গৃহপ্রবেশ

গৃহপ্রবেশ

অভিজিৎ পাঁজা

 

রকম দোতলা বাড়ি শহরাঞ্চলে এই পয়সায় আর পাবেন না দাদা, ফ্যামিলির সাথে আলোচনা করে জানান আমি তাহলে ভিডিও কলে মিটিং টা করিয়ে দেবো রোব্বার…! কথা গুলো বলে একটা জর্দা পান মুখে দিয়ে পল্টু ঘোষ নিজের জামায় মোবাইল টা মুছতে মুছতে টুম্পাকে বললো এই কেসটা ডান হয়ে যাবে মনে হচ্ছে, হয়ে গেলে তোমাকে নিয়ে দার্জিলিং যাব কথা দিচ্ছি। টুম্পা জিগ্গেস করলো ওই সেই বাড়িটা? ওই বাড়িটা কেউ কিনবে? আশপাশে খবর নিলেই তোমার খদ্দের পালাবে এই নিয়ে ছ বার হলো, পাহাড় দেখা আমার আর হলুনিকো! পল্টু বলে আহা চটছো কেনো গিন্নি এবারে ওপাড়ার কেলাবে কিছু টাকা আগে থাকতে দিয়ে রেখে, বিমল বাবুকে ওই কেলাবেই নিয়ে যাব খোঁজ নিতে.. ওরা কেউ কিচ্ছুটি ওসব ঘটনা বলবেনে।

 




 

 

বিমল বাবু ভাড়া থাকেন হাওড়ার কদমতলায়। বেসরকারি কোম্পানিতে অ্যাকাউন্টেন্টের কাজ করেন। বাড়িতে অর্চনা বৌদি, একটা ছেলে একটা মেয়ে। ছেলে বড়, বারো ক্লাসে পড়ে আর মেয়ে ক্লাস এইটে। খরগপুরে আদি বাড়ি, কিন্তু মা মারা যাবার পর সেখানে অল্প জমি আর মাটির দোতলা বাড়ি বিক্রি করে যা টাকা পেয়েছেন তার সাথে নিজের সঞ্চয় মিলিয়ে ওই সতেরো আঠেরো লাখের মধ্যে একটা বাড়ি খুঁজছেন কারণ ফ্ল্যাট ওদের পছন্দ নয়। ছেলে মেয়ে বড় হচ্ছে, কতো দিন আর এই ভাবে একটার পর একটা বাড়ি চেঞ্জ করা যায় সব মালপত্র নিয়ে, তাই অফিসের এক কলিগের থেকে পল্টু ঘোষের নম্বর টা পেয়ে তার বাজেট আর প্রয়োজনের কথা জানালে, শিবপুর বি গার্ডেনের কাছে একটা বাড়ির সন্ধান দেয় পল্টু ঘোষ।

শনিবার হাফছুটির পর অফিস ফিরতি বিমল বাবু পল্টুর সাথে বাড়িটি দেখতে যান। বড় রাস্তা থেকে ভেতরের দিকে ঢুকে একটা দশ ফুট চওড়া ব্লাইন্ড লেনের একদম শেষে কাঠা দেড়েক জায়গার ওপর দোতলা বাড়ি। পকেট থেকে চাবি বের করে গেটের তালা খুলে ভেতরে গেলে দেখেন, দুটো ছোটো ঘর, মাঝে দালান, এক পাশে রান্নাঘর অন্য পাশে বাথরুম। বাড়ির সামনে বারান্দা। দালানের পাশ দিয়ে ওপরে ওঠার সিঁড়ি, ওপরটা একদম সেম নিচের মতো। পল্টু জানায় এই জায়গায় এমন বাড়ি এখন কোনোভাবেই পঞ্চাশ লাখের কমে পাওয়া যাবে না কিন্তু যেহেতু এবাড়ির একমাত্র ছেলে বিদেশে থাকে, আর ফিরবে না তাই কম দামে ছেড়ে দিচ্ছে। এ বাজারে কুড়ি লাখে এরকম বাড়ি.. বিমল বাবু হাতছাড়া করলে ভুল করবেন, পাশে দাঁড়িয়ে পান চিবোতে চিবোতে পল্টুর প্রচেষ্টা। হাতের ফাইল থেকে বাড়ির কাগজ পত্রের ফটোকপি গুলো বিমলদাকে দিয়ে দেয় পল্টু। এক সপ্তাহ পর সার্চিং করে, সব ঠিকঠাক দেখে, পল্টুকে ফোন করে বিমল বাবু।

 




 

 

এক মাসের মধ্যে পেমেন্ট আর রেজিস্ট্রি হয়। বাড়ির ভেতর আর বাইরেটা রঙ করিয়ে নিয়ে মাস দুয়েক পর পয়লা বৈশাখের শুভদিনে গৃহপ্রবেশ করেন বিমলবাবু, খুব ছোটো করে সত্যনারায়ণের সাথে নিরামিষ ভোজের আয়োজন করেন নিমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য। দুপুর আড়াইটে নাগাদ খাওয়া দাওয়া সেরে একতলার সোফায় বসে আইসক্রিম খেতে খেতে হঠাৎ অসুস্থ বোধ করে পল্টু, সোফাতেই অজ্ঞান হয়ে যায় মুহুর্তে। পাশের বাড়ির নিমন্ত্রিত কর্তাব্যক্তি স্থানীয় ডাক্তারকে খবর দিলে উনি এসে দেখে বলেন পল্টু বেঁচে নেই। গৃহপ্রবেশের দিনেই এরকম অঘটন ঘটায় বিস্মৃত হয় সকলে। কিছু পরে টুম্পা এসে পৌঁছয়। পল্টু কে জড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বার বার বলতে থাকে “আমি তোমাকে এই কাজ করতে বারণ করেছিলাম তো গো বলো”…!!

পল্টুর দেহ সৎকারের পর রাত বারোটা নাগাদ বাড়ি ফেরেন বিমল বাবু। স্নান সেরে খেতে বসলে অর্চনা দেবী জানান পল্টুর দেহ নিয়ে ওরা বেরিয়ে যাবার পর পাড়ার এক সদ্য আলাপ হয়া মাসিমা বলেন যে এই বাড়ির কিছু ইতিহাস আছে তাই এতদিন নাকি এটা বিক্রি হচ্ছিলো না। পল্টু দালালি করেছে এবাড়ির তাই নাকি ভূতে ওর ঘাড় মটকেছে। শেষ পাতের চাটনি টা চেটে খেতে খেতে বিমল বাবু বলেন ওসব হচ্ছে লোকের হিংসে বুঝলে গিন্নি, পল্টুর হাই ব্লাড প্রেসার ছিলো ওর হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। সেদিনের মতো কথা শেষ করে শুতে যায় দুজনেই!

পরদিন দুই ছেলে মেয়ে স্কুল আর বিমল বাবু অফিস চলে গেলে অর্চনা দেবী নিচের ঘরে জিনিস পত্র গোছানোর সময় হঠাৎ খেয়াল করেন কেউ যেন চোখের নিমিষে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেলো। ছুটে গিয়ে ওপরে উঠে দেখলেন কেউ কোত্থাও নেই। উঁকি দিয়ে দেখলেন ছাদের দরজাও বন্ধ। একতলায় নেমে ঘরে ঢুকে অবাক হলেন সকাল থেকে তার গুছোনো জিনিস গুলো ঘরময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। খুব ভয় পেয়ে গিয়ে বিমল বাবুকে ফোন করলেন তিনি কিন্তু বিমল বাবু ফোনটা কেটে দিলেন। ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে টিভি টা চালিয়ে মন টা অন্যদিকে করার চেস্টা করলেন। কিছুক্ষণ পর একটা ঝাঁকুনিতে ঘুম ভাঙলো অর্চনা দেবীর। তাকিয়ে দেখলেন জয়। জয় অর্চনা দেবীর ছেলে। জয় জিগ্গেস করলো নতুন জায়গায় এই ভাবে সদর দরজা খুলে সে ঘুমিয়ে পড়েছে? অবাক হয়ে অর্চনা দেবী মনে মনে ভাবলেন তিনি তো সমস্ত দরজা বন্ধ করে বাড়িতে ছিলেন। একটু পরে মিঠি তারপর বিমল বাবু বাড়ি ফিরলে স্বাভাবিক হন অর্চনা। সেই রাতে একতলার ঘরে শুয়ে বিমল বাবুকে ঘটনাটা বললে বিমল বাবু বলেন নতুন জায়গা আর লোকের মুখে ওইসব ভূতের গল্প শুনে তোমার মতিভ্রম হয়েছে।

 

 




 

 

কথাগুলো বলে পাশ ফিরে শুয়েই চমকে গিয়ে চিৎকার করে ওঠেন বিমল বাবু, অর্চনা তরতরিয়ে উঠে টিউব লাইটটা জ্বালিয়ে দেখেন বিমল বাবু ঘেমে চান! এক গ্লাস জল দিয়ে অর্চনা জিগ্গেস করলে তিনি জানান পাশ ফিরতেই ঠিক খাটের পাশে তার মুখের সামনে একটা বাচ্ছা মেয়ে তার দিকে যেন তাকিয়ে ছিলো অপলক দৃষ্টিতে। নির্বাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছেন এমন সময় হঠাৎ মিঠি আর জয় সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এসে জানায় ছাদের ওপর কিছু একটা আওয়াজ হচ্ছে যেন কেউ দৌড়োচ্ছে। মিঠি এবং জয় দুজনে দুজনের ঘর থেকে আগেই আওয়াজ টা পেয়ে ছাদে গিয়ে দেখে এসেছে কেউ নেই, অথচ ঘরে এসে শুলেই আবার এক আওয়াজ হয়েই চলেছে। এবার ভেঙ্গে পড়েন বিমল বাবু। দেশের জমি বিক্রির টাকা, নিজের সঞ্চয়, তার পরেও তাকে লোন নিতে হয়েছে এই বাড়িটা কিনতে এখন তিনি কি করবেন! আগেই তার খোঁজ খবর নিয়ে কেনা উচিৎ ছিলো, লোভে পরে সস্তায় যে তিনি একটা ভুতুড়ে বাড়ি কিনেছেন নিজের সর্বস্ব খুইয়ে, এটা ভাবতে ভাবতেই কলিং বেলটা বেজে ওঠে, বিমল বাবু আর জয় বারান্দায় বেরিয়ে দেখে কেউ নেই। ভেতরে ঢুকে আসার সময় একটা গন্ধ নাকে আসে বিমল বাবুর, জর্দা পানের গন্ধ! বিমল বাবু বুঝতে পারেন পল্টু ঘোষ এসেছিলো। সেই রাতটা বাড়ির সব আলো জ্বালিয়ে এক ঘরেই কাটান সবাই, শুয়ে শুয়ে বিমল বাবু চিন্তা করতে থাকেন এর একটা বিহিত তিনি করবেন, ভূতের ভয়ে হাল ছাড়বেন না কিছুতেই!

পরদিন অফিসে তার সহকর্মী এবং বন্ধু সুজন বাবুকে সম্পূর্ণ ঘটনার কথা জানালে তিনি তার পরিচিত একজন জ্যোতিষ এবং বাস্তুশাস্ত্রবিদের কাছে নিয়ে যান অফিসের পর। সব শুনে তিনি কিছু হামাদ আর সর্ষে দেন বিমল বাবুকে আর একটা লোহার বড় পেরেক। বাড়ি ফিরে স্নান করে একতলার দালানে বাড়ির সব দরজা জানলা বন্ধ করে একটা ধূণচি তে হামাদ আর সর্ষেটা রেখে ঠিক রাত বারোটায় সময় আগুনে পুড়িয়ে দেবার পর সেই ধোঁয়া সারা বাড়িতে ছড়িয়ে পড়লে লোহার পেরেকটা সদর দরজার চৌকাঠে পুঁতে দিতে বলেন তিনি। কথামতো কাজটি করার সময় নিজের বুকে অদ্ভুত ব্যথা অনুভব করেন বিমল বাবু, পেরেকটা চৌকাঠে পুঁতে দেবার আগেই অচৈতন্য হয়ে পড়েন। অ্যাম্বুলেন্স ডেকে হাসপাতলে নিয়ে গেলে কার্ডিয়াক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ভর্তি করা হয় বিমল বাবুকে।

 




 

 

বিমলবাবু সুস্থ হবার পর ওই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবার সময় পাড়ার কিছু বয়স্ক মানুষের কাছে ওই বাড়ির ইতিহাস জানতে চেয়েছিলো মিঠি আর জয়। ওখানে থাকতেন রমাপদ মোদক আর তার পরিবার। ওনার ভাই উমাপদ এন.আর.আই। দুই ভাইয়ের বনিবনা ছিলোনা কোনোদিন। উল্টে ঝগড়া ছিলো বেশি। ব্যবসায় লসের কারণে বিপুল দেনার দায়ে জড়িয়ে পড়েন রমাপদ। দিনের পর দিন পাওনাদারের বিড়ম্বনায় অতিষ্ট হয়ে, অপমানিত হয়ে, নিজের পরিবারকে বিষ খাইয়ে হত্যা করে নিজেও আত্মঘাতী হন তিনি। কিন্তু শরীর ছেড়ে গেলেও ওদের সকলের আত্মা যে ওই বাড়িতে বিরাজমান সেটা পাড়ার লোকের অজানা নয়।

জয় আমার কর্মজীবনের বন্ধু। ভুবনেশ্বর থেকে এম.বি.এ করে একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে ও এখন সিনিয়র মার্কেটিং ম্যানেজার। বছর পাঁচেক আগে ওর রানীকুঠির ফ্ল্যাটের গৃহপ্রবেশের রাতে ওর মুখেই ঘটনাটা শুনছিলাম। গল্পের আকারে পরিবেশন করলাম আপনাদের কাছে!

বিমল বাবু এখন অবসর নিয়েছেন। মিঠি হায়দ্রাবাদে ডেলয়েটে কর্মরত। আর হ্যাঁ…এবারে ওরা বাস্তুবিদ ডেকে, নিয়ম মেনে, জায়গা জমির ইতিবৃত্তান্ত জেনে তবেই ফ্ল্যাটটা কিনেছে হুইস্কিতে বরফ টা দিতে দিতে জানিয়েছিলো জয়জিৎ সরকার!!!

 

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 2   Average: 4/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।