নীল ছবি

গল্প- নীল ছবি

লেখা- শুভজিৎ

 

জ বহুদিন পর এক বছরের পুরোনো ফটো আলবাম খুঁজে পেলাম ।
এলবামের প্রথমেই আমার প্রিয় বন্ধু রাখির একটা ছবি।
নীল পার শাড়ি, মুখে মেকআপ , গায়ে গয়না ।
তার পর রাখির আইবুড়ো ভাত, অধিবাস, ঘাট নেমন্তন্ন এর ছবি। এরপর বর এসেছে। মা বরণ করছেন, বর আসনে বসে বয়স 23 এর সাধন । শুভদৃষ্টি মালাবদল বিয়ের সব দৃশ‍্য পর পর সুন্দর করে সাজানো হয়েছে এলবামে।
ছবিটা দেখে আমার মনের
দরজার টোকা মারলো সেই অভিশপ্ত দিনটা ।

18 ফেব্রুয়ারি, 2019
হঠাৎ শুনতে পেলাম রাখি দুদিন পর বিয়ে।
ছেলের নাম সাধন আগারওয়াল। ছেলে দিল্লি তে বড়ো কম্পানীতে কাজ করে।
ছেলেটার সঙ্গে রাখির ফেসবুকে পরিচয়।
নয় মাসে আগে রাখির সঙ্গে পরিচয়।
তাই এখন প্রেম পর্ব শেষ করে বিয়ের সিদ্ধান্ত সাধনের।

 




 

 

রাখির আত্মীয়- রা হঠাৎ করে এই বিয়ে কথা শুনে ভালো করে খোঁজ খবর নিতে বলেছিলো।
কিন্তু রাখির সাধনের প্রতি বিশ্বাস দেখে রাখির মা বাবা এটা প্রয়জন মনে করে নি।

তাড়াতাড়ি বিয়ে ঠিক হওয়ায় দূরের আত্মীয়রা তেমন কেউ আসতেই পারে নি। দেখতে দেখতে দু-দিনের মাথায় বিয়ে হয়ে গেলো।
রাখির বিয়েটা যে অমন হুট করে হয়ে যাবে কেউ ভাবে নি।

নতুন শাড়ি গহনায়, টুকটুকে লাল সিঁদুরে আমার কুড়ি বছরের চেনা প্রিয় বন্ধু রাখিকে ওদিন দেখেছিলাম অচেনা রূপে ।
আমরা বন্ধুরা বিয়েতে অনেক মজা করলাম । তার পর রাখি বাড়ি শূন্য করে চলে গেলো শশুর বাড়ী।

তারব পর …….
একদিনের জন‍্য দ্বিরাগমনে এসে সব আত্মীয়র মাঝে রাখির মুখে শুনতে পেলাম শুধু শ্বশুর বাড়ির প্রশংসা আর গল্প। রাখি যেন আমাকে ভুলেই গেছে বিয়ের পর।

কিছুক্ষন পর জানতে পারলাম, সাধনের অফিসে ছুটি কম তাই একদিন থেকেই ওরা চলে যাবে । তাই সেদিন আমি আর বাড়ি গেলাম না ।খুব আনন্দে কেটেছিল সেই সন্ধ‍্যাটা।
তার পর সকালে শুনতে পেলাম রাতেই নাকি চলে গেলো রাখি ।
সময় ও নিজের মত বইতে থাকলো। কেটে গেলো কয়েক মাস ।

হটাৎ একদিন রাখির মা- বাবা আমার বাড়ি আসলো। চোখে জল শুঁকিয়ে দাগ পড়ে আছে মুখে।

আমি তাদের বাড়ির ভিতরে নিয়ে গেলাম ।
জানতে পারলাম , মাস দু-এক হয়ে গেলো রাখির কোনো খবর নাই। ফোন, sms সব বন্ধ।
প্রথম প্রথম আত্মীয় বন্ধুরা আসতো, তবে তারা এখন আর আসে না। সবার ফোন বন্ধ।
রাখির ফোন না পেয়ে প্রথমে ওর রাখির শ্বশুর শাশুরী কে ফোন করেছিল রাখির বাবা । নম্বর না লাগায় অবাক খুব চিন্তাও আছে।
কথা গুলো শুনে আমি অবাক হয়ে গেলাম। মনে অজানা ভয় আমাকে আকড়ে ধরল ।
রাতে আর ঘুম আসলো না চোঁখে।
সকালে আমি আর রাখির বাবা নিতাই বাবু থানায় গিয়ে জানতে পারলাম সাধনের ( রাখির বরের ) নাম্বার টা ডিটেলস এবং পেপার সব ভুলভাল। তার চেয়েও বেশি অবাক যখন জানলাম যে রাখির ফোনটার লাষ্ট লোকেশন চেন্নাই ।

 




 

 

তারপর , রাখির শ্বশুর বাড়ি গেলাম । বাড়ি ওয়ালা সুকান্ত ভট্টাচার্য বললেন , ঐ বাড়িটা ওরা ভাড়া নিয়েছিল কয়েক মাসের জন‍্য। তিন মাস আগে ছেড়ে দিয়েছে।

বাড়ি ফিরে রাখির বাবা নিতাই রাখির একটা ফটো নিয়ে ঘরের এক কোনে বসে ছিলেন সারা রাত। আর রাখির মা সারা দিন কেঁদে কাটিয়েছিলেন কয়েক দিন।
আমি আর ওর বন্ধুরা অনলাইনে তন্ন তন্ন করে সার্চ করেছিল সাধনের প্রোফাইল। কিন্তু কোনো কাজ হলো না। প্রোফাইল টা উড়ে গেছিল।

সব সোস্যাল সাইডে রাখির ছবি দিয়ে পোস্ট করলাম যদি কেউ খোঁজ দিতে পারে।
● পরে ফেসবুকেই একজন জানিয়েছিল , সাধনের বাবা-মা কে তারা চিনতেন, তবে অন‍্য এক ছেলের বাবা হিসাবে। দু মাস আগে তাদের বাড়িও মেয়ে দেখতে গেছিলেন ওনারা। মেয়ে পছন্দও করেছিলেন ছেলের জন‍্য। এক মাসের মধ‍্যে বিয়ের জন‍্য চাপ দেওয়ায় ওনারা রাজি হন নি। তাই বিয়ে সম্ভব হয় নি ।

● আরেকজন জানিয়েছিল প্রায় এমন দেখতে একটি ছেলে তার মামাতো বোনকে পছন্দ করেছিল। দিল্লি অফিসের ঠিকানা চাওয়ার পর যোগাযোগ করে নি।
এসব শুনে আমার মন ভেঙে গেলো। এদিকে রাখির বাবাও প্রতিদিন বলছে খবর পাওয়া গেলো কি না। আমি পাথরের মত চুপ হয়ে গেলাম।
এসব কথা শুনে , পরিবারের আত্মবিশ্বাস কমছিল ধীরে ধীরে।
হঠাৎ একদিন দুচিন্তায়এ মারা গেলেন রাখির বাবা নিতাই বাবু ।
আমি রাখির কাছের বন্ধু আমাকে নিতাই বাবু নিজের ছেলের মত দেখে তাই রাখির মার দায়িত্ব একটু হলেও আমার কাধে এসে পড়ল।
থানায় করা হলো মিসিং ডাইরি।
খবরের কাগজে রাখির ছবি , ঠিকানা আর আমার ফোন নাম্বার দিয়ে ছাপা হলো। কারন রাখির মা স্বামী বিরহে আর রাখির চিন্তাও মাথা ঠিক নেই ।

● খবরেরব কাগজে রাখির বিজ্ঞাপন দেখে হঠাৎ একদিন আমার ফোনে একটা ফোন ঢুকল । অচেনা এক ভদ্রলোক আমাকে দেখা করতে বলে ।

আমি আর আমার এক বন্ধু দুজন ওদিনই
সেই লোকের সঙ্গে দেখা করি।
গিয়ে জানতে পারি ,
ভদ্রলোক ও নিজের মেয়ের খোঁজ করছেন একই ভাবে।
ভদ্রলোক আমার সব কথা শুনে বলেন তাদের গল্পটাও এক, শুধু ছেলেটা আলাদা। এর পর উনি আমাকে করুন কন্ঠে বলেন – “মেয়েগুলোর সাথে খুব খারাপ হয়েছে বুঝতে পারছো নিশ্চই, কিন্তু কতটা খারাপ তোমার কোনো ধারণা নেই । এই বলে কেঁদে ফেলল লোকটা।
আমার হাতে একটা সিডি দিয়ে বলেন – “দেখে সহ‍্য করতে পারবেনা জানি। তবু দিলাম।
তার পর বলল,
এই যে লোক গুলো খুব খারাপ মাসখানেকের জন‍্য বাড়ি ভাড়া নেয় । ভালো মেয়েদের পটিয়ে বিয়ে করে তার পর হওয়া হয়ে যায়। এগুলো সব সাজানো ফাঁদ।
আমি কিছু বলার আগেই লোকটা বলল ,
খোলা বাজারে একটা মেয়ে কে তিন চার লাখে কিডন‍্যাপ করে বিক্রি করা হয়।
তাহলে এই লোক গুলো বিয়ের বাহানায় খরচা করে এত খরচ করে মেয়ে তুলে কি লাভ এটাই ভেবে থাকলে ? এর উত্তর পাবে সিডি তে ।

আমি এক মেয়ের বাবা, তোমার থেকে বয়সে অনেক বড়। কিন্তু এই নীল ছবিগুলো আমি বাধ‍্য হয়ে দেখেছি। বিদেশে প্রচুর ধনী অমানুষ আছে । উত্তেজনার জন‍্য ওরা কি না করে এগুলো তুমি জানো না।

এখন নতুন শুরু হয়েছে এ সব সিডির ব‍্যবসা। নতুন বিবাহিত দম্পত্তির প্রথম রাত, রেপের ছবি, মেয়েদের ওপর শারীরিক অত‍্যাচারের ভিডিও এসব দেশে লাখ লাখ টাকায় বিক্রি হয়।
এর জন্য দরকার অনেক আলাদা আলাদা মেয়ে । একজন দিয়ে তো কাজ হয় না ।
তাই মেয়েদের এভাবে ফাঁঁসিয়ে এ ব‍্যবসা ভারত সহ সমস্ত পৃথিবীতে এমন চলছে ।

 




 

পুলিশ এদের হাতের মুঠোয়। বড় বড় মন্ত্রীরা এতে জড়িত। একটা মেয়েকে এরা কয়েক মাস এ ভাবে ইউস করে তারপর মেয়েগুলো কোনো যৌন পল্লিতে রেখে শুরু করে নতুন ব্যবসা ।
খুব খারাপ লাগছে বলতে নিজের মেয়ের খোঁজ করতে করতে তোমার বন্ধু রাখির ঘটনা জানতে পারি সোশ্যাল সাইডে । তাই দেখে তোমায় জানালাম।
জানো, আমার মেয়েরও এই পরিণতি। কথাটা বলে লোকটা চোঁখের জল মুছতে মুছতে আবার বলল,
মেয়েটা ঠিক কোথায় আছে, কোন দেশে তাই জানি না । তবু যদি আমরা এক জোট হয়ে চেষ্টা করি হয়তো কিছু করতে পারবো। অন্তত মানুষ সচেতন হলে এ সব ঘটনা কমবে। মেয়ে বিয়ে দেওয়ার আগে ছেলের সম্পর্কে লোকে ভাল করে খোঁজ নেবে।” এই বলে লোকটা চলে গেলো ।

আমিও বাড়ি ফিরে আসলাম।
তার পর শুভ বাড়িতে আসল । সিডিটা খামের থেকে বের করে চমকে উঠল ।
শরিল এ ঘাম ঝরতে শুরু হয়েছে ।
অন্ধকার ঘরে বসে ছিল শুভ ।
ঘর অন্ধকার । সিডিটা টেবিলে, সাহস হয়নি চালিয়ে দেখতে।
কারন কভার ফটোতেই যে নগ্ন মেয়েটির ছবি সেটা রাখি ।
হঠাৎ দরজায় কেউ টোকা দিলো।
ধীর পায়ে উঠে শুভ দরজা খুলতেই দেখে সায়ন ( কলেজের বন্ধু) । ঢুকেই বকবক শুরু করে দিল, ওকে নিজের ঘরে নিয়ে যাই।
সায়ন বলল জানিস ভাই দিদির বিয়েটা হঠাৎ করেই ঠিক হয়ে গেল । দিদির এক ফেসবুক ফ্রেন্ড ছেলেটা । ছেলের ইঞ্জিনিয়ার দিল্লি চাকরী করে সেলারি ও অনেক ।
দিদি কে দেখতে এসেছিল গতকাল। কোনো দাবী নেই। কিন্তু ছেলের ছুটি কম তাই তাড়াতাড়ি বিয়ে টা সম্পূর্ন করতে হবে। ঠিক করলাম রেজিস্ট্রি করে দিবো সামনের সোমবার। তুই থাকিস কিন্তূ।
তার পর সায়ন নিজের মোবাইল থেকে ছেলেটার ফটো বের করে আমাকে দেখাল।

না, এই ছেলেটিকে আমি চেনে না। তবে ছেলের পাশের মুখটা বড্ড চেনা,
তাড়াতাড়ি রাখির বিয়ের ফটো গুলো বের করলাম ।
হঠাৎ সায়নের চোখ গেলো টেবিলে রাখা সিডি র মধ্যে । ।
সায়ন বলল , ভাই, এগুলো কি দেখছি, তোর যে এ গুন আছে জানতাম না ।
আমি কিছু বললাম না।
সিডির দিকে হাত বাড়ালো সায়ন।
সিডির দিকে হাত বাড়াতেই ওর হাতটা খপ করে ধরে ফেললাম ।
কাঁদো কাঁদো সুরে কেটে কেটে বলে – তোর দিদির বিয়েটা আটকা । বিয়েটা আটকা।
– শুভজিৎ

 




গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 5   Average: 3.8/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।