ফ্রী-ফ্রী-ফ্রী

গল্পের নাম : ফ্রী-ফ্রী-ফ্রী

লেখক : অভিজিৎ ঘোষ

 

ককালে চলত বিনিময় প্রথা। অর্থাৎ ফেলো করি মাখো তেল। তবে আজকাল ফ্রী-র জামানা। দেহাতি ভাষায় বলে ‘ফাউ’। প্রায় সব কিছুতেই কিছু না কিছু ফ্রী থাকবেই। দুটো শার্ট কিনলে একটা শার্ট ফ্রী। একটা টুথপেস্ট কিনলে একটা টুথব্রাশ বিনামূল্যে। এমনকি দশ টাকার ফুচকা খেলে একটা ফাউ। তেমনি ঘটি কিনলে বাটি, থালা কিনলে গেলাস, হরলিক্স কিনলে কৌটো ফ্রী। সাথে যোগ হয়েছে ক্যাশব্যাকের দেদার চল। এই যেমন, দেড় হাজার টাকার কেনাকাটা করলে পাঁচশো টাকা ক্যাশব্যাক, অনলাইন অ্যাপ্লিকেশন দ্বারা টাকা লেনদেন করলে ক্যাশব্যাক। এমনই লাখ লাখ ফ্রী। আমাদের চারপাশটাই ফ্রী-র জিনিসে ভরে আছে। তবে এই ফ্রী-র ব্যাপারটা অত সহজ নয়। বেশ ঘোরালো প্যাঁচালো। সব ফ্রী-র নিচেই মাইক্রোস্কোপিক আকৃতির হরফে লেখা থাকে ‘টার্মস্ এন্ড কন্ডিশনস্ অ্যাপ্লায়েড’।

 




 

বড় বড় প্রতিষ্ঠান থেকে বিজনেস ম্যানেজমেন্ট পাস করা আগ্রাসী মানুষদের মস্তিষ্কপ্রসূত উদারনৈতিক চাল এই ফ্রী-র ফাঁদে বুদ্ধিমানেরা অনায়াসেই পা ফেলেন, আর বোকারা ভুরু কুঁচকে সাতপাঁচ ভাবতে থাকেন।
রতন বাবু উপরোক্ত প্রথম ক্যাটাগরিতে পরেন। ফ্রী দেখলেই তাঁর বাঁ হাত চুলকাতে থাকে। এইতো সেদিনের কথা। রতন বাবু এক মিষ্টির দোকানের বাইরের বিজ্ঞাপন দেখে মিষ্টি কিনতে গিয়ে হইহই রইরই কাণ্ড ঘটালেন। বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে ‘সুগার ফ্রী’— সেই অনুসারে রতন বাবু দাবি করতে লাগলেন,‘ কই দাদা! চিনি দিন, মিষ্টির সাথে সুগার ফ্রী পাওয়া যাবে বিজ্ঞাপনে বলেছে, তাড়াতাড়ি দিন, বাড়ি ফিরব তো নাকি!’

সেদিন মিষ্টির দোকানের মালিকের হাতে নিগৃহীত হতে হতে বেঁচেছিলেন রতন বাবু। দোকান মালিকের সেইদিন সংকটমোচন মৌনব্রত ছিল, তাই।
এছাড়াও তিনি মোবাইলের সাথে ব্যাটারি চার্জার, ঘড়ির সাথে ব্যাটারি, ডান পায়ের একপাটি চপ্পলের সঙ্গে বাঁ পায়ের আরেক পাটি সবই ফ্রী-তে কিনেছেন।
এই গল্পও রতন বাবুর ফ্রী-তে জিনিস কেনা নিয়েই।
তবে গল্প শুরুর আগে রতন বাবুর পরিচয়টা দেওয়া দরকার।

রতন বাবু অর্থাৎ শ্রীযুক্ত রতন কুমার দাস হলেন রাজ্য সরকারি অফিসের একজন হেডক্লার্ক। স্ত্রী শ্রীলেখা, বড় ছেলে সান্তনু ও ছোট মেয়ে রিমিকে নিয়ে সোনারপুরে রতন বাবুর সোনার সংসার। সান্তনু কর্মসূত্রে নাগপুরে থাকে। রতন বাবু নিরীহ গোবেচারা প্রকৃতির মানুষ। অথচ বাইরে থেকে তাঁকে দেখলে মনে হয় খুব কঠিন হৃদয়ের মানুষ। আর পাঁচজন ভদ্র স্বামীর মতো তিনিও স্ত্রীকে যমের মতো ভয় পান। আর পাঁচটা মধ্যবিত্ত বাঙালির মতো তিনিও খুব হিসেবি মানুষ। প্রতিটা পদক্ষেপে মাথার সামনের দিকের তেলা টাকে হাত বুলিয়ে মেপে মেপে হিসাব করে চলেন।
আপাতত রতন বাবু সম্পর্কে এটুকুই জেনে রাখা ভালো।

 




 

যাই হোক এবার গল্প শুরু করা যাক।
বেশ কিছুদিন ধরে রতন বাবুর বাড়ির পুরানো টিভি টায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। এটা তাঁর বিয়ের সময় শ্বশুর বাড়ি থেকে পাওয়া, তাই আবেগতাড়িত হয়ে টিভিটাকে বর্জনের খেয়াল আনেননি কখনো। এ বিশ্বে কোনকিছুই অবিনশ্বর নয়। সব জিনিষেরই এক্সপায়ারি ডেট থাকে। ওটারও তাই হয়েছে। জীবনের অনেক সুখ দুঃখের মুহূর্তের সাক্ষী ওই টিভিটাকে বুকে পাথর রেখে ভাঙাচোরার দোকানে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পাদনের জন্য দিয়ে এলেন রতন বাবু। তাছাড়া অমন মোটা, থেবরানো টিভি এখন কেই বা দেখে! ‘স্লিম অ্যান্ড ট্রিম’ হল মডার্ন ফ্যাশন। সেটা পুরুষ কিংবা নারীর শারীরিক গঠনই হোক অথবা টিভি থেকে মোবাইলের স্ক্রিনের স্থূলতাই হোক— পাতলা, মেদহীন হওয়া আবশ্যক। অতএব রতন বাবু হালফ্যাশনের স্লিম টিভি কিনতে গেলেন।

দক্ষিণ কলকাতার এক নামি ইলেকট্রনিক্সের দোকানের বাইরে বিরাট ব্যানারে দগদগে রক্তাক্ষরে বিশাল হরফে লেখা আছে: ‘ফ্রী! ফ্রী! ফ্রী!’ আর ঠিক তার নীচে খুবই ছোট হরফে নীল রং-এ লেখা আছে: ‘টিভি কিনলে রিমোট ফ্রী।’ বলা বাহুল্য এই শেষ ‘ফ্রী’ উপরের মত বিশাল রক্তাক্ষরে লেখা।
রতন বাবু অফিস যাতায়াতের পথে এই বিজ্ঞাপনটি দেখেছিলেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে তিনি স্রেফ আপাদমস্তক ফ্রী লেখা গুলো দেখে গটগট করে দোকানের ভেতর ঢুকে পরলেন। স্বভাবতই নীল রঙের ছোট হরফের লেখা গুলো তাঁর দৃষ্টির অগোচরে রয়ে গেল।
আগেই বলেছি রতন বাবুর পুরনো টিভিটা ছিল শ্বশুরবাড়ি থেকে পাওয়া। এছাড়া তিনি কখনো টিভি কেনার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাননি। তাই টিভি কেনার বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা একেবারে আনকোরা।

দোকানের ভিতর ঢুকতেই একজন কর্মচারী এগিয়ে এসে গদগদ স্বরে বললেন, ‘আসুন স্যর!….বসুন!’
এইসব ক্ষেত্রে মহিলাদের নিয়ে গেলে ঠকে যাবার সম্ভাবনা থাকে। কর্মচারী গুলো সাধারণত মহিলাদের টার্গেট করে মিষ্টি মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে যা হোক একটা কিছু গছিয়ে দেয়। এমন অভিজ্ঞতা রতন বাবুর অনেক আছে। শেষবার স্ত্রীকে নিয়ে মিক্সার গ্রাইন্ডার কিনতে গিয়েছিলেন। মিক্সার গ্রাইন্ডার পছন্দ হলো না, ও.টি.জি কিনে ঘরে ফিরলেন। সেকারণে এবার তিনি একাই এসেছেন।
কর্মচারীটি একই সুরে বললেন, ‘বলুন স্যর! কি নেবেন?’— তারপর হোটেলের বেয়ারার সাউথ ইন্ডিয়ান ডিসের লিস্ট বলার মত ভঙ্গিতে বলতে লাগলেন, ‘ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশন, ওয়াশিং মেশিন, টিভি, কিচেন চিমনি, মিক্সার গ্রাইন্ডার, ওয়াটার পিউরিফায়ার, ওটিজি, সিলিং ফ্যান, স্ট্যান্ড ফ্যান, টেবিল ফ্যান….’
রতন বাবু বিরক্ত হয়ে গম্ভীরভাবে বললেন, ‘টিভি…’

তিনি জানেন এই রকম বড় দোকানে জিনিস কিনতে গেলে একটু রাশ হালকা হয়েছে কী কর্মচারীরা মাথায় চড়ে বসবে।
তাই আবার গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কি ফ্রী আছে?’
‘স্যর, টিভি কিনলে রিমোট ফ্রি।’
‘যে কোন কোম্পানির টিভিতে!’

 




 

‘না স্যার, এই অফারটা শুধু ‘ভুংচুং’ কোম্পানির টিভিতেই আছে। আর বাকিগুলোতে ওয়াল মাউন্টিং ইনস্টলেশন ফ্রী।’
রতন বাবু তাঁর তেলা টাকটায় দু-তিনবার হাত বুলিয়ে ভাবতে লাগলেন। বাড়িতে টিভির স্ট্যান্ড আছে, সুতরাং ওয়াল মাউন্টিং-এর কোন দরকার নেই। অতএব ‘ভুংচুং’ কোম্পানির টিভি দেখানোর জন্য বললেন।
আরেক জন কর্মচারীকে টিভি দেখানোর কথা বলে কর্মচারীটি রতন বাবুর জন্য পানীয়ের ব্যবস্থা করতে উদগ্রীব হয়ে উঠলেন— ‘স্যর, চা না কফি খাবেন!.. নাহ্ স্যার, খুব গরম পরেছে, আমি বরং আপনার জন্য লস্যি নিয়ে আসছি।’
রতন বাবু ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলেন। ঢোক গিলে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এর টাকাটা কি…’
‘না-না স্যার, আপনি আমাদের ভ্যালুয়েবল কাস্টমার। এটা আমাদের তরফ থেকে।’— কর্মচারীটি যেন মুখে এক চামচ মধু রেখে বললেন।
দোকানের কর্মচারীদের খাতির-যত্নে রতন বাবু বেশ খুশি হলেন। টিভিটাও পছন্দ হয়ে গেল। অতএব ‘ভুংচুং’ কোম্পানির টিভি কিনে রতন বাবু বাড়ি ফিরলেন। সাথে ফ্রী-র রিমোটটা নিতে ভুললেন না।

নতুন টিভি দেখে বাড়ির সবাই খুব খুশি হলো।
রতন বাবু গর্বের সাথে সকলকে ফ্রীতে পাওয়া রিমোটটা দেখালেন।
রিমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, ‘রিমোট তো সব টিভির সাথেই থাকে, এতে ফ্রীর কি আছে!’
শ্রীলেখাও হ্যাঁ-বাচক মাথা নাড়লেন।
রতন বাবুর গর্বে ফুলে ওঠা বুক এবার বেলুনের মতো চুপসে গেল। নিজের নির্বুদ্ধিতা ঢাকতে রিমোটের ব্যাটারি দুটো খুলে দেখাতে লাগলেন—‘দ্যাখ, দ্যাখ, সাথে ব্যাটারিও ফ্রী আছে—’
ভুংচুং কোম্পানির রতন বাবুর নতুন টিভি টা বেশ ভালোই চলছে। শুধু চলছেই না দৌড়াচ্ছে। মানে টিভি স্ক্রীনে দেখানো জন্তু-জানোয়ার, যানবাহন ইত্যাদি। তবে এই বিষয়টি নিয়ে রতন বাবু এখনো সন্দিহান যে ফ্রী-টা কি আদতে ফাউ ছিল!

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © অভিজিৎ ঘোষ

 




গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 0   Average: 0/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
close