“বাঁশিয়ালার প্রেম” তৃতীয় ভাগ

“বাঁশিয়ালার প্রেম”

লিডিয়া গাঙ্গুলী

ন্দ্রানী মেয়েকে দেখে খুব খুশি, অরিজিৎ দিঠিকে শাড়ি পরা দেখে একচোট আদর করে বললো -উফঃ আমার ছোট্ট মেয়েটা কবে যেন বড়ো হয়ে গেল!!!দিঠি বাবার কথায় লজ্জা পেয়ে খানিক ক্ষণ মুখ লুকিয়ে রাখলো অরিজিতের বুকে। ইন্দ্রানী মেয়েকে হাত মুখ ধুয়ে আসতে বলে চা, জলখাবার এর জন্য রান্না ঘরের দিকে গেল। অরিজিৎ বসার ঘরে টেলিভিশনে খবর দেখছে, ওদিকে শ্যামেরও ডাক পড়লো চা এর আসরে। দিঠি হাত মুখ ধুয়ে পোশাক বদলে বাবার পাশে এসে বসলো। ইন্দ্রানী অনেক ক্ষণ ডাকার পরে শ্যাম এসে ঘরে ঢুকে দেখে দিঠি বসার ঘরেই তার বাবার পাশে বসে চা খাচ্ছে, প্রথমটায় ঘরে ঢুকতে একটু ইতস্তত করলেও ইন্দ্রানীর বারংবার ডাককে আর উপেক্ষা করতে পারলোনা। ইন্দ্রানী শ্যামকে দেখেই-কী রে তোর আজ খুব ধকল গিয়েছে নাকি!শ্যাম একটু হেসে
-ওই আর কি…-
-শোন তুই আজ একদম রাত জেগে কাজ করবিনা। আমি তাড়াতাড়ি খেতে দিয়ে দেবো, খেয়ে ঘুমিয়ে পড়বি, কাল আবার সকাল সকাল উঠতে হবে, আমরা সবাই একটু কঙ্কালী তলা পুজো দিতে যাবো।
-আমার কাল হবেনা দুগ্গা মা, আমাকে কলকাতা যেতে হবে। কথাটা বলেই দিঠির দিকে তাকায় শ্যাম। দিঠি বুঝতে পারে এটা ইচ্ছাকৃত করছে শ্যাম, কিন্তু কোন অভিব্যাক্তি না দেখিয়ে চা শেষ করে নিজের ঘরে চলে আসে। ইন্দ্রানী কিছু সময় চুপ থেকে -ও হবেনা!তাহলে জ্যেঠুকেই গাড়ি চালাতে হবে, আচ্ছা তুই সাবধানে যাস তাহলে। কাল ফিরবি তো?
-হুম কালই ফিরবো তবে রাত হবে। শ্যাম আর কথা না বাড়িয়ে নিজের ঘরে চলে আসে।




রাতের খাওয়া আজ সকলে তাড়াতাড়ি খেয়ে নেয়। শ্যাম নিজের ঘরে ফিরে এসে বাঁশিটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে আজকে দিঠির গাওয়া গানটার সুর বাজাতে শুরু করে। দিঠির কানেও পৌঁছায় সুরটা, তখন সে মনে মনে ভাবে এক ছুটে চলে যাবে শ্যামের কাছে, পরক্ষনেই নিজেকে সামলে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। বারান্দায় আসতেই সুরটা আরো স্পষ্ট হয়। জুঁই আর বেল ফুলের গন্ধে ভরে রয়েছে চারপাশ,সঙ্গে বাঁশির আওয়াজ অসাধারণ লাগে দিঠির। বাঁশির আওয়াজের সাথে সাথেই শ্যামের ফোন রিং হওয়ার আওয়াজ পায়, বাঁশি থামিয়ে ফোনটা ধরে শ্যাম।দিঠি খানিক সময় দাঁড়িয়ে থেকে ঘরে এসে দরজা দেয়।

সকালটা খুব সুন্দর শুরু হলো আজ দিঠির। বাবা, মায়ের আদর খেয়ে ঘুম ভাঙলো। এই দিনটা প্রতি বার খুব সুন্দর করে উজ্জাপন করে ইন্দ্রানী, তার মাতৃত্বের দিন এটা কোনোরকম খামতি রাখেনা। শ্যাম আজ কলকাতায় যায়নি, বুড়ার কাছে শুনেছে দিঠির জন্মদিন আজ, প্রতিবার মনে থাকে শ্যামের, শুভেচ্ছা জানাতেও ভোলেনা কখনো কিন্তু এবার যে কি হলো!বেমাউল ভুলে গিয়েছে শ্যাম!!!আসলে মনের উপর দিয়ে যেন ঝড় চলছে অনবরত। দিঠি নিচে এসে বসার ঘরের সোফাতে শুলো, কুসুম চা দিতে এসে দিঠিকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালো। ইন্দ্রানী রান্না ঘর থেকে দিঠিকে শুতে দেখে
-আবার শুলি কেন!!!যা স্নানটা করে তৈরী হয়েনে, বাবা কিন্তু স্নানে চলে গিয়েছে।
-চা খেয়ে যাচ্ছি। বলে চায়ের কাপে একটা লম্বা চুমুক দিলো। ইতিমধ্যে শ্যাম ঘরে এসে
-দুগ্গা মা গাড়ির চাবিটা দাও, গাড়িটা বার করে একটু মুছে রাখি।
ইন্দ্রানী চাবিটা শ্যামের হাতে দিয়ে -তুই স্নান করবি কখন?
-এইতো গাড়িটা বার করেই যাবো স্নানে।
-কাঁচা পাঞ্জাবী পড়বি কিন্তু…
-একদম। একটু হেসে জবাব দেয় শ্যাম।
দিঠি শ্যামের দিকেই তাকিয়ে ছিলো, শ্যামের হাসিটা দেখে মনে মনে ভাবলো “উফঃ এই হাসিটার জন্য মরতেও পারি… কিন্তু সুন্দরদার তো আজ কলকাতায় যাওয়ার কথা ছিলো!!!” চা শেষ করে তৈরী হতে গেলো দিঠি।
স্নান সেরে মায়ের দেওয়া দুধে আলতা রঙের শাড়িটা পরে তার সঙ্গে পরিমিত সাজগোজ করে তৈরী হয়ে নিলো। সাজাগোজার দিকটাতে দিঠি বেশী সময় নষ্ট করেনা, মাকে দেখেই শিখেছে সে, ইন্দ্রানীও কোনোদিনই খুব একটা সাজেনা, ইন্দ্রানীর সাজ বলতে কাজল আর পারফিউম। একদিন দিঠি তার মাকে বলেছিলো-মা তুমি লিপস্টিক দাওনা কেন !!!ইন্দ্রানী হাসতে হাসতে বলছিলো-ওরে বাবা লিপস্টিক দিলে আমার ঠোঁটে গরম লাগে, খুব মজা লেগেছিলো দিঠির কথাটায়। দিঠির ছোটো মামার বিয়েতে(ইন্দ্রানীর সেজো জ্যেঠুর ছেলে)সবাইকে খুব সাজতে দেখে দিঠি মাকে আলাদা করে ডেকে গলা জড়িয়ে ধরে বলেছিলো -মা তোমাকে সাজলে কত ভালো লাগে তুমি সাজোনা কেন!!!আজ একটু সাজোনা মা, ইন্দ্রানী হেসে বলেছিলো -মাম্মাম সাজলে আমার গরম লাগে, তাছাড়া নিজের যা আছে তাতেই প্রত্যেককে সুন্দর লাগে, বাড়তি মেকআপ, লিপস্টিকের প্রয়োজন হয়না, ভিতরের সৌন্দর্যটাই আসল। খুব ভালো লেগেছিলো দিঠির মায়ের এই কথাটা।




তৈরী হয়ে নিচের তলায় নামতে লাগলো দিঠি, ইন্দ্রানী ততক্ষণে তৈরী হয়ে পুজোর জিনিস গোছানো শুরু করেছে। অরিজিৎ বাইরে পায়চারি করছে, আর তাড়া দিচ্ছে, শ্যাম তার দুগ্গা মায়ের সাথে কথা বলছে। দিঠিকে নামতে দেখে শ্যামের চোখ আটকে যায়, কিছুতেই চোখ ফেরাতে পারেনা, ভেজা চুল সঙ্গে শাড়ি উফঃ হৃদপিন্ডটা বেড়িয়ে না আসে শ্যামের!দিঠিও শ্যামের দিকেই তাকিয়ে, ইন্দ্রানী নিজের কাজে মগ্ন, শ্যামের দিকে তাকিয়ে নামতে গিয়ে পা হড়কে যায় শেষ দুটো সিঁড়িতে, শ্যাম সিঁড়ির পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলো সঙ্গে সঙ্গে ধরে নেয় দিঠিকে। দিঠিও শ্যামের বুকের কাছে পাঞ্জাবীটা খামচে ধরে, ইন্দ্রানী -দেখেছিস!!!ভাগ্যিস শ্যাম সামনে ছিলো নাহলে এক্ষুণি একটা বিপদ হতো!!!শাড়ি পড়ে আসতে আসতে নামতে পারিসনা !!! দুজনে স্বাভাবিক হয়ে শ্যাম বাইরে চলে আসে, সে বুঝতে পারে তার দিকে তাকাতে গিয়েই বিপদ হচ্ছিলো দিঠির। দিঠি মায়ের কথায় একটু হেসে -চলো চলো দেরি হয়ে যাচ্ছে এরপর বেশি গরম লাগবে।
সাধারণত দিঠি সবসময় গাড়ির সামনের সিটে বসে, সেটা শ্যাম ভালো ভাবেই জানে বলে নিজে চালকের আসনে বসে দিঠিকে আসতে দেখে সামনের দরজাটা খুলে দেয়। দিঠি সামনে না বসে পিছনের সিটে গিয়ে বসে অরিজিতের উদ্দেশ্যে বলে -বাবা আমি আজ মায়ের কাছে বসবো, তুমি সামনে বসো। ইন্দ্রানী এসে বসলেই শ্যাম রওনা দেয়, মন্দিরে পৌঁছে ইন্দ্রানী পুজো দেয়। দিঠি মন্দিরে মা কালীকে প্রণাম করে গাড়ির দিকে ফিরে আসে, ইন্দ্রানী ও অরিজিৎ তখনো মন্দিরে। শ্যাম গাড়ির কাছেই ছিলো। দিঠিকে আসতে দেখে শ্যামের বেশ ভালো লাগে, কি সুন্দর দেখাচ্ছে, এখনো পর্যন্ত জন্মদিনের শুভেচ্ছাটাও জানানো হয়নি, দিঠিকি কিছু বুঝতে পারছে!সেদিন ইউনিভার্সিটিতে আমি কি একটু বেশি রিয়াক্ট করে ফেলেছি!!!এই সমস্ত বিভিন্ন কথা ভাবতে থাকে শ্যাম। দিঠিও খেয়াল করে শ্যাম ওর দিকে এক ভাবে তাকিয়ে রয়েছে, কাছে আসতেই-শুভ জন্মদিন প্রিয়া…দিঠি একটু থমকে দাঁড়ায়, কী বললো সুন্দরদা প্রিয়া !!!সেই ছোটবেলার খেলার দিন গুলো মনে পরে দিঠির, খেলতে খেলতে সুন্দরদা একদিন বলেছিলো-বাবা কত বড় নাম তোর দিঠিপ্রিয়া ব্যানার্জী!!!আমি তোকে শুধু প্রিয়া বলে ডাকবো, কারণ দিঠি তো তোকে সকলেই ডাকে। -তোমার যেন কত ছোট নাম !!!তোমার নাম টাও যথেষ্ট বড় শ্যামসুন্দর, তাহলে আমিও তোমাকে সুন্দরদা ডাকবো, দুজনেই খুব হেসে ছিলো দুজনের কথায়। সেই হাসির রেশ যেন এখনো দিঠির মুখে ফুটে উঠলো, আর কোন কথা না বলে গাড়িতে গিয়ে উঠে বসলো।
বাড়ি ফিরে অরিজিৎ, ইন্দ্রানী, কুসুম, আর বুড়া সকলেই দিঠিকে ধান দূর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করেছে। বুড়া আর কুসুম একটু ইতস্তত করলেও ইন্দ্রানীর কথায় কেউ না করতে পারেনি। ইন্দ্রানীর মতে বয়সে বড় মানেই সে যেই হোক তার যোগ্য সন্মান প্রাপ্য। দুপুরের খাওয়া শেষ করে দিঠি ইন্দ্রানীর ঘরে গিয়ে…
-মা ও মা আমায় না একটু হোস্টেলে যেতে হবে ১ ঘন্টার জন্য।
-আজ হোস্টেলে!!!কেন?
-বন্ধুরা সব অপেক্ষা করছে, জন্মদিনের সেলিব্রেশন, যাইনা মা, তাড়াতাড়ি ফিরে আসবো, যাবো মা?
-যেতেই হবে মাম্মাম !!!
দিঠি চুপ করে থেকে করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মা এর দিকে। ইন্দ্রানী একটু হেসে…
-আচ্ছা যা, তবে শ্যামকে নিয়ে যা।
দিঠি জানতো মা এই কথাটাই বলবে, মনে মনে খুব আনন্দ পেলো, তবে একটু কপট রাগ দেখিয়ে…
-আমি বলতে পারবোনা। তুমি বলো, তাছাড়া সুন্দরদার তো কাজও আছে, আর ওর বাইকও সার্ভিসিং করাতে দিয়েছে।
-তাতে কী!গাড়ি নিয়ে যাবে, তাহলে তো কোন অসুবিধা নেই !
ইন্দ্রানী শ্যামকে ডেকে বললো দিঠিকে যেন একটু হোস্টেলে নিয়ে যায়। শ্যাম আর কোন কথা না বলে তৈরী হতে শুরু করলো, দিঠি তৈরী হয়ে আগে থেকেই গাড়িতে বসে ছিলো। সামনের সিটেই বসেছে দিঠি, শ্যাম এসে গাড়ি নিয়ে রওনা দিলো। খানিক ক্ষণের মধ্যেই হোস্টেলে পৌছালো দিঠি, শ্যাম গাড়িতেই বসেছিলো। দিঠিকে পেয়ে বন্ধুরা খুব আনন্দ করলো, কেক কাটা হলো, ছবি তোলা হলো, দিঠি চট পট সব মিটিয়ে সাওনিকে বললো…
-এই আজ তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে, মা বলেছেন, তোদের ট্রিটটা ইউনিভার্সিটিতে এসে দেবো আজ যাই, সুন্দরদা অপেক্ষা করছে।
আদ্রিজা দিঠিকে একটু ধাক্কা দিয়ে…
-কাকিমা বলেছেন!!!নাকি তোর শ্যামসুন্দর বলেছে মোহন বাঁশি শুনাবে বলে!!!
দিঠি একটু হেসে কোন কথা না বাড়িয়ে বেড়িয়ে পরে।
গাড়িতে এসে বসে দিঠি শ্যামকে বললো
-কোপাই এর ধারে চলো।
শ্যাম বড় বড় চোখ করে -কোপাই !কিন্ত কেন!?
-আমার ইচ্ছা করছে তাই।
অগত্যা শ্যাম আর দিঠিকে না করলো না। শুধু বললো -দুগ্গা মা কিন্তু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে বলেছেন।
দিঠি কোন উত্তর না দিয়ে জানলার কাচ নামিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকলো। কিছু ক্ষণের মধ্যেই ওরা কোপাই এর ধারে পৌছালো। দিঠি গাড়ি থেকে নেমে একটা পরিষ্কার জায়গা দেখে বসলো, শ্যাম একটু দুরে দাঁড়িয়ে ছিলো। দিঠি শ্যামকে ডেকে ওর পাশে বসতে বললো, শ্যাম এসে দিঠির পাশেই বসলো। দুজনেই চুপ করে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকলো বেশ অনেক ক্ষণ। দিঠি নীরবতা ভেঙে শ্যামকে জিজ্ঞাসা করলো
-তুমি কী অঙ্কিতাদি কে ভালোবাসো সুন্দরদা?
শ্যাম নদীর দিকেই তাকিয়ে বললো- না।
-তবে তুমি কাকে ভালোবাসো?




-কাউকে না শুধু দুগ্গা মা কে ভালোবাসি
দিঠি এবার খুব বিরক্তির সুরে -সেটা তো জানি!আমি কী ধরনের ভালোবাসার কথা বলছি সেটা তুমি বুঝেও না বোঝার ভান করো কেন !!!
-অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে, এবার ফিরতে হবে চল উঠি, বলে উঠতে যায় শ্যাম। দিঠি শ্যামের হাতটা ধরে আটকায়-আজ তোমায় বলতেই হবে, আমি জানি তুমি অঙ্কিতাদি কেই খুব ভালোবাসো। শ্যাম চুপ করে থাকে কোন কথা না বলে গাড়ির দিকে এগোতে থাকে। পিছন থেকে দিঠি -কী হলো কোন উত্তর দিচ্ছ না কেন!শ্যাম দিঠির দিকে তাকিয়ে -আকাশের অবস্থা ভালো নয়, চল বাড়ি ফেরা যাক দুগ্গা মা চিন্তা করবেন নাহলে। দিঠি আর কোন কথা না বলে গাড়িতে গিয়ে বসে। শ্যামও গাড়িতে উঠে পরে, দিঠি শ্যামের দিকে তাকিয়ে -আমায় একটুও ভালোবাসো না তুমি? শ্যাম কোন উত্তর দিলোনা, দিঠি শ্যামের হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে শান্ত হয়ে -সুন্দরদা তুমি আমায় একদম পছন্দ করোনা তাই না? শ্যাম খানিক ক্ষণ চুপ করে থেকে -এটা হয়না প্রিয়া, কোথায় তুই আর কোথায় আমি !!!দুগ্গা মা ছিলেন বলে আমি অনেক কিছু পেয়েছি জীবনে, যা আমার পাওয়ার কথাই ছিলো না। তাছাড়া তুই অরিজিৎ ব্যানার্জী আর ইন্দ্রানী ব্যানার্জীর এক মাত্র মেয়ে, জ্যেঠু, দুগ্গা মায়ের তোকে নিয়ে কত স্বপ্ন, সেটা আমি ভালো করেই জানি। তোর জন্য অন্য কেউ অপেক্ষা করছে, তুই আমার মতো একটা গেঁয়ো ছেলের সঙ্গে সারা জীবন কাটাতে পারবিনা। আমিও দুগ্গা মা কে ঠকাতে পারব না।
-তুমি কেন এতো কিছু ভাবছো !তোমার দুগ্গা মা কে ঠকাতে যাবে কেন!!!ভালোবাসা তো অপরাধ নয় !আমি তোমাকে ছাড়া আর থাকতে পারবো না। তুমি আমায় আর দুরে সরিয়ে দিয়ো না সুন্দরদা, এবার না হলে আমি মরেই যাবো।
গাড়ির মধ্যেই দিঠি শ্যামকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে, শ্যাম স্থির থাকতে না পেরে দিঠিকে কাছে টেনে নেয়। দিঠির কান্না থামলে শ্যাম শান্ত ভাবে
-প্রিয়া পাগলামো করছিস, এটা হয়না। দুগ্গা মা আর জ্যেঠু জানতে পারলে কী হবে জানিনা!তবে আমাকে অনেক দূরে সরে যেতে হবে তোদের থেকে, এখন দুবেলা যাও তোকে একটু চোখের দেখা দেখতে পারছি তখন তাও পারব না!!!
দিঠি শ্যামের বুকে মাথা দিয়ে চুপ করে সব কথা শুনে মাথা তুলে শ্যামের ঠোঁটে নিজের ঠোঁটটা ডুবিয়ে দিলো, শ্যামের সমস্ত দ্বিধা দ্বন্দ্ব নিঃশেষ করতে থাকলো এক নিমেষে, শ্যাম দিঠিকে আরো নিবিড় করে ধরলো। এরই মধ্যে বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে, সব দ্বিধা বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায় ধুয়ে মুছে যেন পূর্ণতা এনে দিলো ওদের ভালোবাসা কে।
প্রিয়তোষ আর বনানীর আজ ইন্দ্রানীর বাড়িতে রাতে খাওয়া দাওয়া করার কথা, পরেশও আসবে আজ দিঠির জন্মদিন উপলক্ষে। অরিজিৎ কোনোদিনই খুব বেশি লোকজন পছন্দ করেনা, তাই দিঠির বন্ধুদের বাড়িতে ডাকেনি দিঠি। অরিজিৎ বরাবরই একটু চুপচাপ থাকতে ভালোবাসে, ভিড়ভাট্টা মোটেও ভালো লাগেনা, সেই কারণে শশুর বাড়ি যাওয়াই হয়না অরিজিতের, বিয়ের প্রথম প্রথম কয়েকবার গিয়েছিলো। ইন্দ্রানীদের বাড়িতে এখনো সবাই এক সাথেই থাকে অনেক জন সমাগম তাই অরিজিতের অস্বস্তি হয়। যাইহোক দিঠি মাকে দেওয়া কথা অনুযায়ী এক ঘন্টার মধ্যে ফিরতে পারেনি, সামান্য দেরি হয়েছে। বাড়িতে যখন ঢুকেছে ওরা তখন বৃষ্টি থেমেছে তবে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। শ্যাম গাড়ি গ্যারেজে ঢুকিয়ে চাবি দিতে ঘরে ঢুকে দেখে ইন্দ্রানী রান্না ঘরে কিছু বানাচ্ছে, চাবিটা জায়গায় রেখে বেড়োতে যাবে পিছন থেকে অরিজিৎ ডেকে – শ্যাম একটু পরেই তোদের দুজন প্রফেসর আসবেন, স্টুডিওতে যেতে পারেন ঠিক করে রাখিস বাবা ঘরটা। ইন্দ্রানী রান্না ঘর থেকে বেড়িয়ে শ্যামকে দেখে -কিরে তোরা গাড়িতে গেলি তাও মাথা ভেজা জামা কাপড় ভেজা !!! দিঠিও নিশ্চই ভিজেছে? উফঃ কী যে করিস তোরা !!! যা তাড়াতাড়ি স্নান কর ঠান্ডা লেগে যাবে, দিঠি নিশ্চয়ই তোকে জোর করে গাড়ি থেকে নামিয়ে ভিজিয়েছে? শ্যাম কোনো কথা না বলে একটু হেসে নিজের ঘরে চলে যায়।
ইন্দ্রানী দিঠির ঘরে গিয়ে দেখে দিঠি বাথরুমে ঢুকেছে, বাথরুমের দরজায় টোকা দিয়ে -মাম্মাম মাম্মাম?
-দাঁড়াও একটু, বলে কিছুক্ষণের মধ্যেই বাথরুম থেকে বেড়িয়ে আসে।
– বৃষ্টিতে ভিজেছিস!যদি জ্বর হয়!




– মা কি করবো বলো ফিরছিলাম খোয়াই এর কাছে বৃষ্টি নামলো, সুন্দরদা গাড়ি থামাচ্ছিলোনা জোর করে থামিয়ে নিজে নামলাম সুন্দরদা কেও টেনে নামিয়ে একটু ভিজে নিলাম, খুব ইচ্ছা করছিল মা।
– এমন কেউ করে ! যাইহোক তৈরি হয়ে নিচে আয় এক্ষুনি বনানী পিসি আর প্রিয়তোষ কাকু চলে আসবে।
শ্যাম ঘরে গিয়ে স্নানে ঢুকেছে মনের ভিতরের যে তোলপাড়টা চলছিল সেটা আজ আর নেই, যেটা কদিন খুব কষ্ট দিয়েছে ওকে। দিঠিকে ও ছোট থেকেই ভালোবাসে কিন্তু দিঠিও যে ওকে ভালোবাসতো সেটা এতদিন বুঝতে পারেনি শ্যাম। স্নান করতে করতে ওদের প্রথম বৃষ্টি ভেজার কথা মনে পড়ছে, হ্যাঁ আজ ওরা প্রথম বৃষ্টিতে ভিজলো একসাথে, ভালোবাসার বৃষ্টি। খোয়াই তখন জনশূন্য, কী সুন্দর অভিজ্ঞতা। দিঠি না থাকলে এই অপূর্ব অভিজ্ঞতা শ্যামের কোনোদিনই হতো না। কতক্ষণ দিঠি ওর বুকে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে ছিলো, সেটা ভেবেই একটা আলাদা অনুভূতি হচ্ছে শ্যামের মনে, দিঠির গন্ধ ছড়িয়ে গিয়েছে ওর সারা শরীরে। এইসব কথা ভাবতে ভাবতে স্নান করছে শ্যাম, হঠাৎ বাথরুমের দরজায় টোকার আওয়াজ, ভাবনায় ছেদ পড়ল স্নান সেরে দরজা খুলে বাইরে আসতেই দেখে শ্যামের বাবা পরেশ লাল এসেছে শ্যামের ঘরে।
-কখন এলে
-এই তো এইমাত্র, দাদা বৌদির সঙ্গে দেখা করলাম তারপর তোর ঘরে এলাম। বৌদি তোকে ডাকছেন, স্যার আর মেডাম এসে গিয়েছেন।
-যাচ্ছি, বলে তৈরী হতে থাকে শ্যাম।
বনানী আর প্রয়োতোষ দুজনেই বিশ্বভারতীর প্রফেসর কলাভবনের, অরিজিতের সাথে এক সাথেই পড়তো, খুব বন্ধুত্ব ছিলো তিনজনের এবং এখনো আছে। বনানী ও প্রয়োতোষ প্রথম থেকেই একে অপরকে ভালোবাসতো এবং বিয়েও করেছে। ওদের একটি মেয়ে আছে সে বোস্টনে অর্থনীতি নিয়ে পড়ে, খুব কম আসে। অরিজিৎ ওদের থেকে বয়েসে একটু ছোটো, বিয়েও করেছে দেরিতে। দুজনে এসেই দিঠির খোঁজ করে ইন্দ্রানীর কাছে, ইন্দ্রানী কুসুম কে পাঠায় দিঠিকে ডাকতে। কুসুম দিঠির ঘরে গিয়ে দেখে দিঠি ফোনে কথা বলছে তবে খুব নিচু স্বরে, কুসুমকে দেখে -কী পিসি কিছু বলবে?
-বৌদি ডাকছে।
-বলো গিয়ে আসছি।
কুসুম মাথা নাড়িয়ে চলে আসে। দিঠি ফোন রেখে নিচে নামতে নামতে দেখে নেয় শ্যাম এসেছে কিনা, ও সিঁড়ি দিয়ে নামে শ্যামও দরজা দিয়ে ঢোকে দুজনের চোখাচুখি হয়, ব্যাস ঐটুকুই, ওরা নিজেরা ঠিক করেছে কারোকে কিছু বুঝতে দেওয়া যাবেনা। ওরা আগে যেমন ছিলো তেমনি থাকবে এমনকি বন্ধুদেরও না, সুতরাং স্বাভাবিক ব্যবহার করতে থাকলো দুজনেই।
শ্যাম ঘরে আসতেই প্রিয়তোষ এই যে আমাদের ডিপার্টমেন্ট এর একটি জুয়েল ছেলে। শ্যাম একটু লজ্জা পায়, ইন্দ্রানী শ্যামকে কাছে নিয়ে বসায়, পরেশের খুব ভালো লাগে কথাটা শুনে, আর দিঠির তো কোনো কথাই নেই, ঠোঁটে একটা হাসি খেলে যায় ওর। ইন্দ্রানী প্রিয়তোষের উদেশ্যে-দাদা ওকে আমি মাস্টার্সের পর পিএইচডি করতে বলেছি।
-হ্যাঁ খুব ভালো ওর হবে জানতো? খুব পরিশ্রমী আর ইনোভেটিভ, ওকে দেখি আর আমার অরিজিতের এই বয়সটা মনে পরে, কাজের গতি চিন্তা ভাবনা পুরো অরির মতো। শ্যাম মাথা নিচু করে বসে থাকে, পরেশ বলে -স্যার দাদা আর বৌদি না থাকলে শ্যামের এগুলো কিছুই হত না। অরিজিৎ একটা সিগারেট ধরিয়ে পরেশকে উদ্দেশ্য করে- না না পরেশ বলো বৌদি না থাকলে, বুঝলি প্রিয় ইন্দু শ্যামকে নিজের ছেলের মতো দেখে, সব সময় বলে আমার এক ছেলে আর এক মেয়ে, তাছাড়া শ্যামের গুণও আছে। ছোট থেকেই খুব সুন্দর মাটির পুতুল গড়তে পারে, পুতুল গুলো দেখার মতো, অপূর্ব, তার সাথে বাঁশিটাও ভালো বাজায়, তুই শুনেছিস ওর বাঁশি? বনানী বললো -হ্যাঁ ইউনিভার্সিটির অনুষ্ঠানে শুনেছি অনেক বার, খুব সুন্দর বাজায় কোথায় যে ভাসিয়ে নিয়ে যায়!!! ইন্দ্রানীর খুব ভালো লাগছে শ্যামের প্রশংসা শুনে।
-আমাদের দিঠিও খুব গুণী, যা সুন্দর গানের গলা মন মুগ্ধ হয়েছিলো ওর গান শুনে, ওর গলায় একটা দরদ আছে। প্রিয়তোষ দিঠির মাথায় হাত বুলিয়ে কথা কটা বললো। দিঠি শুধুই হাসছে।
-আর বলোনা বনানী দি একটুও গান নিয়ে বসে না। কলকাতায় থাকতে যাও বা একটু বসতো এখানে এসে সব গিয়েছে। ইন্দ্রানী কথা কটা বলে দিঠির দিকে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ।
-সেদিন হোস্টেলে রাতের বেলায় কী একটা গান গাইছিলি দিঠি? প্ৰিয় তোর গান শুনে আমাকে রান্নাঘর থেকে বারান্দায় ডেকে নিয়ে গেলো। দিঠি বনানীর দিকে তাকিয়ে-কোনদিন?
-ওই যে রে যেদিন লোডশেডিং হয়ে ছিলো অনেক ক্ষণ।
বনানী দিঠিকে অনুরোধ করলো-ওই গানটা আজ একবার শোনাবি দিঠি?
দিঠি গান শুরু করলো –
“আমার হাত বান্ধিবি, পা বান্ধিবি
মন বান্ধিবি কেমনে?
আমার চোখ বান্ধিবি, মুখ বান্ধিবি
পরান বান্ধিবি কেমনে?”




দিঠির গান শেষ হলে কুসুম এসে ওদের চা, মাংসের চপ আর তোপসে মাছের ফ্রাই দিয়ে গেলো। ইন্দ্রানী রান্নাঘরে কুসুমকে একটু সাহায্য করতে গিয়েছে, অরিজিৎ প্রিয়তোষকে নিয়ে স্টুডিওতে যাবে তাই শ্যামকে ডেকে নিলো সঙ্গে দিঠিকেও, পরেশ ওদের সাথেই গেলো। বনানী ইন্দ্রানীর সাথে গল্পতে ব্যস্ত। প্রিয়তোষ ঘুরে ঘুরে অরিজিৎ আর শ্যামের কাজ দেখছে, শ্যামের ঘরের দরজা সামান্য একটু ফাঁক করা, সেখান দিয়ে একটা ওয়াল পেন্টিং এর কিছুটা দেখা যাচ্ছে একটা বাচ্চা ছেলে বসে বাঁশি বাজাচ্ছে, প্রিয়তোষের পেন্টিংটা দেখে ভালো লাগলো বলে শ্যামকে ডেকে-শ্যামসুন্দর আমি কি তোমার ঘরে ঢুকতে পারি? শ্যাম একটু হেসে সম্মতি সূচক মাথায় নাড়ালো। প্রিয়তোষ দরজা ঠেলে ঢুকে মোহিত হয়ে যায়, প্রিয়তোষের পিছনে অরিজিৎও ঢুকে উচ্ছসিত হয়ে -কি করেছিস কি!!!এতো অনবদ্য সৃষ্টি!!!বলে শ্যামের কাঁধে হাত রাখে। দিঠি বাবার উচ্ছাস দেখে শ্যামের ঘরে ঢুকে অবাক হয়ে যায়, গর্বে মনটা ভরে ওঠে দিঠির। শ্যামের ঘর থেকে বেড়িয়ে দিঠি ইন্দ্রানীর কাছে এসে-মা দেখবে চলো একটা দারুন ব্যাপার ঘটেছে!!! পিসি তুমিও চলো। বলে দুজনকেই স্টুডিওতে এনে হাজির করলো। ইন্দ্রানী আসতেই অরিজিৎ-ইন্দু দেখে যাও শ্যাম একটা দারুন কাজ করেছে বলে শ্যামের ঘরে নিয়ে গেলো ইন্দ্রানীকে, সঙ্গে বনানীও ঢুকলো। শ্যামের ঘরে ঢুকে ইন্দ্রানী চারিদিকের দেওয়াল দেখে শ্যামের বিছানায় বসে পড়লো। বনানী অবাক হয়ে- করেছিস কি শ্যাম!!!এতো পুরো একটা গল্প!!! শ্যাম ইন্দ্রানীর পায়ের কাছে এসে বসে ইন্দ্রানীর কোলে মাথা রেখে জিজ্ঞাসা করে -তোমার ভালো লাগেনি দুগ্গা মা? ইন্দ্রানীর চোখ ছল ছল করে ওঠে শ্যামের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে- সেরা পাওয়া আমার।
রাতে সকলে এক সাথেই খেতে বসলো, ইন্দ্রানী সকলকে যত্ন করে খাওয়ালো, কুসুমও ছিলো সঙ্গে। শ্যাম যদিও বলেছিলো ইন্দ্রানীর সাথে এক সাথে খাবে কিন্তু ইন্দ্রানী শামকেও খেয়ে নিতে বললো কাল ভোরে শ্যামকে কলকাতায় যেতে হবে বলে। প্রিয়তোষ খেতে খেতে -শ্যাম ওয়ালে ওই কাজটায় চুন আর কি চারকোল ব্যবহার করেছিস?
-সঙ্গে লাল মাটিও আছে। শ্যাম জানালো প্রিয়তোষকে।
-ইন্দ্রানীর মুখটা হুবহু একই রকম হয়েছে, বনানী বললো খেতে খেতে।
-বনানীদি সেই বার দুর্গা পুজোতে আমি আর শ্যাম এক সাথে অঞ্জলি দিয়েছিলাম অষ্টমীর দিন, তখন শ্যাম অনেক ছোটো।
-কি সুন্দর মনে রেখেছে বল! বনানী বললো।
-শ্যামের আঁকা পেন্টিংটার মতোই লাগছিলো সেদিন ইন্দুকে, সত্যি শ্যাম কাজটা অনবদ্য হয়েছে, না বলে পারছিনা। অরিজিৎ বললো শ্যামের দিকে তাকিয়ে, শ্যাম লজ্জায় মাথা নিচু করে খাচ্ছে। পরেশের খুব ভালো লাগছে, দিঠিরও মনে মনে আনন্দ হচ্ছে। খেতে খেতে শ্যাম আর দিঠি দুজনে চোখে চোখে কত যে কথা বলছে সেটা তারা দুজনেই জানে।

(ক্রমশ )

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 2   Average: 5/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।