নেমেসিস (দ্বিতীয় পর্ব)

নেমেসিস

অভিষেক দেবরায়

 

(দ্বিতীয় পর্ব)

 

(৬)

রাত প্রায় ন’টা । একা ফ্ল্যাটে বসে আছে শ্রী । একটা চাপা আতঙ্ক ওকে ঘিরে রেখেছে । ভাল লাগছে না । এ এক দম বন্ধ করা আতঙ্ক । এর থেকে কি কোনও মুক্তি নেই ? কোনও অন্ধকার অধ্যায় আবার ফিরে এসেছে । শ্রী কিছুতেই শান্তি পাচ্ছে না । বারবার শুভর মৃত্যু ওকে নাড়া দিচ্ছে । কর্মফল ! বারবার চাবুকের মত এই শব্দটি এফোঁড় ওফোঁড় করে দিচ্ছে ওকে ।

এমন সময় কলিং বেল বাজল । শ্রী একটু ভয় পেল । কিন্তু তবু উঠল । লেন্সের মধ্য দিয়ে দেখল দরজার একদম কাছে দাঁড়ানো কেউ, দরজা ঘেঁষে দাঁড়ানোয় মুখ দেখা যাচ্ছে না । শুধু গায়ের টি শার্ট দেখা যাচ্ছে ।

“কে ?”

বাইরে থেকে ছেলেটির গলা ভেসে এল ।

“একটা ডেলিভারি আছে ম্যাম ।”

শ্রী অবাক হল ।

“ডেলিভারি ! এখন ! কীসের ?”

“ডঃ অরিন্দম বাসুরায়ের । একটা শেভিং কিট ।”

শ্রী দরজা খোলে না । কিছু একটা ভাবতে থাকে ।

“ম্যাম, একটু তাড়াতাড়ি করবেন প্লীজ ? আমাকে আবার রিপোর্ট করতে হবে ।”

শ্রী একটু ভেবে দরজা খোলে । এক যুবক দাঁড়ানো । পরনে ডেলিভারি ম্যানের পোশাক । কাঁধে একটা ব্যাগ । শ্রী যুবকের মুখের দিকে তাকায় । সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্কে চিৎকার করে দরজা বন্ধ করে ভেতরে ঢুকে যায় । মনে হল বুকের রক্ত হিম হয়ে জমে গেল যেন ।

মাইকেল ! হ্যাঁ মাইকেল দাঁড়ানো বাইরে । বীভৎস সেই মুখ । আর সেই হাসি । শ্রী স্পষ্ট দেখেছে ।

 




 

 

বাইরে আর কারো শব্দ পাওয়া যায় না । সাহস করে শ্রী লেন্স দিয়ে দ্যাখে বাইরে কেউ নেই । ভয়ে কেমন হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে শ্রীর । সে এখন নিশ্চিত মাইকেলের আত্মা শ্রীকে খুঁজে বেড়াচ্ছে । শ্রী অনুভব করছে ওকে কেউ অনুসরণ করছে ঘরের ভেতর, কারো নিঃশ্বাসের শব্দ যেন সে শুনতে পাচ্ছে, কিন্তু পেছন ফিরে কাউকে দেখতে পাচ্ছে না । কখনো মনে হচ্ছে জানালায় কেউ দাঁড়িয়ে কিন্তু ওকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে সরে যাচ্ছে ।

এমন সময় হঠাৎ বাইরের দরজার লকে একটা শব্দ হল । শ্রী তাকায় । আস্তে আস্তে লক খুলে দরজাটা খুলতে থাকে । শ্রীর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে । চিৎকার করতে গিয়েও যেন গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোয় না । একটা দেওয়ালের কোণে নিজেকে প্রাণপণে আড়াল করে রেখেছে ।

দরজা খুলল । শ্রীকে অবাক করে দিয়ে ঘরে পা রাখল শেবা, সঙ্গে অরিন্দম । শ্রী হাঁফ ছেড়ে বাঁচল । শেবাকে দেখে অবাক হল । অরিন্দম দরজা বন্ধ করে দিল ।

অরিন্দম ডাকল – “শ্রী ! শ্রী !”

শেবা এদিক ওদিক দেখছে – “Mom…কোথায় গেলে !”

শ্রী যেন প্রাণ ফিরে পায় । শেবাকে কিছু বুঝতে দিলে চলবে না । নিজেকে একটু সামলে আস্তে আস্তে পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে । ভাল করে দুজনের মুখের দিকে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ । অরিন্দম অবাক হয়, কিন্তু পরিস্থিতি সামলাতে অন্য প্রসঙ্গ তোলে ।

অরিন্দম হেসে বলে – “ক’ দিন ধরে মেয়েকে দেখতে চাইছিলে তাই হস্টেলে বলে স্পেশাল ছুটি করিয়ে নিয়ে এসেছি সাত দিনের জন্য । এখন খুশি তো ?”

আচমকা শেবাকে জড়িয়ে ধরে শ্রী । শেবা অবাক হয়, কিন্তু কিছু বলে না । অরিন্দমের মুখ মুহূর্তের জন্য কঠিন হয় কিন্তু নিজেকে সামলে নেয় । শেবার মাথায় হাত রেখে একটু হেসে ভেতরে চলে যায় । শ্রী শেবাকে জড়িয়ে রেখেছে ।

(৭)

খেতে বসেছে তিনজন । শ্রী মেয়েকে পেয়ে একটু যেন মনে জোর পেয়েছে । নিজের হাতে কিছু রান্না করেছে মেয়ের জন্য । টেবিলে রাখা কোল্ড ড্রিঙ্কসের বোতল, শেবা ভালবাসে তাই অরিন্দম নিয়ে এসেছে । অরিন্দম আর শেবা কথা বলছে । শ্রী চুপচাপ খাচ্ছে ।

চিকেনের টুকরো মুখে দিয়ে শেবা বলে – “পড়াশোনার এত চাপ, মাঝে মাঝে I feel exhausted !”

অরিন্দম স্মিত হাসে ।

“এখনই তো নিজেকে তৈরি করার সময় মা । তারপর দেখবি কোথা থেকে কোথায় চলে যাস ।”

“বাড়ি ছেড়ে থাকতে ভাল লাগে না Dad !”

“এটাও একটা experience my dear ! আমাকেও মেডিকেল কলেজে থেকে পড়াশোনা করতে হয়েছিল । তখন তো আর কোলকাতায় আমাদের কেউ ছিল না ।

শেবা চুপচাপ খেতে থাকল । অরিন্দম আড়চোখে শ্রীকে দ্যাখে । শ্রী যেন কি চিন্তা করছে মাঝে মাঝে । সেটা দেখে একটু বিরক্ত হয় । কিন্তু মেয়েকে বুঝতে দেয় না ।

“কোলকাতার মেয়ে তুই – সাউথ পয়েন্টে পড়াশোনা – দুর্গাপুর কেমন লাগছে ?”

“দারুণ !” চোখমুখ বেশ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে শেবার ।

“Durgapur is a nice place Dad ! এত peaceful, এত সুন্দর…….I am in love with that place……yet…….I miss you all !”

অরিন্দম মৃদু হাসল । এই কথাটা শ্রীর কানে গিয়েছে । শেবার মাথায় হাত রেখে একটু আদর করল আলতো করে ।

“তা হ্যাঁরে কলেজে বন্ধুবান্ধব হয়েছে ?”

“হ্যাঁ ।”

 




 

“বয়ফ্রেন্ড ?”

শেবা লজ্জা পেয়ে যায় । অরিন্দম হেসে ওঠে ।

“এই না হলে তুই অরিন্দম বাসুরায়ের মেয়ে ? এই তো চাই । তবে দেখিস, ছেলেটা যেন ভাল হয়, অনেস্ট হয় । তাহলেই হবে ।”

শেবা লাজুক মুখে চুপ করে থাকে । তারপর মায়ের দিকে তাকায় ।

“What’s wrong with Mom ? শরীর ভাল নেই ?”

শ্রী একটু অপ্রস্তুত হয় । কি বলবে বুঝে উঠতে পারে না । অরিন্দমের দিকে দ্যাখে । অরিন্দম হেসে সামলায় ।

“হ্যাঁ রে । ওই একটু প্রেশারটা কমে গেছে । চিন্তা করিস না আমি ওষুধ দিয়েছি দু’ একদিনের মধ্যেই সেরে যাবে । আর এখন তো তুই আছিস কিছুদিন ।”

শ্রী হাসে । শেবা হাসে, তবে কতটা আশ্বস্ত হয় বোঝা যায় না ।

(৮)

রাত তখন অনেক । পাশের ঘরে শুয়ে আছে অরিন্দম আর শ্রী । এই ঘরটা শেবার । নিজের পছন্দমত এই ঘরটা সাজিয়েছে শেবা । অরিন্দম মেয়ে অন্তপ্রাণ । যেভাবে বলেছে যা বলেছে তাই মেয়েকে এনে জোগান দিয়েছে । শ্রী অনেকসময় বকাবকি করলেও শোনেনি অরিন্দম । ও যতই কঠিন হোক মেয়ের কাছে একেবারে বশ । হয়তো সব মা বাবা এমনই হয় ।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে শেবা । বেশিরভাগ ফ্ল্যাটেই এখন আলো নিভে গিয়েছে । কমপ্লেক্সের আলোগুলো জ্বলছে । নীচে দুজন সিকিউরিটি গার্ড মিলে কথা বলছে । কতদিন পর কোলকাতায় ফিরে কি ভাল লাগছে !

“আসলে Mom একটু অসুস্থ তাই হঠাৎ করেই চলে আসতে হল ।……….So sorry baby !……….জানিনা গো, Dad বলছে low B.P….তবে জানিনা, আসার পর থেকেই Mom-কে কেমন একটা লাগছে ।………আমার মনে হচ্ছে Mom আর Dad serious কোনও problem-এ আছে কিন্তু আমায় বলতে চাইছে না ।………..What ?……তুমিও কোলকাতায় এসেছ ?………আগে বলবে তো ?……Interview আছে ?………Great ! All the very best Ronit !……..চাকরি হয়ে গেলে কিন্তু আমার Mom Dad-এর সাথে কথা বলে যাবে ।……..Meet you tomorrow…..bye……”

মনটা যেন আরও চাঙ্গা হয়ে গেল রনিতের সাথে কথা বলে । ঘরে যেতে যাবে এমন সময় হঠাৎ যেন মনে হল শেবার পাশ থেকে একটা ছায়া সরে গেল । শেবা কেমন একটু চমকে উঠল । কই ! কেউ তো নেই ! তাহলে ! তাহলে কি চোখের ভুল ? কিন্তু স্পষ্ট যেন মনে হল……আর যদি কেউ থাকেও তাহলে সে যাবে কোথায় ! চোদ্দ তলার বারান্দা থেকে নিশ্চয়ই নীচে ঝাঁপ দেবে না ।

কিছু বুঝতে পারল না শেবা । আর কোনোদিকে না তাকিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল ।

(৯)

অরিন্দম আর শ্রী দুজনেই জেগে আছে । কারো চোখেই ঘুম নেই ।

“প্লীজ এরকম করে থেকো না শ্রী । শেবা সন্দেহ করবে ।”

“কতদিন লুকিয়ে রাখব সবকিছু অরিন্দম ?”

“কিছু হয়নি শ্রী । আমরা কিছু লুকোচ্ছি না । Clear ?”

বহু বছর আগের সেই জেদী কঠিন যুবক আজ আবার ফিরে এল অরিন্দমের মধ্যে । শিউড়ে উঠল শ্রী । চোখের সামনে যেন আবার কিছু দৃশ্য ।

“তাতেই কি সত্যিটা মিথ্যে হয়ে যাবে অরিন্দম ?”

“সত্যি সেটাই যেটা তুমি বিশ্বাস করবে । বাকি সব মিথ্যে ।”

শ্রী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল ।

“আজ সত্যি আমি মাইকেলকে দেখেছি । ও এসেছিল !”

“আবার !”

“Really অরিন্দম । সেই আগের মতই আছে । একটুও বয়স বাড়েনি , শুধু চোখের মধ্যে একটা কেমন যেন…….আর ক্ষতবিক্ষত মুখ……দেখলেই শরীর শিউড়ে ওঠে । নিমেষে যেন মিলিয়ে গেল ।”

“Hallucination ! শুভর deadbody তোমার দেখা উচিৎ হয়নি ।”

“Believe me অরিন্দম । Please believe me !”

অরিন্দম উঠে গিয়ে একটা সিগারেট ধরাল । শ্রী অসহায়ের মতন চেয়ে রইল । চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে । অরিন্দমকে বলে কোনও লাভ নেই আর । শ্রী সেটা জানে ।

 




 

(১০)

মোহর কুঞ্জে বসে আছে শেবা আর রনিত । এটা শেবার খুব প্রিয় জায়গা । আজ এখানে রনিতের সাথে এই প্রথম – আরও ভাল লাগছে শেবার । জীবনের সব ভাল লাগার সঙ্গে যেন রনিতকে জড়িয়ে না নিলে ভাল লাগে না কিছুতেই । রনিতের পরনে formal dress, interview দিয়ে ফিরেছে ।

“আমি বলছি দেখো, job-টা তোমার হয়ে যাবে ।

“দেখা যাক ।

“তোমার job হয়ে গেলে Dad Mom-এর সাথে আলাপ করিয়ে দেব । আমি pass out করলেই আমাদের বিয়ে হবে । আমিও একটা job নিশ্চয়ই পেয়ে যাব । দুজনে খুব ভাল থাকব ।”

রনিত ম্লান হাসল ।

“আচ্ছা, তোমার মা এখন কেমন আছে ?”

“আজ সকালে দেখলাম একটু better…….”

“ওদের problem-টা ঠিক কি, কিছু বুঝতে পারলে ?”

“Not yet………তবে মনে হচ্ছে কিছু একটা আছে, যা ওদের খুব hurt করছে……”

রনিত যেন কোথায় হারিয়ে যায় । কী ভাবে । শেবা সেটা লক্ষ্য করে ।

“কি ভাবছ ?”

রনিত দীর্ঘশ্বাস ফ্যালে ।

“না । ভাবছিলাম, আঘাত দিতে পারে সবাই কিন্তু পেতে চায় না কেউ । কিন্তু আঘাত এমন জিনিস যা দিলে ফিরে পেতেও লাগে……..”

“তোমার কি ধারণা আমার Mom বা Dad কাউকে hurt করেছে ? You don’t know them Ronit…..they are very good human being………..”

রনিত হেসে ফ্যালে ।

“আমি সেটা কখন বললাম ? আমি তো general একটা কথা বললাম । তুমি এত ভাল, তোমার Mom Dad নিশ্চয়ই ভাল ।”

“Mom Dad আমায় ভীষণ ভালবাসে । ভীষণ । আমার জন্য ওরা যে কোনোকিছু করতে পারে ।”

রনিতের ঠোঁটে ম্লান হাসি । চোখের সামনে হঠাৎ একটা দৃশ্য ভেসে ওঠে । এক প্রৌঢ়া খুব কান্নাকাটি করছে একটা মৃতদেহ জড়িয়ে । মৃতদেহের সর্বাঙ্গ চাদর দিয়ে ঢাকা । আশপাশে আরও বেশ কিছু লোক দাঁড়িয়ে আছে । সবটাই সাদা কালো । ধোঁয়া আর কুয়াশা একটু ঝাপসা করে রেখেছে চারপাশ । মাঝেই মাঝেই এই দৃশ্য ভেসে ওঠে রনিতের সামনে । আর রনিতকে বারবার নিয়ে যায় অতীতের সেই অধ্যায়ে যেখানে…….রনিতের ঘোর কাটে ।

“সব বাবা মা-ই সন্তানের জন্য প্রাণ দিতে পারে শেবা । তাই তো তারা বাবা মা ।”

কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ চোখমুখের ভাষা বদলে গেল রনিতের । চোখে একটা দুষ্টুমির ছাপ দেখা গেল । শেবার পরনে লো কাট স্লিভলেস টপ আর ক্যাপ্রি । একদম যেন রাজকন্যার মতোই লাগছে ওকে । আর তেমনই চূড়ান্ত সেক্স অ্যাপীল এই অষ্টাদশীর ! রনিত মুগ্ধ হয় ।

“কি দেখছ ?”

“আজ কিন্তু তোমায় খুব সুন্দর লাগছে । কোলকাতায় এই প্রথমবার আমরা দুজন, এত সুন্দর বিকেল, আর তুমি…….”

শেবা হাসে । রনিতকে জড়িয়ে ধরে । রনিত শেবাকে বেশ কিছুক্ষণ ধরে চুমু খায় । এদিকে কেউ নেই তাই কারো চোখে পড়ে না । চুমু খাওয়া হলে শেবা যেন একটু আচ্ছন্ন হয়ে যায় ।

রনিত বলে – “একটা জায়গায় যাবে ?”

“কোথায় ?”

শেবা যেন এক নিষ্পাপ শিশু । যেন মেঘবালিকা । যেন তিলোত্তমা । রনিত হাসে । শেবাকে জড়িয়ে ধরে ।

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্ত)

 




গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 0   Average: 0/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।