প্রজাপতির প্রশ্নগুলো

প্রজাপতির প্রশ্নগুলো

প্রজাপতির প্রশ্নগুলো
-এস, এম, মাসুদ করিম
ঘরের এককোণায় একটি প্রজাপতি স্থির হয়ে বসে আছে। প্রজাপতিটি দেখতে খুব সুন্দর। বাদামী বর্ণের, ডানার প্রান্তগুলোতে গোলাকার দাগ। সারাদিন ঘুরে ঘুরে সেটি বেশ ক্লান্ত। দিনটি আজকে তার বেশ ভালো কেটেছে। সে রঙ বেরঙের ফুলগুলোর বিচিত্র স্বাদযুক্ত মধু খেয়েছে। আবহাওয়া ছিল চমৎকার, ঝকঝকে রোদ, শীতের হাল্কা রোদ আর মৃদু ঠান্ডা বাতাস। আজকে সে দুবারের জন্য আক্রমণের শিকার হয়েছিল। বুঝ হবার পর থেকেই সে সবসময় সতর্ক থাকে। এই পৃথিবী অনেক সুন্দর হলেও তার শত্রু কম নয়। সেই ডিম থেকে শুঁয়াপোকা হওয়ার সময় থেকে সে অনেকবার আক্রমণের শিকার হয়েছে। একবার এক পাখি তাকে ঠোকর দিয়ে প্রায় খেয়ে ফেলেছিল। কিন্তু সে শরীর মুচড়িয়ে পাখিটির মুখ ফসকিয়ে নীচে পড়ে যায়। সে পড়েছিল একেবারে গাছের নিচে। শক্ত মাটিতে দূর্বাঘাসের উপর। তার শরীরের অনেকটা থেতলে গিয়েছিল। অনেকদিন আহত থাকার পর সে ভালো হয়েছিল। সে তার স্বজাতিদের অনেককেই মরে যেতে দেখেছে। মানুষগুলো তাদের সামনে পেলে লাঠি বা গাছের ডাল দিয়ে বাড়ি মেরে বা জুতো দিয়ে থেতলে দেয়। এরা শুঁয়াপোকাকে কুৎসিত মনে করে। এগুলো দেখলে তাদের গা শিউরে উঠে, হাত পা শির শির করে উঠে। পিঁপড়া, মৌমাছিগুলোও তাদেরকে আক্রমণ করে বসে। এই পৃথিবীতে থেকে তারা বিদায় হলেই যেন এরা বেঁচে যায়। আক্রমণের পরপরই নিজেদের প্রতি প্রচন্ড ভালোবাসা উৎপন্ন হয়। নিজেকে রক্ষা করতে পারছেই বলে সে এই পৃথিবীর রূপরস উপভোগ করতে পারছে। শত্রু না থাকলে পৃথিবীটা অত্যন্ত চমৎকার হত!
শুঁয়াপোকা থাকা অবস্থায় সে কচিপাতা, নরমঘাসগুলো কচকচ করে খেয়ে ফেলত। তারপর গাঁয়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াত। বনের মিষ্টি হাওয়া, মিঠে রোদ, ঝিরঝির বৃষ্টি, রঙবেরঙের গাছপালা দেখে তার মন উদাস হয়ে যেত। সে আকাশপানে তাকাত আর ভাবত। আকাশ কী সুন্দর! সেখান দিয়ে অনায়াসে বহুদূর চলে যাওয়া যায়। রঙবেরঙের মেঘ, রংধনু, পাহাড়, ঘনবন ইত্যাদি দেখা যায়। ভিতরে তার আকাশজয়ের স্বপ্ন লালিত হতে থাকে ।
একসময় তার স্বপ্নটি পূরণ হয়। সে শুঁয়াপোকা থেকে ডানাওয়ালা প্রজাপতিতে পরিণত হয়। এখন সন্ধ্যার আকাশ তার জন্য চমৎকার পরিবেশ্। এসময় উড়ে চলা তার জন্য আনন্দদায়ক। সে নাচানাচিতে অত্যন্ত পারদর্শী। সে হেলেদুলে, আকাশে উড়ে, কোনো জায়গায় বসে, বিচিত্র সব ভঙ্গিতে নাচে। কেউ কেউ তার এ নাচ দেখে মুগ্ধ হয়। বিশেষ করে মানুষগুলো যখন তারা শুঁয়াপোকা ছিল ঘৃণা করত, কিন্তু তারাই এখন অধিক আগ্রহ নিয়ে তাদের দেখে, ছবি তুলে, পিছন পিছন ছুটে আসে। মানুষগুলোর মিষ্টি হাসি, আর বিচিত্রভঙ্গিতে ছুটাছুটি তার কাছে চমৎকার লাগে।
ঘরের মধ্যে একটি টিউব লাইট, একটি ফ্যান, একটি ক্যালেন্ডার, গুটি কয়েক আসবাবপত্র বিদ্যমান । ঘরটির স্থানে স্থানে মাকড়সার জাল। সেখানে কিছু কীটপতঙ্গ আটকে আছে-কোনটি মৃত এবং কোনটি জীবিত। একটি মাছির চারিদিকে জাল পেঁচানো, নাড়াচাড়া করছে-এখনও মরেনি। এগুলা মাকড়সার খাবার। তারও সতর্ক থাকতে হয়। সে একটু অসতর্ক ও দূর্বল হলে এই মাকড়সার জালে পেঁচিয়ে যেতে পারে। সবল থাকার জন্য চাই খাবার দাবার, একটু ছুটাছুটি। ফুলগুলোর মধু তাকে শক্তি ও বুদ্ধি দেয়। তার মন ফুরফুরে থাকে।
বাল্বের আলোয় একটি নাড়াচাড়া তাকে সতর্ক করে তোলে। একটি টিকটিকি তার দিকে একটু এগিয়ে আসে। তার উদ্দেশ্য ভালো নয়। তবে টিকটিকিটি দূর্বল, সম্ভবত অনেক ক্ষুধার্ত। বাল্বের কাছে থাকা পোকামাকড়গুলো ধরার চেষ্টা করছে। সে নিশ্চিত টিকটিকিটি খেয়ে দেয়ে একটু সবল হলে আরও ভালো শিকার ধরার চেষ্টা করবে এমনকি তাকে ধরেও খেয়ে ফেলতে পারে। টিকটিকিটি হলো কুৎসিত এক প্রাণী-তাদের শুঁয়াপোকা দশার মতো। এরা ছোট ছোট সাদা রংয়ের ডিম পাড়ে। এদের ডিমগুলো মানুষের বাচ্চাকাচ্চারা খেলতে ব্যবহার করে। তারা সেগুলো একজায়গায় জড়ো করে, হাতিয়ে দেখে, তারপর একটি পাটখড়ির উপরের একপ্রান্তে রেখে অন্যদিক দিয়ে ফু দিয়ে উপরে উঠিয়ে খেলে, তারপর ভেঙ্গে ফেলে এবং সেগুলোর মাঝে বাচ্চা খুজতে থাকে। এদের লেজ মাঝে মাঝে খসে পড়ে। সেটির চামড়া ও চোখগুলোও কুৎসিত। যেখানে সেখানে মলত্যাগ করে বলে এরা নোংরা প্রাণী। কুৎসিত ও নোংরা শত্রুর কাছে ধরা খাওয়া অপমানজনক! প্রজাপতিটি পুনরায় সতর্ক হয়ে উঠে।
বাল্বের সাথে মিল আছে সূর্যের। এরা আলো দেয়। এদের আলোর জন্যই শত্রুরা তাকে দেখে ফেলতে পারে। সে কষ্টের মাঝে পতিত হয়। সে ভাবে যদি সে আকাশ হতো তাহলে সূর্যকে নিভিয়ে দিত বা লুকিয়ে ফেলত। তখন অন্ধকারে সে অনায়াসে তার শত্রুদের হতে লুকিয়ে থাকতে পারত। আর আকাশ বা শূন্যস্থান কতই না আরামদায়ক। সেটি সবকিছু ধারন করে আছে বলে যেকোনো কিছু খুজে পাওয়া যায়। ফাঁকা বলে নির্ঝঞ্জাটে সেখান দিয়ে উড়েও চলা যায়। কিন্তু সূর্য বা আলোর জন্যই সে তার শত্রুদের, ভালো জিনিস ও খারাপ জিনিসও দেখতে পায়। আলোগুলো গাছপালাকে বাঁচিয়ে রাখে, রঙ বেরঙের ফুল ফোটায়, প্রাণীদের পথ দেখায়, ভালোমন্দ বুঝতে শেখায়, শত্রু মিত্র চিনায়। আলোর বিভিন্ন কাজের জন্য দরকার আছে। তাহলে সবকিছুরই কোনো কাজের জন্য দরকার আছে। তাহলে তারও কোনো কাজের জন্য এই পৃথিবীতে দরকার আছে। এই পৃথিবীতে তার প্রয়োজনটা কী?
সে ছোট থেকে ধীরে ধীরে বড় হয়েছে। ডিম থেকে হয়েছে শুঁয়াপোকা, তারপর শুঁয়াপোকা থেকে হয়েছে আস্ত এক প্রজাপতি। এখন সে ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়ায়। ফুলের মধু খায়। এতে ফুলের পরাগায়ন হয়, ফল ধরে। তাদের অনেককে শত্রুরা ধরে খেয়ে ফেলে। তারা অন্যের খাবার হয়ে যায়। প্রজাপতিটি শিউরে উঠে। তারপর এখন সে আকাশ হতে চায়। তার ধারনা আকাশ সবকিছু ধারন করে বলে সেটি সবকিছুই জানে।তার সবকিছু জানতে ইচ্ছে করে। সে তার মায়ের কথা মনে করতে থাকে। কিন্তু সে তার মায়ের কথা মনে করতে পারে না। তার মনে হয় সে তার মাকে দেখেছে, তবে চিনতে পারেনি। তার মাও তাকে চিনতে পারেনি। মা না থাকা এক রকমের কষ্ট। আর থেকেও চিনতে না পারাটাও অন্যরকমের কষ্ট। তার বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে উঠে। মায়ের সাথে সাথে তার বাবার কথাও মনে পড়ে যায়। সে কোনদিন তাদের চিনবে না, তারাও তাকে চিনবে না। সে তার ভাইবোনদের কথাও মনে করতে চেষ্টা করতে থাকে। ডিম থেকে ফুটে বের হওয়ার পর তার ভাইবোনদের কথা অত মনে নেই। তারা কী বেঁচে আছে নাকি শত্রুরা তাদের সকলকে খেয়ে ফেলেছে! প্রজাপতিটি নিজেকে একা এবং অসহায় মনে করতে থাকে। সে দূর্বল হয়ে যায়। নাকি তার ভাইবোনরা এখনও বেঁচে আছে। সে তাদের বেঁচে থাকার কথা মনে করে আনন্দিত হয়ে উঠে। আহারে আমরা সবাই কতই না কাছের! কতই না চেনা! এখন সবাই হয়ে গেছি অজানা, অচেনা। তার অন্যান্য বন্ধুদের কথাও মনে হতে থাকে। তারাও তার মতো সবকিছু হারা। তার মনে হয় আকাশ সব জানে। একবার আকাশ হতে পারলেই সবকিছু জানা যাবে! সকলের হয়ে সে আকাশকে প্রশ্ন করতে থাকে-
-আমাদের বাবা-মা, ভাইবোন, আত্মীয়-স্বজনরা কোথায়?
-তারা কী আমাদের মতোই বেঁচে আছে? নাকি শত্রু দ্বারা গত হয়েছে?
-আমরা এখন কী করব? সকলের ন্যায় শুধু বা্চ্চাকাচ্চা উৎপাদন করে যাব!
প্রজাপতি ভাবে আকাশ হওয়া গেলেই সবকিছু জানা যাবে! আকাশ হলে কাউকে কিছু বলা যায়না কিন্তু সবকিছু জানা যায়! যারা আকাশ হয়ে গেছে তারা মনে হয় সবকিছু জেনে গেছে! কিন্তু আকাশ হওয়া যায় কিভাবে? একসময় তার প্রজাপতিররূপ হবে আকাশেররূপ, শুঁয়াপোকা যেমন হয়েছে প্রজাপতিররূপ। সে আর অধিক চিন্তা করতে পারেনা। যেহুতু সবকিছু সে জানে না সে আকাশ হতে পারেনি। মনে মনে আকাশ হওয়ার জন্য সে স্বপ্ন বুনতে থাকে। আকাশ হলেই সে তার প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে পারবে। সে প্রশ্নগুলোর উত্তর জানার জন্য মরিয়া হয়ে উঠতে থাকে? তার মধ্যে বেঁচে থাকার প্রবল ইচ্ছা জাগ্রত হয়। টিকটিকিটি তাকে ধরার জন্য হাঁ করে তার দিকে এগিয়ে আসে। তখনই উড়াল দেয় প্রজাপতিটি? তাকে ধরা পড়লে চলবে না। শত্রু দ্বারা মরলে আর আকাশ হওয়া যাবে না। এই পৃথিবীতে তারও দরকার আছে। সে ঘরে একটি চক্কর দিয়ে জানালার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে পড়ে। সামনে অন্ধকার অনন্ত আকাশ। তার ইচ্ছার ন্যায় উন্মুক্ত।

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 1   Average: 1/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
close