বন্দী রানীর প্রেমকাহিনী

বন্দী রানীর প্রেমকাহিনী

বন্দী রানীর প্রেমকাহিনী। মধুমিতা সাঁতরা

পর্ব- ১

অরিন্দম এসো… এসো অরিন্দম এসো আমার কাছে…. …..এসো তোমাকে আমাদের দুনিয়ায় নিয়ে যায়..এসো……অরিন্দম ছুটে চলল একটি ছায়ার পিছনে।যাওয়ার পথে কত গভীর জঙ্গল, কত দীর্ঘ নদী, কত উচ্চতর পাহাড় পর্বত ও পেরিয়ে গেল। ওর কোনো দিকে ভ্রুক্ষেপ রইল না, ও শুধু সেই ছায়ার পেছনে ছুটে চলল……কতদূর তা ও নিজেও জানে না।

গুড মর্নিং গুড মর্নিং গুড মর্নিং…….
অরিন্দম ধরফরিয়ে বিছানার উপর উঠে বসল।
—-উফ সকাল হয়ে গিয়েছে। (অরিন্দম নিজে নিজেই বলল।) মোবাইলের অ্যালার্মটা বন্ধ করে দিল ও।(বলে রাখি এই বিগত বেশ কয়েকমাস ধরে ও এমন স্বপ্ন দেখছে। )
বিছানা থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে অরিন্দম সকালে দৌড়াতে বেরল ।মিহিরচন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাসায়নিকবিদ্যার এম.এস.সি প্রথম বর্ষের ছাত্র অরিন্দম মিত্র বরাবরই ভোর সাড়ে পাঁচটার সময় দৌড়াতে বেরয়। অরিন্দমের বাড়িটা মহেন্দ্রপুর রায়দীঘির কাছে। জায়গাটা আসলে একটা হিল স্টেশন। পাহাড় , জঙ্গল, নদী তিনটেই আছে এখানে । বিশেষ করে জঙ্গল। এখানকার প্রায় সব রাস্তা এবং ব্রিজ জঙ্গলের মধ্যবর্তী হয়েই গিয়েছে। কিন্তু বন্য জন্তুজানোয়ারের আক্রমণ তেমন বিশেষ হয় না। এখানে সারা বছরই ঠান্ডা থাকে। আর সারাবছরই এখানে টুরিস্ট লেগে থাকায় জায়গাটা খুব উন্নত । স্কুল, কলেজ, হসপিটাল সবই এখানে আছে। আর আছে মহেন্দ্রপুর এবং মিহিরচন্দ্রপুরের সীমানাবর্তী এলাকায় বিস্তৃত জায়গা জুড়ে মিহিরচন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে বহুধরনের কোর্স এবং অভিজ্ঞতা সম্পন্ন শিক্ষক শিক্ষিকা এবং সর্বপরি প্রশস্ত এবং উন্নতশীল আবাসন থাকার দরুন সারা ভারত থেকে বহু ছাত্র-ছাত্রী প্রতি বছর পড়তে আসে। নিঝুম, শান্ত জায়গাটায় জনবসতি বেশী নয়। তবে বেশ কয়েকটি ধনী পরিবারের এখানে বসবাস আছে। তাদেরই একজন অরিন্দমের বাবা অ্যাডভোকেট অমিত মিত্র। অরিন্দমের মা নন্দিতা মিত্র পেশায় অধ্যাপিকা। অরিন্দমেরই কলেজে অঙ্কের অধ্যাপিকা তিনি। অরিন্দমেরা দুই ভাই। ওর ছোট ভাইয়ের নাম অয়ন। সে স্থানীয় স্কুলের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র।

—–হাই, গুড মর্নিং। (শুনে অরিন্দম পেছন ফিরে দেখল ওর বন্ধু দীপ।)
—-গুড মর্নিং। —অরিন্দম বলল।
দুজনে একসাথে দৌড়াতে লাগল। কিন্তু, কিছুক্ষণ
দৌড়াতে দৌড়াতে অরিন্দমের মনে হল ওর দৌড়ানোর গতি যেন সহস্র গুণ বেরে গিয়েছে। ওর চারপাশের সমস্ত বন, জঙ্গল, পাহাড় পর্বতকে ও যেন মূহুর্তের মধ্যে পেরিয়ে চলে যাচ্ছে। ও ছুটছে শুধু ছুটছে আর ছুটেই চলেছে। কিন্ত কোথায় যাচ্ছে ও? আর কেনই বা যাচ্ছে? তা ও নিজেও জানে না। ওর মনে হল কোনো অদৃশ্য শক্তি যেন ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। যেন ওর পৃথিবী থেকে সে ওকে অন্য কোনো পৃথিবীতে নিয়ে চলছে। যেখানে গেলে ওর এই মহেন্দ্রপুর, এই কলেজ, ওর বন্ধুরা,ওর পরিবারের ছোট্ট দুনিয়াটা ও আর পাবে না। সে কথা ভেবেই ওর মনটা কেঁদে উঠল। ওর মন বলে উঠল “না আমি যাব না।। কিছুতেই না।।” নিজেকে অদৃশ্য শক্তির থেকে প্রাণপণ লড়াই করে ছাড়িয়ে নিয়ে ও দাঁড়িয়ে পড়ল। আর ঠিক তখনই পেছন থেকে ও শুনতে পেল একটি নারীকণ্ঠ ওকে বলে উঠল “অরিন্দম সরে যাও।।”
ও আগে পিছু কিছু না ভেবেই যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেখান থেকে বাঁ দিকে পাঁচ পা সরে হাঁটল এবং একটা পাথরে হোঁচট খেয়ে রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়ল। তার সাথে সাথেই একটা মারুতি সুজুকি গাড়ি তীব্র গতিতে টালমাটাল খেতে খেতে পাশ দিয়ে চলে গেল।
—-অরি। (বলে দীপ সামনে থেকে দৌড়িয়ে ওর কাছে এল।)
—-are you ok?  তুই ঠিক আছিস তো? (দীপ ওকে হাত ধরে তুলতে তুলতে বলল।)
—অ্যাঁ —–উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেই অরিন্দম আবার রাস্তায় বসে পড়ল।
—-তোর পায়ে লেগেছে মনে হচ্ছে। শালা ব্লাডি ড্যাংঙ্কারস গুলো। বাপের রাস্তা মনে করে গাড়ি চালাচ্ছে। নির্ঘাত টুরিস্ট হবে। মাল গুলো কদিনের জান্য ঘুরতে এসে নিজেদের এখানকার রাজা ভাবে। হাতে পেলে মালগুলোর দাঁত মুখ ভেঙ্গে দিতাম। ( এমন হাজারো কথা বলতে বলতে দীপ অরিন্দমের পায়ের গোড়ালি ধরে ম্যাসেজ করতে থাকল।)

কিন্ত অরিন্দমের সেদিকে হুশ নেই ।। ও ঘাড় ঘুরিয়ে পেছন দিক এবং আশেপাশে যতদুর চোখ যায় ততদুর তাকিয়ে দেখতে লাগলো কোথাও কোনো মেয়ে আছে কিনা।
—এই অরি।কি দেখছিস ওদিকে নিজের পায়ের দিকে দ্যাখ। আমাকে ধরে উঠার চেষ্টা কর।। চল।।(দীপ)
—হ্যাঁ করছি। আচ্ছা দীপ আমাদের পেছনে কোনো মেয়ে কি দৌড়াচ্ছিল? (দীপকে ধরে উঠতে উঠতে অরিন্দম বলল।)
—হ্যাঁ মিসেস রায় (কলেজের সবথেকে সুন্দরী এবং কড়া অধ্যাপিকা) দৌড়াচ্ছিল তো। (দীপ)
—ধুর বাঁদর (দীপের পিঠে একটা মেরে অরিন্দম বলল।)
—-তুইও যেমন। কোথায় পড়ে গিয়েছিস। নিজের পাটা দেখবি তা না এখন মেয়ে খুঁজছিস। (দীপ)
—আরে তা নয়। আমাকে যেন একটা মেয়েই রাস্তা থেকে সরে যেতে বলেছিল। তাই তো আমি সরে গেলাম। না হলে তো আমাকে এতসময় হসপিটালে নিয়ে যেতে হত। (দীপের হাত ধরে আস্তে আস্তে হাঁটতে হাঁটতে অরিন্দম বলল।)
—-কি? (ভুরু কুঁচকিয়ে) প্রথমে মনে হচ্ছিল তোর পায়ে চোট লেগেছে এখন দেখতে পাচ্ছি মাথায় চোট লেগেছে। (হেসে দীপ বলল)
—উফ প্লিজ।। (অরিন্দম বিরক্ত হয়ে বলল)
—-তা নয় তো কি?  কলেজে এত হট হট মেয়ে রয়েছে তাদের দেখিস না আর এই সকালবেলায় মরে বাঁচতে বাঁচতে তুই মেয়ের গলার আওয়াজ পাচ্ছিস। (দীপ)
—-তুই বুঝবি না ছাড়। (অরিন্দম)

বলাবাহুল্য সেদিন ওদের আর দৌড়ানো ,এক্সেসাইজ কিছুই হল না। দীপ অরিন্দমকে ধরে ধরে বাড়ি পৌঁছে দিল। অরিন্দমের মা সবসময় খুব কড়া শাসন করে তার দুই ছেলেকে। কাজেই অরিন্দমকে খুব বকাঝকা করলেন এবং সারাদিন বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ করে দিলেন। সেদিন অরিন্দমের আর কলেজ যাওয়া হল না। সবাই যে যার মতো কোর্ট, কলেজ, স্কুলে চলে গেল। ওর সারাদিনটা বাড়িতে বই পড়ে এবং দু একটা বন্ধুদের সাথে ফোনে কথা বলে কেটে গেল ।মাঝে মাঝে ওর সকালের রাস্তার ব্যাপারটা মনে হল। কিন্তু ও কাউকে বলার সাহস পেল না। কারণ ওর মনে হল কাউকে বললে সে ওকে বলবে ও হ্যালুজেনেশন করছে ঠিক যেমন সকালে দীপ বলেছিল।

সন্ধ্যা ছটার দিকে ওর বাড়িতে সব বন্ধুরা দল বেঁধে এল। দীপ, রকি, সৌগত, অনীক,মৃণাল  সবাই এল ওকে দেখতে। দীপ সকালের ব্যাপারটা সবাইকে বলে দিয়েছে। তাই রকি আর অনীক মিলে ওর খানিকটা পেছনে লাগল।
রকি বলল —-দ্যাখ ভাই কী কপাল তোর। আমরা তো মেয়েদের পিছনে ছুটে মরছি আর তোর পিছনে মেয়েরা ছুটে মরছে।
অনীক বলল—-কাশ কোনো মেয়ে আমাকেও বাঁচাতো। তবে আর এই মন কি এ নশ্বর শরীরটাও তাকে দিয়ে দিতাম (নাটকীয় ভাবে কথাটা বলে হাসতে লাগল )।
—-তুই কেন সবাইকে বলছিস রে? (দীপের পিঠে বেশ কয়েক ঘাঁ দিয়ে বলল অরিন্দম)
দীপও “তবে রে” বলে অরিন্দমকে কয়েক ঘাঁ দিল।ওরা অরিন্দমের খাটের উপর গোল হয়ে নিজেদের মধ্যে আড্ডা মারতে লাগল ।
—-এই যে তোমরা কি দাদাকে দেখতে এসছো নাকি বাড়ী মাথায় তুলতে এসেছ? ( অরিন্দমের ছোট ভাই অয়ন ঘরে ঢুকে বলল)
—এই মায়ের চামচা এদিকে আয়। (অরিন্দম বলল)
অয়ন অরিন্দমের সামনে এসে দাঁড়াল।
—-কাকীমাকে গিয়ে বল আমরা অরিকে নিয়ে ঘুরতে যাবো বলে এসেছি। (সৌগত বলল)
—- সকালে দাদার পায়ে লেগেছে আর তোমরা এখন দাদাকে নিয়ে ঘুরতে যাবে ? আমি মাকে গিয়ে বলছি। (অয়ন)
—-ওলে বাবারে আমি তো আর ঘর থেকে বোরোবোই না (অয়নের গালটা টিপে) । যা মাকে গিয়ে বল আমি বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাচ্ছি।আমার পা ঠিক হয়ে গিয়েছে (কড়া হয়ে বলল অরিন্দম)।

অয়ন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। একটু পরে অরিন্দমরা সবাই সৌগতর খোলা জিপে করে ঘুরতে বেরল। জিপটা আসলে সৌগতর মামাবাড়ির দাদুর। বেশ পুরোনো এই হুড খোলা জিপে ঘুরতে ওদের সব বন্ধুদেরই বেশ ভালো লাগে। মৃণাল আর রকি সামনে বসেছে। তারমধ্যে মৃণাল গাড়ি চালাচ্ছে। পেছনে সৌগত, দীপ, অনীক আর অরিন্দম বসেছে। মৃণাল বরাবরই একটু কম কথা বলে। ও বেশীরভাগ সময় চুপচাপ গাড়ি চালাচ্ছে আর মাঝে মধ্যে কথা বলছে। রকি আর অনীক বরাবরই হুল্লোড়ে। ওরা দুজনে নানা বিষয় নিয়ে আড্ডা মারছে। সৌগত আর দীপ ওদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। অরিন্দম সবার সঙ্গে মাঝে মাঝে যোগ দিচ্ছে আর মাঝে মাঝে আনমনা হয়ে পড়ছে। দীপ ওর মুখোমুখি সিটে বসেছে বলে অরিন্দমকে মাঝে মাঝে লক্ষ্য করছিল।
—-অরি কি ভাবছিস তুই? (দীপ)
—– কিছু না তো। (অরিন্দম)
—–ঠিক আছে বলিস না আমাদের। (সৌগত)
—-হ্যাঁ ওর তো আবার অদেখা গালফ্রেন্ড আছে সব কথা শোনার জন্য। ওর কি আর আমাদের লাগবে? (রকি)
—-উফ শোন তবে। আমি আজ প্রায় কয়েকমাস ধরে…………   ……… (অরিন্দম)
প্রথম দিন থেকে আজ সকালে দৌড়াতে গিয়ে অবধি যা যা ঘটেছে সব বলল ও বন্ধুদের।
সব শুনে প্রথমে ওরা মজা করল তারপর সবাই ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিয়ে ভেবেও কিছু বুঝতে পারল না। শেষ পর্যন্ত রকি বলল —দুর ছাই, কি শালার লভ স্টোরি তোর যে শুধু তোকে নিয়ে যাচ্ছে তো যাচ্ছে। কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তার কোন ঠিক নেই। বলি রাত্রিতে মাকে লুকিয়ে দু চার পেগ মেরে শুস নাকি যে এসব স্বপ্ন দেখিস।
—চুপ কর । আলতু ফালতু বকিস না। (অরিন্দম বিরক্ত হয়ে বলল)
—উফ এসব না বকে চল গাড়িটা দাঁড় করা ।(সৌগত বলল)
ওরা গাড়িটা ফায়ারি হিল পয়েন্ট থেকে একটু দুরে দাঁড় করাল। তারপর সবাই মিলে বিয়ারের বোতলগুলো নিয়ে পয়েন্টের ওপরে চড়ে কাছাকাছি থাকা পাথর গুলোর উপর বসল।
দীপ, মৃণাল, সৌগত, অনীক, রকি সবাই একটা করে বোতল নিয়ে একসাথে সবাই মিলে চিয়ার্স বলে ছিপি খুলে খাওয়া শুরু করল। শুধু অরিন্দম আজ দুরে দাঁড়িয়ে থাকল। ওর আজ কিছুতেই মন চাইছিল না ড্রিঙ্কস করতে। এমন নয় যে ও এই ধরনের স্বপ্ন প্রথম দেখছে। এর আগেও দেখেছে এবং ভুলেও গিয়েছে। কিন্তু আজ ও সকালের ঘটনাটা ভুলতে পারছে না ,কারণ আজ ও একটি মেয়ের গলার আওয়াজ শুনতে পেয়েছে। সেখান থেকে ওর মনে হচ্ছে ওর জীবনে কিছু ঘটতে চলেছে।
অরিন্দম দুরের পাহাড় এবং নীচের জঙ্গলের দিকে দেখতে লাগল এবং দেখতে দেখতে ও যে কখন হিল পয়েন্টের ধারের দিকে এসে দাঁড়াল ও নিজেও জানতে পারল না।
—–অরি, কি রে আজ খেলি না কেন? (দীপ)
—-আজ ভাল লাগছে না রে। (অরিন্দম)
—–ও শালার আজ আর মাল ভাল লাগবে না। আজ শালা ওকে বেলুন দে। (রকি)
বলাবাহুল্য , রকি সবসময়ই নেশা করলে সেন্স হারিয়ে ফ্যালে ।
—–এই নো নো বাজে কথা একদম নয়। (মৃণাল)
—–মুখ সামলিয়ে কথা বল। (অরিন্দম রেগে গিয়ে বলল)
—-কেন রে শালা তোর বেলুন কি আমার উপর ফাটাবি নাকি? (রকি)
—-এই রকি তুই বড্ড বেশী বাজে বকচ্ছিস । (দীপ)
—-তবে রে শালা আমি বাজে বকছি? (উঠে দীপের কাছে গিয়ে দীপের গলাটা চেপে ধরল রকি)
—-ছাড় ওকে ছাড়। (সৌগত, মৃণাল, অনীক)  সবাই ছুটে গেল। শুধু অরিন্দম গেল না।।
—–তোরা শালা সব খারাপ গুণ আমার মধ্যে দেখতে পাস। আর ওই যে শালা অরির বাচ্চা আমার তানিয়াকে কেড়ে নিয়েছে সেবেলায় তোদের চোখে পড়ে না। (রকি)
—-আমি আগেও বলেছি রকি এখনও বলছি তানিয়াকে আমি পছন্দ করিনা। ও নিজেই আমার পেছনে পড়েছে। (অরিন্দম)
—–হ্যাঁ রে শালা সারা পৃথিবীর মেয়েরা তোর পিছনেই তো পরে। আমরা তো সব নপুংসক। তুই একাই চু*** পারিস(রকি)
—-রকি অরি ঠিকই বলছে তোর ওই মালটাই অরির পেছনে পড়েছে। আমি নিজে দেখেছি। (অনীক)
—হ্যাঁ রে বাল কাল যখন তোর বউ ওর পিছনে পরবে তখন তুই আমার যন্ত্রণাটা বুঝবি। (রকি)
—-চুপ বাল। (বলতে বলতে অনীক রকির সাথে মারপিট বাঁধিয়ে বসল।
দীপ মৃণাল আর সৌগত মিলে ওদের ছাড়াতে লাগল।
অরিন্দম এবারেও ওদের লড়াইয়ের মাঝে এল না।
রকি আর অনীককে ছাড়িয়ে দেওয়ার পরও রকি রাগে ফুঁসতে লাগল।
—-সব তোর জন্য। তুই কি মনে করিস নিজেকে?( বলতে বলতে রকি অরিন্দমের দিকে এগিয়ে গেল)
—তুই বেকার আমার সাথে ঝগড়া করছিস ।তানিয়া আদৌও তোকে ভালবাসে না। (অরিন্দম)
—হ্যাঁ রে শালা আমাকে কি করে ভালবাসবে বল। তোর মতো তো সার্ভিস দিতে পারি না। (রকি)
—-রকি। (রেগে গেল অরিন্দম)
—-বো**দা কি এমন আছে রে তোকে মধ্যে যা আমার মধ্যে নেই। (অরিন্দমের জামার কলারটা চেপে ধরল রকি)
—-ছাড়… তোর মতো বো**দা সাথে কথা বলে কোনো লাভ নেই। (অরিন্দম রকির হাত চেপে ধরল)
—-তোকে না এমন করে দেব যে তুই কোনো মেয়ের সাথে শুতে পারবি না। (রকি দাঁতে দাঁত চেপে বলল)
অরিন্দম আর রকির মধ্যে ধস্তাধস্তি হতে লাগল। দীপ, সৌগত, অনীক আর মৃণাল মিলে রকিকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল। ওরা যতবার রকিকে ছাড়িয়ে আনে অরিন্দমের থেকে রকি ততবার আবার অরিন্দমের কাছে গিয়ে ওকে মারতে শুরু করে। এদিকে অরিন্দমও চুপ করে থাকার ছেলে নয়। রকি যদি ওকে একটা মারে তো ও রকিকে দুটো মারে।
কিন্তু এসব করতে করতে ওরা সবথেকে মূল্যবান জিনিসটাই খেয়াল করেনি। আর সেটা হল অরিন্দম হিল পয়েন্টের একদম ধারে দাঁড়িয়ে আছে। আর এক পা পিছলেই ও সিধা নীচের জঙ্গলের মধ্যে তলিয়ে যাবে। আর পয়েন্ট থেকে জঙ্গলের দুরত্ব হাজার ফুটের। তার ওপর এই জঙ্গলের ধার দিয়ে একটা নদীও বয়ে গিয়েছে। কাজেই একবার যে ওখান থেকে পড়বে, তাকে এই পৃথিবীতে আর কেউ কোনোদিন দেখতে পাবে না।
অন্যদিকে রকি আরো একবার অন্যদের ছিটকে ফেলে অরিন্দমের দিকে ছুটে গেল। অরিন্দম দেখতে পেল রকি ওর দিকে ছুটে আসছে এবং রকি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ওকে সামনে থেকে একটা ধাক্কা মারল। তারপর অরিন্দম দেখতে পেল সব বন্ধুরা এমনকি রকি নিজেও অরি…. বলে চিৎকার করে উঠল। ও দেখলো ওর বন্ধুরা সবাই অাস্তে আস্তে উপরে উঠে যাচ্ছে। অনেক উপরে উঠে যাচ্ছে সবাই।। অনেক উপরে। আর কাউকে ও দেখতে পাচ্ছে না। ও নিজের চোখটা বন্ধ করে নিয়ে একবার নিজের বাবা মা ছোট ভাই সবার কথা মনে করে নিল। নিজের পরিবারকে মনে করতে করতে আচমকাই ওর স্বপ্নের সেই ছায়া পরীটির কথা মনে পড়ল। আর ঠিক তখনই ও বুঝতে পারল কেউ ওকে পেছন দিক থেকে জড়িয়ে ধরল। তারপর ও আর নীচের দিকে পড়ল না বরং ও চলল জঙ্গলের দক্ষিণের পাহাড়ের দিকে। ওর শরীর আস্তে আস্তে অবশ হয়ে এল,চোখ বন্ধ হয়ে গেল।

এরপর অরিন্দম যখন চোখ খুলল তখন ও দেখল ও একটা গাছের গায়ে হেলান দিয়ে বসে আছে। আর যেটা দেখল তাতে ওর সারা শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল….. ওর সামনে একটি নারীমুর্তি বসে ওর গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। সে নারীমুর্তিকে দেখে ও একবার ঢোক গিলে নিল, তারপর ভয়ার্ত গলায় জিঞ্জাসা করল —–কে তুমি?
—-তোমার জ্ঞান ফিরেছে অরিন্দম। ( নারীমুর্তি অন্তত কোমল এবং মিষ্টি স্বরে বলে উঠল।)
এই মিষ্টি এবং সুমধুর আওয়াজ এবং কোমল  আন্তরিক স্পর্শে অরিন্দমের মনের সব ভয় দুর হয়ে গেল। ওর মন শান্ত হয়ে উঠল ।
—-কে তুমি?  আমার নাম জানো কি করে? (অরিন্দম শান্ত গলায় জিঞ্জাসা করল)
—-তোমার শরীর কেমন লাগছে এখন? (নারীমুর্তি ওর কথার উত্তর না দিয়ে বলে উঠল)।
—-আমার কথার উত্তর দাও। তুমি কে? (অরিন্দম নিজের গায়ের থেকে নারীমুর্তির হাত সরিয়ে দিল)
—-ছুঁতে দাও আমাকে তোমায়। দুরে সরিয়ে দিও না আমাকে। বহু বছর আমি শুধু তোমার জন্য অপেক্ষা করে আছি । (নারীকণ্ঠের প্রতিটি কথায় তীব্র কষ্ট, বিরহ, যন্ত্রনা, দীর্ঘশ্বাস ফুটে উঠল) ।।

এই কোমল বিরহিনীর প্রতিটি কথা অরিন্দমের বুকে গিয়ে বিঁধল। ওর বুকের গভীর থেকে কে যেন বলে উঠল “আমিও তো তোমার জন্য অপেক্ষা করে আছি। ”
কিন্তু অরিন্দম নিজের মনের কথা চেপে নিয়ে বলল —-কে তুমি বলত? আর তুমি কিভাবে আমাকে বাঁচালে?
কিন্তু নারীমুর্তি ওর কথার কোনো উত্তর না দিয়ে ওর হাত ধরে ওকে টেনে তুলে গাছের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড় করাল।ও দেখল ও কয়েক হাজার ফুট উঁচু কোনো পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে আছে। তারপর নারীমুর্তি ওর বুকের ওপর ঠিক যেখানে ওর হৃদয় আছে সেখানে হাত দিয়ে মধুর স্বরে বলল—-  আমি তোমার এইখানে আছি । আজ নয় জন্ম জন্মান্তর ধরে আছি । তোমার মনে তোমার শরীরের প্রতিটি শিরায় আমি আছি। তোমার নিঃশ্বাসে তোমার প্রশ্বাসে আমি আছি। আমি আছি তোমার মধ্যেই আমি আছি। আমাকে চিনতে হলে আগে নিজেকে জানতে হবে যে রুপ।

অরিন্দম নারীমুর্তির মুখে রুপ নামটা শুনে অবাক হয়ে গেল। কারণ,  ওর মনে হল এই নামটা ও এর আগে যেন কোথায় শুনেছে। ও কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু ওর সব বলাকে বন্ধ করে দিয়ে নারীমুর্তি ওর ঠোঁটে ঠোঁট মিশিয়ে দিল।

সেই আলো আঁধারিতে নীচের পৃথিবী থেকে বহু  উচ্চতর পাহাড়ে, সেই হালকা বাতাসে, আকাশে মেঘের চাঁদের খেলাতে, এক পলকে ও দেখল নারীমুর্তির পিঠের দুপাশ দিয়ে কি যেন ছড়িয়ে আছে  ।।

(চলবে)

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 2   Average: 3/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।