ঠিক ঠিক ঠিক

ঠিক ঠিক ঠিক
——————–
রীনা দাস (নীলাঞ্জনা)
———————-
এক
——

সাতসকালে টিকুর সঙ্গে তুলকালাম হয়ে গেল তুতুলের। ঝগড়াটা বাঁধল টিকুর গার্লফ্রেণ্ডকে নিয়ে। আসলে টিকুকে নিয়ে তুতুল ভীষণ পজেসিভ। দু বছর আগে যখন প্রথম টিকুকে দেখেছিল, তখন যে লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট হয়েছিল, এমন নয়। ওই একটু আধটু আলাপ পরিচয়। তারপর বন্ধুত্ব। টিকুও বেশ লাজুক বা বলা ভাল সাবধানী ছিল গোড়ার দিকে। যথেষ্ট দূরত্ব রেখে মিশত। তারপর যা হয়। তুতুলের তখন চোদ্দ। বয়ঃসন্ধির ভালবাসা হতে শুরু করলে আর থামতে পারে না। একটু আধটু দেওয়া নেওয়া ক্রমশ বাড়তে থাকে। টিকুও আস্তে আস্তে সহজ হয়ে ওঠে। তারপর এই দুটো বছর ধরে তারা দুজনে দুজনের খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল। তার ওপরে ছিল শরীর। ভালবাসায় শরীর অনেকটাই ভূমিকা নেয়।

চোদ্দ থেকে ষোল, দু বছরে তুতুল যত সুন্দরী হয়েছে, টিকুও তত জোয়ান হয়েছে। রঙও খুলেছে আগের থেকে। অমন ধপধপে রঙ, অমন সাজোয়ান চেহারা, তুতুল তাই চোক্ষে হারায় টিকুকে। আর টিকুও এক মুহুর্ত তুতুলকে না দেখে থাকতে পারে না। আড়ালে আবডালে সুযোগ পেলেই এক ছুটে চলে আসে তার কাছে। তারপর সেই নির্জনে পুটুর পুটুর করে কথা বলে দুটিতে। কথার মাঝখানে তুতুল এটা ওটা খাওয়ায় টিকুকে। মোট কথা গভীর প্রেম ছিল।
হঠাৎই টিকুর আচরণে কিছুটা অসঙ্গতি চোখে পড়ল তুতুলের। কেমন যেন পাল্টে যাচ্ছে টিকু। তুতুল একলা হলে, আগের মত ছুটে ছুটে যেন আর আসে না। একটু বেশি ব্যস্ত থাকে নিজের কাজে। একটু যেন সময় কম দেয় তাকে। প্রথম প্রথম ভীষণ অভিমান হচ্ছিল। তারপরে নারী সুলভ সন্দেহ। তক্কে তক্কে থাকে তুতুল। শেষে আজ সকালে হাতেনাতে ধরে টিকুকে তার নতুন গার্লফ্রেণ্ডের সঙ্গে। এবং খুবই কম্প্রোমাইজিং অবস্থায়। প্রথম অনুভুতি যেটা হয় তুতুলের, সেটা বিস্ময় আর হতাশা। টিকুর সঙ্গীনীটিকে দেখে হতবম্ভ হয়ে যায় তুতুল। অমন সুন্দর জোয়ান টিকু কিনা শেষে এই রোগা কেলে কুচ্ছিত একটা অখাদ্যের মোহে তাকে ডিচ করল! হায় ভগবান! পাড়ার কত ইয়ং ছেলে তার প্রেমে পাগল। অনেক মাঝ বয়েসী এমন কি বুড়োরাও কেউ সোজাসুজি, কেউ আড়ে আড়ে দেখে তার রূপ। আর সেই তাকে ছেড়ে কিনা টিকু এই……ছিঃ ছিঃ।

তারপরের অনুভুতিটা হল উন্মাদ রাগ। এই দুটো বছরে ঠিকু তার সঙ্গে কত গল্প করেছে, কিন্তু কোনদিন তাকে ছুঁয়েও দেখেনি। আর আজ নতুন বান্ধবীর সঙ্গে জড়াজড়ি করে ওই সব করছিল বুককেসের আড়ালে। একেবারে বেহুঁশ হয়ে গেছিল দুজনে। আছাড়ি পিছাড়ি খাচ্ছিল দুটো শরীর। তার ধপধপ আওয়াজ শুনেই না তুতুল উঁকি মেরে হাতেনাতে ধরে ফেলল ওদেরকে। চীৎকার করে উঠল তুতুল,

 




 

: টিকুউউউউ!
এক ঝটকায় দুজনে ছাড়া ছাড়ি হয়ে গেল। বান্ধবীটি সুট করে লুকিয়ে পড়ল খাটের তলায়। ধরা পড়ে গিয়ে টিকুর তখন বেশ বিব্রত অবস্থা। তুতুলের ফরসা মুখ রাগে তমতম করছে। সেই শুরু হল কথা কাটাকাটি। তারপর তুলকালাম ঝগড়া। শেষে হাতে ধরা কেকের টুকরোটা ছুঁড়ে মারল তুতুল টিকুর দিকে। একটুর জন্যে ফসকে গেল। সেদিকে ঘুরেও তাকাল না টিকু। প্রেমে বাধা পড়ায় ভীষণ রেগে গেছিল সেও।
: টক টক, টিক টিক টিক!
বলে মোটা ফরসা লেজটা নাড়াতে নাড়াতে ছুটে ঢুকে গেল খাটের তলায়, যেখানে তার নতুন প্রেমিকা অপেক্ষা করছিল তার জন্যে।
: বেইমান কোথাকার!
ফের চীৎকার করে উঠল তুতুল।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাগটাও পাকিয়ে উঠছিল। আর অদ্ভুত ভাবে পুরো রাগটা গিয়ে পড়ল ওই রোগা কালো মেয়ে টিকটিকিটার ওপরে। কোথাকার বন জঙ্গল থেকে আসা কুচ্ছিত একটা। তোর কি দরকার ছিল এখানে আসার। এসে তার টিকুকে কেড়ে নেবার। আস্তে আস্তে রাগটা জীঘাংসায় পরিণত হল। দুপুরে বাড়ি ফাঁকা। সেই সুযোগে ঝুলঝাড়াটা নিয়ে হাজির হল তুতুল। খাটের তলায় ঢুকিয়ে এলোপাতাড়ি চালাতে লাগল। যা ভেবেছিল তাই হল। ভয় পেয়ে টিকটিকি দুটো খাটের তলা থেকে বেরিয়ে এসে দেয়ালে উঠে গেল। এই তো সুযোগ। সপাং করে দুটোর মাঝখানে দেয়ালে ঝুলঝাড়াটা আছড়ালো তুতুল। ছিটকে গেল দুটোতে দু দিকে। এবার মেয়ে টিকটিকিটাকে কায়দা করে তাড়িয়ে তাড়িয়ে নিয়ে এল ঘরের দরজার দিকে। প্রাণের ভয়ে সেটা আশ্রয় নিল পাল্লা আর ফ্রেমের খাঁজে। সঙ্গে সঙ্গে পাল্লাটাকে সজোরে বন্ধ করল তুতুল। করে চেপে ধরে থাকল। তারপর একটু ফাঁক করে দেখল, রস বেরিয়ে ছ্যাদড়া ভ্যাদড়া হয়ে মেয়ে টিকটিকিটা চেপ্টে আটকে আছে ফ্রেমের খাঁজে। নিজের হাতের কাজের নিজেই প্রশংসা করল মনে মনে।
: মরে যা। মরে যা। মরে যা তুই!
বারবার আস্তে আস্তে পাল্লাটা বন্ধ করছিল আর খুলছিল তুতুল। আঃ কি আরাম! কি শান্তি! খানিক পরে পাল্লাটা খুলে রেখে, চেয়ারে এসে বসল। বসে, চুপ করে তাকিয়ে থাকল সেদিকে। একটু বাদেই টিকু এসে হাজির হল। একপাক ঘুরে এল তার মৃত সঙ্গীনীর চারদিকে। তারপর কেমন একটা চোখে চেয়ে রইল তুতুলের দিকে। ড্যাবাড্যাবা গোলগোল চোখে রাজ্যের ঘেন্না। তুতুল চোখ সরিয়ে নিল। ফরসা মোটা টিকটিকিটা বেরিয়ে গেল জানলা দিয়ে। তুতুলের সঙ্গে টিকুর সেই শেষ দেখা। অন্ততঃ তখন তাই মনে হয়েছিল তুতুলের।

দুই
—–
: বাবুটা কি করছে আমার?
: এই একটু রিল্যাক্স করছি সোনা। এক্ষুনি তো আবার মিটিংয়ে যেতে হবে।
: খাওয়া হয়ে গেছে বাবুটার?
: হুঁউউ।
:- লাঞ্চ পছন্দ হয়েছে আজকের?
: ভীঈষণ!
: তাহলে ফোন করেনি কেন বাবুটা?
: এই তো করতে যাচ্ছিলাম জানু। তার আগেই তুমি কল করলে।
: তাহলে আই লাভ ইউ বল।
: আই লাভ ইউ জানু।
: হামি দাও।
: উমমাহ্। এবার ছাড়ি। মিটিংয়ে যেতে হবে।
: বাই বাবু। লাভ ইউ।
: লাভ ইউ জানু। বাআই।
ফোনটা কেটে দীর্ঘশ্বাস ফেলে দীপক। তার তিন বছরের প্রেমিকা, দু বছরের পুরনো বউ তুতুল তাকে অসম্ভব ভালবাসে। তার যত্ন করে যেন মায়ের মত। তাকে চোক্ষে হারায়। দীপকের কিসে সুখ, কিসে আনন্দ, কিভাবে তাকে আরো একটু ভাল রাখবে, এই সব ভাবতে ভাবতেই দিন কেটে যায় তুতুলের। দিনের পর দিন তার আদর আর ভালবাসা যেন বেড়েই চলেছে। এমন কি অফিসে এলেও তুতুলের খোঁজ খবর নেওয়া চলতে থাকে। দশটা থেকে পাঁচটার মধ্যে অন্ততঃ বার পাঁচেক ফোন করে। সঙ্গে সঙ্গে সাড়া না দিলে টেক্সট মেসেজিংয়ে অভিমান। তখন মানীনীর মান ভাঙ্গাতে হয় দীপককে। প্রথম প্রথম ভালই লাগত। কিন্তু এই দু বছরে তুতুলের আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে ধরা ভালবাসায় ক্রমশ হাঁফিয়ে উঠেছে দীপক। মুক্তি পেতে চাইছে তার ভেতরটা। কিন্তু কিছুই করার নেই।

 




 

লেখাপড়া শেষ করে ভাল একটা চাকরির খোঁজে হাপিত্যেশ করে ঘুরছিল দীপক। এখানে ওখানে চেষ্টা করতে করতে এই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে একটা চাকরি পেয়ে ছিল। মালিকের পিএর। উদয়াস্ত খাটুনি। এমন কি ছুটির দিনেও ফাইলের তাড়া নিয়ে হাজির হতে হত মালিকের বাড়ি। প্রাইভেট কোম্পানীতে যা হয়। তবে মাইনেটা ভাল ছিল। তাই মুখ বুঁজে কাজ করছিল দীপক। আর এই যাওয়া আসা করতে করতে একদিন তার দেখা হয়ে গিয়ে ছিল মালিকের মা মরা একমাত্র মেয়ের সঙ্গে। আস্তে আস্তে আলাপ, পরিচয়, তারপর ভালবাসা। সে একেবারে উত্তাল, উদ্দাম। বছর তিনেকের মাথায় এক রকম নীমের পাঁচন গেলার মতই বাধ্য হয়ে তাদের বিয়েটা দিয়ে ছিলেন তুতুলের বাবা। আদুরী মেয়ের জেদের কাছে হার স্বীকার করে। হার্টের প্রবলেম ছিল আগে থেকেই। তাদের বিয়ের মাস দুয়েকের মধ্যেই মারা গেলেন। আর এই অতুল ঐশ্বর্য্যের অধিকারীনী তুতুল তাকে বসাল কোম্পানীর মালিকের আসনে। এই বিলাস ব্যসন, এই লাইফ স্টাইল এখন তুতুলের ভালবাসার মতই তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। এসব ছেড়ে দারিদ্র্যের মধ্যে আর ফিরতে পারবে না সে। তাই চাইলেও মুক্তি নেই তার। ফের একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দীপক।

অবশেষে সুযোগ এসে গেল। মাঝেমাঝেই রোমান্সের ভুত চাপত তুতুলের মাথায়। দীপককে নিয়ে কয়েক দিনের জন্যে চলে যেত দূরে কোথাও অজ্ঞাতবাসে, কাউকে কিছু না বলে। প্রেমের বন্যায় ভাসতো, ভাসাতো দীপককে। সে রকমই এবারও গিয়েছিল। নিজেদের গাড়ি, ড্রাইভার না নিয়ে কার রেন্টাল থেকে ভাড়া করেছিল একটা সুমো। ট্যাঙ্কি ফুল ডিজেল আর গাড়ি ভর্তি খাদ্য পানীয় নিয়ে আচমকা অফিস থেকে ডেকে নিয়ে ছিল দীপককে মাঝ দুপুরে। রাস্তা থেকে পিক আপ করেছিল তাকে। কেউ কিচ্ছু জানলো না। তুতুল দীপককে নিয়ে পাড়ি দিয়েছিল নেতারহাটের জঙ্গলে। বন বাংলো বুকিংও করেছিল নিজের নামে। রাস্তায় যেতে যেতে সেসব হাসতে হাসতে বলছিল। আর দানা পাকিয়ে উঠছিল পরিকল্পনাটা দীপকের মাথায়। শহর ছাড়িয়ে হাইরোডে উঠেই সীট পাল্টে নিয়েছিল দীপক। তুতুলকে পাশে বসিয়ে ড্রাইভ করছিল। আর একটার পর একটা চিলড্ বীয়ার তুলে দিচ্ছিল তার হাতে।

গাড়ি ছুটছিল জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। বেশ রাত। হেডলাইটের আলো মসৃণ পীচ রাস্তার অন্ধকারকে চীরে দিচ্ছিল। এক এক করে পার হয়ে গেল লোহারডাগা, মধুবনী, আরো কি কি সব। এলানো জিভে অসংলগ্ন বকছিল আর হাসছিল তুতুল। রাস্তাটা কি ভীষণ নির্জন। হঠাৎই গাড়ি থামাতে বলল তুতুল। অতগুলো বীয়ার প্রকৃতির ডাককে অনিবার্য করে তুলেছে তুতুলের। যেমন হিসেব ছকে রেখেছিল দীপক। গাড়িটাকে রাস্তার ধারে থামাল। তুতুল তাড়াতাড়ি দরজা খুলে নেমে গেল পাশের জঙ্গলে। হেডলাইট নিভিয়ে নিঃশব্দে নেমে এল দীপক। তারপর ডিকি খুলে হাতে নিল ভারী হুইল রেঞ্চটা। পা টিপে টিপে তুতুলের পেছনে এসে দাঁড়াল। একটা মাত্র আঘাত মাথার পেছনে। ওঁক করে একটা আওয়াজ করে লুটিয়ে পড়ল তুতুল।

 




 

তার শরীরটাকে পাঁজাকোলা করে এনে গাড়ির সামনে যত্ন করে শুইয়ে দিল দীপক। গলার কাছে আঙ্গুল ছুঁইয়ে দেখল, ধাত আছে। মরে যায় নি। এখনো বেঁচে আছে। এবার গাড়িতে উঠে বসে স্টার্ট দিল। হেডলাইটও জ্বেলে দিল। তারপর এগোতে লাগল তুতুলের দিকে। চোখে জোরাল আলো পড়ার জন্যেই হোক, বা ইঞ্জিনের গোঁগোঁ আওয়াজেই হোক, তুতুলের জ্ঞান ফিরে এসেছিল। যমদূতের মত গাড়িটাকে এগিয়ে আসতে দেখে কোনমতে উঠে টলমল করে রাস্তা ধরে দৌড়তে গেল তুতুল। কিন্তু গাড়িটা এক ধাক্কায় তাকে ছিটকে ফেলে দিল। তারপর থেমে গেল। নেমে কাছে এগিয়ে এল দীপক। গাড়ির আলোয় ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত তুতুল ভয়ে বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখল, দীপককে কেমন অন্য রকম দেখাচ্ছে। মুখটা সরু আর লম্বাটে হয়ে গেছে। হাত পা গুলো বাঁকা বাঁকা। সারাগায়ে কেমন আঁশ। কাছে এসে সরু লিকলিকে জিভ বের করে তার গালের রক্তটা চেটে দিল। ড্যাবড্যাবে দুটো চোখে অসহ্য ঘেন্না ঝরে পড়ছে। চিনতে পেরেছে, তুতুল চিনতে পেরেছে তাকে।

: টিকু তুই! এতদিন পরে ফিরে এসেছিস সেদিনের বদলা নিতে!
আর্ত চীৎকার করে ওঠে তুতুল। কোন কথা না বলে তার আততায়ী ফের গিয়ে গাড়িতে ওঠে। তারপর ভারী সুমোটাকে খুব আস্তে আস্তে গড়িয়ে দেয় তুতুলের ওপর দিয়ে। মরণ চীৎকার করে থেমে গেছিল তুতুল। তবুও তার রক্তাক্ত ছ্যাদড়া ভ্যাদড়া শরীরটার ওপর দিয়ে গাড়িটাকে বার বার আগুপিছু করতে করতে, স্টীয়ারিং ধরে বসে থাকা অতিকায় ফরসা টিকটিকিটা বলে উঠল,
: টিক টিক টিক। ঠিক ঠিক ঠিক।

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 1   Average: 5/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।