জার্সি নম্বর ৯.৫৮

জার্সি নম্বর ৯.৫৮

জার্সি নম্বর ৯.৫৮

– উৎপল দাস

(কাল্পনিক)

 

ন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক থেকে অবসর নিয়েছেন মাত্র ছয়মাস হলো। কিন্তু অবসর কোথায় ! ব্রাজিলের আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক কোচ এর দায়িত্বভার প্রায় জোর করেই চাপিয়ে দেওয়া হলো তাঁর উপর। তাই ব্রাজিলে পারি দিলেন তিনি।

ব্রাজিল ফুটবলে বিখ্যাত, কিন্তু অন্যান্য খেলায় ততটা এগিয়ে নয়। ব্রাজিল সরকার খুব জোর দিয়েছেন এবার এই ব্যাপারটায়।  ব্রাজিলিয়ান অ্যাথলেটিকস কনফেডারেশন মোটা সেলারিতে নিয়োগ করলো তাঁকে। সেখানে অ্যাথলেটিকস এর তেমন পরিকাঠামো নেই। কনফেডারেশনের তত্বাবধানে যেই মাঠটি রয়েছে সেটি খুবই ছোট। উপরন্তু চারদিকে বনজঙ্গলে ঘেরা। অনতি দূরে রয়েছে সমুদ্র সৈকত। আর সেই বনে রয়েছে অগণিত সামুদ্রিক পাখিদের বাস। সারাদিন কিচিরমিচির শব্দে ভরে উঠে মাঠের চারিদিক। এই ছোট্ট মাঠ থেকে কি আন্তর্জাতিক স্তরের খেলোয়াড় তৈরি করা যাবে? কিন্তু করতেই তো হবে। যার জন্য এতো দূর আসা। প্র্যাক্টিস সেশনে আজকে মাত্র চারজন এলো। কথা ছিলো প্রায় ২৯ জন আসবে। বাল্ক এবসেন্সও একটা ব্যাপার এই ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ার, তিনি সেটা বুঝতে পারলেন। তবুও শুরু হলো চারজনকে দিয়েই। প্রথমেই ওয়ার্ম আপ তারপর স্ট্রেচিং ও পরে কার্ডিয়াক, জগিং, রানিং ইত্যাদি ইত্যাদি। তিনি অ্যাথলেটিকস কনফেডারেশন কে এতো বড় মাপের অনুপস্থিতির খবর জানাতেই সাড়া পড়লো। প্রতিটি খেলোয়াড়কে সতর্ক করে দেওয়া হলো। কিন্তু পরদিনও সেই একই অবস্থা। আজকে মাত্র ৯ জন, এর মধ্যে গতকালকের একজন আসেনি। তিনি খুবই মর্মাহত হলেন। এতো অপেশাধারী হলে কীকরে হবে? দেশকে মেডেল এনে দেওয়া কি চাট্টিখানি ব্যাপার !!!

 





 

আজকের মতো প্র্যাক্টিস শেষ হলো। সবাই চলে গেলে তিনি একটু রানিং এ যান। আজ পাশের জঙ্গলের পায়ে চলা সরু পথেই দৌড় লাগালেন। পাঁচ-ছয় কিলোমিটার পথ এগিয়ে গেলেন জঙ্গলের পথে। কিছুক্ষনের মধ্যেই পৌঁছে গেলেন সমুদ্র সৈকতে। সূর্যের কিরণে চিক চিক করছে ব্রাজিলের সমুদ্র তটের সোনালী বালি। আরও কিছুক্ষন এগিয়ে দেখলেন কুড়ি পঁচিশ জন ছেলে পুলে মিলে ফুটবল খেলছে সমুদ্র সৈকতে। দৌড়ে এগিয়ে গেলেন তিনি সৈকতের দিকে। কিন্তু গিয়ে দেখেন যে ওই এথলেটরা, যারা গত দুদিন ধরে প্র্যাক্টিস সেশন ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছে। কিছুই বলেননি তিনি। খেলোয়াড়রা কিছুক্ষন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে আবারো ফুটবল খেলা শুরু করে দিলো। তিনি আবার সেই জঙ্গলের পথেই ফিরে চললেন।

জঙ্গলের প্রায় মাঝামাঝি এসেই দেখেন একটি ছয় সাত বছরের ছোট্ট ছেলে গাছের শুকনো ডাল পালা মাথায় করে জঙ্গলের পথ ধরে এগিয়ে আসছে। ছেলেটির গায়ে ছেড়া ময়লা শার্ট। পরনে পুরোনো ফাটা হাফ পেন্ট। খালি পায়ে ধুলাবালি মাখা। তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন।
ছেলেটি কাছে এগিয়ে আসতেই তিনি একটু সরে রাস্তা দিলেন। ছেলেটি তাঁকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো।

পরদিন ভোরে মাঠে প্রায় ১৩ জনের উপস্থিতি। এভাবে কনফেডারেশনের কথাকে উপেক্ষা করা খেলোয়াড়দের কথা ভেবে তিনি চিন্তায় পড়ে গেলেন। এভাবে মেডেল তো দূরের কথা প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে কোয়ালিফাই-ই করবে না কেউ। কিন্তু খেলোয়াড়দের উপস্থিতির ব্যাপারটা দেখা কনফেডারেশনের দায়িত্ব। তিনি শুধু প্রতিদিনের প্র্যাক্টিসই করিয়ে যাচ্ছেন।

আজ প্র্যাক্টিস চলাকালীন গতকালের সেই ছোট্ট ছেলেটিকে মাঠের বাউন্ডারি বরারব শুকনো ডালপালা কুঁড়াতে দেখতে পেলেন তিনি। আজকের মতো প্র্যাক্টিস শেষ করে তিনি রানিং এর জন্য বেরিয়ে পড়লেন। আজও সেই  জঙ্গলের পথ হয়েই সমুদ্রতট পর্যন্ত যাবেন তিনি। জঙ্গলের ভেতরে কিছুক্ষন এগিয়ে গিয়েই প্রত্যাশিত ভাবে সেই ছেলেটিকে আবারও দেখতে পেলেন। ওকে দেখে তাঁর খুবই মায়া হলো আজ।
তিনি ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হ্যালো, তোমার নাম কি?”
— আমার নাম সিপ্রিয়ানো।
— তুমি রোজই আসো এই দিকে?
— হ্যাঁ, আমি রোজ শুকনো ডাল পালা কুঁড়াতে আসি। এগুলো কুঁড়িয়ে নিয়ে গেলে তবেই মা রান্না করতে পারবে। আমার বাবা নেই। আমি, মা আর আমার ছোট্ট বোন আছে।
— ওহো… তা তুমি খেলতে ভালোবাসো না?
— হ্যাঁ, খুব ইচ্ছে হয় খেলতে, কিন্তু…
— কিন্তু… কি?
— আমি তো গরিব। আমার ভালো কাপড় নেই, জুতো নেই। কেউই তাই খেলায় নেয়না।
— আমি খেলায় নেবো। খেলবে তুমি? খেলার কাপড়, জুতো সবই দেবো।
সিপ্রিয়ানো অনেক্ষন ধরে চুপ করে রইলো। মাথা থেকে শুকনো ডাল পালার বোঝাটি মাটিতে রেখে বললো, “হ্যাঁ স্যার, আমি খেলবো”
— ঠিক আছে, আমি ঐ মাঠে রোজ সকাল ছয়টায় আসি। তোমার জন্য ভোর পাঁচটায় আসবো। তুমি আসবে তো? আমি কাপড় জামা আর জুতো এনে রাখবো তোমার জন্য।
সিপ্রিয়ানো খুব খুশি হলো আর হাত জোর করে প্রণাম করে বললো, “ঠিক আছে স্যার, আমি কালকে ভোরে আসবো”
তিঁনি সিপ্রিয়ানোর হাতে ১০০ (ব্রাজিলিয়ান মুদ্রা) ব্রাজিলিয়ান রিয়েল দিয়ে বললেন, “যাও, এই ১০০ রিয়েল দিয়ে মা ও বোনের জন্য খাবার কিনে নিয়ে যেও।”
এইকথা বলেই তিনি ডাল পালার বোঝাটি সিপ্রিয়ানোর মাথায় তুলে দিয়ে বিদায় নিলেন।

পরদিন ভোর পাঁচটা। তিনি মাঠে এসে সিপ্রিয়ানোর জন্য অপেক্ষা করছেন। কিছুক্ষনের মধ্যেই সিপ্রিয়ানো এলো। মাঠের বাউন্ডারির কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে খুব সহজেই ঢুকে গেলো সে। ওকে দেখেই তিনি বললেন, “ওয়েলকাম সিপ্রিয়ানো, ভেরি গুডমর্নিং”
— সে হাসিমুখে হাত জোর করে প্রণাম করে বললো, “গুডমর্নিং স্যার”
— এই নাও তোমার নতুন পোশাক আর জুতো। যাও ওই ছোট্ট ঘরটায় গিয়ে পড়ে নাও। এক্ষুনি… ফাস্ট ফাস্ট…
সিপ্রিয়ানো আদেশ পালন করতে দেরি করে নি। তৎক্ষণাৎ সেগুলো পড়ে কোচের সামনে এসে দাঁড়ালো। কী মিষ্টি লাগছে এই সাত বছরের ছোট্ট সিপ্রিয়ানোকে। একদম যেন প্রফেশনাল এথলেট! শুরু হলো ওয়ার্মিং আপ, স্ট্রেচিং, কার্ডিয়াক, ফ্রি হ্যান্ড। সব কটাতেই দুর্দান্ত ডেডিকেশন সিপ্রিয়ানোর। তিনি লক্ষ্য করলেন, সিপ্রিয়ানোর অপার কার্ডিয়াক ক্ষমতা, একঘন্টা টানা প্র্যাক্টিস করেও মোটেও পরিশ্রান্ত হয়নি সে। প্র্যাক্টিস শেষে ওকে দুধ ও পাউরুটি খেতে দিলেন তিনি। অত্যন্ত স্নেহভরে পিঠে হাত বুলিয়ে তিনি বললেন, “তুমি একদিন পৃথিবী বিখ্যাত এথলেট হবে, এটা আমার বিশ্বাস।”
খুব খুশি হলো সে। আজ বিদায় নিলো সিপ্রিয়ানো। বাকি এথলেটরা মাঠে পৌঁছে গেছে। ওদের নিয়ে শুরু হলো আবার প্র্যাক্টিস।

 




 

 

এমনি করে কেটে গেলো ছয়মাস। সিপ্রিয়ানোর অপার কার্ডিয়াক ক্ষমতা। ১০০ মিটার ও ২০০ মিটার দৌড়ে খুবই ভালো পারফর্মেন্স ওর। টানা একঘন্টা দৌড়েও তেমন পরিশ্রান্ত হয় না সে। ইতিমধ্যেই ব্রাজিলিয়ান অ্যাথলেটিকস কনফেডারেশনের নজর কেড়েছে সিপ্রিয়ানো।

রোজ প্র্যাক্টিস শেষে একসাথে ব্রেকফাস্ট করেন তিনি তাঁর প্রিয় জুনিয়র এথলেট সিপ্রিয়ানোর সাথে। ধীরে ধীরে খুব ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছে দুজনে। একদিন তিনি সিপ্রিয়ানো কে বললেন, “তোমার জীবনের স্বপ্ন কি?”
— স্যার, আমার স্বপ্ন হলো আমার সবচেয়ে প্রিয় এথলেট এর সই করা টিশার্ট জার্সি আর রানিং সু যেন আমি জয় করতে পারি।
— আচ্ছা, কে তোমার প্রিয় এথলেট?
— স্যার, আমার প্রিয় এথলেট হলেন উসেইন বোল্ট। আমি উনাকে দেখিনি, তবে রেডিওতে শুনেছি যে তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুতগামী মানুষ।
— তুমি তাঁকে দেখোনি?
— না স্যার, আমার বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। সেই সামর্থ্যও নেই। মোবাইল বা টিভি কিছুই নেই। তাই আমার বাবার পুরোনো রেডিওটা তে উসেইন বোল্টের ব্যাপারে শুনেছি। আমিও উঁনার মতোই একজন বিখ্যাত দৌড়বিদ হতে চাই।
— হ্যাঁ, তুমি নিশ্চই পারবে। সামনের বছর এই কনফেডারেশনে নতুন এথলেট এর সিলেকশন হবে। তোমার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স সিলেক্টররা দেখেছে। তারা কিন্তু খুবই ইম্প্রেশড। তোমাকে সহজেই নিয়ে নেবেন। তখন তুমি খেলার পোষাক জুতো ইত্যাদি সবই পাবে এখান থেকে। তুমি নিশ্চই পারবে।

এভাবে কেটে গেলো আরও ছয়মাস। সিপ্রিয়ানোকে তিনি বলেন, ‘সিপ্রিয়ানো: দা ইউনিট অফ স্পীড’। খুব খুশি হয় সে। আরও মনোবল বাড়ে সিপ্রিয়ানোর। দিনে দিনে সে হয়ে উঠে ব্রাজিলের সর্বকনিষ্ঠ সেরা দৌড়বিদ এথলেট।

একবছরের কন্ট্রাক্ট শেষ হলো আজ। আজই সন্ধ্যার ফ্লাইটে তিনি দেশে ফিরে যাবেন। আজকে তিনি শেষ বারের মতো সিপ্রিয়ানোকে প্র্যাক্টিস করালেন। তিনি ওকে বলতে পারেন নি যে কাল থেকে ওদের দুজনের আর দেখা হবেনা। তিনি খুবই আবেগপ্রবন ও সংবেদনশীল মানুষ। কোনোরকমে নিজের আবেগকে সামলেছেন আজ। দুজনে একসাথে ব্রেকফাস্ট করলেন। সিপ্রিয়ানো ফিরে যাওয়ার আগে তিনি তাকে ১০০০ রিয়েল দিলেন। বললেন এটি একটি গিফ্ট। হাতে গিফ্ট পেয়ে সিপ্রিয়ানো পায়ে ধরে প্রণাম করলো তার প্রিয় কোচকে। তিনি ওকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বললেন, “আমার আশীর্বাদ সদা তোমার পাশে থাকবে। একদিন তোমার স্বপ্ন সফল হবেই। ভালো থেকো সিপ্রিয়ানো।”
আবার আগামীকাল আসবে কথা দিয়ে বিদায় নিলো সিপ্রিয়ানো।
সন্ধ্যার ফ্লাইটে দেশে ফিরে গেলেন তিনি।

 

 




 

 

পরদিন সিপ্রিয়ানো ভোর পাঁচটায় মাঠে এসে দেখে অন্য আরেকজন কোচ। সে কিছুই বুঝতে পারছেনা। স্যার কি খুব অসুস্থ? সে খুবই চিন্তিত। নতুন কোচ বললেন, “হারি আপ সিপ্রিয়ানো…. কাম অন… স্টার্ট জগিং…. ফাস্ট ফাস্ট…. ”
— ইয়েস স্যার।
বলেই শুরু করে দিলো সে তার রোজকার প্র্যাক্টিস। একঘন্টা লাগাতর রানিং, জগিং স্ট্রেচিং আর ফ্রি হ্যান্ড সেরে নতুন কোচের সাথে ব্রেকফাস্ট করলো ঠিক সেই ভাবেই। সিপ্রিয়ানো ফিরে যাওয়ার আগে নতুন কোচ বললেন, “সিপ্রিয়ানো, তোমার সিলেকশন হয়ে গেছে। কাল থেকে তুমি সকাল ছয়টায় আসবে। সবার সাথে প্র্যাক্টিস করবে কেমন? ”
— থ্যাংক ইউ স্যার।
— শোনো, তোমার জন্য একটি গিফ্ট আছে।
— কি গিফ্ট স্যার?
— এই দেখো, গিফ্ট বক্সটা। খুলে দেখো কি আছে তাতে।
সিপ্রিয়ানো খুবই যত্ন করে গিফ্ট প্যাকেটটি খুললো। ভেতরে যা পেলো তা দেখে সে নিজের চোখকে যেন বিশ্বাসই করতে পারছেনা। ভেতরে ছিলো একটি টিশার্ট জার্সি যার নম্বর হলো ৯.৫৮ ও একজোড়া রানিং সু, যাতে সই করা আছে উসেইন বোল্টের। সাথে পেলো একটি চিঠি। চিঠিটিতে লেখা ছিলো,

“বেস্ট অফ লাক সিপ্রিয়ানো, ইউ আর দা ইউনিট অফ স্পীড”

ইউর ফ্রেন্ড,
উসেইন বোল্ট

চিঠির খাম থেকে হঠাৎই একটি ছবি মাঠে পড়লো। সিপ্রিয়ানো ছবিটি হাতে নিয়ে দেখলো যে ছবিটি হলো তার প্ৰিয় কোচের, যার নিচে সই করা আছে ‘উসেইন বোল্ট’।
নতুন কোচ বললেন, “তুমি খুবই ভাগ্যবান সিপ্রিয়ানো, যে তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুতগামী মানুষটির বন্ধু। তিনিই সেই উসেইন বোল্ট যিনি ২০০৯ সনে ১০০ মিটারের দৌড় প্রতিযোগিতা মাত্র ৯.৫৮ সেকেন্ডে শেষ করে বিশ্বরেকর্ড করেছিলেন।”
অশ্রুসজল চোখে সিপ্রিয়ানোর বুক গর্বে ফুলে উঠলো।

 




গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 1   Average: 5/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।