বর্তমান ভারত ও বিজ্ঞান

                বর্তমান ভারত ও বিজ্ঞান

 

মাধ্যমিকের পর যেসব ছেলেমেয়েরা বেশি নম্বরের জন্য সায়েন্স এর পিছনে দৌড়ায় আমি তাদের মধ্যের একজন☺️,অতঃপর উচ্চমাধ্যমিকের পর তাদের অধিকাংশই হারিয়ে যায়,কিন্তু তারপরও যাদের শিক্ষা হয় না আর অনার্স এর পিছনে দৌড়ায় আমি তাদের মদ্ধেরও একজন, এরকম দৌড়াতে দৌড়াতে লক্ষ্য করলাম প্রায় সাত বছর হয়ে গেল এখনো আমি সায়েন্স এর জগতে টিকে আছি, বুঝলাম শুধু মোহবসে নয় সাইন্সকে অজান্তেই ভালোবেসেছিলাম বলেই বোধহয় আমার মতো এক মদ্ধমেধার ছেলেও এই জগতে টিকে গেছে। সায়েন্স জগতে ঢোকার সময় যে মনোভাব পোষণ করতাম এখন তার আমূল পরিবর্তন এসেছে । তবে আজকে আমি একটা অন্য বিষয় এর উপর আলোকপাত করতে চাই, যেটা আজকের সমাজে অনেকটাই প্রাসঙ্গিক, এটা সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা ,হতেও পারে পাঠকদের মনে কোনো ব্যাতিক্রমী চিন্তাভাবনা থাকতে পারে,আমি সবার চিন্তাভাবনা কেই সম্পূর্ণ সম্মান করি।

কিভাবে শুরু করবো সেটাই বুঝতে পারছি না,আজকাল কার দিনে বাবা মায়েরা তাদের ছেলেমেয়েদের সায়েন্স নেয়ার জন্য বিশেষ উৎসাহ প্রদান করেন , কিন্তু আমার একটাই প্রশ্ন ,কেন?, আমরা যারা সমাজে থাকি তারা বিজ্ঞানের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল,বিজ্ঞানীদের প্রতি কতটা মানবিক,কতটা সহযোগী তা নিয়ে বলতে গেলে আমার মনটা খারাপ হয়ে যায়, কেন ভাবছেন, চলুন কিছু টুকরো টুকরো ঘটনার সাথে আপনাদের পরিচয় করানো যাক।




স্যার জগদীশ বোস এর নাম আমরা সবাই শুনেছি, তিনি কী করেছেন জিজ্ঞাসা করলে একজন বাচ্ছা চোখ বুঝিয়ে বলে দেয় “গাছের প্রাণ আবিষ্কার করেছে”, ব্যাস এখানেই কী শেষ?, wireless communication বা বেতার নিয়ে তার যে এক বিশাল কাজ আছে তা আমরা অনেকেই জানি, যখন তিনি এরকম অভাবনীয় জিনিস আবিষ্কার করে ভাবলেন পুরো সমাজকে তার আবিষ্কারের গুনে মুগ্ধ করবেন সেটাই তার জীবনের কাল হলো😢, বিদেশে পারি দিলেন সেখানে তিনি কিছুদিন কাটিয়ে যখন দেশে ফিরলেন তখন দেখলেন তার labrotrary তে আগুন লেগে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে, ইতিমধ্যে মার্কনি বেতার আবিষ্কারের জন্য নোবেল prize টা নিয়ে নিলেন, ব্রিটিশদের চক্রান্ত টা বুঝতে বাকি ছিল না জগদীশ বোস তথা সমাজের , হয়তো মার্কনি নিজ পরিশ্রমে তা আবিষ্কার করেছে,কিন্তু সমস্ত তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে বর্তমান পৃথিবী মেনে নিয়েছে যে জগদীশ বোস ই প্রথম তার উদ্ভাবন করেন, কিন্তু প্রশ্ন সেখানে নয়, আচ্ছা তৎকালীন ভারতীয় সমাজ কী ভাবে জিনিস টা কে react করেছিল, তার নিশ্চই খুব বড় কিছু করেছিলেন সেই বাঙালি বিজ্ঞানীর সাথে ঘটে অন্যায়ের জন্য?, আজ্ঞে না সেরফ চেপে গিয়েছিলেন ,বা গায়ে লাগাননি, জগদীশ বোস এর মানসিক অবস্থা ..না থাকুক আজ আর তার কথা তুলবো না।কারণ আরো অনেক উদাহরণ আছে যে☺️।

সত্যেন্দ্রনাথ বোস, হুম ওনাকে ও কে না চেনে? ,বাঙালির গর্ব উনি,আর ওনার কাজও সারা জাগানোর মতো, পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেওয়ায় মতো কাজ, বোস-আইনস্টাইন statistics, বোসন কণা ওনার নাম থেকেই উদ্ভুত, যদিও নোবেল prize টা হলোনা, একটা প্রবাদ আছে ” বিজ্ঞানের জগতে যতগুলো গর্হিত কাজ আছে, তার মধ্যে একটা হলো সত্যেন্দ্রনাথ বোস কে নোবেল প্রাইজ না দেওয়া”, তা যাই হোক ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্ষে এটাই কাম্য ,বরং উল্টোটা হলে আশ্চর্য লাগতো,গল্পটা সেখানে নয়, গল্পটা হলো সেই বোস তাঁর জীবনের শেষ দিকে কাটিয়েছে কলকাতার এক অচেনা গলিতে নিজের স্ত্রীর সাথে কিছুটা আর্থিক অভাবে😢, এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলি চলচ্চিত্রকার ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় একদিন তার এক কো স্টার তথা জুনিয়ার কে জোর করে কে দু হাঁড়ি মিষ্টি দিয়ে বলে তাকে অনুসরণ করতে,সে ভদ্রলোক একটু বিরক্ত হন, কোথায় যাচ্ছেন জানেনা,শুধু বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন দু হাঁড়ি মিষ্টি, বারবার জিজ্ঞাসা করেও কোনো উত্তর পান্না কো স্টার মশাই,অবশেষ একটা অন্ধগলিতে ঢোকেন তাঁরা, একটা বাড়িতে ঢুকে ভানু বাবু হাঁক দেন” স্যার বাড়িতে আছেন?’, অবশেষ যখন তাঁরা ঘরে ঢোকেন দেখে ঘর অন্ধকার,একটা প্রদিপ জ্বালাতেই কো স্টার মশাই এর চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়, দেখেন একটা পুরোনো চাদর গায়ে দিয়ে বসে আছেন প্রবাদপ্রতিম বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বোস, তিনি তাঁর স্ত্রী কে উদ্দেশ্য করে বলেন ” দেখেছো, আজকাল আর তো কেউ মনেও রাখে না,কিন্তু ভানু ভোলে নি ঠিক মিষ্টি নিয়ে এসেছে”, কো স্টার মশাই যখন এই ঘটনা টা বলেন তখন ঊল্লেখ করেন সেই বক্তব্যের মধ্যে কতটা ব্যাথা ছিল, কো স্টার আর কেউ না অনুপ কুমার স্যার।হুম এইভাবেই বাঙালি বিজ্ঞানীরা অবহেলিত হয়েছেন আমাদের সমাজে,ভাবুন তো এত বছর পরও আমরা রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন করি সবাই মিলে,কিন্তু সত্যেন্দ্রনাথ এর জীবন দশায় তার জন্মদিন টা কতটা অবহেলিত ছিল, আচ্ছা আজকে কী আমরা সেটাকে যথাযত মর্যাদা দেই?,প্রশ্ন টা থেকেই গেল আমাদের জন্য।




আচ্ছা ঠিকআছে পুরোনো কথা ছাড়ুন,আজকাল কার দিনে আসা যাক, সেতো আরো খারাপ অবস্থা, আচ্ছা কতজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী বললেই আমাদের মধ্যে অধিকাংশ আলবার্ট আইনস্টাইন, স্টিফান হকিংস এর নাম বলে,জানিনা বাবা বিদেশি নামের ভিতরে কি মাধুর্য থাকে?, অনেকেই বলেন হকিংস ব্ল্যাক হল, white dwarf ইত্যাদি ইত্যাদি আকর্ষণীয় জিনিসের উপর কাজ করেছেন, এই প্রসঙ্গে একটা গল্প বলি ,  বর্তমানে IUCAA এর ডিরেক্টর সৌমক রোয়চৌধরি এর বয়ানে – “যখন আমি কেমব্রিজে পড়ি একদিন কিছু পড়াশোনা গত সমস্যা নিয়ে হাজির হই অধ্যাপকের কেবিনে ,সেখানে বসে ছিলেন আরেক ভদ্রলোক, তারা দুজনে কি একটা গভীর বিষয়ে ডিসকাস করছিলেন, বোর্ডে লেখা ছিল রয় -চৌধুরী ইকুয়েশন ,আমার নাম শুনে অজানা ভদ্রলোক স্তম্ভিত হয়ে বললেন তুমি কি রয় চৌধুরী এর কেউ হও সম্পর্কে?, আমি হেসে বলি না ,তবে ভদ্রলোক আমার শিক্ষক যখন আমি প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়তাম”, এই গল্পে বলে রাখি সেই অজানা ব্যাক্তিটি ছিলেন ,আর কেউ না স্বয়ং স্টিফেন হকিংস ,তখন ও তিনি কিছু কিছু কথা বলতে পারতেন, হুম আর এখানের শিক্ষক টা হলেন অমল কুমার রায়চৌধুরী,প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক অত্যন্ত সাদামাটা এক নিপাট মানুষ যে তার সারাজীবন দান করেছেন বিজ্ঞান চর্চায় ,পিছিয়ে পড়া ছাত্রদের অকৃপণ হাতে সাহায্য করেছেন পড়াশোনায় ,ইনি তো এখনকার ই মানুষ কজন এনাকে সম্মান করি, কজন এনার বিষয়ে চর্চা করেন সমাজের কাছে,যখন বিদেশিরা এদের কাজকর্মের গুরুত্ব উপলব্ধি করেছে, আমরা তো অনেকেই জানি ই না এনাকে। আরো গাদা গাদা উদাহরণ দেয়া যায়, পাকিস্তান এর নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী আব্দুস সালাম (১৯৭১) নোবেল prize উৎসর্গ করেছিলেন তাঁর এক বাঙালি শিক্ষককে,যিনি তখন কলকাতা তেই থাকতেন,কেউ চিনতো না ভদ্রলোককে,অবশেষে অনেক খোজের পর তার দেখা মিললো কলকাতার কোনো এক গলিতে সম্পূর্ণ অবিবাহিত অবস্থায় হাঁটতে চলতে অক্ষম হয়ে মৃত্যুর অপেক্ষা করছে তার নিজের বাড়িতে সম্পূর্ণ একা। সারাজীবন দান করেছেন দেশকে বিজ্ঞানের আলোয় আনার জন্য আর তার জীবনের শেষ পরিণতি তো দেখুন।




আজকাল আমরা এই সব ভাবিনা, এটা এন্টারটেইনমেন্ট এর যুগ, আজ আমাদের সমাজে যদি কেউ সম্মান পায় তা হলো সিনেমা আর্টিস্ট, ক্রিকেটার, নেতা মন্ত্রী, তারপর সিরিয়াল অভিনেতা,গায়ক ইত্যাদি ইত্যাদি আরো কত কি?,আর বিজ্ঞানীরা😊?, যাদের আমরা মাথায় করে নাচি, ভেবে দেখুন তো তাঁদেরকে এত গুরুত্ব দেয়ার কি আদপেই কোনো মানে হয়?,আমার তো মনে হয় সত্যি ই কোনো মানেই নেই, সমস্যায় যখন পড়েন তখন সমাধান কারা করে?, কারা সবার আড়ালে থেকে মুখ বুঝে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে শুধু মাত্র আপনাদের আমাদের জন্য যারা ভালো থেকে অতি ভালো জীবন যাপন করতে পারি?, ইলেক্ট্রিসিটি ,মোবাইল,গাড়ি, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস এর এই বিপুল সম্ভার যা ছাড়া আপনার একটা দিন কাটেনা ,অথচ যারা সেগুলো ……☺️। ভেবে দেখুন প্রতিবছর iit দিয়ে কত ছেলে মেয়ে বেরোয় ,তারা কোথায় যায়?,প্রশ্ন করেছেন?, অধিকাংশ বিদেশে যায়, আর যাবেই বা না কেন বলুন আমাদের দেশে এমন facilites নেই যে তারা কাজ করবে, কত resarcher রা বিদেশে পারি দেন,আমার নিজের জানাই এমন অনেক লোক আছে,আর কেই বা বলতে পারে ভবিষ্যতে আমরা পারি দেব না সুযোগ পেলে?,তাহলে দেখুন শুধু সমাজই নয় সরকার ও কতটা উদাসীন।

আজকাল যখন করোনা virus এর উপদ্রব বেড়েছে তখন লোকের জ্ঞান ফিরছে, অবশ্য কতদিন টিকবে তাও সন্দেহ আছে, কারোর মুখে বলতে শুনছি “বিজ্ঞানী রা কি ঘুমাচ্ছে, একটা ভ্যাকসিন তৈরি করতে পারছে না”, যদিও ফ্রান্সের এক লেডি resarcher খুব সুন্দর রেপ্লিই করেছেন, তিনি বলছেন ” যে সমাজে প্রয়োজন এর তুলনায় বিলাসিতা প্রাধান্য পায়, সে সমাজে মানুষের বেঁচে থাকার বিশেষ কিছু মানে নেই”,অবশ্য তিনি এ ও উল্ল্যেখ করেছেন কিভাবে অল্প বেতনের কারনে তারা দিনের পর দিন অসুবিধার মধ্যে কাটিয়েছেন, অন্যদিকে অভিনেতা ,খেলোয়াড় রা লক্ষ লক্ষ ডলার কামাচ্ছে। আমাদের দেশ ও ওই একই হাল। প্রতিবছর কজন বিজ্ঞানী isro এর সুইসাইড করেন তা একবার google করে দেখুন ,অবাক হতে শুরু করবেন, বিজ্ঞান ও তার সঙ্গে জড়িত ব্যাক্তিদের একটু সহানুভূতি দেখান,তারা অনেক পরিশ্রম করে যা আপনার ধারণার ও বাইরে,কল্পনাতীত, বিজ্ঞান একটা সাধনা যা অন্য কিছুর থেকে কম নয়,এটা শুধু তারাই বোঝে যারা তার সান্নিধ্য পেয়েছে।

আশা করি বিজ্ঞানীরা করোনা ভ্যাকসিন খুব তাড়াতাড়ি আবিষ্কার করে,আরো একবার প্রমান করবে, যে যখন সমস্ত আশা শেষ হয়ে যায় তখন একদল লোক তাঁদের সর্বস্ব দিয়ে আবার সবকিছু ঠিক করে দেয়,সবার অজান্তেই। এইভাবেই বেঁচে থাকুক বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীরা। ধন্যবাদ।

কলমে—-pusparath bag

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 1   Average: 1/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।