পুত্রবধূ

গল্পের নামপুত্রবধূ

লেখক—ভিক্টর ব্যানার্জী

 

 

জেলেখানায় বসে একখানা বিড়ি ধরিয়ে সূরজ রুদ্রকে বলল—“কি রে আজ তো ছুটি হয়ে যাবে?”
রুদ্র বলল—“হ্যাঁ।”
—“বেরিয়ে কোথায় যাবি?”
—“নন্দিতার কাছে।”
—“সেবারে প্যারোলে গেলি না যে!”
—“এমনি।”
সূরজ বিড়ি দেশলাইটা দিয়ে বলল—“এনে খা। আর তো দেখা হবে না। ভালো থাকিস।”
রুদ্র বলল—“না রে আজ আর খাবো না। জানিস সূরজ,নন্দিতার জন্য বড় কষ্ট হয় রে,জীবনে কিচ্ছু পেল না মেয়েটা। সব আমার দোষ,কপালের দোষ।”
সূরজ কাঁধে হাত রেখে বলল—“যাবার সময় মন খারাপ করিস না রুদ্র।”
এমন সময় রুদ্রকে জেলার সাহেব ডেকে পাঠাল।
জেলের খাতায় সই সাবুদ করে রুদ্র ফিরে এসে
সূরজকে বলল—“যাই রে।”
—“যাই বলতে নেই ভাই,বল আসি।”
—“আচ্ছা,আসি।”
এই বলে জেল থেকে বেরিয়ে এল রুদ্র।

 




 

রুদ্র’র জেল হবার বৃত্তান্তটা বলা আবশ্যক। রুদ্র রায়,কলকাতার সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে। বাবা স্কুলের মাস্টারমশাই। ছোট থেকে গানবাজনা নিয়েই থাকত রুদ্র। হারমোনিয়ামের রিডে তার হাত কথা বলতো। যে কোনো গানের সুর অনায়াসে বাজাতে পারত। একবার ওর গানের শিক্ষক ওর বাবাকে বলেছিল—তার সপ্তকের সরগম নিয়ে আপনার ছেলে খেলতে পারে,এ ছেলে বড় হয়ে ওস্তাদ হবে! আর ওস্তাদ ! ওস্তাদ হওয়া কি অত সহজ কথা! যাইহোক,একটা সময় প্রচুর ছাত্রছাত্রীদের গান শেখাতো রুদ্র। এই সময়তেই নন্দিতার সাথে তার প্রেম হয়।

রূপে লক্ষ্মী,গুনে সাক্ষাৎ মা সরস্বতী। গানের জোয়ারে তরী ভাসতে পারত। নন্দিতা খ্রীস্টানের মেয়ে,তাই বাড়ির অমতেই বিয়ে করতে হল রুদ্রকে। ফলে বাড়ি ছাড়তে হল তাদের। উল্টোডাঙ্গার একখানা ছোটো বাড়িভাড়া নিয়ে রুদ্র নন্দিতাকে নিয়ে উঠল। দু বেলা ছাত্রছাত্রীদের গান শিখিয়ে রুদ্র’র রোজগার হত না বলে লোকাল প্রোগ্রামে গাইতে শুরু করল নন্দিতা। অল্পদিনেই অনেকখানি সাফল্য। গানে গানে ভালোই কাটছিল তাদের দিনগুলো। এমন সময় নকশালদের বাড়াবাড়ি আরম্ভ হল। রুদ্র’র গানের টিউশনগুলো বন্ধ হয়ে গেল। নকশালরা ডেকে নিয়ে গেল রুদ্রকে। তারপর তাদের দলে একপ্রকার বাধ্য হয়ে নাম লেখাতে হল। এই সময় প্রচুর দলের ছেলেরা তার বাড়ি আসত। বাড়িওয়ালা নকশালদের ভয়ে রুদ্রকে বাড়ি থেকে তাড়াতে পারল না। ধীরে ধীরে গানের মাস্টরমশাই হয়ে গেল নকশাল নেতা—রুদ্র রায়! তারপর একদিন পুলিশের চোখে ধরা পড়ে হাজতবাস!

সেদিন জেল থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পাইকপাড়ার বস্তিতে এল রুদ্র। নন্দিতা এখন এখানেই থাকে। আগের বার প্যারোলে আসতে পারেনি বলে হয়তো রাগ করে বসে অাছে,এইসব ভাবতে ভাবতে রুদ্র বস্তিতে ঢুকল। ঢুকতেই একটা বাচ্ছাছেলে দৌড়ে গিয়ে নন্দিতাকে বলল—“মামী,ও মামী দেখো কে এসেছে?”

 




 

নন্দিতা ভাত বসিয়ে ছিল। ঘুরে তাকাতেই দেখল,রুদ্র!
রুদ্র জুতো খুলে ঘরে ঢুকে বসে বলল—“একটু জল দেবে?”
কুঁজো থেকে এক গ্লাস জল নিয়ে রুদ্রকে দিয়ে সে বলল—“এ নাও ধরো।”
তারপর দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে রুদ্র’র পাশে বসে বলল—“এবারে প্যারোলে এলে না তো,তাই তোমায় একটা কথা বলা হয়নি।”
—“কি কথা?”
—“জানো,গতমাসে বাবা এসেছিলেন।”
—“কার?তোমার?”
—“না গো তোমার।”
শুনেই রুদ্র’র মুখখানা কঠিন হয়ে উঠল। সে বলল—“কেন, কি চায় তারা?”
—“একটিবার তোমায় দেখতে চায়।”
রুদ্র গম্ভীর স্বরে বলল—“তুমি জানো নন্দিতা,ও বাড়ির সাথে কবেই আমার সম্পর্ক চুকেবুকে গেছে। আজ কেন তবে নতুন করে তারা আবার সম্পর্ক পাতাতে চাইছে?”
নন্দিতা শান্ত গলায় বলল—“দ্যাখো রাগ করে কি করবে বলো,উনি আমাদের সাথে যাই করুক না কেন উনি তোমার বাবা!”
—“আমার বাবা,মা,ভাই-বোন কেউ নেই। নন্দিতা, শুধু তুমি ছাড়া এ দুনিয়ায় আমার আপন বলতে কে আছে বলো।”
নন্দিতা চুপ করে রইল। কিছুক্ষণ পর ড্রয়ার থেকে  পঞ্চাশ টাকার নোটের একখানি বান্ডিল এনে বলল—“এটা উনি দিয়ে গেছেন।”
রুদ্র ওর দিকে তাকিয়ে বলল—“কাল ও বাড়ি গিয়ে ফেরত দিয়ে আসবে।”
—“তুমি যাবে না?”
—“না।”
এই বলে রুদ্র উঠে পড়ার উপক্রম করছিল। নন্দিতা বলল—“কোথায় চললে?বসো বলছি।”
এই বলে দরজায় খিল দিয়ে সে রুদ্র’র হাতখানা ধরে বলল—“বেশ তোমায় যেতে হবে না। কিন্তু এখন কোত্থাও বেরোবে না। এই সবে ফিরেছ,একটু জিরিয়ে নাও।”
রুদ্র বলল—“নন্দিতা কত কষ্ট,কত দুঃখ বুকে নিয়ে তুমি আমার জন্য এত বছর অপেক্ষা করেছিলে। আর ওরা,আমি বাঁচলাম না মরলাম,তার খবর পর্যন্ত রাখেনি। একজন স্কুল মাস্টার হয়ে জাতের দোহাই দেয়! তুমি ভুলে যেতে পারো নন্দিতা, সেদিনের কথা আমি ভুলিনি। যেদিন এক কাপড়ে বেরিয়ে আসতে হল,কোথায় ছিল তাদের টান!”
নন্দিতা বলল—“আচ্ছা এসব এখন বাদ দাও।”
এই বলে টাকার বাণ্ডিলটা তুলে ড্রয়ারে রেখে দিয়ে বলল—“কাল ওটা আমিই ফেরত দিয়ে আসব।”

 




 

পরেরদিন সকালবেলা নন্দিতা মাথায় ঘোমটা দিয়ে টাকার বাণ্ডিলখানা নিয়ে ও বাড়িতে গেল। রুদ্র’র বাবা বাজারের থলি হাতে বেরোতে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ নন্দিতাকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়লেন।
বললেন—“খোকা এলো না বউমা?”
—“না বাবা,সে আসবে না।”
এই বলে কোঁচর থেকে পঞ্চাশ টাকার নোটের বাণ্ডিলখানা ওনার হাতে দিয়ে নন্দিতা বলল—“বাবা টাকাটা ও নিল না। আপনি এটা রেখে দিন।”
—“আমায় ফেরত দিলে কেন বউমা?তুমি তো রেখে দিতে পারতে। ও টাকা তো তোমাদেরকেই দেওয়া।”
—“না বাবা,তা হয় না। আপনার ছেলেই আমার সব। টাকার আমাদের প্রয়োজন নেই। জেলের যন্ত্রনার দাগ হয়তো মিলিয়ে যাবে,কিন্তু ওর মনের যন্ত্রনার ক্ষত ওই টাকা দিয়ে তোলা যাবে না বাবা।”
এই বলে ঘোমটাখানা টেনে বেরিয়ে এল নন্দিতা। রুদ্র’র বাবা টাকার বাণ্ডিলটা হাতে নিয়ে মূহ্যমান হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

—সমাপ্ত—

১৪ই বৈশাখ ১৪২৭
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ©ভিক্টর ব্যানার্জী

 




গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total:    Average: /5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।