পাপ

পাপ

পাপ
অংশুমালী বর্ম্মন

ষাঢ়ের এক বৃষ্টির রাতে বিয়ে হলো নয়নের। সানাই বাজিয়ে, ঢোল বাজিয়ে মেয়ের পক্ষের বিশেষ করে মহিলা মহলকে কাঁদিয়ে রেনু কে ঘরে তুললো নয়ন। জগতের মা সারদা, সুন্দরী বৌমা পেয়ে খুব খুশি। সবাই কে ডেকে ডেকে বলতে থাকে, দেখ, আমার দেবী প্রতিমার মতো বৌমাকে দেখ। এমন বৌমা ঘরে থাকলে-ঘরে আর আলো জ্বালাতে হবে না। ঘর আমার যেন আলোয় ভরে গেল। আলোর বিপরীতে অাঁধার থাকে। বিয়ের বাইশ দিনের মাথায় শাশুড়ী সারদা বৌমার অন্ধকার দিকটা দেখতে পেল। টিউবওয়েল পাড়ে রেনু বমি করছে। সারদা প্রথমে স্বাভাবিক ভাবেই নিল। কিন্তু পর পর চার পাঁচ দিন একই ঘটনা বার বার ঘটতে থাকায় কেন যেন তার মনে সন্দেহ হলো। রাতে একান্তে স্বামীকে সারদা বলেই ফেলল, রোজ রোজ বৌমার বমি করার ঘটনা টা। সারদার বর শিবনাথ, বলল, বৌমা কি অসুস্থ। কই নয়ন তো আমাকে কিছু বলল না।
সারদা ফিসফিস করে বলে, আমার তো সন্দেহ হয় গো, মেয়ে বুঝি পেট বাঁধিয়েছে। শিবনাথ বলল, তা যা হয় হোক, কালকে বৌমাকে নিয়ে নয়ন কে ডাক্তারের কাছে পাঠাবো। ভালো খবর হলে, মিষ্টি বিলাবো।
সারদা আর কিছু বলল না। সারদা মনে মনে হিসেব কষতে লাগল। বৈশাখের শেষে বিয়ের পাকা কথা হয়েছে। জৈষ্ঠ্য মাসের শেষের দিকে নয়ন একবার গেছিল শ্বশুর বাড়ি। তাও আবার দিনে গিয়ে দিনে চলে এসেছে। তারপর বিয়ে, বিয়ে হওয়ার আজ পঁচিশ দিন, আর তাতে এরকম বমি হওয়ার তো কথা না। নিশ্চয়ই মুখপুড়ি, আগে তার মুখ পুড়েছে।
পরদিন নয়ন রেনুকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেল। ডাক্তার রেনুকে দেখার পর কয়েকটা টেস্ট করতে দিলেন। ডায়াগনস্টিক সেন্টারে টেস্ট গুলো করার পর সেগুলোর রিপোর্ট ডাক্তার কে দেখালো নয়ন। ডাক্তার রিপোর্ট দেখে হাসি মুখে বলল, বাবু আসছে। নয়ন শুনে খুব খুশি হলো। কিন্তু ডাক্তার যখন বলল, বাচ্চার বয়স তিন মাস। আর এ সময় কি কি করতে হবে, কি কি খাওয়াতে হবে। সবকিছু ডাক্তার বলে যাচ্ছে। কিন্তু তার একটা কথাও নয়নের কানে পৌছালো না। নয়ন এর কান তখন ভোঁ ভোঁ করছে। বারে বার শুধু একটি ধ্বনি প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসছে। বাচ্চার বয়স তিন মাস।
রেনুকে অনেক ভালবাসতো নয়ন। হয়তো বিশ্বাসও করতো নিজের থেকেও বেশি। কিন্তু একি হলো, নাহ, নিজের জীবনের প্রতি ঘৃণা জন্মে গেলো নয়নের। রেনুকে কিছুই বললো না। রেনুও কিছু জানতেই পারলো না। ডাক্তারের কাছে টেস্টের রিপোর্ট দেখাতে একাই গেছিল নয়ন। রেনু তখন বাইরে ছিল। রোগীদের ওয়েটিং রুমে।
রেনুকে নিয়ে বাড়ি ফিরল নয়ন। মা সারদা জানতে চাইল। ডাক্তার কি বলেছে, বৌমার জটিল কোনো ব্যামো কি না। নয়ন বলল, নাহ, সব ঠিক আছে। আর কিছু না বলে মায়ের সামনে থেকে সরে পড়লো। একটু একা থাকতে চায় সে। নিজেকে অনেক গুলো প্রশ্ন করবে সে। আর সব প্রশ্নের উত্তরও তাকেই খুঁজতে হবে। বাড়ি থেকে দশ মিনিট হাঁটলে টাঙ্গন নদী। নদীর ধারে গিয়ে বসলো নয়ন। বেলা ডুবুডুবু। নদীর দিকে তাকিয়ে নিজের সহজ সরল জীবনটাকে নিয়ে ভাবতে লাগল নয়ন। ওর ছোট থেকে বেড়ে উঠা, তারপর রেনুর সাথে বিয়ে। বিয়ে ঠিক হওয়ার পর নয়ন যখন রেনুদের বাড়ি গেছিল। তখন একা পেয়ে রেনুর কাছে জানতে চেয়েছিলো, রেনু ওকে পছন্দ করে কিনা। রেনু লজ্জায় লাল হয়ে মুখে এক চিলতে হাসি এঁকে বলেছিল, জানি না। তারপর এক প্রকার ছুটে পালিয়ে গেছিল রেনু। রেনুর সেই লজ্জা মিশ্রিত হাসি, তার বলা শব্দগুলো রোমাঞ্চিত করেছিল নয়নকে। ভীষন ভাললাগায় হৃদপিণ্ড কেঁপে উঠেছিল তার। নয়ন বুঝতে পেরেছিল, রেনুরও তাকে পছন্দ হয়েছে। কত কথা,কত স্মৃতি, এক নিমেষে তার মস্তিষ্কে এসে ভর করেছে। কিন্তু ডাক্তারের বলা কথাগুলো কিছুতেই ভুলতে পারছে না। কে ছিল, রেনুর জীবনে। যার বিষ রেনুর গর্ভে বাড়ছে। নাহ্, রেনুর কাছে জানতেই হবে। কিন্তু বাবা মাকে জানাবে না নয়ন। খুব কষ্ট পাবে তারা। আর ঘটনাটি জানাজানি হয়ে গেলে গ্রামে তাদের একঘরে হয়ে থাকতে হবে। আত্মীয় স্বজনরা হয়তো আর তাদের আঙ্গিনা মাড়াতে আসবে না। হয়তো পিছনে আলোচনার ঝড় উঠবে। আর যা হয় হোক। সমাজে নয়নের পরিবার কি রকম হেনস্তার শিকার হবে, ভাবতেই নয়নের চোখে জল চলে আসে।
সে রাতে শুতে যাওয়ার সময় নয়ন রেনুকে বলল, একটা কথার সোজাসাপটা উত্তর দিবে রেনু। রেনু বলল, বলো।
আজকে যে ডাক্তারের কাছে গেলাম, ডাক্তার বললো, তোমার পেটে তিন মাসের বাচ্চা। এ বাচ্চাটা কার রেনু। রেনু বিছানায় বসে চুলে বেনি দিচ্ছিলো, নয়নের কথা শুনে হাত থেমে গেল রেনুর। নীরবে চোখের জল ফেলতে লাগল। নয়ন বরাবরই শান্ত প্রকৃতির। রেনুর চোখের জল তার সমস্ত রাগ নিমেষে শীতল করে দিল। বলো রেনু, কে ছিল তোমার জীবনে।
রেনু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
নয়ন বুঝতে পারে না, কি করবে। এত বড় একটা ঘটনা তাও সে রাগ করতে পারছে না রেনুর উপর। আর রেনু, সেও তার কথার উত্তর দিচ্ছে না। প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য কাঁদছে। তখন নিজের জীবনের প্রতি ঘৃণাটা আবার মাথা চাড়া দিল যেন। রেনুকে বলল, ঠিক আছে, রেনু। তুমি সুখে থেকো। আমি বেঁচে থেকে ও পাপের মুখ দেখতে পারবো না আমি। আমি চললাম মরতে। বলে, নয়ন বাইরে বেড়িয়ে যাচ্ছিল। তখনি রেনু মাটিতে পড়ে নয়নের পা আঁকড়ে ধরলো। আর বলতে লাগল, আমাকে ক্ষমা করে দাও গো। আমি পাপী। আমি অনেক ভুল করেছি। তুমি আমাকে মেরে ফেল, তবুও মরতে চেও না।
সে রাতে আর ঘুম হলো না নয়নের। রেনুও ঘুমাতে পারলো না। ভোর রাতে রেনু নয়নকে বলল, আমার পেটে কার সন্তান তুমি জানতে চাও। তাহলে শোনো। আমার দাদার পাপ, আমার পেটে। কথাটা শুনে নয়ন স্তম্ভিত হয়ে যায়। বলে, তোমার দাদা। হ্যাঁ, আমার নিজের দাদা রোহিত এর। এখন তুমি যা করতে বলবে, আমি তাই করবো। আমাকে মরতে বললে, আমি মরবো। আর আমাকে ছেড়ে দিতে চাইলে ছেড়ে দিতে পারো।
নয়ন কিছু বলতে পারে না। চুপ হয়ে যায় রেনুও।
পরদিন সকালে বাবা, মাকে ঘটনাটি জানায় নয়ন। মা তো কাঁদতে শুরু করে। শিবনাথ বলল, কান্না বন্ধ করো সারদা। আমি কথা বলবো বিয়াই এর সাথে। আজ কাতিহারের হাট। সেখানে বিয়াই এর সাথে দেখা করে কথা বলবো। তোমরা শুধু চুপচাপ থাকো। বৌমাকে দোষারোপ করিও না। ভুল সবার জীবনে হয়, তাই বলে একটা ভুলের মাশুল হিসেবে আমরা আরো একটা ভুল করবো না।
কাতিহার হাটে রেনুর বাবার সাথে দেখা হলো শিবনাথের। সবকিছু বলল শিবনাথ। রেনুর বাবা কিছু বলতে পারলো না। চুপচাপ শুনতে লাগলো, আর চোখের জল মুছল। শেষে রেনুর বাবা বলল, বিয়াই, আপনি যা বলবেন, আমি তা মেনে নিবো। রেনুকে না রাখতে চাইলে রাখবেন না। যে ভুল করেছে, তাতে আপনাকে আর অনুরোধ করবো না, রেনুকে মেনে নেওয়ার।
শিবনাথ বলল, বিয়াই, আপনার মেয়েকে কি আমি আমার মেয়ে ভাবি না। যদি আমার নিজের মেয়ে এরকম ভুল করতো, তাহলে। ওসব বাদ দেন। এখন আপনাকে যেটা করতে বলি, সেটা শুনেন। যেহেতু বাচ্চাটা আমার ছেলের নয়, তাই এ বাচ্চা কে আমি আমার বাড়িতে মেনে নিতে পারবো না। বাচ্চাটা নষ্ট করার ব্যবস্থা করেন। আর যতদিন বৌমা এসব থেকে না সেরে উঠছে, ততদিন আপনার বাড়িতে রাখেন। সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে গেলে গ্রহ শান্তি আর গীতা পাঠ অনুষ্ঠান করবেন। তারপর আমরা আবার বৌমাকে নিয়ে আসবো। আর এ কথা পাঁচকান করার কোন দরকার নেই।
রেনুর মা এসে রেনুকে নিয়ে গেল। বাচ্চা নষ্ট করার ঔষধ খাওয়ানো হলো। বাচ্চা নষ্ট হলে বাড়িতে যাগযজ্ঞ করল। তারপর এক শুভ দিন দেখে রেনুকে আবার আনতে গেল নয়ন আর ওর বাবা মা।
আর রোহিত, রেনুর দাদা, ঘটনা জানার পর সে যে ফেরার হলো, আর সে ফিরে এলো না।
রেনু আর রোহিতের সেই পাপ কাহিনী কেউ কখনো শুনতে চায় নি। আর রেনুও কাউকে কিছু বলে নি। সংসার জীবন চলতে থাকলো। তবে কি রেনুর সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে না। মনে পড়ে না তার দাদা রোহিতকে। কে জানে সবার অজান্তে দু’ফোটা চোখের জল রেনু আজও রোহিতের জন্য ফেলে। না হয়তো ঠিক রোহিতের জন্য নয়, সেই পাপের জন্য ফেলে।

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 1   Average: 5/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
close