প্ল্যানচেট

রহস্য রোমাঞ্চ গল্প- “প্ল্যানচেট”

 

কে শ্রাবণ সন্ধ্যা, তার ওপর মুষলধারে বৃষ্টি, চারিদিক অন্ধকার আর ঘন কালো মেঘে ঢেকে এসেছে আকাশটা। প্রতিদিনের মতো পাড়ার ক্লাবে সান্ধ্যকালীন আড্ডাটা বেশ জমে উঠেছে। লোডশেডিং হয়ে গেছে বৃষ্টি নামার আগে থেকেই।তা প্রায়শতই সুদীপ আসে না ক্লাবে, অফিসের কাজ,লেখালিখি, তারপর বাড়ির কাজ এই সব নিয়ে তার ব্যস্ত জীবন।আজ এত বৃষ্টিতে ছাতা মাথায় দিয়ে তাকে আসতে দেখে পাড়ার ছেলেরা তো ভীষণই অবাক। সুদীপ ভেজা ছাতাটা ক্লাবের বারান্দায় গুটিয়ে রেখে, একটু গলা ঝাকানি দিয়ে ঢুকল ক্লাবের ভিতরে।

আর ঢুকতেই পাড়ার বিশ্বম্ভর দাদু একটু মসকরা করে বলল, ‘কি হে ছোকরা আজ হঠাৎ এখানে, তোমার তো আজকাল টিকি মেলাভার।’ সাথে পল্টু,কানাই,শ্যামল,রাহুল শ্যাম দা,শুভ দা সবাই অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে,যেন ভূত দেখছে তারা। সুদীপ এবার মুখ খুলল, ‘ কেন আসতে পারি না কি ক্লাবে, আজ একা ভালো লাগছিল না,তাই—‘ সুদীপ এর এ হেন কথা শুনে সবাই একটু দুঃখ বোধই করল। কারণ সবাই কমবেশি জানে সুদীপের নিজেকে ব্যস্ত রাখার নামে সবার থেকে আলাদা করে নেওয়ার কারণটা।

সে যাইহোক, রহিম চাচা বলল, ‘ কেন যে সবাই মিলে তোমরা ছেলেটা অপ্রস্তুতিতে ফেলছো জানি না, জানো তো ওর বিষয় টা। তা সুদীপ বসতো বাবা বস্। আজ বরঞ্চ একটা গল্প শোনা তো আমাদের।’ এই প্রস্তাবটা রহিম চাচা রাখার সাথে সাথেই সবাই তাতে সায় দিল। পল্টু বলল,’ দাদা, একটা গল্প হয়ে যাক না,অনেক দিন গল্প শুনিনি তোমার কাছে’। সুদীপ প্রথমটাই আপত্তি করলেও বিশ্বম্ভর দাদুর কথাটা ফেলতে পারল না। আর মনে মনে ভাবল আজকাল কার যুগে আর গল্প শোনা, গল্প লেখা এসব এর চল নেই বললেই চলে। সবাই তো ব্যস্তই থাকে মুঠো ফোনে।

সেই যাই হোক সুদীপ সবার অনুরোধে গল্প আরম্ভ করল। এটাকে ঠিক গল্প বলা চলে না, সেদিন সন্ধ্যায় আমরা যেটা শুনেছিলাম,আজও মনে পড়লে—-। যাই হোক ফিরে আসি সুদীপের কথায়। সুদীপ বলল, আজ তোমাদের বলব প্লানচেট কে কেন্দ্র করে একটা ঘটনা, তা তোমরা জানো তো প্লানচেট কি?’ সুদীপের প্রশ্নের উত্তরে কানাই বলল, ‘সে আর নতুন কি দাদা,অনেক বার শুনেছি,দেখেছি সিনেমাতেও।’ সাথে বিশ্বম্ভর দাদু ও বলল, ‘ হ্যাঁ, অবশ্যি শুনেছি। সে আর্য যুগ থেকেই শোনা যায় এর কথা।

আমাদের রবীন্দ্রনাথ থেকে আব্রাহাম লিঙ্কন সবাই তো প্লানচেট করতেন। শোনা যায় রবীন্দ্রনাথ প্লানচেট করে তাঁর প্রিয় কন্যা ও পুত্রদের সাথে কথা বলতেন। তার মধ্যে ছিল তাঁর প্রিয় কনিষ্ঠপুত্র শমিন্দ্রনাথ,জ্যোষ্ঠ কন্যা মাধুরীলতা,সতেন্দ্রনাথ প্রমুখরা। বড্ড ভালোবাসতেন কিনা শমিন্দ্রনাথ কে রবীন্দ্রনাথ। তাই বারবার ডাকতেন শমিন্দ্রের আত্মাকে। মিডিয়াম ছিল উমাদেবী। সেই যাইহোক, তা তোমার ঘটনাটা ঠিক কি বলতো?’ বিশ্বম্ভর দাদু প্রশ্ন করল। আর এদিকে সবাই তখন একে অপরের খুব কাছাকাছি এসে বসেছে। আর বাইরে তখন অঝোরে বৃষ্টি, ঘরে মোমবাতিটা নিভব নিভব অবস্থা।বার বার বিদ্যুৎ এর আলোয় ঘরটা ঝলমলিয়ে যাচ্ছে।সুদীপ বলতে শুরু করল ঘটনাটা, ‘ তা তোমরা তো সবাই জানো কবিতার কথাটা।

একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল সুদীপ। আমিও বুঝিনি হঠাৎ ও আমায় ছেড়ে চিরদিনের মতো চলে যাবে। তখন আমি কলকাতার একটা অফিসে কাজ করি, আর ওখানেই দেখা কবিতার সাথে। কি একটা বিশেষ কাজে এসেছিল আমাদের অফিসে। তো এভাবেই প্রথম দেখা,তারপর প্রেম আর সবাইকে না জানিয়ে বিয়ের কথাবার্তাও চলছিল। কবিতা থাকত শ্যামবাজার স্ট্রিটের একটা ফ্লাটে, ওর পৈতৃক বাড়ি উদয়নারায়ণ পুরে। এইখানে একটা পত্রিকার অফিসে কাজ করত।বেশ চলছিল সব। আমিও অফিস শেষে ওর বাড়ি যেতাম, সপ্তাহের শেষে এক আধবার বাইরে ঘুরতে যেতাম।

ও বেশ হাসি খুশিই থাকত। কিন্তু হঠাৎ সব কেমন জানি বদলে গেল কবিতা। মুখে হাসি নেই,চিন্তাগ্রস্ত থাকত। জিজ্ঞাসা করলেও কিছুই বলত না।বেশকয়েক বার সাইকোলজিস্টেও দেখিয়ে ছিলাম, কিন্তু কিছুই পরিবর্তন হয়নি। বাধ্য হয়ে আমিই একটা কাজের লোক,বলা যায় ওর দেখাশোনা করার লোক রেখেছিলাম।সে ও বলত স্যার ম্যাডাম খাবার,ঔষুধ কিছুই খেতে চাই না।আমিও যেতাম মাঝে মধ্যেই দেখা করতে,ওকে বোঝাতাম। কিন্তু ইদানিং ও আমার কোনো কথায় শুনত না। তারপর যা ঘটেছিল সেটা তোমরা সবাই জানো।কবিতা র মৃতদেহ টা পাওয়া গিয়েছিল নিচের বেসমেন্টের সামনে। পুলিশের অনুমান ছিল আত্মহত্যা। যেদিন ঘটনাটা হয় ও আমায় ফোন করেছিল, কিছু একটা বলতে চাইছিল। আমায় শুধু বলেছিল সুদীপ তাড়াতাড়ি এসো আমার ভয় লাগছে,গিয়েও ছিলাম ওর ফ্ল্যাটে,কলিং বেলটা বাজাতে যাব,শুনলাম এক বিকট চিৎকার আর নিচে গিয়ে দেখি কবিতা।কিন্তু, ততক্ষণে সব শেষ, কবিতার মাথা থেতলে গেছে, রক্ত ভেসে যাচ্ছে মেঝেটা।

আমার মাথায় কিছুই আসছিল না, শুধু একটা কথায় মনে আসছিল কবিতা তুমি এটা ঠিক করলে না। এভাবে—‘ সুদীপের গলা ততক্ষণে ভারী হয়ে এসেছে, চোখগুলো ছলছল করছিল, বিদ্যুতের আলোয় স্পষ্ট দেখলাম আমরা সবাই। পল্টু বলল, ‘দাদা তারপর কি হল?’ সুদীপ একটু নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘তারপর পুলিশ তদন্ত শুরু করল, আমায় ঘন্টার পর ঘন্টা জেরা করতে লাগল। কবিতাকে নিয়ে হাজারো প্রশ্ন করেছিল। তারপর বেশ কয়েক মাস কেসটা চলার পর, আত্মহত্যা হিসাবেই বন্ধ হল সবটা। আমিও সব ছেড়ে ছুড়ে কলকাতা থেকে একেবারে চলে এলাম এখানে, ওই অফিসের ম্যানেজারই আমার বদলির ব্যবস্থাটা করে দিয়েছিল। কিন্তু আমি আজও ওর মৃত্যুটা মেনে নিতে পারলাম কই।

ভীষণ মিস্ করতাম ওকে, ও আমার সাথে জড়িয়ে গিয়েছিল যে।তা একদিন অফিসের এক সহকর্মী রমেশ আমায় প্লানচেটের কথাটা বলল। সব শুনে আমিও রাজি হয়ে গেলাম। কতদিন পর কবিতার সাথে কথা হবে,ভীষণ আনন্দিত হলাম। তা রমেশই প্লানচেট সংগ্রহ থেকে যা যা লাগে সবই করল। আমিও বসলাম একাকী ঘরে সেদিন। চারিদিক চুপচাপ,নিস্তব্ধ রাত্রি,বাইরে বাঁকা চাঁদটা মেঘের আবরণে ঢাকা। একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে আমি ঘরে একা, কবিতার কথা একমনে ভাবছি, আর অপেক্ষা করছি কখন কবিতা আবার সুদীপ বলে ডাকবে।বেশ কিছক্ষণ এইভাবেই কাটল,আমি তখনও আশা ছাড়িনি, হঠাৎ শীত শীত অনুভূত হল,বুঝলাম ঘরের তাপমাত্রা কমছে ধীরে ধীরে। একটা শব্দ হল হঠাৎ।

তাহলে কি কবিতা এল। হ্যাঁ একেবারে তাই, কবিতাও যেন এতদিন ধরে এইসময়টার জন্যই অপেক্ষা করছিল। কবিতা বলল, ‘ সুদীপ কেমন আছো? জানি ভালো থাকা সম্ভব নয়। আমিও ভালো নেই।’ এতদিন দিনপর কবিতার সেই চেনা আওয়াজ নিজেকে আর সামলে রাখতে পারলাম না। আমি কিছু বলতে যাব, কবিতা বিষন্ন গলায় বলল, ‘ সেদিন তোমায় কত করে ডাকতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু ওই নর রাক্ষস গুলোর ভয়ে পারিনি। আর তুমিও একবার খেয়াল করলে না আমায়,আমি তোমার পাশ দিয়েই চলে গেলাম।’তখন আমার মনে পড়ে গেল সেদিনের ঘটনাটা আবার, হ্যাঁ তাই তো, আমি লিফ্টে থেকে নেমে তোমার রুমটার দিকে যাব মনে হয়েছিল কেউ যেন লিফ্টের দিকে গেল।

কিন্তু আমি তোমার কথা ভাবতে ভাবতে একবারও খেয়াল করিনি।কিন্তু সেদিন ঠিক কি হয়েছিল বলতো আমায়,তুমি কেন আত্মহত্যা করলে,পারলে আমায় একা রেখে যেতে।’ কবিতা বলল, ‘ না আমি আত্মহত্যা করিনি, ওই নরখাদক গুলো র হাত থেকে আমি নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে গিয়েই—‘ আমি বললাম, ‘কি হয়েছিল,কারা ছিল এরা?কারা তোমায় মারতে চেয়েছিল?কেন?’ কবিতা ভারাক্রান্ত গলায় বলল, ‘ওরা টিনু দালালের লোকছিল, একটা জমি নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল আর এই বিষয়টা নিয়ে আমি একটা ইডিটরিয়াল লিখেছিলাম মনে আছে তোমার?’ আমি বললাম,’হ্যাঁ’। তারপর- কি হয়েছিল?’ কবিতা বলল,তার পর থেকেই আমায় রীতিমত হুমকি,প্রাণে মেরে ফেলার ভয় সব দেখানো হচ্ছিল।

আমি ভয় পায়নি,কিন্তু যখন ওরা তোমার ক্ষতি করবে বলল,আমি পত্রিকা অফিস ছাড়তে বাধ্য হলাম। কিন্তু ওরা আমার পিছু ছাড়ল না। আমি তোমায়ও কিছু বলতে পারলাম না, আর ধীরে ধীরে ডিপ্রেশনে চলে গেলাম। কিন্তু সেদিন আমি তোমায় সব বলব বলেই ফোণ করে আসতে বলেছিলাম। কলিং বেল টা বাজল,আমি ভাবলাম তুমি। দরজা খুলতেই ওরা ঘরে ঢুকল। আমায় জোড় করে বিছানায়,তারপর আমায় ছিঁড়ে খেল ওরা, আমি ওদের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতেই লিফ্টে করে নিচে নেমে তোমার কাছেই আসব ভেবেছিলাম।

কিন্তু তা আর হল কই?’ কবিতাকে থামিয়ে দিলাম আমি,ভীষণ অপরাধী লাগছিল নিজেকে, মাথায় করাঘাত করতে লাগলাম, কেন আমি আগে পৌঁছালাম না,কেনই ওকে খেয়াল করলাম না লিফ্টের গেটে। ‘আর এই ছিল ঘটনা, আর তারপর থেকেই এই মাঝেমধ্যে এইভাবেই ওর সাথে কথা হয়।’ সুদীপ শেষ করল। আমরা সবায় কি বলব কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম। বিশ্বম্ভর দাদু কিছু বলতে যাবে— সুদীপ থামিয়ে দিয়ে বলল,’না আজ উঠি, আমার কবিতার আসার সময় হল।’ ততক্ষণে বৃষ্টি প্রায় থেমে গেছে। দূরে শোনা যাচ্ছে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। ————————————————————————- রচনা- সুমন ঘোষ। কামারপুকুর, হুগলী ।27 শে জুন,2020

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 1   Average: 5/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।