চঙ্কাদার কম্পিটিশন

চঙ্কাদার কম্পিটিশন

লেখক—ভিক্টর ব্যানার্জী

মাস ছয়েক আগের কথা, পাকুড়তলায় তখন একটা তাসখেলার কম্পিটিশন আয়োজন করা হয়েছে। পাড়ার সব বড়বড় তাসারুরা এসে নাম লিখিয়ে গেছে। তো চঙ্কাদার নামটাও লিখিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন প্রতিযোগিতার আগের দিন বাজারে চঙ্কাদার সাথে নিমাইয়ের দেখা।
তাকে দেখেই নিমাই বলল
—“আরে গুরু, কাল তো তোমার অগ্নিপরীক্ষা!”
সে বলল
—“আমি কি সীতা নাকি বে! ও সব পরীক্ষা টরীক্ষা নয়। যেদিন শুনেছি, ফার্স্ট প্রাইজ কালার টিভি দেবে, সেদিনই বুঝে নিয়েছি ও টিভি আমার। তোরা কেউ ধারের কাছে আসতে পারবি না।”
—“জিও চঙ্কাদা ! এই তো চাই। কাল দেখিয়ে দাও যে, তুমি বাঘের বাচ্চা।”
চঙ্কা এমনিতেই বাঘকে একদম পছন্দ করত না। যার জন্য নিজের বউকেই কোনদিন চিড়িয়াখানায় ঘুরতে নিয়ে যায় নি। বলে নাকি, বাঘের মতো হারামজাদা প্রাণী পৃথিবীতে নেই। 
যাইহোক সে বলল
—“দ্যাখ নিমাই, বাঘের বাচ্চা বলবি না। অন্য যে কোনো প্রাণীর বাচ্চা বল। আমি কিচ্ছু মনে করব না।”
নিমাই এমনিতেই ফোক্কর ছেলে, বলল
—“আচ্ছা ঠিক আছে বাঘ নয়, তুমি প্রমাণ করে দাও যে, তুমি কতবড় কুত্তার বাচ্ছা।”
শুনেই চঙ্কাদা রেগে গিয়ে বলল
—“এই সব চ্যাংরাপনা তোর গুষ্টির পেছনে ঢুকিয়ে দোবো নিমাই।”
ততক্ষণে নিমাই ছুট্টে পালিয়ে গেছে।
চঙ্কাদার মেজাজ গেলো কড়কে। ভেবে নিল নিমাইকে তাসের ময়দানে দেখে নেবে। এদিকে নিমাইও এলাকার বড় তাসারু। তবে ওর কাজই হল চঙ্কাদার পেছনে কাঠি করা। যেহেতু পর পর দুবছর নিমাইকে সেমিফাইনালে হারিয়ে দিয়েছে। সেই রাগে নিমাইও সুযোগ পেলেই চঙ্কাদাকে উত্তপ্ত করে দিয়ে পালিয়ে যায়।
যাইহোক, পরের দিন কম্পিটিশনে এসেই চঙ্কাদার ক্যালমা শুরু হয়ে গেল। হিট থেকে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত প্রত্যেকটা ম্যাচে চঙ্কাদার দুর্দান্ত পারফরমেন্স দেখে মুগ্ধ হয়ে সবাই বলল,‘আজকে টিভিটা চঙ্কার ঘরেই গেল’। অন্যদিকে নিমাইও কম যায় না। সেও হিট থেকে সেমিফাইনাল পর্যন্ত সব খেলা ফাটাফাট্ জিতে গেছে। এখন ফাইনালে এসে নিমাই আর চঙ্কাদা মুখোমুখি।
চঙ্কাদা বলল
—“কাল তো কুত্তার বাচ্চা বলে পালিয়ে গেলি হারামজাদা !”
নিমাই মুচকি হেসে বলল
—“ও তো ইয়ার্কি করলাম। তুমি বাঘের বাচ্চা।”
—“তোকে একবার বলেছি নিমাই, বাঘের বাচ্চা বলবি না।”
—“আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি মানুষের বাচ্চা।”
পাড়ার সবাই গোল করে ওদের ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিল। দেখতে দেখতে খেলা শুরু হয়ে গেল। ফার্স্ট রাউন্ডে চঙ্কাদার অসাধারণ পারফরমেন্স! রাউন্ড জিতে ওর বুকের ছাতি বিয়াল্লিশ ইঞ্চি হয়ে গেছে। এবার শুরু হল সেকেন্ড রাউন্ড, ব্যস্ চঙ্কার ভাগ্যে শনির নাচন শুরু হয়ে গেছে। তাস দেখে সে বিড়বিড় করে বলল
—“কেলো করেচে !”
নিমাইয়ের হাতে তখন তাসের টেক্কা, সাহেব, বিবি সব বড়বড় তাস সাজানো। নিমাই মুচকি মুচকি হাসছে আর বলছে
—“বাঘের বাচ্ছা আজকে গেলো!”
মাইন্ড ব্লোয়িং পারফরমেন্স দিয়ে নিমাই সেকেন্ড রাউন্ড জিতে গেল। চঙ্কাদার ছাতি তখন চুপসে গেছে। লাস্ট রাউন্ড যে জিতবে—সেই ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য চ্যাম্পিয়ন’। এবার নিমাইয়ের হাতে তাসের কার্ড। সে এমন ম্যাজিক্যাল তাস ফাটালো যে, সব কটা ভালো কার্ড নিজের হাতের মুঠোয় করে নিল। চঙ্কার ভাগ্যে জুটেছে যত ফুকো তাসগুলো। ওই তাস দেখে চঙ্কার মুখ খেয়ালখোলা ক্যাবলা ভোলার মতো হয়ে গেলো।
সে বিড়বিড় করে বলল
—“ইস্ টিভিটা হাতছাড়া হয়ে গেলো রে। সাইটটা একদম খারাপ যাচ্ছে।”
যাইহোক, নিমাই একসেলেন্ট খেলে ম্যাচটা জিতে গেলো। নিমাইয়ের ভাগ্যে তখন কালার টিভি ! চঙ্কার ভাগ্যে সেকেন্ড প্রাইজ টেবিল ফ্যান।
নিমাই বলল

—“বাঘের বাচ্চা বাড়ি যাও,
               টেবিল ফ্যানের হাওয়া খাও।”

এই শুনে চঙ্কা রেগে ব্যোম্ হয়ে গেলো। তারপর যা করল, তাতে নিমাইয়ের সমস্ত কষরত একেবারে পুকুরে ডুবে গেলো। প্রাইজের টিভিটা সাজিয়ে রাখা ছিল ক্লাবের টেবিলের ওপর। চঙ্কা খচে মচে রাস্তা থেকে ঢিল ছুঁড়ে মারল টিভির কাঁচে। ফটাং করে আওয়াজ করে কালার টিভির পিকচার টিউব গেলো উড়ে। নিমাই চমকে গিয়ে বলল
—“এ কি সব্বোনাশ করলি রে চঙ্কা !”
চঙ্কাদা তখন টেবিল ফ্যানটা কাঁধে নিয়ে মার দৌড়।
ওই ফাটেলা টিভিটা দেখে পাড়ার সবাই বলল
—“নিমাই রে, এবারেও চঙ্কা জিতে গেলো।”
পরে নাকি ওই টিভিটা নিমাই সারিয়ে ছিল। তবে সারানোর পর কালার টিভিটা ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট হয়ে গেছে।

—————-

২৬ শে বৈশাখ ১৪২৭
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ©ভিক্টর ব্যানার্জী

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 3   Average: 3/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।