরে আয়, তবে বেশিদিন থাকিস না, পড়াশুনা আছে তো”।
“ঠিক আছে,” ব্যাগে দুদিনের জামাকাপড় ভরে সমু বেরিয়ে পড়ল।

গজেন মিস্ত্রির কারখানার পিছন দিকে একটা জায়গায় দেওয়ালটা একটু ভাঙ্গা আছে , চুপচাপ সেই দিক দিয়ে কারখানার ভিতরে ঢুকে পড়ল সমু, জো অবশ্য বলেছে সবাই ঘুমিয়ে আছে, তবু সাবধানের মার নেই, সমু ভিতরে ঢুকেই তরতর করে একটা গাছে উঠে পড়ল, কোন প্রাণের তো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না, একটা ছোট ডাল ভেঙ্গে সমু ভিতরের দিকে ছুঁড়ে দিল, টিনের ওপর ডালটা পড়ে বেশ জোরে আওয়াজ হল, কিন্তু তাও কারোর সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না, খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে সে গাছ থেকে নামল, একটু এগিয়েই তার বুকটা ধক করে উঠল, একটা কালো কুকুর, স্থির দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। সমু কারোর কাছে শুনেছিল কুকুর দেখে পালাতে নেই, সমুও চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল কুকুরের চোখে চোখ রেখে, তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। বেশ খানিকক্ষণ দাড়িয়ে থাকার পরও যখন কুকুরটা নড়ল না, তখন সমু একটু নিজের হাতটা নাড়াল, কিন্তু কুকুরটার কোন হোলদোল নেই। এবারে সে একটু সাহস সঞ্চয় করে কুকুরটার দিকে এগিয়ে গেল, কুকুরটা যেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চোখ খুলে স্ট্যাচু হয়ে গেছে, তার মানে জো যা বলেছিল তাই ঠিক, সবাই ঘুমিয়ে আছে, কিন্তু কি অদ্ভুত ঘুম।

 




 

কারখানার ভিতরে একা একা ঘুরছিল সমু, হরেক রকম যন্ত্র বানিয়ে রেখেছে গজেন মিস্ত্রি, কিন্তু কোনটা নিতে “কেনের” লোকেরা আসবে? গজেন মিস্ত্রি তার বিছানায় শুয়ে আছে, কোন সাড়াশব্দ নেই, পাশেই রান্নাঘর, তাতে নানারকম খাবার ফ্রিজে রাখা আছে, খিদে পেয়ে গেছিল সমুর, একটু পাউরুটি, মাখন লাগিয়ে খেয়ে নিল সমু, তারপর ভাল করে মেশিনগুলো দেখতে লাগল। মিয়াঁও করে আওয়াজ হতে চমকে উঠল সমু, একটা বিড়াল, কোথা থেকে জুটেছে এসে, মনে হয় কুকুরগুলোর সাড়াশব্দ না পেয়ে, ভালই হল, একটা সঙ্গী পাওয়া গেল, বিড়ালটাকে একটুকরো পাউরুটি ছুঁড়ে দিল, সেটা খেয়ে আনন্দে গলে গিয়ে সমুর পায়ে মাথা ঘসতে লাগল। যন্ত্রগুলোর সামনে নানারকম বর্ননা লেখা আছে, একটা ছোট ড্রিলারের মত মেশিনের সামনে লেখা আছে, “ফিল ইয়োর পাস্ট, বাট কান্ট রিটার্ন”, মনে হয়, এই যন্ত্রটা অতীতে নিয়ে যাবে কিন্তু, ফেরত আনতে পারবে না,আর একটা মাঝারি কামানের মত যন্ত্র, লেখা আছে “পাওয়ার বল”, তার পাশে আছে একটা ছোট যন্ত্র লেখা আছে, “মাল্টীপ্লায়ার বাট কান্ট ওয়ার্ক ডাইরেক্টলি”, তার পাশে একটা যন্ত্রের নাম “ক্লাউড ক্রিয়েটর”, একটু লোভ লাগল সমুর, যন্ত্রটার গায়ে একটা অন বোতাম আছে চাপতেই, এককাড়ি মেঘ বেরিয়ে ঝপ করে একপসলা বৃষ্টি হয়ে গেল, সমু একেবারে ভিজে চুপচুপ, জামাকাপড় পালটাতে হবে , বাকি যন্ত্রগুলো পরে দেখা যাবে।
“সমু, সমু, সমু”, একটানা যান্ত্রিক আওয়াজে সমুর ঘুম ভাঙল, দুফুরে খেয়ে, দেয়ে, কখন, ঘুমিয়ে পড়েছিল, খেয়াল নেই। ধড়ফড় করে উঠে বসল সমু, ঘড়ির স্ক্রিনে জো এর মুখ, “চিং আসছে, কেনের বিজ্ঞানী, ভাল কিন্তু খুব নিষ্ঠুর, সাবধান, তোমাকে যেন দেখতে না পায়, আমি তোমার ঘড়ীর মাধ্যমে একটা বলয় বানিয়ে দিয়েছি, ওর সিগনাল তোমাকে ধরতে পারবে না, কিন্তু তুমি সামনে যাবে না, ও যেন তোমাকে দেখতে না পায়”।

“কিন্তু আমি তো বুঝতে পারি নি কোন যন্ত্রটার জন্য ওরা আসছে”।
“সেটা আমরাও বুঝতে পারছি না , ও এসে গজেন মিস্ত্রি কে জাগাবে , তারপর যে যন্ত্রটার ওপর কাজ শুরু করবে সেটাই হবে সেই যন্ত্র, কিন্তু ওরা যেন কাজ শেষ করতে না পারে।“
“কিভাবে আটকাব ওদের”।
“চিং এর হাতে বেশি সময় নেই, তোমাদের সময় অনুসারে ওর হাতে মাত্র চারঘণ্টা সময়, তার মধ্যে ওকে কাজ সেরে রওনা হতে হাবে, আমরা দুজনে মিলে চেষ্টা করব ওদের আটকাতে, এরপর থেকে আমি সরাসরি তোমার ব্রেনে আমার কথা পাঠিয়ে দেব, তুমিও আওয়াজ না করে মনে মনে উত্তর দেবে, মনে রাখবে শব্দ যেন না হয়, চিং এসে গেছে, এবার তুমি লুকিয়ে পড়”।
কিছু প্যাকিং বাক্সের আড়ালে সরে যেতে যেতে সমু জিভ কাটল, “ফিল ইয়োর পাস্ট “ যন্ত্রটা সে হাতে নিয়েছিল, সেটা ওর কাছেই রয়ে গেছে।

যে লোকটিকে কিছুক্ষণ আগে সুন্দরবনে দেখা গিয়েছিল, সেই লোকটি এখন গজেন মিস্ত্রির কারখানায় কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, লোকটি হাল্কা স্মরে শিষ দিচ্ছিল আর ঘুরে ঘুরে সমস্ত যন্ত্র গুলো দেখছিল। আস্তে আস্তে সে গজেনের কাছে গিয়ে দাঁড়াল, খুব সুরেলা গলায় ডাকল “গজেন, গজেন”। সেই ডাকেই গজেন আস্তে আস্তে চোখ খুলে তাকাল, তারপর উঠে বসল। চিং তাকে নিয়ে গিয়ে দাঁড়াল “মাল্টিপ্লায়ার” যন্ত্রটার সামনে। খুব সূক্ষ্ম চোখে যন্ত্রটাকে দেখে একটা ছোট প্যানেল খুলে ফেলল সে, ভিতর থেকে একটা ছোট্ট ক্যাপসুলের মত কিছু বার করে গজেন এর হাতে দিয়ে বলল, “এটা পাল্টাতে হবে।“ সমুর কানে জো এর মরিয়া আওয়াজ এল, “ওটা পালটাতে দিও না, সমু সর্বনাশ হয়ে যাবে, ওরা ওই মাল্টিপ্লায়ার দিয়ে আমাদের শত্রুদের সংখ্যা বাড়িয়ে দেবে, তারপর আমরা কমজোরি হয়ে পড়লে আমাদের আক্রমণ করবে ”। এর মধ্যে একটা যাচ্ছেতাই কাণ্ড হয়ে গেল, যে বিড়ালটা সমুর কাছে পাউরুটি খেয়েছিল সেটা হঠাৎ করে একটা আরশোলা দেখে গজেন মিস্ত্রি আর চিং এর দু পায়ের ফাঁক দিয়ে গলে গিয়ে, এক লাফ দিয়ে পাশের ডাঁই করে রাখা রাখা থার্মোকলের বাক্সের মধ্যে লাফিয়ে পড়ল। কে জানত গজেন মিস্ত্রি আবার বিড়ালকে এত ভয় পায়, সে “বাবাগো” বলে লাফিয়ে সোজা চিং এর কোলে। আর দুজনে মিলে জড়াজড়ি করে এক্কেবারে কুমড়ো গড়ানো যাকে বলে, তারপর দুজনে মেঝের দুপাশে বসে নিজেদের ঠুকে যাওয়া কপাল ঘসতে লাগল।

 




 

এই কাণ্ড দেখতে দেখতে সমুর মনে একটা আইডিয়া খেলে গেল, সে তার হাতের “ফিল ইয়োর পাস্ট” যন্ত্রটা গজেনএর দিকে তাক করে বেশ কয়েকবার চালিয়ে দিল। কোন আওয়াজ হল না শুধু একটা ছোট্ট নীল আলো বারকয়েক গজেনকে ছুঁয়ে চলে গেল, সমুর বুকটা ধকধক করছে, তার প্ল্যান কাজ করবে তো, এই যন্ত্রটাও যদি খারাপ থাকে।
একটু পড়ে চিং লাফিয়ে উঠল, “গজেন, আর সময় নেই, এই পার্টসটা পাল্টাও, এখুনি”।
গজেন একটা লম্বা হাই তুলে বলল, “এত তাগাদা করলে হয় ?, এইটুকুনি যন্ত্র, কোথায় আছে , বার করতে হবে তো, এতে বাপু সাতদিন সময় লাগবে , এত তাড়াতাড়ি কাজ হয়”। এই বলে গজেন আধশোয়া হয়ে একটা পড়ে থাকা পাখির পালক দিয়ে কান চুলকোতে লাগল।
চিং এর মুখ রাগে বেগুনি হয়ে গেল, সে গজেনের ঘাড় ধরে সোজা দাঁড় করে দিল, “আমি বলছি, এখুনি কর, আমার হাতে সময় নেই”।
কিন্তু গজেনের কোন হোলদল নেই, সে আবার হাঁটু মুড়ে আধশোয়া হল,”তাগাদা দিও না বাপু”, বলে আবার পালক দিয়ে কান চুলকোতে লাগল।
এর মধ্যে চিং পকেটে থাকা একটা কিছু বাজতে শুরু করেছে, “চিং রাগে হিতাহিত শূন্য হয়ে গজেনের পিঠে টেনে দুটো লাথি মারল।“ কিন্তু লাথি খেয়ে গজেন একটু মুচকি হেসে পাশ ফিরে পুরো শুয়ে পড়ল।
চিং কে দেখে বোঝা যাচ্ছিল, সে পুরোপুরি বিভ্রান্ত। একটুক্ষণ সময় সে কারোর সঙ্গে কথা বলল, কি বলল সমু কিছু বুঝতে পারল না, তারপর বিষণ্ণ মুখে গজেন মিস্ত্রির কারখানা ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
সমু কানে জো এর উত্তেজিত গলা এল, “চিং চলে গেল, আমরা বেঁচে গেলাম কিন্তু তোমাদের গজেন মিস্ত্রির হঠাৎ কি হল বল তো”।
সমুর মুখে হাসি , “ জো, তোমার তো জানা নেই, আমাদের আলসেপুর গ্রামের সবার পূর্বপুরুষই অলস ছিল, গজেন নিজের তৈরি যন্ত্রের ঘায়ে এখন অলস হয়ে গেছে, আমি ওর “ফিল ইয়োর পাস্ট” যন্ত্রটা ওর ওপরেই চার্জ করে দিয়েছিলাম।

আলসেপুরে এখন একজন আলসে আছে, সে হল গজেন মিস্ত্রি, সে সারাদিন শুয়ে থাকে, সমু তার বাবাকে ধরে করে তার খাওয়া পড়ার ব্যবস্থা করেছে। চিং চলে যাবার পর জো সব কুকুরগুলোকে জাগিয়ে দিয়েছে, তারা এখন গজেন মিস্ত্রির কারখানা পাহারা দেয়, কিন্তু সমুর খুব ন্যাওটা। তাদের খোরাকও সমুর বাড়ি থেকে আসে। আলসেপুর আবার আগের মত চলছে, কেবল খুব গরম পড়লে সমু গিয়ে গজেন মিস্ত্রির “ক্লাউড ক্রিয়েটর” মেশিনটা চালিয়ে খানিকটা বৃষ্টি নামিয়ে দেয়। গজেন মিস্ত্রি শুয়ে শুয়ে সব দেখে, পাখির পালক দিয়ে কান চুলকায়, আর মুচকি মুচকি হাসে। আলসেপুরের লোকেরা অবশ্য বেজায় খুশি, যাই হোক, গ্রামের নাম সার্থক করার একটা লোক তো পাওয়া গেছে।

 

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 2   Average: 5/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।