নেমেসিস (প্রথম পর্ব)

নেমেসিস

অভিষেক দেবরায়

(প্রথম পর্ব)

 

(১)

“কি বলছিস তুই ! Have you gone mad !”

“আমি সত্যি বলছি শ্রী, believe me….আমি আজকেও মাইকেলকে দেখেছি !”

“কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব ?”

“আমি জানি না শ্রী । গত এক মাস ধরে আমি মাইকেলকে দেখছি, তোরা কিছুতেই আমাকে বিশ্বাস করছিস না । আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি !”

“শুভ মাইকেল বাইশ বছর আগে মারা গেছে, আমরা নিজেরা ওর বডি কবর দিতে দেখেছি, কেন বুঝতে পারছিস না ?”

এবার শুভ অসহায়ের মত কেঁদে ফেলে । যেন একটা অসহ্য আতঙ্ক আর ভয় ওকে গ্রাস করছে ।

“আমি জানি শ্রী but believe me……আমার মনে হচ্ছে ও সবসময় আমায় follow করছে । ও আমায় বাঁচতে দেবে না শ্রী !”

“তুই মদ খেয়েছিস ?”

শ্রীর গলায় এবার একটু কঠিন সুর ।

“না । বিশ্বাস কর !”

শুভ যে মিথ্যে বলছে না এটা বোঝা গেল । আর তাছাড়া মদ খেয়ে মিথ্যে বলার মত বয়স আর ছেলেমানুষি কোনোটাই নেই শুভর । শ্রী একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিল ।

“তুই এক কাজ কর । দু’ পেগ খেয়ে শুয়ে পড় । ঘুম হলেই ফ্রেশ লাগবে ।”

শুভ চিৎকার করছে – রাগে ক্ষোভে অসহায়তায় – যেন মৃত্যুকে কাছ থেকে দেখছে –

“তোরা ভাবছিস আমি অসুস্থ ! আমি পাগল ! তোরা কেন বুঝতে পারছিস না আমি……….”

হঠাৎ শুভর গলার স্বর পাল্টে গেল ।

“শ্রী ! শ্রী ! মাইকেল…..দরজার বাইরে নক করছে……”

“What ! মাইকেল দরজার বাইরে…..

পাশে বসেই একটা মেডিকেল জার্নালে চোখ বোলাতে বোলাতে স্কচের পেগে চুমুক দিচ্ছিল অরিন্দম । কাল সেকেন্ড হাফে দুটো OT আছে । দুটোই খুব critical case । একটু ঘুম না হলে অসুবিধে হয়ে যাবে । এতক্ষণ ধরে কথাগুলো কানে এলেও গুরুত্ব দিচ্ছিল না অরিন্দম । ও জানে শুভ নেশা করলে ভুলভাল বকে, এটা ওর অভ্যেস । এমনিতেও শ্রীর সাথে শুভর অত মাখামাখি মনে মনে ভালভাবে নেয় না অরিন্দম, কিন্তু কিছু বলতে পারে না । তাই চুপ থাকে ।

 




 

 

মাইকেলের নাম কানে যেতেই সজাগ হয়েছিল অরিন্দম । মাথাটা গরম হয়ে গিয়েছিল । এত রাতে ফোন করে কি ধরনের নাটক শুরু করেছে শুভ ? অরিন্দম শ্রীর কাছ থেকে ফোনটা তুলে নেয় আচমকাই । রাগ চেপে রেখে একটু কঠিন কিন্তু সংযত গলায় বলল , “শুভ অরিন্দম বলছি । কি হয়েছে তোর ?”

শুভ বাচ্চা ছেলের মত কাঁদতে থাকে ।

“অরিন্দম, ভাই আমায় বাঁচা…..মাইকেল দরজা নক করছে…..ও আমায় মেরে ফেলবে……”

“দরজা খুলিস না তাহলে !”

আচমকা যেন শুভর গলার স্বর আটকে আসতে লাগল । যেন মৃত্যুকে সামনে থেকে দেখছে । আর বাঁচার কোনও উপায় নেই ।

“অরিন্দম, মাইকেল…..আমার সামনে…….আমায় বাঁচা ভাই ! আমায় বাঁচা !…….”

আচমকা ফোনটা কেটে যায় । অরিন্দম কল ব্যাক করে । ফোন সুইচড অফ !

অরিন্দম অবাক হয় ।

“আশ্চর্য ! ফোন অফ !”

শ্রী চমকে উঠল ।

“মানে ! এই মাত্র তো…..”

“মনে হয় চার্জ শেষ ।”

“এখন কি হবে ?”

অরিন্দম বিষয়টাকে অত গুরুত্ব দিল না । পেগে শেষ চুমুক দিয়ে জার্নালটা পাশের টেবিলে রেখে দিল ।

“কি আবার হবে ? যে কোনও কারণেই হোক শুভর মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে ! ওর চিকিৎসার প্রয়োজন । আর নইলে শালা গলা অবধি মাল গিলে ভুলভাল বকছে !”

“শুভ মদ খেলে মিথ্যে বলে না অরি । আমি বলছি শুভ মদ খায়নি !”

অরিন্দম এক অদ্ভুত দৃষ্টি মেলে তাকাল শ্রীর দিকে । সেই দৃষ্টি কেমন যেন বিদ্ধ করল শ্রীকে । শ্রী মাথা নীচু করে থাকল । কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে আবার অস্থির হয়ে উঠল শ্রী ।

“শুভর সামনে বিপদ অরিন্দম, আমার মন বলছে । এক কাজ করো…..চলো এক্ষুনি একবার ওর ফ্ল্যাটে যাই !”

অরিন্দমের গলায় এবার বিরক্তি ঝরে পড়ল ।

“তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল ! রাত এখন ক’টা বাজে সে খেয়াল আছে ?”

“যদি ওর সত্যি সত্যি কোনও বিপদ –”

“কিছু হবে না । হয়তো বেশি মাল গিলে –”

সঙ্গে সঙ্গে শ্রীর দিকে তাকাল অরিন্দম ।

“ওহ – সরি – নইলে – সব ওর hallucination ! গত এক মাস ধরেই তো এসব চলছে । He need psychiatric treatment !”

অরিন্দম পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে । শ্রী পারে না ঘুমোতে । বসে থাকে । চোখে মুখে একটা চাপা আতঙ্ক । এই অন্ধকার রাত যেন ওকে গিলে খেতে আসছে ।

“মাইকেল কি সত্যিই মারা গেছে অরিন্দম ?

অরিন্দম বিরক্তির সঙ্গে পাশ ফিরে তাকায় – “আমরা সবাই তো burial ground-এ গেছিলাম । আমাদের চোখের সামনে ওকে কফিনে শোয়ানো হল…..মাটি চাপা দেওয়া হল………এসব অবান্তর কথার মানে কি শ্রী ?”

“তাহলে কি মাইকেল……..

“কি ? বাইশ বছর পর মাইকেল ভূত হয়ে ফিরে এসেছে ?”

শ্রী কিছু বলে না । অরিন্দমের দিকে কিছুটা সম্মত হয়ে তাকায় । অরিন্দমের চোখে বিরক্তি আর রাগ ফুটে বেরোচ্ছে । স্কচের নেশা কেটে যেতে পারে তাই ও আরও ক্ষিপ্ত ।

Disgusting ! শুয়ে পড়ো । আমার কাল O.T আছে । I need rest !”

অরিন্দম পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে । শ্রী বসে থাকে । চোখে অনেক প্রশ্ন, সংশয় । আচমকা যেন একটা চাপা আতঙ্ক শ্রীকে তাড়া করে বেড়াতে থাকে । অতীতের কোনও ছায়া ওকে নাড়া দেয় যেন । চোখের সামনে পরপর সিনেমার মত চলতে থাকে অনেক অনেক ছবি । চোখ ভিজে আসে, যেন দম বন্ধ হয়ে আসে ।

 




 

 

(২)

একটা নীল আলোর মধ্য দিয়ে হেঁটে চলেছে শ্রী । চারপাশে কেউ নেই কিছু নেই । শুধু অন্ধকার নীল আলো চারপাশে । কেমন একটা খুব মন কেমন । এ কোথায় এসেছে শ্রী ?

দূরে কে ? কে না – কারা ? দুজন ! দুজন ছায়ামূর্তি । কি করছে ওরা ?

কাছে ছুটে গেল শ্রী । দেখল ঝাপসা দুজন । একজন শুয়ে আছে, আরেকজন তার বুকের ওপর হুমড়ি খেয়ে আছে । শ্রীর পায়ের শব্দ শুনেই ওপরের ছায়ামূর্তিটি উঠে দাঁড়াল । তখনই দেখতে পেল নীচে শুয়ে আছে যে তার মুখ রক্তাক্ত, মারা গেছে । তার মধ্যেও চিনতে পারল – শুভ !

চোখ গেল অন্যজনের দিকে । হাতে ধরা লম্বা ফলার ছুরি, রক্ত টপটপ করছে সেটার শরীর থেকে । এ কি – মুখে অজস্র ক্ষতচিহ্ন – গলার নলি কাটা……..আর কি ভয়ঙ্কর দৃষ্টি – হাসছে – এ তো – মাইকেল !………….

একটা একটানা যান্ত্রিক শব্দ ভেসে আসছে কোথাও থেকে । শ্রী এদিক ওদিক তাকাচ্ছে কিন্তু কিছু দেখতে পাচ্ছে না । একটা চাপা ভয় একটা চাপা উত্তেজনায় যেন পাগল হয়ে যাবে । দম আটকে আসছে যেন । সামনে কাউকে দেখতে পেল না আর । যেন ভোজবাজির মতোই মিলিয়ে গিয়েছে দুজন । কেমন যেন মনে হল চারপাশে মাইকেলের অদৃশ্য উপস্থিতি – যে কোনও মুহূর্তে মৃত্যুদূত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে শ্রীর ওপর !

যান্ত্রিক শব্দটা ভেসেই আসছে ক্রমাগত…………………………….

ঘুম ভেঙে যায় শ্রীর । ঘেমে গিয়েছে । কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল ধাতস্থ হতে । সেই যান্ত্রিক শব্দটা কানে বাজছে । শ্রীর মোবাইলটা বাজছে । এটারই শব্দ । কিন্তু এ কেমন দুঃস্বপ্ন দেখল শ্রী ? কেন দেখল ?

ভয়ে ভয়ে ফোনের দিকে তাকায় । সকালের আলো শ্রীকে একটু সাহসী করে তুলেছে । অচেনা নাম্বার থেকে ফোন এসেছে । ঘড়ির দিকে তাকায় । সবে সাতটা বেজেছে । এত সকালে ফোন আসায় অবাক হয় শ্রী । ফোন হাতে নিয়ে রিসিভ করে ।

“হ্যালো ।……শ্রী বাসুরায় বলছি ।…..শুভদীপ সেন ? হ্যাঁ আমার বন্ধু ।…….What ! কি বলছেন !…….আচ্ছা ।”

আতঙ্কে চোখ মুখ যেন অন্যরকম হয়ে যায় শ্রীর । শ্রীর চিৎকারে ঘুম ভেঙে উঠে বসে অরিন্দম । উদ্বিগ্ন মুখে তাকায় । শ্রী ভয়ে কাঁপতে থাকে ।

“কি হয়েছে শ্রী ?”

শ্রী যেন ঠিক করে কথা বলতে পারছে না । নিঃশ্বাস আটকে আসছে যেন । চোখ থেকে টপটপ করে জল পড়ছে ।

“অরিন্দম, পুলিসের ফোন ছিল । শুভ….”

“কি হয়েছে শুভর ?”

“শুভ খুন হয়েছে অরিন্দম !”

অরিন্দম যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারে না । কোনও কথা খুঁজে পায় না । এটার জন্যে সত্যি ও প্রস্তুত ছিল না ।

“অফিসার এক্ষুনি একবার ডেকেছে । শুভর ফ্ল্যাটেই আছে পুলিস ।”

অরিন্দম একটু ভাবল ।

“পুলিস তোমাকেই কেন………..anyway……আমি রেডি হয়ে নিচ্ছি । তুমিও রেডি হয়ে নাও । এক্ষুনি বেরোব ।

অরিন্দম উঠে বেরিয়ে যায় । শ্রী তখনো আতঙ্কে কাঁপছে যেন ।

তাহলে কি শুভ ঠিক বলেছিল ! তাহলে কি মাইকেল………..!

(৩)

“আপনারা ?”

“আমি শ্রী বাসুরায় ।”

ইনভেস্টিগেটিং অফিসার প্রলয় বক্সী । চোখে একটা অভিজ্ঞতা আর অবিশ্বাস একসঙ্গে খেলে বেরায় । প্রলয় শ্রীকে ভাল করে আপাদমস্তক জরিপ করে ।

“ও, আপনিই শ্রী বাসুরায় । এদিকে আসুন । আপনি ?”

“ডঃ অরিন্দম বাসুরায় ।”

প্রলয় আবার দুজনকে আপাদমস্তক দ্যাখে । ওরা ভেতরে ঢোকে । শুভর মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে আঁতকে ওঠে শ্রী । অরিন্দমের বুকে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে । অরিন্দম শ্রীকে জড়িয়ে ধরে । সোফার ওপর এলিয়ে রয়েছে শুভর মৃতদেহ । চোখে দুঃসহ আতঙ্কের ছাপ । মাথা আর মুখ ক্ষতবিক্ষত । গলার নলি কাটা । শরীরের অন্য কোথাও কোনও আঘাতের চিহ্ন নেই । আশেপাশে কোনও মার্ডার ওয়েপন নেই । ফটোগ্রাফার নানা অ্যাঙ্গেল থেকে ছবি তুলছে ।

প্রলয় ইশারা করে বারান্দার দিকে যেতে । আস্তে আস্তে অরিন্দম শ্রীকে নিয়ে প্রলয়ের পেছন পেছন পাশের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায় । শ্রী আস্তে আস্তে সোজা হয়ে দাঁড়ায় । একটু নিজেকে সামলে নেয় ।

প্রলয়কে জিজ্ঞেস করে – “আপনি আমার নাম্বার কীভাবে পেলেন ?”

“Victim-এর হাতে মোবাইল ফোন ছিল । সেটা seize করে দেখলাম victim লাস্ট কল আপনাকে করেছিলেন । ওনাকে আপনারা কবে থেকে চিনতেন ?”

শ্রী একবার অরিন্দমের দিকে তাকাল ।

“কলেজ লাইফ থেকে । শুভ, I mean, শুভদীপ সেন আর আমি একসাথে পড়তাম । অরিন্দম শুভর বন্ধু ছিল সেই সুবাদে আমরা তিনজন কমন ফ্রেন্ড হয়ে গেলাম ।”

“তারপর ডঃ বাসুরায়ের সাথে আপনার বিয়ে হয়, তাই তো ?”

শ্রী মাথা নাড়ে । প্রলয় অরিন্দমের দিকে তাকাল । একবার শ্রীর দিকে । তারপর প্রসঙ্গ পাল্টাল ।

“Victim মিঃ সেন তো শেয়ার মার্কেট analyst ছিলেন ।”

অরিন্দম উত্তর দিল – “হ্যাঁ ।”

“বিয়ে শাদি করেননি ?”

“করেছিল । কিন্তু এক বছরের মধ্যেই separation, তারপর divorce ।”

“I see……..ওনার বাবা মা বা অন্য কোনও relative…….”

“ওর বাবা মা জামশেদপুরে থাকে । আমি আপনাকে নাম্বার দিয়ে দিতে পারি ।”

“Thanks !”

 




 

 

শ্রীর দিকে তাকাল প্রলয় । চোখে একটা তীক্ষ্ণ ইঙ্গিত ।

“আচ্ছা মিসেস বাসুরায়, মিঃ সেন আপনাকে অত রাতে কেন ফোন করেছিল ?”

শ্রী একবার অরিন্দমের দিকে তাকায় ।

“ও কোনও কারণে খুব ভয় পাচ্ছিল । ওর মনে হচ্ছিল কেউ ওকে খুন করতে চায় ।”

প্রলয়ের ভ্রু কুঁচকে ওঠে ।

“খুন !”

অরিন্দম পরিস্থিতি সামাল দিতে চেষ্টা করে – “মনে হয় শেয়ার মার্কেট oriented কোনও সমস্যা থাকবে । Professional jealousy-ও হতে পারে ।”

“সেটা তদন্ত সাপেক্ষ । আচ্ছা মিসেস বাসুরায়, মিঃ সেন যে কাল আপনাকে কল করেছিল আপনার husband জানেন ?”

প্রলয়ের দৃষ্টিতে আর গলায় কেমন একটা শ্লেষ – ঝাঁঝরা করে দিল শ্রী আর অরিন্দমকে । অরিন্দম দৃঢ় গলায় কঠিন স্বরে বলল – “অফিসার, আমরা খুব ভাল বন্ধু । আর শ্রী আমার স্ত্রী । আমাদের একটা মেয়ে আছে । We are a happy family !”

প্রলয়ের ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল ।

“কে খুন করেছে সেটা কিছু বুঝতে পারলেন অফিসার ?”

“এখনো নয় । কোনও murder weapon পাওয়া যায়নি, ফ্ল্যাটের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল, বারান্দার এই দরজাটাও ভেতর থেকে বন্ধ ছিল । জানালা দিয়ে কোনও মানুষের পক্ষে ঢোকা সম্ভব নয় । বুঝতে পারছি না । কিছু একটা রহস্য আছে ।”

শ্রী ভয়ে ভয়ে অরিন্দমের দিকে তাকায় । যেন কিছু বোঝানোর চেষ্টা করে ।

“আপনাদের একটু কষ্ট দেব । আপনারা একটু আমার সাথে থানায় চলুন । Statement record করেই ছেড়ে দেব । আর মিঃ সেনের বাবা মা এমনকি প্রাক্তন স্ত্রীর সঙ্গেও যোগাযোগ করতে হবে । Please !”

অরিন্দম জবাব দেয় – “Sure !”

প্রলয় শুভর মৃতদেহের দিকে এগিয়ে যায় । ফটোগ্রাফাররা ছবি তুলছে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে । ওখানে দাঁড়ানো কয়েকজন পুলিশকর্মীর সাথে কিছু কথা বলছে প্রলয় । শ্রী অরিন্দমের দিকে তাকায় । অরিন্দম শ্রীকে বেশি কথা না বলতে ইশারা করে ।

হঠাৎ একটা বিদ্যুতের ঝিলিক খেলে যায় শ্রীর মাথায় । ঠিক এরকম ভাবে ক্ষতবিক্ষত হতেই তো দেখেছিল শুভকে ও স্বপ্নে । মনে পড়ে গেল মাইকেলের সেই রক্তমাখা মুখে হাসি আর হাতে রক্ত চুইয়ে পড়া ছুরির ফলা । তাহলে কি সেই স্বপ্নের সাথে কোনও connection আছে শুভর খুনের ? তাহলে কি……………….?

(৪)

“আমার দিনের শেষ ছায়াটুকু মিশাইলে মূলতানে

গুঞ্জন তার রবে চিরদিন ভুলে যাবে তার মানে

কর্মক্লান্ত পথিক যবে বসিবে পথের ধারে

এই রাগিণীর করুণ আভাস পরশ করিবে তারে

নীরবে শুনিবে মাথাটি করিয়া নীচু

শুধু এইটুকু আভাসে বুঝিবে বুঝিবে না আর কিছু

বিস্মৃতদিনে দুর্লভ ক্ষণে কেউ বেঁচেছিল বুঝি

আমরা যাহার খোঁজ পাই নাই তাই সে পেয়েছে খুঁজি ।”

এতক্ষণ মুগ্ধ হয়ে রনিতের দিকে চেয়ে ছিল শেবা । কি কণ্ঠস্বর ! কি চমৎকার আবৃত্তি ! যেন সাক্ষাৎ দেবদূতের কণ্ঠ । কুমারমঙ্গলম পার্কের এই সুন্দর বিকেলে কেমন যেন একটা মাদকতা সৃষ্টি হল ।

অরিন্দম আর শ্রীর মেয়ে শেবা । পোশাক আশাক চালচলনে মা বাবার মতই আধুনিকা, মড । ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে দুর্গাপুরের হস্টেলে থেকে । রনিতের সঙ্গে পরিচয় ফেসবুকে । রনিত বয়সে শেবার চেয়ে প্রায় সাত আট বছরের বড়, সাধারণ । তবু শেবার ওকেই পছন্দ । রনিতের বড় গুণ সে খুব ভাল আবৃত্তি করতে পারে । ফেসবুকে কবিতা পড়েই মুগ্ধ হয় শেবা । তারপর কথা বলা শুরু । খুব তাড়াতাড়ি বন্ধুত্ব । তারপর কখন যে রনিতের প্রেমে শেবা মুগ্ধ হয়ে গেছে, নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে, টের পায়নি । শেবা আধুনিকা, রুচিশীলা । ও মনে করে যে বাঙালি মেয়ে শেষের কবিতা আর কামসূত্র পড়বে না আর বুঝবে না, উপলব্ধি করতে পারবে না, সে আর যাই হোক কারো সঙ্গিনী হতে পারবে না । সাত পাঁকে বাঁধা পড়তে পারে, সহবাস করতে পারে, কিন্তু সঙ্গিনী হতে পারবে না । তাই এই সিক্স প্যাক, এইট প্যাক, ক্রু কাট ইত্যাদির যুগেও ও প্রেমে পড়েছে এমন এক সাধারণ কিন্তু অসাধারণ পুরুষের ।

“তোমার voice-এ magic আছে রনিত !”

রনিত হাসে । ম্লান হাসি ।

“মাঝে মাঝে ভাবি এই সবকিছু তো কিছুদিনের…..তারপর…..”

“মানে ?”

 

 




 

 

শেবার দিকে তাকায় রনিত । পড়ন্ত বিকেলের আলোয় একটা বিষণ্ণতার ছায়া । একটা মন খারাপ । রনিতের চোখ যেন ভেজা । ভেজা ওর কণ্ঠ ।

“তোমার আর আমার মধ্যে ফারাক একটা প্রজন্মের । তোমার বাবা নামী ডাক্তার, তোমাদের এত মড পয়সাওয়ালা ফ্যামিলি, তুমি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছ । সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ । আর আমি ? অত্যন্ত সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে । এখনো ভাল কোনও চাকরি পাইনি ।……..তোমার আজ আমাকে নিয়ে খেলতে ইচ্ছে করছে তাই খেলছ, কাল যখন ইচ্ছে ফুরিয়ে যাবে ছুঁড়ে ফেলে দেবে ।”

রনিতের মুখে অসহায়তা আর অভিমানের ম্লান হাসি । শেবা ওর দিকে চেয়ে থাকে । কি যেন বোঝাতে পারে না ।

“তুমি কেন বুঝতে পারো না আমায় ? I love you Ronit, despite all the differences I love you ! ভালবাসায় কোনও ফারাক থাকে না ।……….আমি তোমায় নিয়ে খেলছি না রনিত । আমি তোমায় সত্যি……..”

শেবার চোখে অভিমান । কেঁদে ফ্যালে । রনিত সঙ্গে সঙ্গে ওকে বুকে টেনে নেয় । কপালে হাল্কা চুমু খায় ।

“আমি ওভাবে বলিনি ।”

“এবার যখন বাড়ি যাব চলো আমার সাথে, Mom Dad-এর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব তোমায় । তাহলে তো বিশ্বাস করবে ।”

রনিত ম্লান হাসে । চোখ ছলছল করে আসে ।

“আগে আমায় একটা ভাল চাকরি জোগাড় করতে দাও শেবা, তারপর…..তার আগে নয়….প্লীজ…..”

শেবা বাচ্চা মেয়ের মত রনিতকে জড়িয়ে কাঁদতে থাকে ।

“আরে পাগল, এভাবে কেউ কাঁদে ? তোমার কান্না কি আমার ভাল লাগে বলো ? কেঁদো না । প্লীজ !”

শেবা আস্তে আস্তে শান্ত হয় । মাথা তোলে । রনিতের চোখে চোখ রাখে ।

“Why don’t you trust me ?”

“ভয় করে যে !”

“আমি আছি তো । তোমার পাশে ।”

রনিত হাসে । আঁকড়ে ধরে শেবার নরম শরীরটাকে । একটা মিষ্টি গন্ধ শেবার গায়ে লেগে আছে । শেবার নরম লাল পাঁপড়ির মত ভিজে ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল রনিত । এক উষ্ণ মাদকতায় ডুবে যেতে লাগল দুজনে…….সূর্যের পড়ন্ত আলোর মতোই…………………

(৫)

অরিন্দম । কি ভাবছ তখন থেকে ?

শ্রী চমকে ওঠে । অরিন্দমকে দেখে একটু ধাতস্থ হয় । শ্রী টিভি চালিয়ে বসে আছে । সাউন্ড মিউট । আসলে অন্য কিছু ভাবছে । চোখে মুখে কেমন একটা ভয় । অরিন্দম স্কচে চুমুক দিতে দিতে অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছিল শ্রীকে ।

“কি হল ?”

“শুভ……ওর murder-টা সত্যি অদ্ভুত । তাই না ?”

একটু গম্ভীর হয়ে গেল অরিন্দম ।

“হুম । মনে হচ্ছে এটা unsolved case হিসেবেই বন্ধ হয়ে যাবে । পুলিস কোনও ক্লু পাচ্ছে না ।”

“খুনি ধরা পড়বে না অরিন্দম । কারণ খুনি কোনও মানুষ নয় !”

“মানে !”

শ্রীর চোখে মুখে একটা অসহ্য আতঙ্ক ছাপ ফেলে দিয়েছে । বারবার একই জিনিস ভেবে চলেছে ক্রমাগত ।

“শুভকে মাইকেল খুন করেছে অরিন্দম । তুমি দেখলে না শুভর মাথা আর মুখ কেমন ক্ষতবিক্ষত করে দেওয়া হয়েছে ! এখনো কিছু বুঝতে পারছ না তুমি !”

মাথা প্রচণ্ড গরম হয়ে গেল অরিন্দমের ।

“Shut up ! কীসব উল্টোপাল্টা কথা বলে যাচ্ছ ?”

শ্রী কাতরভাবে বলতে গিয়ে প্রায় কেঁদে ফেলল – “আমি উল্টোপাল্টা বলছি না অরিন্দম । সত্যি বলছি !”

“মাইকেল বাইশ বছর আগে মারা গেছে শ্রী !”

“মাইকেল মারা গেছে । কিন্তু মাইকেলের আত্মা…..প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ফিরে এসেছে…….”

চিৎকার করে ওঠে অরিন্দম ।

“Shut up !”

শ্রী চমকে ওঠে ।

অরিন্দম নিজেকে একটু সামলে সিগারেট ধরায় একটা । তারপর নীচু গলায় বলে – “I am sorry but…..এসব কথা বন্ধ করো । প্লীজ ।”

“তুমি এখনো শুভ আর আমাকে নিয়ে সন্দেহ করো – তাই না অরিন্দম ?”

অরিন্দম অবাক হয়ে তাকায় শ্রীর দিকে । শ্রী কিছু বলে না । একটা অভিমান ভরা চোখে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ । তারপর মুখ ঢেকে বসে । অরিন্দম নিজেকে সংযত করে নেয়, চোখের কোণে একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা আর ক্ষোভ যেন মিলে মিশে ফুটে ওঠে । মুহূর্তের জন্য ।

“এক কাজ করো, শেবাকে গিয়ে একদিন দেখে এসো । কিছুক্ষণের জন্য মনটা ভাল হয়ে যাবে । দেখো ভাল লাগবে ।”

শ্রী সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজিত হয়ে যায় ।

“অরিন্দম, শেবা যদি কিছু জানতে পারে ! আমাদের past, আমাদের সব কিছু…যা ও জানে না, ও কি আমাদের ক্ষমা করতে পারবে ?”

ঠাণ্ডা গলায় শ্রীর চোখে চোখ রাখে অরিন্দম ।

“ও কিছু জানে না শ্রী । ও কিছু জানবে না ।”

এমন সময় হঠাৎ পাশের ঘরের দরজাটা শব্দ করে বন্ধ হয়ে যায় । দুজনেই চমকে ওঠে । শ্রী কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেল ভয়ে ।

“দরজাটা নিজে থেকে কীভাবে বন্ধ হয়ে গেল !”

অরিন্দমও কিছু বোঝে না । একটু বুক কাঁপছিল ওর কিন্তু সেটা প্রকাশ করল না । অস্ফুটে বলল – “মনে হয় হাওয়াতে…..”

“হাওয়া কোথায় অরিন্দম ?”

অরিন্দম কিছু বোঝে না । দরজাটার কাছে এগিয়ে যায় । শ্রী গিয়ে থামায় । পেছন থেকে টেনে ধরে অরিন্দমকে ।

“যাবে না ! ওই ঘরে কেউ আছে !”

“তুমি কি পাগল হলে নাকি ? ওই ঘরে কে থাকবে ? বাড়িতে আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই !”

“আমাদের সামনে বিপদ অরি । Try to understand !”

অরিন্দম শ্রীকে সরিয়ে দেয় । মাথায় একটা জেদ চেপে গেছে হঠাৎ । ও এর শেষ দেখে ছাড়বে ।

“কোনও মানুষ যদি আমাদের কোনও ক্ষতি না করতে পারে, কোনও ভূত আমাদের কিছু করতে পারবে না…..কারণ ভূত বলে কিছু হয় না ।”

“অরিন্দম দরজা এক ধাক্কায় খুলে ফ্যালে । ঘর আগের মতই ফাঁকা । কেউ কোথাও নেই । এক পাশের জানালা খোলা । ঘরে ঢোকে অরিন্দম । শ্রী পেছন পেছন ভয়ে ভয়ে । অরিন্দম লম্বা নিঃশ্বাস নেয় একটা ।

“নাও দ্যাখো । ঘরটা যেমন ছিল তেমনই আছে । দ্যাখো খাটের তলায় wardrobe-এর ভেতরে মাইকেলের ভূত আছে কীনা ।”

বিদ্রুপ গায়ে না মেখে এদিক ওদিক দ্যাখে শ্রী । তারপর আস্তে আস্তে জানালার দিকে এগিয়ে যায় । বাইরের দিকে দ্যাখে । আচমকা ভয়ে চিৎকার করে পিছিয়ে আসে ।

অরিন্দম ছুটে এগিয়ে যায় ।

“কি হল শ্রী ?”

“ওই ওখানে….”

 




 

 

শ্রীর গলা দিয়ে কথা বেরোচ্ছে না । থরথর করে কাঁপছে ।

“কি ? কি হয়েছে ?”

“স্পষ্ট দেখলাম, একটা মুখ…..রক্ত লেগে আছে…..মাইকেল……..”

অরিন্দম জানালার কাছে ছুটে গেল । কাউকে দেখা গেল না ।

“ অরি, মাইকেল আমাকে দেখে হাসল । বীভৎস সেই হাসি । স্পষ্ট দেখলাম ।”

অরিন্দম শ্রীর কাঁধে হাত রাখল । তারপর হাত ধরে বিছানায় নিয়ে বসাল ।

“তোমার ঘুমের দরকার । একটা ঘুমের ওষুধ দিচ্ছি আজ তোমায় ।”

অরিন্দম ড্রয়ার খুলে একটা স্ট্রিপ বের করল । একটা ট্যাবলেট খুলে বের করল । জলের বোতলের দিকে হাত বাড়াতে যাবে এমন সময় শ্রী অসহায়ের মত কেঁদে ফেলল – ঠিক যেমনটা কেঁদেছিল শুভ – মারা যাওয়ার দিন রাতে ।

“অরিন্দম, কেন বুঝতে পারছ না ? শুভ মারা গেছে । খুন হয়েছে । এবার আমাদের পালা অরিন্দম । মাইকেল আমাদের কাউকে ছাড়বে না ! কাউকে না !”

অরিন্দম চোখে চোখ রাখল শ্রীর । অত্যন্ত কঠিন সেই দৃষ্টি ।

“আমরা কিছু করিনি শ্রী । কোনোদিন কোনও অপরাধ করিনি । অন্যায় করিনি । মাইকেল মারা গেছে । মৃত মানুষ কোনোদিন ফেরে না ।”

(ক্রমশঃ……………….)

 

 




গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 0   Average: 0/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।