পক্ষীরাজ

গল্পের নামপক্ষীরাজ

লেখক—অভিজিৎ ঘোষ

 

 

কেই বলে কর্মফল লাভ ।
সারাজীবন কিপটেমি করে জমানো টাকায় চাকরি জীবনের শেষদিকে দীপক রায় তাঁর সাধের গাড়িটি কিনেছিলেন। পাছে মোটা টাকা সুদের বোঝা বইতে হয়, সেই কারণে সাদা রঙের মাহিন্দ্রা কোম্পানির এস-ইউ-ভি গাড়িটা কিনতে নগদ সাড়ে পনেরো লক্ষ টাকা খরচ করেছিলেন। এতে অবশ্য অনেকেই অবাক হয়েছিল।
আর অবাক হবে না-ই বা কেন?
যে মানুষটা গোটা জীবনটা নিজের প্রয়োজনে পাঁচটা পয়সাও খরচ করেন নি, তিনি কিনা নেহাতই সখ পূরণের জন্য অতগুলো টাকা খসিয়ে একটা গাড়ি কিনে ফেললেন!

 




 

কেউ কেউ বলেছিল,’বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরেছে’।
যদিও এতে আর কেউ খুশি হয়েছিল কি না তা জানা নেই, তবে দীপকবাবুর স্ত্রী ইলা দেবী ও পুত্র দীনেশের আনন্দের সীমা রইল না। ইলা দেবীর চির অসুখী ভাঙা চোয়ালে হাসির রেখা ফুটে উঠেছিল। তিনি ভাবতে লেগেছিলেন এবার হয়তো ভাগ্যদেবী তাদের সহায় হলেন — তাদের সিদ্ধ-ভাত আর ডাল খাওয়ার দিন শেষ হতে চলল। যার তিন কাল গিয়ে এককালে ঠেকার সময় হয়ে এসেছে তার কাছে শেষকালটা কোনোক্রমে একটু-আধটু ভালো-মন্দ খাবারের প্রত্যাশা করাটা বেঁচে থাকার নিমিত্ত মাত্র। এযাবৎকালে দীপকবাবুর দাক্ষিণ্যে তাঁর সংসারে সিদ্ধ-ভাত আর ডালই জুটত রোজকার আহার্য; কখনও বা জুটত বাড়ির উঠোনের লাউটা, কুমড়োটা কিংবা পুঁই। পুঁটি মাছ বা চারাপোনার ঝোল হত ধুমকেতু আগমনের মত, রুই-কাতলা-ইলিশ কিংবা খাসি-মুরগি তো নৈবনৈবচ !

 

                  ২

ধবধবে সাদা রঙের উপর কালো বর্ডার দেওয়া গাড়িটার একটা জমকালো নাম দিয়েছিলেন দীপকবাবু — ‘পক্ষীরাজ’। এসব ছোট-খাট মফঃস্বলে এমন গাড়ি কদাচিৎ দেখা যায়। তাই গাড়িটাকে যে-ই দেখত সে-ই মন্ত্রমুগ্ধের মত এক কথায় বলত, ‘চমৎকার!’ — শুনে দীপকবাবু খুশি হওয়ার বদলে বেশ বিরক্তই হতেন। পাছে কারও নজর লেগে পক্ষীরাজের কোনো অনিষ্ট হয়; আবার রাস্তায় চললে পেট্রোল খরচের ধাক্কা— এইসব কারণে গাড়িটাকে আর বাইরে বের করলেন না, এমনকি কাউকে ওর সামনে পর্যন্ত ঘেঁষতে দিলেন না। পক্ষীরাজের ঠাঁই হল বাড়ির উত্তর-পশ্চিম কোণে কাঁঠাল গাছতলায় টিনের খোলা ছাউনির নিচে।

তবে পক্ষীরাজের যত্নে কোন ত্রুটি রাখলেন না দীপকবাবু। জল খরচ বাড়লে ইলেক্ট্রিসিটি বিল বাড়বে দেখে তিনি নিজে কখনও স্নানের জন্য এক-আধ বালতির বেশি জল খরচ করেন না, কিন্তু প্রতিদিন সকালে বালতি বালতি জল দিয়ে গাড়িটার সাফ-সাফাই করেন। তারপর একবার ইঞ্জিন স্টার্ট দেন, আর সাথে সাথেই পক্ষীরাজ যেন ধরফরিয়ে নড়েচড়ে উঠে জীবন স্পন্দনের লক্ষণ প্রকাশ করে— ‘ভ্রুম্…ভুর্রুম….. ভ্রুরুরুমম্ …ভ্রুরুরুরুরু..পিক্ পিক্… ভ্রুরুরু..পিক্…’ — ব্যাস্ ওইটুকুই। এরপর গাড়িটাকে লক্ করে চাবিটা সিন্দুক বন্দি করে স্নান-আহার সেড়ে অফিসে বেরিয়ে পড়েন।আবার অফিস থেকে ফিরে পক্ষীরাজের যত্নআত্তিতে লেগে পড়েন। কারও সাধ্য নেই গাড়ির চাবিতে হাত দেয়, তাহলেই দীপকবাবু রুদ্রমূর্তি ধারন করেন।
এই তো গেল তাঁর নিত্যদিনের রুটিন।

 

 




 

এমনকি দীনেশের জন্মদিনে কখনও তিনি দু’টাকার একটা পেন উপহারের বেশি সামর্থ্য না দেখালেও পক্ষীরাজের বার্ষিকীতে ওকে ফুল-মালা দিয়ে রাজকীয় বেশে সাজান।
আবার সখ করে গাড়ির ভিতরে সুন্দর ফেং-সুই কার-হ্যাঙ্গিং, ড্রাইভিং সীটে লেদারের সীট কভার, এমনকি নিয়ন লাইটও লাগিয়েছেন।
এসব দেখে ইলা দেবী মুখ ঝামটা দিয়ে বলেন,’উফ্! আদিখ্যেতা দেখলে গায়ে জ্বালা ধরে’।
একবার একটা শালিক পাখি পক্ষীরাজের উপর মলত্যাগ করলে দীপকবাবু বেজায় চটে গিয়ে গালাগাল করে সেটাকে ভাগালেন। বললেন, ‘শালা, হারামজাদা, হাগার আর জাগা পেলি না!’— সেই দিনই রাজমিস্ত্রি ডেকে ইট গাঁথুনির গ্যারেজ গড়িয়ে নিলেন।

 

            ৩

 

রিটায়ারমেন্টের পর দীপকবাবু পক্ষীরাজকে এক মুহুর্তও চোখের আড়াল করেন না; রোগ-ভোগ, অসুখ-বিসুখ হলেও না। সারাটা দিন গাড়ির সামনে বসে নজরদারি করেন। পক্ষীরাজকে তাঁর নেহাতই যন্ত্র বলে মনে হয় না — ওর সাথে একাত্মতাও অনুভব করেন। তাই তো প্রায়ই ফিস্-ফিস্ করে পক্ষীরাজের সাথে কথা বলেন। এটি অবশ্য ইলা দেবীর নজর এড়ায়নি।

এমনি একদিন দীপকবাবু পক্ষীরাজের সামনে গিয়ে সস্নেহে বললেন,’পক্ষীরাজ! তোর খুব বাইরে যেতে ইচ্ছে করে বল। তোকে নিয়ে আমি অনেক দূরে চলে যাব… অনেক দূরে। যেখানে আমাদের আর কেউ খুঁজে পাবে না…’
‘এতকাল সংসার কচ্ছি, আমাদের তো কোথাও নিয়ে যাবার মুরদ হল

না। …তা ওটি নিয়ে কোথায় যাবে শুনি?’— পিছন থেকে ইলা দেবী রুক্ষ স্বরে বললেন।
দীপকবাবুর সমস্ত উদ্দীপনা এক নিমিষে মুড়ির মত নেতিয়ে গেল। পিছন ঘুরে ভেজা তুলোর মত চুপসানো মুখ করে মাথা নিচু করে বললেন, ‘ কোথাও না। … কোথায় আবার!.. কোত্থাও না তো!’

 




 

ইলা দেবী ততোধিক কর্কশ স্বরে বললেন, ‘আমি সব শুনেছি…ওই বেজন্মাটাকে নিয়ে কোন্ জাহান্নামে যাবার মতলব আঁটা হচ্ছে শুনি?’
‘খবরদার!ওকে বেজন্মা বলবে না।’— ক্ষিপ্রভাবে বললেন দীপকবাবু।
‘একশোবার বলব, বেজন্মা… বেজন্মা… বেজন্মা….. উফ্! দরদ একেবারে উতলে উঠছে।… তা কোথায় যাবে বললেই তো ল্যাটা চুকে যায়।’
দীপকবাবু আবার পক্ষীরাজের দিকে মুখ ফিরিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে বললেন, ‘পক্ষীরাজে চেপে আমি বৈতরণী পার হয়ে বৈকুণ্ঠধাম যাব।’
এই শুনে ইলা দেবী ক্রন্দনরোল তুলে বলতে লাগলেন, ‘ওগো, তুমি কি পাগল হয়ে গেলে গো! কিসব আবোল-তাবোল বকছ!…‌ এ আমার কি সব্বনাশ হল ভগবান!’

 

           ৪

 

সেদিনের পর সারা পাড়ায় রটে গিয়েছিল কিপটে দীপকবাবু শেষকালে গাড়ির মোহে পড়েছেন, আর মৃত্যুর পরও তাঁর আত্মার সেই মোহ থেকে মুক্তি হবে কিনা তা-ও সন্দেহাতীত।
পাড়ার মহিলাদের আসরে অনেকেই ইলা দেবীর কষ্টে সমবেদনা জানাতে গালে হাত দিয়ে বললেন,’ও মাগো, বুড়া বয়সে তোমার কত্তার মাথাটা এক্কেবারে খারাপ হয়ে গেছে। তোমার কিনা শেষটায় এমন দশা হল!’
ইলা দেবী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে বললেন,’ গাড়ি তো নয় যেন সতীন এনেছে ঘরে। সারাদিনে ওটার থেকে চোখ সড়লে না আমার দশা দেখবে।’
এই শুনে সকলে ই-কার ও বিসর্গ যোগে একসাথে তাঁর কষ্টে শরিক হলেন। বললেন,’ ইস্ ,‌‌ ছিঃ ছিঃ ছিঃ—’
এঁদের মধ্যে মুখার্জি গিন্নী বয়সে সবথেকে প্রবীণা। বার্ধক্য জনিত কারণে তাঁর শ্রবণ ক্ষমতা কমজোর হয়েছে অনেক দিন আগেই। তিনি কি শুনলেন আর কি বুঝলেন কেজানে, ঝঙ্কার দিয়ে বলা শুরু করলেন, ‘থাম্ রে থাম্! পুরুষ মানুষের কোনো বিশ্বাস নেই—আঠারো কি আশি সবাই এক।তেনাদের বশে রাখার একমাত্র উপায় হল নজরবন্দী করে রাখা….. একবার চোখের আড়াল হয়েছে তো ব্যাস্—সতীন ঘরে নিয়ে আসবেই—’

 

        ৫

 

দেখতে দেখতে পক্ষীরাজের দীপকবাবুর বাড়িতে আগমনের দশ বছর পূর্ণ হল। তবে ওকে দেখলে মনে হয় যেন এখনই শো-রুম থেকে আনা হয়েছে—এমনই চাকচিক্য। কিন্তু বয়সের ভারে দীপকবাবু অনেকটাই সামনের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। এখন তাঁর এই জরাজীর্ণ শরীর নিয়ে হামা দিয়ে গাড়ির তলায় ঢুকে চিৎ হয়ে শুয়ে নিচের অংশের সাফাই এবং মেরামত দুই-ই করতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। তবু্ও তিনি দমেন না। ‘নো প্রবলেম’ —মনে মনে বলেন দীপকবাবু—’তোর জন্য সব কবুল, পক্ষীরাজ ‘।

 




 

পক্ষীরাজের দশম বর্ষপূর্তির দিন দীপকবাবু প্রতিবারের মত ওকে রাজকীয় বেশে সাজাতে সকাল সকাল বাজার থেকে ফুল-মালা ও অন্যান্য সাজ-সরঞ্জাম কিনে আনলেন। তারপর গুনগুনিয়ে গাইতে গাইতে গাড়ি সাফাইয়ের কাজে লেগে পড়লেন। সাফ-সাফাই শেষে ইঞ্জিন স্টার্ট দিলেন—’ভ্রুম্…ভুর্রুম….. ভ্রুরুরুমম্ …ভ্রুরুরুরুরু..পিক্ পিক্… ভ্রুরুরু..পিক্…’—বাঁ হাতটা স্টিয়ারিংয়ে রেখে ডান হাতে ইঞ্জিনটা বন্ধ করতে গিয়ে বললেন,’তুই এখনো সেই প্রথম দিনটার মতোই আছিস। শু-ধু আ..মা…রই.. দিন ঘ-নি…য়ে—’ কথাটা আর শেষ করতে পারলেন না। মুখ থুবড়ে এলিয়ে পড়লেন স্টিয়ারিংয়ের উপর। তৎক্ষণাৎ হর্ণটা বেজে উঠলো—’পিইইইইইইইই….’
মাইনর স্ট্রোক হয়েছিল, যেটা দীপকবাবু সেযাত্রায় সামলে নিয়েছিলেন।
এরপর সেদিন দু’টি ঘটনা ঘটল।

প্রথমটি ছিল এই যে, দীপকবাবুর গ্যারেজে স্থান পাওয়ার পর প্রথমবারের জন্য পক্ষীরাজ চলল রাস্তায়। অবিরাম হর্ণের আওয়াজ শুনে যখন ইলা দেবী ও দীনেশ ছুটে এসে দীপকবাবুকে অচৈতন্য অবস্থায় গাড়ির ভিতর থেকে বের করল, গাড়ির চাবিটা তখন ইগনিশন পয়েন্টে গোঁজা ছিল। দীনেশ তাঁকে পাঁজাকোলা করে ঘরে রেখে এসে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে গাড়িটা নিয়ে বের হয়ে গেল ডাক্তার ডাকতে।

পরেরটি অত্যন্ত ভয়ানক। বাপ-মায়ের অতি আহ্লাদের দুধে-ভাতে সন্তান বাস্তবের কঠিন রাস্তায় একলা চলা শুরু করলে তার যে দুর্দশা হয়, পক্ষীরাজেরও ঠিক তেমনি হাল হল। কোনোদিন না চলার ফলে কিছুদুর যাওয়ার পর পক্ষীরাজের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এক-এক করে অসার হতে শুরু করল— প্রথমে গিয়ারবক্স জাম হল, তারপর এক্সিলেরেটার; পরে ব্রেক-ফেল হল; সামনের ডানদিকের চাকাটা খুলে গেল; সবশেষে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পুরানো একটি ব্রীজের কমজোর রেলিং ভেঙ্গে তীব্র বেগে ঝাঁপিয়ে পড়ল নিচের শুকনো নদী বক্ষের সারি সারি পাথরের চাঁইয়ের উপর। দীনেশ কোনোভাবে লাফিয়ে গাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রাণে বাঁচলো। সামান্য আহত হয়েছিল সে; কিন্তু অনেক উঁচু থেকে পাথরের উপর পড়ে পক্ষীরাজের হুড, বাম্পার, ট্রাঙ্কলিড, চাকাগুলো সব গোলাপের ঝড়া পাঁপড়ির মত এদিক সেদিক বিক্ষিপ্ত হল, আর বাকি দেহটা দুমড়েমুচড়ে কিম্ভুতকিমাকার রূপ নিল। ওটাকে আর দীপকবাবু ঘরে ফেরাতে পারলেন না।

এই দুর্ঘটনার শোকে দীপকবাবুর শারীরিক অবস্থার ধীরে ধীরে অবনতি ঘটতে লাগল। তিনি শয্যাশায়ী হলেন। আর মাঝে মাঝেই ভিরমি খেয়ে বিড়বিড়িয়ে বলেন, ‘ ওই তো আমার পক্ষীরাজ! সাদা ডানা দুটো মেলে আমায় নিতে আসছে—’, সাথেই যেন শুনতে পান পক্ষীরাজের সেই পরিচিত গোঙানি—’ভ্রুম্…ভুর্রুম….. ভ্রুরুরুমম্ …ভ্রুরুরুরুরু..পিক্ পিক্… ভ্রুরুরু..পিক্…’।

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © অভিজিৎ ঘোষ

 




গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 0   Average: 0/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
close