দ্বৈত

দ্বৈত

🍁দ্বৈত🍁

হ্যালো চঞ্চল, শোন আজ বিকেল চারটের সময়ে চলে আসিস গান্ধী ঘাটে যেতে হবে।
কেন !
আরে বাবা তুই তো জানিস স্নিগ্ধার সাথে দেখা করার জন্য, সেখান থেকে সাতটার সময়ে ফিরে গঙ্গার ঘাটে প্রিয়া।
কি বলছিস!!আর কতকাল!! এবার একজনকে ফিক্সড কর।
কি যে বলিস তোর মনে হয়, এরা কেউ ফিক্সড করার মতো!!
তাহলে এদের সাথে সময় কাটাচ্ছিস কেন!!
খুঁজছি তো পাচ্ছি কোথায়! তুই ই বল এদের মধ্যে একটাকেও তোর পছন্দ হয়!
পছন্দ হয়না তো মিশিস কেন!
কী করব , টাইম পাস তো করতেই হবে ।
টাইম পাস এর জন্য তোর অন্য কোন কাজ নেই এগুলোই করতে হবে ??এর পরিনতি ভেবে দেখেছিস কখনও!!
তুই আসবি কিনা বল!
না আমি যাব না
হা হা হা! তোকে আসতেই হবে। তোকে ছাড়া যে আমি কোথাও কোন ডেটে যাই না আর যাব না সেটা তো তুই জানিস। তাই কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। সময় মত চলে আসিস, রাখছি।………বলেই ফোন রেখে দিল অর্ক।

গান্ধী ঘাট পার্কটা বেশ সুন্দর। গঙ্গার ধারে লম্বা করে রেলিং দেওয়া পার্কটার সুন্দর একটা নাম ও আছে। তবে অটোওলাকে সবাই গান্ধী ঘাট ই বলে। অর্ক আর চঞ্চল অটো থেকে নামলো। ভাড়া মিটিয়ে দুজনেই হন হন করে হাঁটা দিল পার্কের দিকে। টিকিট কেটে পার্কে ঢুকতে ঢুকতেই দেখলো স্নিগ্ধা ভ্রু কুঁচকে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। অর্ক বলল- চঞ্চল তুই আর এগোস না তোকে দেখলে ফায়ার হয়ে যাবে। চঞ্চল অবাক হয়ে বিরক্ত মুখে বলল – মানে কি! আমাকে তুই আনিস কেন- এটাই তো আমি বুঝি না। তোর সমস্যা টা কি!!!! অর্ক ওর গালটা টিপে দিয়ে বলল – রাগ করিস না, ফেরার পথে এগরোল খাবো, বলেই অর্ক তাড়াতাড়ি স্নিগ্ধার দিকে এগিয়ে গেলো আর চঞ্চল দেখেশুনে একটা ফাঁকা বেঞ্চে বসে পকেট থেকে ফোনটা বের করল।

অর্ক কাছে আসতেই স্নিগ্ধা তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল – এই তোমার চারটে? ঘড়ি নেই? দেখতে পারো না? তোমার প্রেম করার ইচ্ছে নেই? আদৌ আমাকে ভালোবাসো তো?
অর্ক :-  হ্যাঁ সোনা, অনেক ভালোবাসি, এতটাই যা তুমি চিন্তাও করতে পারবে না।
স্নিগ্ধা :- তাহলে পকেটে করে ওকে নিয়ে আসো কেন? এই নিয়ে আমরা তিনবার দেখা করছি। তিনবারই ও সঙ্গে, কেন?
অর্ক :- আস্তে বলো স্নিগ্ধা সবাই শুনছে । আর চঞ্চল ও শুনতে পাবে।
স্নিগ্ধা :- শুনছে শুনুক , ও জানে না- কেউ ডেটিং এ গেলে তার সাথে যেতে নেই !! তোমার যে কোন একজনকে বেছে নিতে হবে , হয় আমি না হয় ও। তোমার ডিসিশন আমাকে জানিয়ে দিও – বলেই স্নিগ্ধা আর এক মুহুর্ত ও দাঁড়ালো না। রাগে গজগজ করতে করতে পার্ক থেকে বেড়িয়ে গেল। অর্ক নির্বিকার । চঞ্চল অবশ্য স্নিগ্ধাকে আটকানোর চেষ্টা করলো , কিন্তু স্নিগ্ধা এক ধাক্কায় ওকে সরিয়ে বেরিয়ে গেল।ঘটনাটা আকস্মিক বটে, কারণ ঠিক পনেরো মিনিট আগেও কেউ জানত না যে এই ঘটনা ঘটতে চলেছে। চঞ্চল চিৎকার করতে লাগল – অর্ক ওকে আটকা, যেতে দিস না। আমার জন্য তোরা নিজেদের মধ্যে ব্রেকআপ করিস না, প্লিজ ওকে আটকা।

অর্ক খুব আস্তে বলল – চুপ কর , যেতে দে, আমরাও রওনা হই। ছটার ট্রেনটা ধরতে না পারলে প্রিয়ার সাথে দেখা হবে না। সাতটায় টাইম দেওয়া আছে-  মনে আছে তো, চল । বলে অর্ক চঞ্চলের হাত ধরে টেনে নিয়ে চলল।  চঞ্চল দেখলো পার্কের সবাই ওদের দিকে তাকিয়ে আছে।

অর্ক আর চঞ্চল যখন নৈহাটি স্টেশনে নামলো তখন প্রায় সাড়ে ছটা। ট্রেনে অর্ক প্রিয়া সম্পর্কে অনেক কথাই বলল।
অর্ক :- জানিস চঞ্চল, এই মেয়েটাকেই আমি ফাইনাল করবো – বুঝলি! দারুণ দেখতে, আর যখন হাসে আমার কানে যেন সেতার বাজে, আর যখন কথা বলে মনে হয় হার্ট বিট বেড়ে যায়। vc তে এত চমৎকার লাগে দেখতে বুঝলি, সব যদি ঠিক থাকে তাহলে প্রিয়াই  আমার ফাইনাল গার্ল ফ্রেন্ড হবে- আর ওকেই আমি বিয়ে করবো বুঝলি!!! – এই কথাগুলো অর্ক গড়গড় করে বলে যাচ্ছিল। চঞ্চল কিছু শুনতে পাচ্ছিল কিছু পাচ্ছিল না , কারণ – একে গাড়ির আওয়াজ , তার মধ্যে ওর মনটাও একটু অন্যমনস্ক। শুধুই মনে হতে লাগলো, আজকের সিনক্রিয়েট টা পুরোপুরি ওর আর অর্কর জন্যই হল। তাইতো, যেখানে স্নিগ্ধা আর অর্কর ডেটিং, সেখানে ও কি করছিল! নিজেকে কাবাব মে হাড্ডি বলে মনে হয় ওর সব সময়েই, কিন্তু আজ এত অপরাধ বোধ হচ্ছে, বারবারই মনে হচ্ছে আজকের ঘটনার জন্য ওই দায়ী। আর সেই কারণেই অর্কর নতুন গার্ল ফ্রেন্ড সম্পর্কে শোনার আগ্রহ চঞ্চল পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছে। শুধু তাই নয়, ওই মেয়েটি আর অর্কর প্রতি কিছুটা বিরক্তিও দানা বাঁধছিল।

গাড়ি ছেড়ে দিতেই স্টেশন আস্তে আস্তে ফাঁকা  হতে লাগলো । অর্ক বললো – চল, দুজনে দুটো এগ রোল খাই। তারপর যাওয়া যাবে, এখনো হাতে আধঘণ্টার ওপর সময় আছে। অর্ক আপত্তি করে বলল – নারে , আমার একটা কাজ আছে- আমার এখনই বাড়ি যেতে হবে। অর্ক প্রায় নাছোড়বান্দার  মত ওর পেছনে পড়ে গেল এগ রোল খেয়ে প্রিয়ার সাথে দেখা করতে যাওয়ার জন্য ,অনেক পীড়াপিড়ির পর অগত্যা চঞ্চল কে বাধ্য হয়ে রাজি হতে হলো।

বড় রাস্তা ধরে দুজনেই চলেছে গঙ্গার দিকে স্বপ্নবিথী পার্কের উদ্দেশ্যে। দুজনেই চুপচাপ কেউ কোন কথা বলছে না। চঞ্চল বলল – আমাকে কেন নিয়ে যাস সব সময়! এটা তোর গার্ল ফ্রেন্ডরা মেনে নিতে পারে না। এটা বুঝিস না কেন!!
অর্ক :- ওকে নিয়ে সমস্যা হবে না। ও জানে তুই যাবি। চঞ্চল :- ওকে প্রপোজ করেছিস?
অর্ক :- না, দু – একবার চেষ্টা করেছি , কিন্তু এড়িয়ে যায়।
চঞ্চল :- আমার কথা ওকে ঠিক মতো বলেছিস তো!!!
অর্ক : – এতে ঠিক মত বলার কি আছে! তুই আমার তখনকার বন্ধু যখন আমরা স্কুলে ভর্তি ও হইনি। মনে আছে আমাদের দেখে সবাই কেমন অবাক হতো? চঞ্চল বলল – এখনো হয়, বেশি করে হয়। আমরা যে পরস্পরকে নিজের মায়ের পেটের ভাইয়ের মতো দেখি এটা তো অনেকেই মেনে নিতে পারে না। আড়ালে তো সবাই চিরকাল কানাঘুষোই করে এল।
অর্ক :- আড়ালে বলছিস কেন! দাদা তো তোকে দেখতেই পারে না। আর বৌদি কি কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে তা তো তোর জানাই আছে। কিন্তু যত যাই হোক, আমি তোকে কোনদিন ছাড়তে পারবো না রে।

কথা বলতে বলতে ওরা স্বপ্নবিথী পার্কের কাছে এসে দাঁড়ালো। অর্ক টিকিট কাটছে আর চঞ্চল গেটের ফাঁক দিয়ে যাকে দেখতে পেল নীল রঙের টপ আর পালাজো তে পিঠ পর্যন্ত নেমে আসা হাল্কা বাদামী চুলে, তাকে দেখে ওর খুব চেনা মনে হল। বুকের ভেতর টা ধক করে উঠলো। প্রথমে মনে হল ভুল দেখছে , তারপর অনেক কষ্টে নিজেকে স্বাভাবিক করল। অর্ক বলল – চল টিকিট কাটা হয়ে গেছে।

অর্ক হাত নেড়ে ডাকল – প্রিয়া , আমরা এদিকে। আমার চোখে চোখ পড়তেই মেয়েটির ভুরু কুঁচকে গেল, কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। অর্ক বলল – পরিচয় করিয়ে দিই । আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড প্রিয়াঙ্কা। আর প্রিয়াঙ্কা, ও আমার ছোটবেলার বন্ধু…. কথাগুলো বলা শেষ হওয়ার আগেই প্রিয়াঙ্কা যেন সম্মোহিতের মত বলল – চঞ্চলা, চঞ্চলা রায়। সুরেন্দ্রনাথ কলেজ 2011 ব্যাচ কমার্স তাই তো? চঞ্চলা মাথা নিচু করে দাড়িয়ে রইল, হ্যাঁ প্রিয়াঙ্কা ঠিকই বলেছে । ও শারীরিক দিক থেকে ও মেয়ে কিন্তু মানসিক ভাবে ও পুরোপুরিই ছেলে। প্রিয়াঙ্কা দৌড়ে এসে চঞ্চলার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ওর সারা মুখে চুমু খেতে লাগল । এক সময় লিপলক করে ফেলতেই চঞ্চলাও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। প্রিয়াঙ্কাকে শক্ত করে দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল – আর চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিল। অর্ক হতভম্ব, চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে আছে। এই অবস্থা চলল প্রায় সাত- আট মিনিট, একটু স্বাভাবিক হওয়ার পর প্রিয়াঙ্কা অর্কর দিকে তাকিয়ে ওর হাত ধরে বলল – তুমি আজ আমায় কি দিয়েছো তা তুমি নিজেও জাননা অর্ক । আমি আর চঞ্চলা কলেজ থেকে একে অপরকে ভালোবাসি। উই আর হোমোসেক্সুয়াল পারসোনালিটি। আমরা সারাজীবন একে অপরের সাথে থাকব ঠিক করেছিলাম । কিন্তু তখন আমরা কেউ চাকরি করতাম না । আর এদিকে বাবা কি করে যেন আমাদের পুরো বিষয়টা আঁচ করে কায়দা করে আমাকে বিদেশে পাঠিয়ে দেন লেখাপড়ার অজুহাতে। আমার সব থেকে বড়ো ভুল ছিল – চঞ্চলার বাড়ির ঠিকানা পর্যন্ত আমি জানতাম না । তাই দেশে ফিরে অনেক খোঁজ করেও ওর দেখা পাইনি। আজ তোমার মাধ্যমে পেলাম । তোমার এই উপকার আমি কোনদিন ভুলবো না অর্ক। বলেই অর্ককে হাগ করলো। চঞ্চলার দিকে তাকিয়ে বলল – কি রে চঞ্চল, এবার তো আমরা আমাদের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিতে পারি, তাই না!!! আমাদের ভালোবাসা পূর্ণতা পেতে পারে – কি বলিস? চঞ্চলা বলল – আমার বাড়ির লোককে কিছুতেই বোঝাতে পারছিলাম না রে আমার অবস্থানটা। এবার তোর সঙ্গে যখন দেখা হয়েই গেল, এবার আর কোন বাধাই রইল না।  অর্ক, ভাই আমার, তুই কিছু মনে করিস না প্লিজ, তুই অন্য কাউকে খুঁজে নে । প্রিয়া আমার থাক। অর্ক কি বলবে বুঝে পেল না। একটা অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে সামনের বেঞ্চটায় থপ করে বসে পড়ল। ওরা দুজন একটু দূরে নিরিবিলিতে গিয়ে বসলো যেখান থেকে অর্ককে আর সোজাসুজি দেখা যাচ্ছে না। অর্ক দেখলো প্রিয়াঙ্কা চঞ্চলার  ডান হাতটা নিজের মুঠোর মধ্যে নিয়ে চঞ্চলার কাঁধে মাথা রাখলো আর চঞ্চলা বাঁ- হাত দিয়ে ওকে কাছে টেনে নিল। অর্কর মাথা ঝিমঝিম করে উঠলো মনের অজান্তেই মোবাইলে নম্বর ডায়াল করল। হ্যালো, স্নিগ্ধা!!……………

🍁ন মু 🍁

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 4   Average: 3.8/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।