দূরত্বেও

দূরত্বেও

দূরত্বেও
~ কুন্তল
হঠাৎ ই মাইকে সোনা গেলো ; ‘অনুগ্রহ করে শুনবেন হাওড়া হুগলি লোকাল নির্ধারিত সময়ে নির্ধারিত প্লাটফর্মে 10 মিনিটের মধ্যে আসছে’। আর্নিকা চোখের পলক ভিজিয়ে সোমক এর হাত চেপে ধরলো প্রতিবারের মত।
“তুই আবার চলে যাবি আমার ছেড়ে।আর একটু কি বসা যায় না।আবার কবে দেখা হ…”
আর্নিকা কে ঠোঁটে আঙ্গুল রেখে থামিয়া দিয়ে সোমক বললো “চলে যাচ্ছি নাহ আসছি বলতে হয় আর কখনো কখনো কাছে আসার জন্যে দূরে যেতে হয়। কারন দূরত্বই তো ভালোবাসাকে আরো গভীর করে তোলে।আর তাছাড়া তোর ট্রেন আসছে তোকেই যেতে হবে আমি কি করবো বল আমার কি মন চাইছে তোকে ছেড়ে যেতে,একদম ই নাহ। কিন্তু কি করবো বল তোকেও ট্রেন ধরে ফিরতে হবে আর আমাকে ও বাস ধরে কলেজে ফিরতে হবে কিন্তু দুঃখ একটাই যে আলাদা আলাদা দুটি পথে”
“হম”
“আবার কাঁদে সব ঠিক হতে যাবে ভরসা রাখ আর মন দিয়ে পড়াশুনা কর।এই পরিস্থিতিতে তোকেও প্রতিষ্ঠিত হতে হবে এটাকে টিকিয়া রাখার জন্যে”
“কেনো এমন টা হলো বলতে পারিস” অবিরত কাঁদতে কাঁদতে আর্নিকা বলে উঠলো
“কি হয়েছে কিছুই হয় নি তো, আর যা হয়েছে ভালোর জন্যেই হতেছে,এই জন্যেই হয় তো বলে ভালোবাসা সত্যি সেটাই যেগুলো অসমাপ্ত কারন যদি সব কিছু পেয়ে যাই জিবনে তাহলে আকাঙ্ক্ষা কিসের করবো আর তোকে পাওয়ার আকাঙ্খা ছাড়া জীবন যাপন করে বা কি করবো,এই কিছু আধা অধুরা ভালোবাসা ই তো জিবনে বাঁচার রসদ যোগায়”
“এতো কিছু হয়েছে শুধু বয়সে এর জন্যেই।কেনরে যখন এই জনমে ভালবাসারই ছিলো তখন একই সাথে  জন্মাতে পরলি নাহ, এক্ষণ তহ মনে হয় এতো টা দেরি হতে গেছে যে সারাজিবনের ব্যাপ্তিকাল ও কম লাগে,তোকে যেন জনজন্মতর ধরে পাই”  -আফসোস এর সুরে আর্নিকা বলে উঠলো
“হম তাহ বটে হক কথা কয়েছিস তবে”~একটু রসিয়ে সোমক  বললো -,”দেখ তুই শুধু একা নয় সয়ং ভগবান ও এই কষ্টের ওপর দিয়ে গেছে রধাও কৃষ্ণের তুলনায় 2 বছরের বড় ছিল এখানেও তাই, কৃষ্ণের মতো তুইও আমার সর্বত্রই জুড়ে আছিস শুধু ভাগ্যে নেই যেটা আমাকে যোগ্যতার দ্বারা তোকে অর্জন করতে হবে। ববধ্যান সত্ত্বেও জন্মজন্মন্তর ধরে কৃষ্ণের আগে রাধার নাম নেওয়া হয় ঠিক তেমন এখানেও আমাদের জন্ম আর ভাগ্য কোনো গুরুত্ব রাখে নাহ”
“অনেক হয়েছে আর সান্তনা দিতে হবে না।আচ্ছা তুই এলি তহ এলি এতো দেরি করে কেনো এলি জিবনে আর একটু আগে আস্তে পারলি নাহ জিবনে?”
“কি করবো বলো ম্যাডাম ক্লাস 9 এ গিয়ে যখন বন্ধুত্ব হয় তখন তহ আর এমন কিছু হবে ভাবতে পারিনি আর 11 – 12 গিয়ে যখন বুঝতে পারলাম এটা বন্ধুত্ব নয় তার থেকেও বেশি কিছু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে কিন্তু ওই যে বলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ মানুষ আমাদের জিবনে অনেক আগেই আসে কিন্তু আমরা তাদের চিনতে দেরি করে ফেলি এখানেও ঠিক তাই। হাজারবার ভেবেছি বলে ফেলবো যে এক্ষণ তুই আমার আর ফ্রেণ্ড নয় গার্ল ফ্রেন্ড কিন্তু সপ্ন ভাঙার ভয় কখনো মন থেকে মুছতেই পারলাম না। যদি তুই রেগে যাস আমায় ছেড়ে চলে যাস তোকে তহ হারাবই তার সাথে প্রিয় বন্ধুকেও,ভাবলেই কেমন যেন অন্ধকার হয়ে আসতো মনটা।” -অনেক টা ব্যাকুল আর আবেগপ্রবণ হয়ে বলে উঠলো সোমক “যাই হোক মুখে কিছু না বলেই সেষ পর্যন্ত বুঝতে পারলি অন্তত যে সত্যি জানতে চাস তোকে চাই যদি মিথ্যেও মানতে চাস তবুও তোকেই চাই”
“থাক থাক অনেক হয়েছে আর এখনকার কাপলদের মত অত রসিয়ে নেকা নেকা কথা না বললেও হবে।আমিও নিজেও একসময় বুঝতে পারিনি কক্ষন বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসা হোল সম্পর্ক টা, কিন্তু আগে থেকেই জানতাম বয়সের ব্যবধান আছে তাই ভয়ে বোধ হয় কেউ কাউকে বলতে পারিনি। কিন্তু 1স্ট ইয়ারের 3র্ড সেম এর পর শুধু তুই নয় নিজেকেও আর আটকে রাখতে পারলাম না সারা দিনে একবার অন্তত তোর সাথে কথা না বলতে পারলে সারা দিন তোর খোজ না পেলে যেনো খুব কষ্ট হতো।যদিও আমাদের মধ্যে কোনো রকমের প্রপোজ টপোজ কিছু হয়নি তবুও কোনো দুঃখ বা আপসোস নেই, নাই বা হলো একবিংশ শতাব্দীর তথাকথিত ভালোবাসা এটা নাহয় নব্বৈদশকের সোজা সাপটা খাদ হিন ভালোবাসা হয়েই থাক।”
“যাই হোক এত খনে তাহলে তুই একটু হাসলী ।এই হাসি টা যেনো সারা জিবন এই ভাবে তোর ঠোঁটে থাকে,এই হাসিতেই তহ আমি একসময় পাগল হয়েছিলাম।এই হাসি টুকু তোর মুখে ফুটিয়া রাখার জন্যে তহ আমি যেকোনো কিছু করতে পারি,আর সেই জন্যেই এত কিছুর পর ও,এত কষ্টের পরেও,তোর থেকে পর্যন্ত দূরে থেকেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে উঠে পরে লেগেছি।কিছু করতে পারলেই তোর বাবার কাছ থেকে মাথা উচু করে তোর হাত চেয়ে নিয়ে যেতে পারব আর এই হাসি টাকেও ধরে রাখতে পারব।”
“হম এই কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার জন্যে কিছু মনে করিস না এতে আমার পরিবারের কোনো দোষ নেই।তোর সাথে সম্পর্কে আবদ্ধ হয়ার পর আমার মনে হয়েছিল যে কেউ বলুক আমার পরিবারকে তার আগে আমার নিজে থেকে এই সম্পর্কটার ব্যাপারে জানিয়ে দেওয়া দরকার”
“অব্বসই পরিবার আগে কারন ওখান থেকেই আমরা প্রথম ভালোবাসা পেয়েছি তার পর অন্য কারোর ভালোবাসা ভিত্তি করে।যেমন তোর পরে আমার জিবনে অন্য কেউ এলে তোকে ছেড়ে দিতে পারিনা ঠিক তেমনি পরিবারের পরে যদি কেউ সেরকম ভালোবেসে থাকে তাবোল পরিবারের ভালোবাসা কে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।তোর পরিবারের প্রতি যে কৃতজ্ঞতা,অনুগত,ভালোবাসা স্নেহ এটাই তো আমাকে মুগ্ধ করে,আর এই যারা বলে নাহ যে আমি ওর প্রথম দেখাতেই ওর মন দেখে ভালোবেসে ফেলেছি এত যথারীতি ভুল কারণ প্রথম দেখাতেই মন বোঝা যায় না,তার মনের পরিচয় তার আচারাচরণ তার ব্যাবহার আর কাজে।তুই যা করেছিস সঠিক করেছিস কখনো ওদের কাদিয়া বা ওদের সম্মানে আঁচ এনে সুখী হতে পারবোনা,তুই যখন তোর পরিবার কে ভালোবেসে এত টা ত্যাগ করতে পারিস তাহলে আমাদের ভালোবাসা সার্থক হলে তুই আমার জিবনে এলে তুই কিকি করবী সেটা বুঝতে পেরে তোর মন তাকে আরো বেশি করে ভালোবেসে ফেলেছি”
“কিন্তু কতদিন আর লুকিয়ে লুকিয়ে এই রকম দেখা করবো বল ” একটু চিন্তিত হয়েই আর্নিকা বললো
প্রতুত্তরে সোমক বেশ জমিয়ে বললো ” এই লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম করার মজাই আলাদা বেশ।এই যেমন  তোর বাবা  রানিচক থেকে লেডিজ কামরায় তুলে দেওয়ার বাড়ির থেকে লুকিয়ে পরের স্টেশন নেমে আমার কামরায় চলে আসিস তারপর আমরা সারা রাস্তায় গল্পঃ করতে করতে হাওড়া স্টেশনে চলে আসি আবার এখানে ওয়েটিং রুম বসে ঘন্টা দুএক আরো কথা বলি। মন্দ কি এটা না হয় 90’s একদম রঙিন রোমান্স হোয়ই থাক ক্ষতি টা কি।পরে যদি কাউকে এই রোমাঞ্চকর ভয়মিসৃত প্রেমের কাহিনী সোনাই লোকে হা করে শুনবে,হয় তঃ গল্পঃ ও লিখে ফেলতে পারে কেউ এত ইন্টারেস্টিং লং ডিসটেন্স রেলেশনশিপ এর ওপরে।”
ট্রেনের সাইরেন শুনে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে ব্যাগ গুলো তুলে নিয়ে সোমক অর্নিকা এর মুখের পানে চেয়ে চোখদুটো মুছে দিয়ে এইবারের মত শেষ একটা উষ্ণ আলিঙ্গন করে দুজনে উঠে দাড়ালো আর হাতে রাখা হাত টির আঙ্গুল এক এক করে আলগা হয়ে গেলো তারপর মুখে মৃদু হাসি, চোখে কুয়াশা আর বুক ভরা আশা ভালোবাসা নিয়ে আর্নিকা এগিয়ে গেলো ট্রেনে উঠতে, আর সোমক সেই দিকে তাকিয়েই আস্তে আস্তে একপা দুপা করে পেছাতে রইলো বুক ভরা আশা আর হতাশ নিয়ে ।ঠিক সেই সময় ট্রেন ঢুকলো আর মাইকে সোনা গেলো ‘ যত্রিগণ অনুগ্রহ করে শুনবেন হাওড়া হুগলি লোকাল প্লাটফর্মে ঢুকছে দয়া করে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন ‘

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 1   Average: 3/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।