জীবাশ্ম

জীবাশ্ম

গল্প ——— জীবাশ্ম

লেখক ——- কৃষ্ণ গুপ্ত

 

দীর জলের কুল কুল শব্দে আর পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা হিম শীতল বাতাসে সকালের প্রকৃতি টা শ্যামসুন্দর বাবুর কাছে যেন স্বর্গসম লাগছিল। শ্যামসুন্দর বাবু মানে বিখ্যাত আর্কিওলজিস্ট শ্যামসুন্দর মুখোপাধ্যায়।
কুলি কাম বেয়াড়া পাসাং চা টা এনে দিতেই শরীর আর মন ফুরফুরে হয়ে উঠল।
চা টা খেয়ে তাঁবু থেকে নদীর পাড় বরাবর বেশ কিছু টা এগিয়ে গেল শ্যামসুন্দর। নদীর নাম ‘রোয়িং’। অরুণাচল প্রদেশের বিখ্যাত নদী।
এই নদী থেকে কিছু দূরেই ঐতিহাসিক ‘ভীষ্মকনগর ফোর্ট’। যেখানে 1969 থেকে 1973 সাল অবধি টানা খনন কাজ চালান হয়। যদিও ফোর্ট টি আবিষ্কার ছাড়া আর ‘চুটিয়া’ রাজবংশের কিছু ইতিহাস ছাড়া আর কিছু জানা সম্ভব হয় নি। ঐতিহাসিক নিদর্শন থেকে যে টুকু জানা যায়, চুটিয়া রাজ গৌরিনারায়ণ 800 খ্রীষ্টাব্দে এই ফোর্ট টি নির্মাণ করেন। পরে 1200 খ্রীষ্টাব্দে ফোর্ট টি রিপেয়ার করেন লক্ষ্মীনারায়ণ। যদিও আবিষ্কারের সময় একটা ধ্বংস স্তূপ ছাড়া আর কিছু ছিল না।
তার বাবা ঐ খননকারী দলের একজন সদস্য ছিল। তাই বহু বছর ধরে একটা নষ্টালজিয়া ওনার মধ্যে কাজ করত। ছাত্র জীবনের সময় বাবার সঙ্গে বহু বার এই অঞ্চলের আশেপাশে এসেছে। বার বার ই ওর মনে হত, যে চীন সীমান্তের এই দুর্গম অংশ টার অনেক লুকানো রহস্য আছে। যা হয়তো লোক চক্ষুর আড়ালেই থাকবে চিরকাল।
ওর কপাল ভাল এই দুর্গম স্থান নিয়ে সরকারের সদিচ্ছা হওয়া তে আবার নতুন করে খনন কাজ শুরু হয়েছে। কালেচক্রে যার লীডার উনি।

কতক্ষণ ওভাবে নদীর পাড়ে বসেছিলেন জানেন না। হঠাৎ পরিচিত ডাকে পিছন ফিরলেন। দেখলেন সার্ভে ইনেস্পেক্টার জীতেন শইকিয়া দাঁড়িয়ে আছে।
— স্যার গাড়ি রেডি। ব্রেকফার্স্ট টা কি গাড়িতেই করে নেবেন?
— অসুবিধা নেই। চলুন যাওয়া যাক।
ওরা দুজনে একটা ছোট গাড়ি তে উঠতেই গাড়ি ছেড়ে দিল। তারপর আধ ঘণ্টার মধ্যেই একটা বড় পাহাড়ের নিচে এসে দাঁড়াল। এখান থেকে ট্রেক রুট প্রায় আধ ঘণ্টার। পুরো জায়গা টা ছোট, বড় টিলা আর ঝোপ ঝাড়ে ভর্তি। ট্রেক রুটে শুরু থেকেই সঙ্গে দু জন বন্দুক ধারী গার্ড রয়েছে। কারণ দু ধারে ঘন জঙ্গল। দিনে দুপুরে ও বাঘ, লেপার্ডের দেখা মিলতে পারে।

ওরা যখন ঝোপ, ঝাড় ভেদ করে একটা বড় গুহার কাছে গিয়ে থামল। তখন গলদ ঘর্ম অবস্হা। দু জনেই জ্যাকেট খুলে রাখল। এটা একটা বিশাল গুহা। এখানে ই কিছু গুহা চিত্র পাওয়া যাওয়াতেই মনে হচ্ছে বহু পুরানো কোন সভ্যতা লুকিয়ে থাকতে পারে।

 




 

 

প্রায় জনা দশেক লেবার মাটি খুঁড়ছে। ওদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আর একজন আর্কিওলজিস্ট শিরিন পোংতে। উনি অরুণাচল প্রদেশের ই মানুষ।
ছোট, বড় পাথর টপকে ভিতরে যেতেই হাসি মুখে বেড়িয়ে এলেন। — বহুত সারে চিজ মিলা হ্যায়, মিস্টার মুখার্জী। — কথা টা বলেই তিনি ইশারা করলেন।
শ্যামসুন্দর বাবু তাকিয়ে দেখলেন, নব্য প্রস্তর যুগের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিস উদ্ধার করা হয়েছে। এগুলো সবই ল্যাবরোটরি তে যাবে পরীক্ষার জন্য। সেখানে তিনিই এগুলোর বয়স নির্ণয় করবেন।
তিনি কয়েক টা জিনিস খুঁটিয়ে দেখে আশপাশে একটু হাঁটতে লাগলেন। এখানে ঝোপ, ঝাড় এত টাই ঘন, যে চলতে ফিরতেও অসুবিধা হচ্ছে। তবে ওনার জহুরীর চোখ বলে দিচ্ছে এখানে এক সময় কোন সভ্যতা ছিল।
বেশ কিছুক্ষন ঘুরে দেখার পর এক সময় একটা লম্বা বড় চেটালো পাথর দেখে তার উপর বসলেন। রোদ টাও বেশ উঠেছে। এটা মে মাস। তাই গরম টা এখন ভালই লাগছে। সকালের নদীর পাড়ের মত বাতাশের শিরশিরানি টা আর নেই। গুহার পাশে যথেষ্ট গরম। তাই তিনি এখন একটু বিশ্রাম করে নেওয়া ঠিক করলেন। আশেপাশে একই রকম প্রচুর পাথর পড়ে আছে। প্রত্যেক টাই প্রায় একরকম। সচরাচর এরকম লম্বা চ্যাটালো পাথর দেখা যায় না।
গুহা কে নিয়ে জায়গাটা এতটাই সুন্দর, যে নিজেকে বুড়ো বয়সে বেশ রোমান্টিক লাগল শ্যামসুন্দর বাবুর। পকেট থেকে একটা সিগারেট ধরালেন। একটু দূরেই মিস্টার শইকিয়া একই রকম একটা পাথরে কিছু একটা পরীক্ষা করছেন। এমন সময় শ্যামসুন্দর বাবুর মনে হল, পাথর টা যেন কেমন কেঁপে উঠল। প্রথম বার টা তার মনের ভুল মনে হল। দ্বিতীয় বার কাঁপতেই চিন্তিত মুখে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর শইকিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, — কিছু অনুভব করছেন মিস্টার শইকিয়া?
মাটি টা কাঁপছে না কি?
জীতেন শইকিয়া ও একটু উদ্বিগ্ন হলেন যেন। — স্যার মনে হয় ভূকম্পন! এখন ই ওদের গুহা থেকে বেড়িয়ে আসতে বলি।
— হ্যাঁ, হ্যাঁ বলুন। — শ্যামসুন্দর বাবু ও হাতের সিগারেট ফেলে ত্রস্ত হাতে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর কিছু একটা দেখে হঠাৎ শইকিয়াকে মোবাইল বাড় করে শ্রমিক দের ফোন করার আগেই থামালেন।
তারপর হাতের ইশারা তে কাছে ডাকলেন।
মুখে চোখে কৌতূহল নিয়ে শইকিয়া ধীর পায়ে এগিয়ে এল।
— গত কাল সামান্য বৃষ্টি হয়েছিল। মাটির গর্ত গুলো তে জল জমে আছে এখন ও। ভূকম্পন হলে তা নড়ত।

সেটা বুঝতে পেরে শইকিয়া মাথা দুলিয়ে সমর্থন করে বলল, — তবে?
— এখানে একটু কান পাতুন। কিছু টের পাচ্ছেন?
শ্যামসুন্দর বাবুর কথায় শইকিয়া পাথরের বুকে কান পেতে চমকে গেল যেন।
— একটা শব্দ আসছে ভেতর থেকে!
— হুম, ঠিক তাই। শ্রমিক দের দু জন কে অন্তত ডাকুন। খুব সাবধানে এই পাথরের আস্তরণ টা হালকা করতে হবে। আমার মনে হয় আমরা বিশাল কিছু একটা পেতে চলেছি।

কিছুক্ষনের মধ্যে ই দু জন শ্রমিক অতি সাবধানে পাথরের স্তর কাটতে থাকল।
ঐখান কার একই রকম যে পাথর গুলো আছে, তার মধ্যে ও একই রকম শব্দ অনুভব করা গেল। তাই শ্যামসুন্দর বাবুর নির্দেশে গুহা তে খনন রত বাকি শ্রমিক রাও পাথর কাটার কাজে চলে এল।

প্রায় সন্ধ্যের কিছু আগে প্রথম পাথর টা থেকে যা বেড়িয়ে এল, তা রীতিমত অবাক করার মত। একটা জীবাশ্ম! যদিও তখনও তার প্রায় পুরো শরীরই পাথরের আড়ালে ছিল। হাতে সময় নেই বলে সেদিনের কাজ স্বগিত রাখতে হল।
ওটা আবিষ্কৃত হতেই শ্যামসুন্দর বাবু শিশুর মতন উচ্ছ্বল হয়ে উঠলেন। পকেট থেকে দু হাজার টাকা বার করে শ্রমিক দের বিতরন করে দিলেন। তারপর বলে দিলেন, এটা কে যেন তাঁবু তে নিয়ে আসা হয়। ল্যাবরোটারি তে যাবার আগে তিনি প্রাথমিক অনুসন্ধান করতে চান। সেদিন কার খনন কাজ শেষ করে সবাই তাই তাঁবুর উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
সন্ধ্যা বেলা জমজমাট পার্টি শুরু হল নদীর পারে। কিন্তু পার্টির খরচ যিনি দিলেন, সেই শ্যামসুন্দর বাবু ই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে গেলেন। উনি অ্যাজমা পেশেন্ট। আজ ঠাণ্ডা -গরমে টান টা বেড়েছে। তা ওনার এই অবস্হা দেখে পোংতে সাহেব এসে জানালেন, — মিস্টার মুখার্জী, আগার আপকা কোই প্রবলেম নেহি হ্যায়, তো ইয়ে ফসিল কা প্রাইমারী টেস্ট ম্যায় করসাক্তা হু।
শ্যামসুন্দর বাবু হাত তুলে সমর্থন করলেন। কারণ আজ একটু তাড়াতাড়ি ই শুয়ে পড়তে চান উনি।

 




 

রাত এখন প্রায় বারোটা। মোট 9 টা তাঁবু তে 18 জনের বড় টিম। এর মধ্যে কিচেন স্টাফ, গাড়ি চালক থেকে শুরু করে শ্রমিক, ফরেস্ট গার্ড আর আধিকারিক রাও আছেন।
ডিনার শেষ করে বাইরে চাঁদের আলোয় ড্রিঙ্ক করছিলেন পোংতে। স্হানীয় বলে এখান কার সব কিছু তার হাতের তালুর মতন পরিচিত।
ফসিল টাকে তার তাঁবু তেই রাখা হয়েছে। তাই ইচ্ছে হল শুয়ে পড়ার আগে একবার ওটাকে পরখ করবেন।
তাঁবুতে একটা করে ব্যাটারী চালিত চার্জার ঝোলানো রয়েছে। কিন্তু এই বস্তু টিকে দেখতে গেলে জোরালো আলো দরকার। তাই ঘরে ঢুকে মোবাইল এর আলো জ্বেলে তিনি ফসিল টার দিকে এগিয়ে গেলেন। কিন্তু ফসিল টা কোথায় গেল?
এখানেই তো একটা ত্রিপলের উপর শোয়ানো ছিল ওটা!
তাহলে কি অন্য কোন তাঁবু তে ওকে না জানিয়ে রাখা হয়েছে?
হঠাৎ পিছনে একটা অস্পষ্ট আওয়াজ কানে আস্তে পিছন ফিরলেন। তার পর একটা প্রাণঘাতি চিৎকার করে মুখ থুবরে পড়লেন। আর উঠলেন না।
হৈ হট্টগোল শুনে অসুস্থ শরীর নিয়েই শ্যামসুন্দর বাবু ছুটে এলেন। ছুটে এল ইউনিটের বাকি সবাই ও।
তাঁবুতে বিছানার নিচে জীবাশ্মর পাথর চাপা পড়ে নিথর হয়ে আছে পোংতে সাহেব। এত ভাড়ি পাথর বুকে চাপা পড়াতে পোংতে সাহেব মারা গেছেন বলে শ্যামসুন্দর বাবুর ধারণা। কিন্তু পাথর টা তো রাখাছিল মেঝেতে। ওটা কি করে পোংতে সাহেবের বুকে এসে পড়ল?
কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শী না থাকায় এ যাত্রায় সঠিক তথ্য পাওয়া সম্ভব না।
পরদিন সকালে পোংতে সাহেবের বডি পোস্টমর্টেমের জন্য পাঠিয়ে শ্যামসুন্দর বাবু ঠিক করলেন, তিনি আজ বিশ্রাম নেবেন। পাসাং ছাড়াও একজন শ্রমিক থাকবে ওনার সঙ্গে ঐ জীবাশ্ম টাকে আরও হাল্কা করার জন্য। আর প্রাথমিক পরীক্ষার বিষয় টি আজকেই শেষ করতে চান উনি।
সেই মতন তিন জন কে রেখে বাকি টিম টা শইকিয়ার নেতৃত্বে গুহা অভিমুখে চলে গেল।
দুপুর বারোটার মধ্যে ই শরীরের অনেক টা অংশ কে পাষাণ মুক্ত করা গেল। সেটা দেখে শ্যামসুন্দর বাবু বেশ খুশি হলেন। কম করে কয়েক সহস্র বছর আগেকার কোন যোদ্ধার জীবাশ্ম। পুরো শরীর টা পরিষ্কার হলে বাকি বিষয়ে জানা যাবে। তিনি নিশ্চিন্তে লাঞ্চ শেষ করে নিজের তাঁবুতে এসে বিশ্রাম নিলেন। আবিষ্কারের নেশাতে শরীর আর মন দুটোই আজ ভাল তার।

শ্রমিক টি একমনে নদীর পাশে পাথর পরিষ্কারের কাজ করছিল। হঠাৎ দুপুর তিনটে নাগাদ একটা আর্ত চিৎকার শুনে পাসাং নদীর পারে ছুটে গিয়ে দেখল ঐ শ্রমিক টি উপুর হয়ে নদীর জলে পড়ে আছে। মাথা টা যেন কেউ পাথর দিয়ে ফাটিয়ে চৌচির করে দিয়েছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে চার দিক।
পাসাং বিভ্রান্ত হয়ে দৌড়ে গিয়ে শ্যামসুন্দর বাবু কে ধরে নিয়ে এল। দু জনে ধরা ধরি করে যখন শ্রমিক টি কে ডাঙায় তুলল, ততক্ষণে তার শেষ সময় উপস্থিত। কোন রকমে নদীর পাড়ের জঙ্গলের দিকে ডান হাতের তর্জনী দেখিয়ে সে চোখ বুঝল।
কিছু মুহূর্ত নীরব থাকার পর শ্যামসুন্দর বাবু চেঁচিয়ে উঠলেন, — আরে একে কে এভাবে মারল আর ফসিল টাই বা কোথায়?
ওর কথায় পাসাং ও আশ্চর্য হয়ে গেল। যত দূর চোখ যায়, শুধু নদীর পাড়ের বিস্তৃত বালি, পাথর। কুল কুল শব্দে প্রবাহমান রোয়িং, আর দূরে হাতছানি দেওয়া ঘন পাহাড় আর অরণ্য। কিন্তু কোথাও ফসিল টা নেই!
— আশ্চর্য! ওটা কি ভোজবাজির মতন উবে গেল, না কেই নিয়ে গেল চুরি করে?
এই শ্রমিক টা কেই বা কে হত্যা করল?
শ্যামসুন্দর বাবু পাগলের মতন ছোটাছুটি করতে লাগল। এত বড় আবিষ্কার টা কি শেষ অবধি লোক চক্ষুর আড়ালেই থেকে যাবে?
না, এই উত্তর ওদের কাছে নেই। উত্তেজনায় শ্যামসুন্দর বাবু বেশ একটু অসুস্থ বোধ করাতে পাসাং ওনাকে নিয়ে তাঁবু তে ফেরত এল।

ওদিকে গুহার অদূরে শ্রমিক দের মধ্যে তখন উৎসাহ বেড়ে যেতে লাগল। যে চ্যাটালো পাথর গুলো কে জীবাশ্ম সন্দেহে কাটিং করা হচ্ছিল। তা সত্যিই তাই। জীতেন সইকিয়ার মনে হল, কয়েক হাজার বছর আগের কোন এক প্রাকৃতিক দূর্যোগে এক সঙ্গে বহু সৈন্য সে বার মারা গেছিল। কালের গর্ভে মৃতদেহ গুলো বছরের পর বছর ধরে থাকতে থাকতে পাললিক শিলার চাপে ক্রমশ পাথর হয়ে গেছে।
আবিষ্কারের নেশাতে শ্রমিক রা বিশ্রাম হীন ভাবে এক টানা কাজ করে চলেছে। এরা খুব পরিশ্রমী। একের পর এক জীবাশ্মের শরীর প্রাথমিক ভাবে পাষাণ মুক্ত হচ্ছে। আর শ্রমিক রা উল্লাসে ফেটে পড়ছে।
শব গুলির চেহাড়া দেখে শইকিয়ার মনে হল এরা সবাই চৈনিক। চোখ গুলো ছোট ছোট। মুখে মঙ্গোলিয় ছাপ স্পষ্ট। ইতিহাস সাক্ষী থেকেছে কিভাবে চেঙ্গিজ খাঁ র মতন চৈনিক বহিরাগতরা ক্রমশ ভারত বর্ষে আক্রমণ করে গেছে। সেই গুপ্ত প্রক্রিয়া এখন ও বন্ধ হয় নি। এখন ও কাগজ পড়লে বোঝা যায় লাদাখ, সিকিম আর অরুণাচল প্রদেশের বিভিন্ন প্রান্ত দিয়ে তারা ভারতের উপর কিভাবে নজর দারী আর দখল দারী চালাচ্ছে।

শইকিয়া একটা পাথরের উপর বসে কতক্ষণ এসব কথা ভাবছিল জানে না। হঠাৎ মেঘ করে আকাশ কাল হয়ে বিদ্যুৎ চমকাতে দেখে তিনি লাঞ্চ ব্রেক ঘোষণা করলেন। শ্রমিক রা সবাই যে যার মতন গুহা তে ফিরতে শুরু করল।
শইকিয়া নিজেও দ্রুত লাঞ্চ শেষ করল। তার পর গুহার চিত্র গুলো নিবিষ্ট চিত্তে পরীক্ষা করতে শুরু করল।

ইতিমধ্যে প্রবল ঝড় শুরু হল। চারদিকে ধুলোয় ভরে গেল।
এত ভয়ঙ্কর ধুলি ঝড় আগে কখনো দেখেনি শইকিয়া। সেই সঙ্গে ভয়ঙ্কর মেঘের গর্জন। একটু পর শুরু হল বৃষ্টি। বাতাসের বাষ্প কনা তে ধোঁয়াশা হয়ে গুহার ভিতর টা গাড় অন্ধকারে পরিণত হল।
জলের হাত থেকে বাঁচতে মোবাইল জ্বালিয়ে আরও ভিতরে ঢুকতে গেল শইকিয়া। গুহার অনেক টা ভিতরে বৃষ্টির জল ঢুকতে পারবে না।
কিন্তু একি! শ্রমিক রা সবাই ভয়ে এদিক ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছে কেন?
কারোর সাথে ধাক্কা খেয়ে শইকিয়া সাহেবের চশমা টা পড়ে ভেঙে গেল। মোবাইল এর অপ্রতুল আলো তে শইকিয়া যা দেখলেন, তাতে তার বাক্ শক্তি লোপ পেল। কাতারে কাতারে পাথুরে চেহারা তে চৈনিক সৈন্যরা (জীবাশ্ম) গুহা তে আক্রমণ করেছে। তাদের হাতে সব তামা আর পাথরের অস্ত্র!
শইকিয়া সাহেবের একবার মনে হল, উনি দিবা স্বপ্ন দেখছেন। কিন্তু পর ক্ষণেই পাথরের আঘাতে এক শ্রমিক কে মাটিতে পড়ে যেতে দেখে উনি চমকে উঠলেন। এও কি করে সম্ভব?
মুহূর্তের মধ্যে জনা কুড়ি সৈন্য হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে তীব্র আক্রমণ শুরু করল নিরস্ত্র শ্রমিক দের উপর। অবস্থার ভয়াবহতা দেখে শইকিয়া একটা বড় পাথরের আড়ালে গিয়ে ঢুকলেন। একের পর এক শ্রমিকের আর্তনাদ তার কানে আসতে লাগল। সেই সঙ্গে শুনতে পেলেন পাথুরে সৈনিক দের নারকীয় উল্লাস।
এক সময় ফরেস্ট গার্ডরা আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালাতে শুরু করল। গুলির শব্দে গুহার ভিতরে প্রবল কম্পন শুরু হল। এ, এক অতি প্রাকৃতিক যুদ্ধ চলছে যেন জীবিত আর মৃত দের মধ্যে! ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠতে লাগল গুহার অভ্যন্তর। আর সেই সঙ্গে শ্রমিক দের আর্তনাদ। আড়াল থেকে শইকিয়া সাহেব লক্ষ্য করলেন, কিভাবে বন্দুকের নলের সামনে পাথুরে মূর্তি গুলো গুঁড়িয়ে ধুলো হয়ে যাচ্ছে। আর সঙ্গে সঙ্গে তার জায়গা নিচ্ছে আর একজন সৈনিক। এক সময় শ্রমিক দের আর্তনাদ কমে গেল। থেমে গেল বন্দুকের গুলি ও। কিন্তু চোখের সামনে দেখলেন পাথুরে মানুষ গুলো পুরো গুহা ময় এখনও কিছু খুঁজে বেড়াচ্ছে। তবে কি ওর সব সঙ্গীদের কেই হত্যা করে ফেলেছে এই পাথুরে আত্মা গুলো?
খুব সন্তর্পণে এক পা এক পা করে শইরিয়া বের হবার চেষ্টা করলেন। অন্ধকারে ছায়ামূর্তি গুলো এখন ও গুহাময় ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাই খুব সাবধানে বের হতে হবে। এখান থেকে কোন মতে বের হতে পারলে প্রায় আধ ঘণ্টা ট্রেক রুট। গাড়ির চাবি ওনার কাছেই আছে। ড্রাইভার না থাকলে ও অসুবিধা নেই। একবার গাড়ি অবধি পৌঁছাতে পারলেই হবে। নিজেই ড্রাইভ করে নেবে উনি। এদিকের রাস্তা টা ভালই জানা ওনার।
এক পা দু পা করে অন্ধকারে পাথরের আড়াল ধরে চলতে থাকলেন উনি। শ্বাসের আওয়াজ ও যেন সাপের হিস হিস শব্দের থেকে বেশী শোনাচ্ছে। হৃতস্পন্দণ এত দ্রুত হচ্ছে যে, মনে হচ্ছে এখনই দম বন্ধ হয়ে যাবে।
জায়গা টা ভয়ানক অন্ধকার। অথচ মোবাইলের আলো জ্বালানো সম্ভব না। আর একটু গেলেই গুহার প্রবেশদ্বার। অন্ধকারে এখন ও তিনি তাদের অস্তিত্ব টের পাচ্ছেন। পাছে কোন শব্দ করে ফেলেন, তাই গুহার দেওয়াল সংলগ্ন হয়ে তিনি বুকে হেঁটে গেট অবধি যাবার চেষ্টা করলেন। ভাগ্য ভাল বলতে হবে। গেটের সামনে টা এখন দেখা যাচ্ছে। শইকিয়া কোন রকমে উঠে দাঁড়ালেন। পর মুহূর্তে ভয়ে কুঁকড়ে গেলেন। গুহার ঠিক সামনেই প্রচণ্ড শব্দ করে বাজ পড়ল। তার উজ্জ্বল আলো তে দেখলেন জনা পাঁচেক পাথুরে সৈন্য তার দিকেই চুপিসারে এগিয়ে আসছে! তাদের চোখে মুখে এক জিঘাংসার ছবি।
মৃত্যু পিছনে বুঝতে পেরে শইকিয়া সাহেব সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। তারপর সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে প্রচণ্ড গতি নিয়ে দৌড়াতে লাগলেন। কিন্তু বেশী দূর যেতে পারলেন না।
পাথরের ধারালো অস্ত্র গুলো পর পর তার শরীরে বিঁধতে লাগল। এক সময় তার প্রাণ হীন শরীর টা একটা গর্তের মধ্যে গিয়ে পড়ল।
পিছনের সৈন্য গুলো দাঁড়িয়ে গেল। দুর্ভেদ্য ভাষায় নিজেদের মধ্যে কিছু বলল। তার পর আবার গুহার ভিতরে ঢুকে গেল। তার পর অন্ধকার থেকে ই পর পর বার করে নিয়ে এল হতভাগ্য শ্রমিক আর ফরেস্ট গার্ড দের ক্ষতবিক্ষত শরীর গুলো। তারপর ওরা পাথরে পাথর ঘষে আগুন জ্বালাল। তারপর সেই আগুনে ঝলসাতে লাগল একের পর এক মৃতদেহ।
তারপর শুরু হল অভিনব কায়দায় আগুন ঘিরে উল্লাস।

 




 

প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যাবার পরও শইকিয়া কে নিয়ে খননকারী টিম টা না ফেরায় শ্যামসুন্দর বাবু আর পাসাং খুব দুশ্চিন্তা গ্রস্ত হয়ে গেছিল। দুজনেই মোবাইল থেকে অনেক বার চেষ্টা করলেন ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করার। কিন্তু টাওয়ার লাগছিল না। শেষ অবধি রাত ‘আট’ টার সময় দু জনেই হাল ছাড়লেন।
তবে কি কোন দুর্ঘটনা ঘটল? আজ কে নিয়ে মোট চার দিন ওরা এখানে আছে। কোন দিন সন্ধ্যা সাত টার বেশী দেরি হয় নি। কিছুক্ষন আগে প্রবল ঝড় বৃষ্টি হয়েছে। তাই সে জন্য ও ওদের দেরি হতে পারে। হয়তো ওরা ওখান থেকে বের হতেই পারল না আজ। কিন্তু অত গুলো লোক খাবেই বা কি আর শোবে ই বা কোথায়? সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে শ্যামসুন্দর বাবু নিকটবর্তী থানা তে একটা খবর দিলেন।
এদিকে রাত বাড়তে লাগল। ‘ন’টার পরও যখন কেউ এল না, তখন পাসাং শ্যামসুন্দর বাবুর ডিনার তাঁবুতে পৌঁছে নিজেও খেতে গেল কিচেনে।
কিন্তু লণ্ঠনের হালকা আলোয় যা দেখল, তাতে ওর রক্ত হিম হয়ে গেল!
একটা পাথুরে অমসৃন একটা মূর্তি তার বিছানাতে এসে বসে আছে! এটা তো সেই ফসিল টা! ভয়ে পাসাং দু পা পিছিয়ে এল।
ওকে পিছিয়ে যেতে দেখে পাথুরে মূর্তি টি উঠে দাঁড়াল। তার এক হাতে একটা ব্রোঞ্জের ছুরি। অন্য হাতে একটা গোল পাথর। ছোট ছোট চোখ দুটিতে কুটিলতা।
পাসাং পালাতে যেতেই গোল পাথর টি ওর মাথা লক্ষ্য করে ছুড়ে দিল চৈনিক সৈন্য টি। পাসাং ডান দিকে লাফিয়ে কোন মতে প্রাণ বাঁচাল।
মুহূর্তে উঠে পড়ল পাসাং। এত সহজে ওকে কাবু করা মুশকিল। পাথুরে মূর্তি টি আর একটা পাথর তুলে তাকে দ্বিতীয় বার আঘাত হানার আগেই তাঁবু খাটানোর মোটা একটা বাঁশ হাতে তুলে নিল। তারপর সব শক্তি একত্র করে ওর পাথর ধরা হাতে আঘাত করল। মুহূর্তের মধ্যে পাথরের হাত গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ভেঙে পড়ল।
আঘাতের ফলে সৈন্য টি সামনে মুখ তুবড়ে পড়ল। তার মাথার সামনের কিছু অংশ গুঁড়িয়ে গেল। ভেঙে গেল কাঁধের কিছু টাও।
কিন্তু তাই নিয়ে পুনরায় উঠে দাঁড়াল। তারপর পাসাং পুনরায় তাকে মারার চেষ্টা করতেই হাতের ছুরি টা ছুড়ে দিল পাসাং এর বুক লক্ষ্য করে। পাসাং সতর্কীত হওয়ার আগেই ছুরিটা ওর বুক এফোঁড় ওফোঁড় করে দিল।
একটা আর্তনাদ করে পাসাং মাটিতে ছিটকে পড়ল। তার পর ছটফট করতে করতে থেমে গেল ও।
সৈনিক টি ও রক্ষা পেল না। পাসাং ছুরিকাঘাত খাওয়ার আগেই মূর্তির দ্বিতীয় হাতটি ও গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। টাল সামলাতে না পেরে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে যাবার মুহূর্তে ভাঙল হাঁটু জোড়াও। শুধু মাত্র ধর টুকু নিয়ে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে পড়ে রইল পাথুরে সৈনিক টি।

শুয়ে পড়ার পর পর ই কিছু একটা ধস্তাধস্তির আওয়াজ পান শ্যামসুন্দর বাবু। সেই সঙ্গে পাসাং এর চিৎকার।
মাথার মধ্যে হাজার চিন্তা বাসা এমনিতেই ঘুরছিল। একে তো পুরো খননকারী টিম টা আজ ফিরে আসে নি। তার উপর গত কাল রাতে পোংতে আর আজ সকালে একজন শ্রমিকের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়। এখন আবার পাসাং এর চিৎকার!
না, কষ্ট হলেও একবার উঠে দেখতেই হচ্ছে।
চাদরের তলা থেকে বের হয়ে গায়ে ওভারকোট টা চাপিয়ে নিলেন তিনি। তারপর ধীর পায়ে শব্দের উৎস বুঝে কিচেনের সামনে এসে হতবাক হয়ে গেলেন। পাসাং এর প্রাণ হীন শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছে। বুকের উপর বিদ্ধ আস্ত একখানা ব্রোঞ্জ এর ছুরি!
পাশে হাত, পা ভাঙা অবস্থা তে পড়ে আছে ওদের যুগান্তকারী আবিষ্কার ঐ ফসিল টা!
শ্যামসুন্দর বাবুর হাত পা কাঁপতে লাগল। উনি একবার পাসাং আর একবার ভাঙা ফসিল টার দিকে তাকালেন। এটা কি ভাবে সম্ভব? পর পর তিনটে মৃত্যু এটাই প্রমাণ করছে, এই পাথুরে মানুষ টার মধ্যে কিছু একটা আছে। সেটাই যত রহস্যের কারণ।
আচ্ছা এর মধ্যে কি কোন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে? ধুর, তাই বা কিভাবে সম্ভব? তিনি তো প্রফেশনাল। ভুত, প্রেত আবার কেউ মানে নাকি?

উনি মোবাইলের আলো টা একটু দূর থেকে জীবাশ্মের ভাঙা মুখের উপর ফেললেন। দেখে তো মঙ্গোলিয়ান টাইপের মনে হচ্ছে। হতে পারে চিনা সৈনিক। আচ্ছা এই লোক টার মতন গুহার সামনে পড়ে থাকা বাকি জীবাশ্ম গুলোও কি তবে চৈনিক? আচ্ছা খননকারী টিম না ফিরে আসার পিছনে এদের কোন ভূমিকা নেই তো?
ভাবতে ভাবতে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসলেন তিনি। ভাঙা হাত আর হাঁটু গুলো পরীক্ষা করে দ্রুত ডাইরী তে কিছু নোট করলেন। তার পর ভাঙা মুখের উপর মোবাইলের আলো ফেললেন। দেখে তো মনে হচ্ছে এই ফসিল টি প্রায় বিশ হাজার বছর আগেকার।
অত্যন্ত নিবিষ্ট চিত্তে উনি ভাঙা পাথুরে মানুষ টির প্রতিটি অংশের বর্ণনা ডাইরী তে লিখতে থাকলেন। তার পর আসতে আসতে সৈনিক টির কান, দাঁত এগুলো পরখ করতে থাকলেন। আর তখন ই ঘটল সেই প্রাণঘাতী ঘটনা টা।
শ্যামসুন্দর বাবুর মাথা পাথুরে মানুষ টির মুখের সামনে আসতেই ভাঙা মুখ দিয়েই মূর্তিটি তার কণ্ঠ নালী কামড়ে ধরল। বড় বড় পাথুরে দাঁত গুলো বসে যেত লাগল ক্রমশ গলার গভীরে। মাত্র কয়েক সেকেন্ডই তিনি ভাবার অবকাশ পেলেন। তারপরই শ্বাস আটকে গেল শ্যামসুন্দর বাবুর। নিষ্প্রাণ শরীর টা পরে রইল তার আবিষ্কারের উপর।

—– সমাপ্ত ——

 

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 0   Average: 0/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।