নারীবুদ্ধি নমস্তেঃ

নারীবুদ্ধি নমস্তেঃ

পলাশ মাহাত

 

যৌন চেতনা থেকেই ভালবাসার জন্ম । আর যৌনতায় গিয়ে ভালবাসার মৃত্যু । এটাই সত্য । এটাই নির্বিকল্প । তা যে যা বলে বুলুক । এই গল্পের নায়িকা শেফালিকে যদি জিগ্যেস করা হয় , তোমার ত শিবের মত বর আছে , তবু কেন নবেন্দুকে ভালবাস ?

শেফালি সঠিক উত্তর দিতে পারবে না । না হয় দেবে না । বলবে , নবেন্দু আমাকে ভালবাসে , তাই যখন সে আমাকে জানাল তার ভালবাসার কথা তখন আমি না করতে পারলাম না ।

আর যদি নবেন্দুকে বলা জিগ্যেস করা হয় , শেফালি ত পরের বউ , তাকে কেন ভালবেসেছ হে ?

নবেন্দু বলবে , ভাল লাগে তাই ভালবেসেছি ।

-কি ভাল লাগে ?

নবেন্দু বলবে , সব কিছু । তার হাঁটা-চলা ,কথা বলা ,ভাব-ভঙ্গি ,এমনকি হাঁটু মুড়ে বসাটা পযর্ন্ত ।

আবার যদি জীমূতকে জিগ্যেস করা হয় , শেফালির বর আছে , নাগর আছে , অবৈধ সম্পর্ক আছে , তবু কেন তার ওপর নজর রেখেছ ?

জীমূত সেয়ানার মত কথা বলবে , আমি সৌন্দর্যের পুজারি । শেফালির সৌন্দর্য আছে , তাই তাকে দেখে দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি । জীবনে রসদ খুঁজে পাই ।

যে যেমন পারবে সে সেইরকম করে ভালবাসার ব্যাখ্যা দেবে বা দেওয়ার চেষ্টা করবে । কিন্তু কেউ মুখে উচ্চারণ করবে না যৌনতার কথাটি ।

তো সেদিন যেমন শেফালি বলল নবেন্দুকে , এইবার সব কিছু ভুলে যাও । আর নয় , অনেকদিন হল এই ভালবাসাবাসির খেলা ।

নবেন্দুও বলে , হ্যাঁ আর নয় । কিন্তু সম্পর্কটা ত থাকবে । আমরা ত বন্ধুর হয়ে থাকতে পারি ?

শেফালি বলল , সেই ভাল ।

নবেন্দু বলল , জানো শেফু আমি তোমাকে হৃদয় দিয়ে ভালবাসি । এই জীবনে কোনদিন ভুলতে পারব না ।

-সে আমি জানি । কিন্তু আর ভালবাসার কথা বোলো না । আমার ভয় করে ।

-আমারও ।

-তবে আজই শেষ । এইখানেই শেষ , কি বোলো ?

-হ্যাঁ এইখানেই শেষ ।

এইসব কথাবার্তা হয় দুপুরের সময় । আর সেইদিনই ,সন্ধের সময় জীমূত যায় শেফালিদের বাড়ি । হামেশাই যায় । দীনুদা দীনুদা বলে ঢোকে । আর কোনদিন আধা-ঘন্টা কোনদিন এক ঘন্টা আড্ডা মারে । তারপর বের হয় ।

দীনু মানে দীনবন্ধু । শেফালির স্বামী । বয়েসটা ওই পঁয়তাল্লিশের মত । আর শেফালি বড় জোরে বছর সাতেকের ছোট । কিন্তু শেফালিকে দেখলে পঁচিশের বেশি মনে হবে না । তামাটে গায়ের রঙ । ছিপছিপে শরীর ।

গাঁয়ের সম্পর্কে দীনু দাদু হয় জীমূতের । শেফালি বুড়ি দিদি ।

আর জীমূতের বয়েস ? কত হবে ? এখনো কলেজ থেকে বেরয়নি । একুশ কি বাইশ । তবে বেশ হাট্টাখাট্টা । পেশিবহুল চেহারা । জিম করে করে শরীরটাকে বানিয়েছে দানবের মতন । তার কাছে নবেন্দুও হার মানে । আর নবেন্দুর বয়েস দীনুর মত । যৌবনের মাঝামাঝি সময় ।নবেন্দুর ভরন্ত শরীর । শেফালির সংগে আজ সাত বছর ধরে সম্পর্ক । গাঁয়ের সবাই জানে । সেটা আর এখন কারও কাছে মুখরোচক গল্প নয় ।

শুধু জীমূতের মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে , এই যে শেফালি এতদিন ধরে স্বামীকে ঠকাচ্ছে , এটা কি তার স্বামী জানে না । মানে দীনু ? না কি জেনেও মেনে নিয়েছে ,বউয়ের পরকীয়া প্রেম ? অথবা শেফালিই বা কি ভাবে ম্যানেজ করে স্বামীকে ? ইত্যাদি ইত্যাদি ।

কখনও কখনও মনে করে শেফালিকেই জিগ্যেস করবে । কিন্তু তাতেও জীমূতের ভয় , যদি রাগ করে শেফালি ? রেগে গিয়ে বন্ধ করে দেয় রাসা । বা তার মুখের ওপর সপাট বলে দেয় কাল থেকে তুমি আমাদের ঘরে এসো না । তখন আসাটাও বন্ধ হয়ে যাবে ।

দীনুর সংগে আড্ডা মারলেও শেফালিই কিন্তু মূল টারগেট জীমূতের । শেফালিও সেটা বুঝেছে এতদিনে । শেফালিকে দেখলেই জীমূতের মন খারাপ ভাল হয়ে যায় । শিরা-উপশিরা পুলকিত হয় ।আর কেমন যেন একধরনের চিনচিন করা নেশা –লাগা অনুভূতিতে সর্বাঙ্গ ছেয়ে যায় । শেফালিকে একবার না দেখলে মন ছটফট করে । নীরস নীরস লাগে । খাঁ খাঁ করে বুকের ভেতরটা । কি আছে শেফালির ওই বৈশ্যামাফিক মুখে । চোখে ।

দিন সাতেক পেরিয়ে যায় । শেফালি ,নবেন্দু বন্ধুর মত আচরন করে । কিন্তু তাদের চোখের চাহনি অন্য ভাষা বলে । যা তারা বোঝে । যা তাদের পূর্ব পরিচিত ।

তবু সংযত রাখে নিজেদের । প্রতিশ্রুতবদ্ধ সংকল্প থেকে কেউ নড়ে না ।

কিন্তু ভালবাসা যে কোন বাঁধন মানে না , কোন নিয়মে সীমাবদ্ধ থাকে না সেটা তারা ক্ষনে ক্ষনে অনুভব করে । নিজেদের মনকে নিজেরাই শান্তি দেয় । করে ক্ষত বিক্ষত। তখন আরও বেশি আকর্ষণ অনুভব করে একে অন্যের প্রতি । তবু কেউ বলে না আর পারছি না। মনে করে আমি নয় , সে আগে ভাঙুক বন্ধুর প্রতিশ্রুতি ।

একদিন রাস্তার মাঝে দেখা দুজনের । বিকেলবেলা । এই সময় সাধারনত শেফালি বের হয় না ঘর থেকে । সেদিন বেরিয়েছিল । নবেন্দু দেখেই বুঝে গেছে , তার খোঁজেই বেরিয়েছে শেফালি । এমনি কতবার তাকে শেফালি খুঁজছে হন্যে হয়ে । দূর থেকেই চোখের ইশারায় তাকে যেতে বলেছে তাদের বাড়ি ।

সেদিন শেফালি সোজা গিয়ে দাঁড়াল নবেন্দুর কাছে । কথা বলল । অতন্ত মামুলি কথা । যে কথা না বললেও চলে । বিশেষ করে এই রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে । নবেন্দুর মাথায় কিছু ঢুকচ্ছিল না শেফালির উদ্ভট আচরণ । সে শুধু হ্যাঁ হুঁ করছিল । তারপর এক সময় শেফালি বলল , তুমি ভেবো না বাড়িতে সে নেই বলে তোমার সংগে এত গল্প করছি ।

আসল কেস এই বার নবেন্দু বুঝতে পারল । সে বলল ,না না ওই রকম কেন ভাবব ?

শেফালি বলল , দেখো আমি আগের সবকিছু ভুলে গেছি , আশা করি তুমিও সব ভুলে গেছ ?

-হ্যাঁ আমারও কিছু মনে নেই । এখন আমি আর তুমি তো বন্ধু ।

হুঁ ।‘ বলে খানিক ক্ষন চুপ করে থাকল শেফালি ।তারপর আবার বলল ,তুমি যেদিন প্রথম আমার সংগে রাত কাটালে ,সেইদিনের কথা আমি একদম ভুলে গেছি ।

-আমিও । আমার তো মনেই পড়ে না।

-না , যাই , ঘরে অনেক কাজ আছে । ‘বলেও যাওয়ার কোন জন্য পা বাড়াল না শেফালি । নবেন্দুর মুখের দিকে চেয়ে বলল , দেখ বাপু আগের মত রাতে গিয়ে কপাট ঠকঠক কোরো না যেন ।

-না , করব না ।

-আমার আবার দশটা না বাজলে ঘুম হয় না । তুমি নিশ্চয় দশটার আগেই ঘুমাও ?

-না , আমি আরও বেশি রাত জাগি ।

-এই দেখো , তোমার সংগে গল্প করলে আমার সময়ের খেয়াল থাকে না । না জানি লোকে দেখে কি না কি ভাবছে ? ‘ বলে শেফালি আর দাঁড়ায়নি । সোজা চলে যায় ঘরে ।

 




 

শেফালি তারাতাড়ি খাওয়া-দাওয়া সেরে শুয়ে পড়ে । ভাত রাঁধেনি । চায়ের সংগে মুড়ি খেয়েছে । দীনু নেই । শ্বশুর বাড়ি গেছে । কাল আসতে আসতে দশটা ।

ঘুম আসছে না শেফালির । নিজের পেরিয়ে আসা দিনের কথাগুলো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মাথায় । অস্থির করে তুলছে তাকে ।

শীতকাল । ঠান্ডা বেশ জমেছে । আটটা মানে এখন অনেক রাত । শুনশান পাড়ার রাস্তা । আর দু একটা কুকুর মৃদুস্বরে চিতকার করছে ঠান্ডায় । এমন সময় শেফালির বন্ধ দরজায় কে যেন ঠকঠক করল ।

শেফালি তড়াক করে উঠে বসল বিছানায় ।একরাশ আনন্দ এসে পাগল করে দিল তাকে । এ নিশ্চয় নবেন্দু । নবেন্দু ছাড়া কেউ হতেই পারে না। তাহলে নবেন্দু নিশ্চয় বুঝেছিল তার মনের কথা । বিকেলে হেয়ালি করে বলা কথাগুলোর মানে । ভালবাসার এই এক গুন , সব কথা খুলে না বললেও বুঝে নেয় । না বলা কথাও শুনতে পায় । শরীর যদি শরীরকে ডাকে , তবে উপায় নেই সেই ডাকে সাড়া না দিয়ে ।

শেফালি দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ায় । খোলার আগে তবু শেফালি বলে , কে ?

-আমি । ‘দরজার ওপারের লোকটা বলে ।

শেফালি আর দেরি করেনি । খুব সাবধানে দরজা খোলে । যাতে শব্দ না হয় । শব্দ হলে লোকে জেনে যাবে । আর জানলেই বা কি !

দরজা খুলেই নবেন্দুকে এক ঝটকায় ভেতরে টেনে ঢোকায় শেফালি । তারপর আবার দরজা বন্ধ করে আস্তে আস্তে । আর অনুচ্চ গলায় জিগ্যেস করে , কেউ দেখেনি তো আসার সময় ?

নবেন্দু বলে , না ।

ঘরের ভেতর ঘন অন্ধকার । কিছুই ঠাহর করা যায় না । শেফালি হাত বাড়িয়ে নবেন্দুকে ছোঁয় । নবেন্দুর গায়ে হাত বোলায় । আবেগঘন গলায় বলে , আমি জানতাম তুমি আসবে ।

নবেন্দুকে নিয়ে গিয়ে বসায় নিজের বিছানার ওপর । নিজেও বসে নবেন্দুর গা ঘেঁষে । এক শরীর আর এক শরীরের উষ্ণ সুখ অনুভব করে । শেফালি বলে , জানো সেদিন যখন আমরা বন্ধুত্বের সম্পর্কে নিজেদের বাঁধার কথা বললাম , সেই তখন থেকে শুধু তোমার ভালবাসার কথা বার বার মনে পড়েছে । এক মিনিটের জন্যও তোমাকে ভুলতে পারিনি । ভোলার চেষ্টা করলে মনে হয়েছে তোমাকে আরও আরও বেশি করে ভালবেসেছি । আরও বেশি করে অনুভব করেছি তোমার ভালবাসা ।

নবেন্দু চুপচাপ শেফালির কথা শোনে ।

শেফালি বলে , এই জীবনে আর কোনদিন তোমাকে ভুলতে পারব না । তুমি আমাকে ভুলতে পারবে ?

অনুচ্চ গলায় নবেন্দু বলে , না ।

শেফালি বলে , আমার কি মনে হয় জানো ? মনে হয় আমাদের এই সম্পর্ক এই জন্মের নয় ।

নবেন্দু সংক্ষেপে বলে ,হুঁ ।

শেফালি বলে , কি রাগ করছে ?

-না ।

তাহলে কথা বলছ না যে খুব ?

-বলছি ত ।

-তোমাকে আগের মত –

কথা শেষ করতে দেয় না নবেন্দু , তার আগেই সে শেফালির মুখ চেপে ধরে সেই অন্ধকারে । আর বাতাসের মতো স্বরে ফিসফিস করে বলে , বেশি কথা বোলো না । জানোই ত দেওয়ালেরও কান আছে ।

বলে নবেন্দু হাত সরিয়ে নেয় শেফালির মুখ থেকে ।

শেফালি তখনকার মত আর কোন কথা বলেনি । প্রায় আধঘন্টা পর যখন তাদের দুজনের শরীর ও মন পরিতৃপ্ত , তখন ফের কথা বলা শুরু করে শেফালি । বলে , তুমি যে আমাকে এত ভালবাস , আমি ভাবতে পারিনি । তোমাকে না ভালবাসলে আমি বুঝতেই পারতাম না ,আমার জীবনে এত সুখ আছে ।জীবন এত মধুর । এই আজকের ভালবাসা আমি জীবনে কোনদিন ভুলব না ।

নবেন্দু কথা বলে না , চুপ করেই থাকে ।

শেফালি এইবার নবেন্দুর গা ছুঁয়ে ফের বলে , কথা দাও আমাকে ছেড়ে কোনদিন যাবে না ।

নবেন্দু বলে , কথা দিলাম ।

তখন শেফালি নবেন্দুর গালে আরও একবার চুমু খায় । তারপর বলে , এইবার এসো ।

দরজা খুলে দেয় শেফালি । নবেন্দু বের হবে এমন সময় আবার নবেন্দু একটা হাত ধরে বলে , যেদিন ডাকব ,সেইদিন তোমাকে আসতে হবে ?

-আসব ।

নবেন্দু ঘর থেকে বেরিয়ে যায় ।

শেফালি দরজা বন্ধ করে । নিজের বিছানায় গিয়ে শোয় । কিন্তু ঘুম আসে না । আসবেও না আর । তখনো তার শিরায় শিরায় প্লাবিত হচ্ছে সেই পরম আনন্দ আর চরম তৃপ্তির সুমধুর রেস । আহা , মাগো কি সুখ । কি চরম শান্তি । কি সর্বনাশা অনুভূতি । উফ যদি না ভালবাসতাম তবে জানতাম না সুখের শিখরে পৌঁছানো যায় ।স্বর্গে বিচরণ করতে পারে মানুষ । নবেন্দু তোমাকে কি বলে ধন্যবাদ দেব । ওঃ নবেন্দু –

প্রায় ঘন্টা খানেক পেরিয়ে যায় । ঘুম আসে না শেফালির চোখে ।আসবে না ।

এমন সময় আবার শেফালির দরজায় কে ঠকঠক করে ।

শেফালি শুনে চমকে ওঠে । আবার কে , নবেন্দু কি ফিরে এল ?

( ৪ )

আবার ঠকঠক শব্দ ।

শেফালি ওঠে গিয়ে দাঁড়ায় দরজার কাছে । আস্তে করে বলে , কে ?

-আমি । আমি নবেন্দু ।

আবার কেন এল । ‘ একরাশ বিরক্তি ঝরে পড়ে শেফালির গলায় ।

-দরজা খোলো , তারপর সব বলছি ।

শেফালি দরজা খুলতেই নবেন্দু ঢুকে যায় ঘরের ভেতর । যেমন আগে ঢুকত ।

ঘর সেই আগের মত অন্ধকার । কিছু ঠাহর করা যায় না।

শেফালি দরজা বন্ধ করে দেয় । বলে , কেন এলে আবার ?

নবেন্দু বলে , কেন এলে মানে ? আমি তোমাকে ভালবাসি । আর জানি , তুমিও আমাকে ভালবাস । বলো বাস কি না ?

-বাসি । কত বার বলব ?

নবেন্দু একটু চুপ থেকে কি যেন ভাবে । তারপর বলে , আজ বিকেলে যখন তুমি কথা ঘুরিয়ে আমাকে জানালে যে দীনু বাড়িতে নেই ,তখন থেকে তোমার কাছে আসার জন্য ,তোমাকে কাছে পাওয়ার জন্য কি অস্থিরই না হয়ে ওঠেছি । এই মনের অবস্থার কথা একবার যদি বুঝতে পারো ,তাহলে এমনি কথা বলতে পারতে না । না জানি আমি পাগল হয়ে যাব ।

বলতে বলতে শেফালিকে কাছে টেনে নেয় নবেন্দু ।

শেফালি বাধা দেয় না , কিন্তু মনে সেই উচ্ছ্বাস নেই , সেই উদ্মাদ-করা আবেগ নেই । অনিচ্ছুক মনে চাপা বিরক্তির স্বরে বলে , ছাড়ো আমাকে ? আমার সব সময় ভাল লাগে না ।

-সব সময় কোথায় ? কতদিন পর এই আসছি ।

-এই আসছি মানে ? ‘ শেফালির বুক ধক করে ওঠে।

নবেন্দু বলে , তুমি সেদিন যখন বন্ধুত্বের কথা বললে তখন আমার মনে হয়েছিল , আমি বন্ধু হয়ে থাকতে পারব । তাই হ্যাঁ করেছিলাম । কিন্তু এতদূর এগিয়ে আসার পর বন্ধু হয়ে থাকা সম্ভব নয় ।

বলতে বলতে নবেন্দু শেফালিকে জড়িয়ে ধরে। আবেগঘন গলায় বলে , তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না ।

-তাই বলে সব সময় ? ‘ অসহ্য বিরক্তি প্রকাশ করে শেফালি ।

নবেন্দু রেগে যায় মনে মনে । বলে , বার বার এক কথা বলে কেন বিরক্ত করছ ?

শেফালি বলে , এই ত একঘন্টা আগে তুমি গেলে , আর এরই মধ্যে আবার—

-কি বলছ তুমি ? আমি ত এই আসছি ।

-মিছে কথা ।

-মিছে নয় , সত্যি বলছি , আমি এই আসছি ।

শেফালির বুক ধক করে ওঠে । কাঠ হয়ে যায় সে ।ভাবে , নবেন্দু যদি এখন আসে , তবে তখন কে এসেছিল ? কে সেই বহুরূপী । যে এসেই তাকে ডলে ,মুচড়ে মর্দিত করেছে । সুখের চরম শিখরে পৌছে দিয়েছিল , তাকে অশেষ আনন্দ দিয়ে আনন্দ নিয়ে চলে গেল । কে সে ? কে ?

নবেন্দু বিস্ময় প্রকাশ করে বলে , কেউ এসেছিল না কি শেফু ?

শেফালি বলে , হ্যাঁ ,এসেছিল্ ।

নবেন্দুর বিস্ময় আরও বেড়ে যায় । শেফালির উপর সন্দেহ জাগে । বলে , কে ?

শেফালি এবার আর ভুল করতে চায় না । সে সুইচ টিপে আলো জ্বালায় । আলোয় ঘর ভরে ওঠে । নবেন্দুকে দেখে । হাঁ নবেন্দুই । তখন নবেন্দুর চিবুক ধরে সে । মায়াবী চোখে কিসের যেন সংকেত । ঠোঁটে চটুল হাসি । হেসে হেসে বলে , এই মানুষটা এসেছিল ।

নবেন্দু কিছু বুঝতে পারে না শেফালির কথা । অবাক হয়ে শেফালির দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে বলে , আমি আবার কখন এলাম ?

শেফালি বলে , এসেছিলে , আমার স্বপ্নে এসেছিলে । রাজকুমারের মত ।

নবেন্দুর সন্দেহ ও বিস্ময় কেটে যায় । চিন্তা মুক্ত হয় । মনে মনে ভাবে শেফালি আমাকে এত ভালবাসে , আমাকে স্বপ্নে দেখে , আমি তো বিরাট ভাগ্যবান। মুখে বলে , তুমি আমাকে এত ভালবাস ?

-হুঁ ।

-জানো শেফু , তুমিও আমার স্বপ্নে আস ।

-মিছে কথা । ‘ বলেই বেশ কিছুক্ষন চুপ করে থাকে শেফালি । কি যেন ভাবে , তারপর আবার বলে , তুমি কেন এলে ? তোমাকে না বলেছি বন্ধুর মত থাকতে ?

-তা আর সম্ভব নয় । ‘ অসহায়ের মত বলে নবেন্দু ।

-কিন্তু এরকম ভাবে আর চলতে পারে না । জীবন ছারখার হয়ে যাবে ।

-এ কথা আগে ত বোলোনি ? এখন কেন বলছ ?

-বলছি এজন্যই যে দীনু এখন সন্দেহ করে আমাকে । তাছাড়া এক রকম চলে না সবদিন ।

মনে মনে রেগে যায় নবেন্দু , হতাশও হয় । সে কোনদিন ভাবেনি শেফালি তাকে এমনি কথা বলবে । শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বলে , তুমি কি চাও ,আমাকে খুলে বল ?

শেফালি কোন কথা বলে না , চুপ করে থাকে । নবেন্দু বলে , তুমি কি সত্যি সত্যি আমাদের এতদিনকার সম্পর্কটা ভাঙতে চাইছ ?

এবারেও শেফালি আগের মত চুপ করে থাকে ।

নবেন্দু বলে , আমি তোমাকে ভালবাসি । তোমার ইচ্ছায় আমারও শেষ ইচ্ছা । তুমি যখন চাইছ , সম্পর্কটা শেষ হোক তখন তাই হোক । আজ এইখানেই শেষ ।

বলেই নবেন্দু বেরিয়ে আসছিল , ওমনি শেফালি তার একটা হাত ধরে খপাক করে । কিন্তু মুখে কোন কথা বলে না । নবেন্দুর চোখে চোখ রাখে ।

নবেন্দুও চেয়ে থাকে শেফালির মুখের দিকে । কি যেন খোঁজে । বল এইভাবে আমাকে আর আটকিয়ো না । যেতে দাও ।

শেফালি হাত ছেড়ে দেয় । নবেন্দু ঘর থেকে বের হয় । আস্তে আস্তে দরজা বন্ধ করে দেয় শেফালি । তারপর নিজের বিছানায় গিয়ে শরীর এলিয়ে দেয় । ঘুমানোর চেষ্টা করে । ঘুম আসে না । শুধু সেই বহুরূপীর কথা মনে পড়ে । যে তার জীবনকে চরম আনন্দে , সুখে ,বিচিত্র স্বাদে কানায় কানায় ভরে দিয়েছিল এক লহমায় । আবার কি সে আসবে এই রাধা কুঞ্জে । হে মদনমোহন মুরারি , এই রাধা তোমার পথ চেয়ে আছে ।

কিন্তু কে এই মুরারি ? নৈশবিহারী ? কে হতে পারে ?

তবে কি জীমূত ?

( সমাপ্ত )

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 1   Average: 5/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।