বাঁশিয়ালের প্রেম

বাঁশিয়ালের প্রেম

বাঁশিয়ালের প্রেম
লিডিয়া গাঙ্গুলী
প্রথম ভাগ -১ম পর্ব –

মোবাইল এর অ্যালার্ম এ ঘুম ভাঙে ইন্দ্রানীর, ভোর ৫টায় অ্যালার্ম দিয়েছিলো কাল রাতে। আজ দুর্গা  সপ্তমী,  পাড়ার পুজো প্যান্ডেল থেকে ঢাকের আওয়াজ ভেসে আসছে। নবপত্রীকা স্নানের জন্য নিয়ে যাচ্ছে, বিছানায় বসেই মা দুর্গার উদ্দেশ্যে প্রণাম করে বিছানা ত্যাগ করে ইন্দ্রানী।ফ্রেশ হয়ে চা বসিয়ে অরিজিৎকে ডাকতে থাকে “কি গো অরি ওঠো সাড়ে ৫টা বাজে, দেরী হয়ে গেলে ট্রেনটা মিস হতে পারে…” ইন্দ্রানীর ডাকে পাশ ফিরে পাশবালিশটা জড়িয়ে অরিজিৎ বলে “ইন্দু আর আধ ঘন্টা পরে ডাকো প্লিজ…” অগত্যা কি করবে ইন্দ্রানী শোয়ার ঘর থেকে বেড়িয়ে বসার ঘরে এসে লাস্ট মিনিট কিছু গোছগাছ করতে থাকে, গোছগাছ করতে করতেই চা খায়, এরই মধ্যে মিষ্টি সুরেলা গলায় তার মেয়ে তাকে ডেকে ওঠে “মাম্মাম মাম্মাম…”ইন্দ্রানী উত্তর দেয় বলো মাম্মাম? কোথায় তুমি…? মেয়ের কাছে এসে আদর করে তাকে বিছানা থেকে নামিয়ে তৈরী করতে থাকে। ইন্দ্রানী আর অরিজিতের মেয়ে দিঠি, বয়স ৪ বছর, কিন্তু কথা বলবে যেন কত বড়ো হয়েগেছে। মাকে বিভিন্ন প্রশ্ন বাণে জর্জরিত করতে করতে তৈরী হতে থাকে দিঠি, মা আর মেয়ের কথা শুরু হলে আর থামতে চায় না, এই কথার তোড়েই অরিজিতের ঘুম ভাঙে সেও বিছানা ছেড়ে উঠে চা খেয়ে তৈরী হতে শুরু করে।

শিয়ালদা স্টেশন থেকে ভোরের তারা মা এক্সপ্রেস ধরবে ইন্দ্রানীরা, মেয়ে হওয়ার ২বছর পর থেকেই পুজোয় তারা বীরভূমের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। বিয়ের পর পর অরিজিৎ আর ইন্দ্রানী বছরে প্রায় ৪/৫বার বীরভূম যেত, আর বাদ বাকি সময় পাহাড় অথবা সমুদ্র। যদিও সমুদ্র তাদের দুজনেরই খুব একটা পছন্দের নয়, তবে বীরভূম ইন্দ্রানীর ভালোবাসার জায়গা, অরিজিতেরও খুব পছন্দের। তাই তারা সপ্তাহের শেষেই বেশীরভাগই বীরভূমে চলে আসতো।সেখানের মানুষজন রাস্তা ঘাট গাছপালা বড়োই টানে তাদেরকে। অরিজিৎ মাঝে মধ্যে অন্য জায়গায় যাওয়ার কথা বললেও ইন্দ্রানী বাদ সাধতো, কারণটা সে নিজেও জানেনা, কেন জানি টানে তাকে বড়ো জায়গাটা। সেই মোরামের পথ, বড়ো বড়ো সায়র, অনেক পুরোনো পুরোনো গাছ যাদের চারিদিক থেকে নেমে এসেছে ঝুরি, অনেক রকমের পাখি, শাল বন, সোনাঝুরির জঙ্গল, আকাশ ছোঁয়া উক্যালিপ্টাস এর সারি, খোয়াই বন, কোপাই নদী, সব যেন ইন্দ্রানীর ভীষণ নিজের মনে হয়। এসবের থেকেও এখানকার মানুষদের যেন খুব কাছের মানুষ মনে করে ইন্দ্রানী, ওঁদের গা থেকে লাল মাটির গন্ধ পায়, একটা ভালোবাসা…খুব নিজের লাগে ওর  মানুষ গুলোকে।
শেষ পর্যন্ত ট্রেনটা ধরতে পেরেছে, যদি ঠিক ঠাক ট্রেনটা চলে তবে সাড়ে ১০টার মধ্যে বোলপুর স্টেশন পৌঁছাবে তারা। সেখান থেকে গাড়িতে দারোন্দার কামারপাড়ায় যাবে, সেখানেই থাকে তারা বরাবর, শহরের কোলাহল ভালোলাগেনা ইন্দ্রানীর। কামারপাড়ায় দুই গ্রামের আদিবাসীরা মিলে একটাই দুর্গা পুজো করে, এতো সাধারণ সেই পুজো শহুরে জাঁকজমক নেই, কিন্তু একটা আন্তরিকতা আছে।  এইসব ভাবতে ভাবতেই কখন তাদের ট্রেন বর্ধমান স্টেশনে এসে দাঁড়ালো। মেয়েকে এই ফাঁকে বিস্কুট আর ডিম সিদ্ধ খাইয়ে দিলো ইন্দ্রানী। এর আগে আর একটা স্টেশনে থেমেছিল ট্রেনটা নৈহাটী তবে দাঁড়ায়নি বেশিক্ষণ। যাইহোক বর্ধমান থেকে ট্রেনটা ছাড়তেই আবার ভাবনা সাগরে ডুব দিলো ইন্দ্রানী। পথে যেতে যেতে বড়ো বড়ো তালগাছ দেখছিলো আর মেয়েকে দেখিয়ে বলছিলো “মাম্মাম ওই দেখ ঐযে সবথেকে উঁচু গাছ গুলো তালগাছ।” মেয়ে তালগাছ দেখে মা কে অনেক প্রশ্ন করতে লাগলো “মাম্মাম তালগাছে কি একানড়ে থাকে?” অরিজিৎ মা ও মেয়ের কথোপকথনে হাসে শুধু, আর নিজের ফোনে কি যেন দেখতে থাকে। ট্রেনটা যখন কোপাই নদীর ধারে একটু গতি কমালো ইন্দ্রানী দিঠি কে নদী দেখিয়ে বললো “মাম্মাম ঐদেখ…দিঠি নদীটি অবাক দৃষ্টিতে দেখতে দেখতে মাকে জিজ্ঞাসা করলো “মাম্মাম এটা কি পুকুর? ইন্দ্রানী দিঠিকে কোলের উপর টেনে বসাতে বসাতে বললো “না সোনা এটা কোপাই নদী ওই যে সেই কবিতাটা… আমাদের ছোটো নদী চলে আঁকে বাঁকে এটা সেই নদী। দিঠির চোখ চিক চিক করে ওঠে আর এক নাগাড়ে কবিতাটা বলতে শুরু কর…ওদের বিপরীত সিটে একটি অল্প বয়সি মেয়ে অনেকক্ষণ ধরেই মা ও মেয়ের কথোপকথন শুনছিলো আর মাঝে মাঝে হাসছিলো, সে দিঠিকে নিজের সিট থেকে উঠে এসে গাল টিপে বলে “বাবা… তোমার তো দেখছি পুরো কবিতাটাই দারুন ভাবে মুখস্ত”…দিঠি লজ্জা পেয়ে মায়ের বুকে মুখ গুঁজে দেয়। ইন্দ্রানী একটু হেসে মেয়েকে আরো নিবীড় করে কাছে টেনে নেয়। দেখতে দেখতে তারা বোলপুর স্টেশনে পৌঁছে যায়।

২য় পর্ব –

যে বাড়িটায় ইন্দ্রানীরা থাকে প্রতিবার সেখানেই এসেছে এবারও, এই বাড়িটা তাদের তিনজনেরই খুব প্রিয় , তাদের ভালো লাগার আর একটা কারণ হলো যতবার তারা এইখানে আসে এই বাড়িটাতে তারা একরাই থাকে। অন্য কেউ থাকেনা, বাড়ির মালিক থাকে গড়িয়াতে। একজন কেয়ারটেকার আর একজন আদিবাসী ভদ্রমহিলা রান্নাবান্না করার জন্য থাকে, রাতে ভদ্রমহিলা বাড়িতে চলে যান।যে কেয়ারটেকার সেই আবার এই বাড়ির সব গাছপালা দেখাশোনা করে। একটা খুব সুন্দর বাগান আছে বাড়ির সাথেই, বাড়ির পাশেই একটা বড়ো সায়োর আছে, আর অতিপুরোনো কিছু গাছ তাদের চারধার দিয়ে নেমে আসা ঝুরি। প্রহরীর মতো পাহারা দিচ্ছে এই গাছগুলো গোটা অঞ্চলটাকে, কত কিছুর সাক্ষী যে এই গাছ গুলো। অনেক রকমের পাখি বাসা করে আছে গাছ গুলোতে, জায়গাটা খুব নিরিবিলি শুধু পাখির ডাক পাওয়া যায়। বাড়ির পাশ দিয়ে এঁকে বেঁকে চলে গেছে লালমাটির পথ। যদি এই পথ দিয়ে কেউ হেঁটে যায় তার পায়ের শব্দ বহুদূর পর্যন্ত শোনা যায়, ছপ ছপ… কি যে ভালো লাগে ইন্দ্রানীর।তারা যে ঘরটায় থাকে তার জানলা দিয়ে ঐ পথটা অনেক দুর পর্যন্ত দেখা যায়। ঘরে ঢুকে জানলা খুলে সেদিকেই তাকিয়ে আছে ইন্দ্রানী, বাইরের উঠোনে বসার একটা জায়গা করা আছে সেখানেই বসে চা খাচ্ছে অরিজিৎ আর দিঠি উঠোনে খেলছে। দৌড়ে দৌড়ে তার বাবার কাছে এসে শিউলি ফুল রেখে যাচ্ছে আবার দৌড়ে ফুল কুঁড়াতে চলে যাচ্ছে। মেয়েকে ঘরে আসতে বলে অরিজিৎ ঘরের দিকে এগোতে শুরু করলো, দিঠি  বাবাকে পিছন থেকেও এসে জড়িয়ে ধরে বললো “বাবা একটু বসোনা এই ফুল গুলো পাহারা দাও না প্লিজ আমি আর একটু ফুল কুঁড়াই। অরিজিৎ মেয়ের কোথায় সম্মতি জানিয়ে খানিক ক্ষণ বসে একটা সিগারেট ধরালো।

ইন্দ্রানী জানলা দিয়ে তাকিয়ে থাকবার সময় দেখলো এই বাড়ির যে কেয়ারটেকার মাধব লাল আসছে সঙ্গে একটি ৮/৯বছরের বাচ্ছা ছেলে,  ছেলেটির পরনে একটা কালো হাফপ্যান্ট আর গায়ে কমলা রঙের একটা গেঞ্জি, কোমরে একটা গামছা বাঁধা তাতে আবার একটা বাঁশি গোজা। ছেলেটি মাথা নিচু করে মাধব লাল এর কথা শুনতে শুনতে আসছে আর সম্মতি সূচক মাথা নাড়াচ্ছে। মাধব লাল একটা খাটো ধুতি আর আদুল গা মাথায় একটা গামছা বাঁধা। জানলার দিকে তাকাতে ইন্দ্রানীর সঙ্গে মাধব লালের দৃষ্টি বিনিময় হয়…  ইন্দ্রানী আর মাধবলাল একে অপরকে দেখে হাসে। মাধবলালের সাথে ইন্দ্রানীদের যোগাযোগ অনেক দিনের, পরেশলাল এর বাবা মাধবলাল, পরেশলাল অরিজিতের পূর্ব পরিচিত, অরিজিৎ পেশায় একজন শিল্পী, তাই বহু আগে থেকেই তার শান্তিনিকেতন আসা যাওয়া কলাভবনে। তার কিছু বন্ধু এখন কলাভবনেরই প্রফেসর, আর পরেশলাল যখন কিশোর তখন অরিজিৎ আর তার বন্ধুদের সাথেই থাকতো পরেশ।  সারাদিন ওদের কার কি লাগবে কিছু দরকার কিনা তারই দেখাশোনার ভার থাকতো পরেশের উপর,  তার ফাঁকে ফাঁকে লেখা পড়াটাও চালিয়ে গিয়েছে। বিশ্বভারতীর হোস্টলের কিছু ছেলের পরেশকে ছাড়া চলতো না তখন, চা এনে দেওয়া,  অথবা বিড়ি সিগারেট সব সাপ্লাই দিতো পরেশ। খুশি হয়ে তাকে যে যা দিতো তাই হাসি মুখে নিতো সে। এইভাবে চলতে চলতে একদিন বিশ্বভারতিতেই পিওনের কাজ পায়, যদিও তাকে এই চাকরির জন্য ডি গ্রুপের পরীক্ষায় বসতে হয়েছিলো তাছাড়া পোরেশকে ইউনিভার্সিটিতে স্যারেরাও ভালোবাসতো,হাসি খুশি ছেলেটি  সবার মন জুগিয়ে চলতো, পড়াশুনাতে খুব খারাপ ছিলো না তাই চাকরি পেতে কোনো অসুবিধা হয়নি।

পরেশকে অরিজিৎ  খুব পছন্দ করে প্রথম থেকেই। কোলকাতা থেকে অরিজিতের আসার খবর পেলেই পরেশ দেখা করতে চলে আসে, কয়েক বছরের ছোটো পরেশ অরিজিতের থেকে। চাকরিটা পেলেই পরেশের বাড়িরলোক বিয়ের দেওয়ার জন্য উঠে পরে লাগলো, পরেশ প্রথমটায় বাঁধা দিলেও পরে আর না করেনি। গ্রামে খুব অল্প বয়সেই ছেলে /মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হতো, বর্তমানে যদিও পরিস্থিতি কিছুটা হলেও বদলেছে। পরেশের অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে গেলো পাশের গ্রামের মেয়ে ফুলমতির সঙ্গে। ফুলমতি দেখতেও ফুলের মতো মিষ্টি ছিলো, অরিজিৎ ও তার বন্ধুরা সবাই এসেছিলো পরেশলাল এর বিয়েতে। ইন্দ্রানী আসেনি কারণ তখন অরিজিতের সাথে তার বিয়েটা হয়েছিলোনা, যোগাযোগ যদিও ছিলো অনেক আগে থেকেই তবুও যেহেতু বিয়ে হয়নি তাই বিয়ের আগে একসাথে কোথাও রাত্রি যাপনে নিষেধাজ্ঞা ছিলো ইন্দ্রানীর পরিবার থেকে। তার এক বছরের মধ্যেই অরিজিৎ আর ইন্দ্রানী বিয়ের করে, তাদের বিয়েতেই ইন্দ্রানীর ফুলমতির সঙ্গে আলাপ হয়েছিলো। সদা হাস্য ফুলমতির সঙ্গে একদিনেই বেশ বন্ধুত্ব হয়েছিলো ইন্দ্রানীর, সহজ সরল মিষ্টি স্বভাবের ফুলমতি কত কি গল্প করেছিলো ইন্দ্রানীর সাথে। বিয়ের পর আরো দুই তিন দিন ছিলো পরেশ ও ফুলমতি,  একা হাতে তারা অনেক কাজও সামলেছিলো। চলে আসার সময় বলেও এসেছিলো -“দিদি তুই আর দাদা যাস কেনে আমাদিগের ঘোরটোতে…” কি মিষ্টি হাসি ছিলো ফুলমতির। বিয়ের কয়েক মাস পরে ইন্দ্রানীরা এসেছিলো ফুলমতির সঙ্গে দেখা করতে দারোন্দাতে। পরেশই ওদের নিয়ে এসেছিলো বোলপুর থেকে পরেশদের গ্রামে, তখন ফুলমতি ৭মাসের অন্তরসত্তা। কয়েকদিন খুব আনন্দে কেটেছিলো ওদের, খুব ভালো রান্না করতো ফুলমতি, ইন্দ্রানী তখন ৭মাসের সাধ খাইয়েছিল ফুলমতিকে। নিজের হাতে রেঁধে বেড়ে, সুন্দর করে সাজিয়ে ফুলমতির সাধ দেওয়া হয়েছিলো। ইন্দ্রানীর হাত দুটো ধরে ফুলমতি বলেছিলো-“তুই আর জনমে মোর নিজের কেউ ছিলি দিদি”, ইন্দ্রানী একটু হেসে বলেছিলো এই জন্মেও আমি তোমার নিজেরই লোক। শুনে ফুলমতি কেঁদে ফেলেছিলো ইন্দ্রানী তাকে বুকে জড়িয়ে বলেছিলো এই সময় কেউ কাঁদে না পাগলী। ইন্দ্রানীর চলে আসার দিন ফুলমতি ইন্দ্রানীকে বলেছিলো-“দিদি তুই আসবিক তো আমার খোকা দেখতে? ” ইন্দ্রানী ফুলমতিকে আস্বস্ত করে বলেছিলো -“অবশ্যই  আসবো তুমি সুস্থ থেকো”…

মেয়ের ডাকে হঠাৎ হুঁশ ফেরে ইন্দ্রানীর -“মাম্মাম চলো চলো দেখবে চলো একটা বন্ধু এসেছে… ” ইন্দ্রানীর হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো বাইরে।

৩য় পর্ব-

না ফুলমতিকে দেওয়া কথা তখন রাখতে পারেনি ইন্দ্রানী, বাড়ি ফেরার দুমাসের মধ্যেই অরিজিৎ গোয়াতে একটা প্রজেক্ট নিয়ে চলে যায়, আর ইন্দ্রানীকে সুন্দরবন চলে যেতে হয় তার চাকরীর সুবাদে। ইন্দ্রানী একজন সোশ্যাল ওয়ার্কার, সুন্দরবনেই তখন তার পোস্টিং হয়। যোগাযোগ ও করতে পারেনি তখন কারণ ইন্দ্রানী থাকতো প্রত্যন্ত গ্রামে, সেখানে ইলেক্ট্রিসিটি ছিলোনা। ইন্দ্রানীকে তিনদিন অন্তর সন্দেশখালিতে এসে ফোন আর ল্যাপটপে চার্জ দিতে হতো। তাছাড়া গ্রামের অতো ভিতরে নেটওয়ার্ক পাওয়া যেতোনা। অরিজিতের সঙ্গে ৩/৪দিন অন্তর কথা হতো সেই সময়, অরিজিতের থেকেই জানতে পেরেছিলো ফুলমতির খোকা হয়েছে কিন্তু ফুলমতির অবস্থা ভালো নয়। তিনদিন পর আবার খবর এসেছিলো ফুলমতিকে বাঁচানো যায়নি, পরেশের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিলো অরিজিতের ফোনে। সেইসময় টা পরেশ খুব ভেঙে পরেছিলো, অত্যাধিক রক্তক্ষরনের কারণেই মৃত্যু হয়েছিলো ফুলমতি। বেশ কিছুদিন ইন্দ্রানী খাওয়া দাওয়া ঘুম কিছুই করতে পারেনি, বারবার ফুলমতির সেই হাসি মুখটা মনে পরেছে আর ঠুকরে ঠুকরে কেঁদেছে।

বাইরে এসেই চমকে ওঠে ইন্দ্রানী, পরেশ আর ফুলমতির ছেলে, দেখতে অবিকল ফুলমতির মতো। সেই কাজল কালো চোখ, সেই গজ দাঁতের হাসি। এই প্রথম দেখছে ইন্দ্রানী তাকে। না তারপর থেকে যতবার এসেছে এই গ্রামে দেখা হয়নি ফুলমতির খোকার সাথে। ইন্দ্রানী নিজেও কখনো দেখতে চায়নি, কথা না রাখতে পারার কষ্ট কুঁড়ে কুঁড়ে খেয়েছে ইন্দ্রানীকে। এবারো ভাবেনি দেখা হবে, যতবার এসেছে খবর পেয়েছে মাধব লালের কাছ থেকে…খোকা কত বড়ো হলো কেমন আছে, ইত্যাদি। অরিজিতের সঙ্গে দেখা হয়েছে পরেশ লাল ও তার ছেলের বিশ্বভারতীতেই। সেখানেই আশ্রমে ভর্তি করেছে ছেলেকে আর ছেলেকে নিয়ে সে বিশ্বভারতীর কোয়ার্টারেই থাকে। অরিজিতের থেকেই খবর পেয়েছিলো খোকার স্কুলে ভর্তি হওয়ার কথা। দিঠি হাত ধরে টানতে টানতে বাইরে এনে মাকে বসিয়ে খোকার হাত ধরে ইন্দ্রানীর কাছে নিয়ে আসে। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইন্দ্রানী ও খোকা একে অপরের দিকে। দিঠি মায়ের কানে কানে এসে বলে “মা নাম জিজ্ঞাসা করো বন্ধুর” সম্বিৎ ফিরে পেয়ে একটু এগিয়ে গিয়ে ইন্দ্রানী জিজ্ঞাসা করে “নাম কি তোমার? “উল্টো দিক থেকে উত্তর আসে “শ্যামসুন্দর”…” বাঃ ভারী সুন্দর  নামতো তোমার… !কে রেখেছে এতো সুন্দর নাম?” শ্যাম কোনো জবাব দেয়না, আবার ইন্দ্রানী জিজ্ঞাসা করে”তোমার কোমরে ওটা কি মোহন বাঁশি বুঝি?” শ্যাম এবারো কোনো জবাব না দিয়ে শুধুই তাকিয়ে থাকে ইন্দ্রানীর দিকে, তারপর বলে এটা আমার বন্ধু,  আমার সবসময়ের সাথী। ইন্দ্রানী চট করে ঘরে গিয়ে একটা চকলেট নিয়ে এসে শ্যামের হাতে দিতে গেলে শ্যাম প্রথমটায় নিতে চাইনা, দিঠি মায়ের হাত থেকে চকলেট টা নিয়ে শ্যামের হাতে ধরিয়ে দেয়। ইন্দ্রানী শ্যাম কে বলে “একদিন আমায় শোনাবে তোমার বন্ধুর আওয়াজ?”শ্যাম শুধু মাথা নাড়ায়।
মাধবলাল কাছে এসে বলে আর বলোনা বৌমা এখানে এলেই সারাদিন বাঁশি কোমরে গুঁজে ঘুরছে, নয়তো কোনো গাছের তলায় বসে বাঁশি বাজাচ্ছে নয়তো বা মাটি দিয়ে কিছু না কিছু বানাচ্ছে। ইন্দ্রানী মাধবলালের কোথায় একটু হেসে বলে “তাই নাকি শ্যাম!!তুমি মাটির জিনিসও বানাতে পারো!!! আমায় দেখিয়তো… ” শ্যাম সম্মতি সূচক মাথা নাড়ায়। দিঠি শ্যামের হাত ধরে বলে “বন্ধু খেলবে? ” শ্যাম হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে… “না আমার খেলতে ভালো লাগেনা। দিঠি ঠোঁট ফুলিয়ে বাবার কোলে গিয়ে বসে, মাধবলাল ইন্দ্রানীদের স্নান সেরে খেয়ে বিশ্রাম নিতে বলে শ্যামকে নিয়ে চলে যায়। অরিজিৎ মেয়েকে কোলে নিয়ে ঘরে ঢোকে, ইন্দ্রানী মাধব আর শ্যামের চলে যাওয়া দেখতে থাকে।

৪র্থ পর্ব –
দিঠিকে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে নিজে খেতে বসে ইন্দ্রানী, অরিজিতের খাওয়া হয়েগিয়েছে, সে বারান্দায় বসে একটা সিগারেট ধরায়। কুসুম ইন্দ্রানীকে খাবার পরিবেশন করেছে, ইন্দ্রানী বলে “কুসুমদি তুমিও খেয়ে নাও না আমার সাথে বসে,” শুনে কুসুম একটু লাজুক হাসি হেসে বলে “না না ঠিক আছে বৌদি।” অরিজিৎ ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলে “উফ কুসুমদি দারুন রান্না করেছিলো আজ প্রতিটা রান্না অসাধারণ।” ইন্দ্রানী অরিজিতের কথায় সম্মতি জানায়। কুসুমকে আবার খেতে বসতে বলে ইন্দ্রানী তারপর একথায় সেকথায় শ্যামের কথা জিজ্ঞাসা করে “শ্যাম কি সবসময় এরকম চুপচাপই থাকে কুসুমদি?” বৌদি আমাদের গ্রামের আর পাঁচটা বাচ্ছার মতো নয় শ্যাম…একটু চুপচাপ সারাদিন নিজের মনে থাকে, সামনের ঐ বট গাছটার তলায় বসে বাঁশি বাজায় নাহলে উঠোনের ওইপাশে যে চালাটা করা আছে সেখানে বসে মাটি দিয়ে কতকি গড়ে… ইন্দ্রানী একটু উদাস হয়ে বলে “ওর মা খুব ভালো ছিলো, হাসি খুশি খুব ভালোবাসতো আমায় কিন্তু ওর আসল সময় আমি থাকতে পারলামনা… ইন্দ্রানীর চোখ ছল ছল করে ওঠে, খাওয়া শেষ করে উঠে পরে। “বৌদি সেই কোন সকালে বেরিয়েছো যাও এখন গিয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে নাও বলে নিজে খেতে বসে কুসুম…।

ইন্দ্রানী ঘরে ঢুকে দেখে মেয়ে অঘোরে ঘুমাচ্ছে… জানলার পাশে এসে দাঁড়ায়, আজ তার খুব ফুলমতির মুখটা মনে পরছে… অবিকল এক রকম দেখতে ফুলমতির খোকাকে, সেই চোখ… সেই নাক… ভুরু এতো মিল!!!দিঠির মুখতো বাবা মা মিলিয়ে, এসব কথা ভাবতে ভাবতে বিছানায় এসে বসে ইন্দ্রানী।  অরিজিৎ ইন্দ্রানীর হাত টা টেনে নিজের কাছে নিয়ে আসে…ইন্দ্রানী একটু বিরক্তির সুরে “উফঃ কি করছো মেয়ে জেগে যাবে”, অরিজিৎ আরো কাছে এসে…”এখন মেয়ে জাগবেনা এতো ভোরে উঠেছে”, ইন্দ্রানী ঈষৎ ধাক্কা দিয়ে-“না অরি ছেলেমানুষি করোনা…”  বাঁধা পেয়ে অরিজিৎ পাশ ফিরে শোয়…।  ইন্দ্রানী খানিক ক্ষণ শুয়ে থেকে বারান্দায় এসে বসে, বাইরে কুসুমদি হাঁসেদের খেতে দিচ্ছে। এইবাড়িতে তিনটি রাজঁহাস আর পাঁচটা পাতিহাঁস রয়েছে, বাইরে উঠোনে মাধবলাল গাছেদের জল দিচ্ছে। দুর থেকে বাঁশির আওয়াজ ভেসে আসতেই ইন্দ্রানী বেড়িয়ে আসে উঠোনে, উঠোন থেকে একটু এগিয়ে মোরামের পথ ধরে বাঁশির আওয়াজ অনুসরণ করে এগোতেই সামনের বটগাছের তলায় শ্যামকে দেখতে পায়। শ্যাম বাঁশিতে সুর ধরেছে, কি করুন সে সুর… ইন্দ্রানী একটু একটু করে এগিয়ে আসে শ্যামের দিকে… কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে বাঁশি শুনতে থাকে। শ্যাম হঠাৎ বাঁশি থামিয়ে দুটো হাঁটুর উপর হাত রেখে মাথা নিচু করে বসে থাকে…শ্যামকে এমন বসে থাকতে দেখে  ইন্দ্রানীর বুকের ভিতরটা মুচড়ে ওঠে, সে এগিয়ে এসে পাশে বসে শ্যামের মাথায় হাত রাখতেই শ্যাম চোখের জলটা মুছে ইন্দ্রানীর দিকে তাকায়…ইন্দ্রানী শ্যামের মাথায় হাত বলাতে বলাতে -“কি হয়েছে শ্যাম? পুজোরদিনে কাঁদে কেউ!শ্যাম কিছুক্ষন চুপ করে থেকে তারপর ইন্দ্রানীকে জিজ্ঞাসা করে “তুমি আমার মা কে দেখেছো কোনোদিন? দেখেছিতো…কেমন দেখতে ছিলো মা? তোমার মতো? ইন্দ্রানী একটু হেসে বলে-“একদম তোমার মতো খুব মিষ্টি”…শ্যাম চোখ গুলোকে বড়ো বড়ো করে…তাই সত্যি!!ইন্দ্রানী সম্মতি সূচক মাথা নাড়ায়… দুজনেই চুপ শ্যাম নীরবতা ভেঙে-“জানো আমি দেখিনি, বাবার কাছে একটা ছবি আছে তবে বোঝা যায়না…বাবার পয়সার  ব্যাগে থাকতে থাকতে নষ্ট হয়ে গেছে”…শ্যামের দিকে করুন হয়ে তাকিয়ে ইন্দ্রানী বলে “আচ্ছা আমার কাছে ছবি আছে আমি তোমায় দেখাবো”…এখন আছে? মোবাইলে থাকতে পারে দেখতে হবে…তবে আমার বাড়িতে আছে আমার বিয়ের অ্যালবামে…আমি আবার যখন আসবো নিয়ে আসবো কেমন…মুখটা বেজার করে শ্যাম বলে “আচ্ছা…আনবে তো?” ইন্দ্রানী শ্যামের চুলটা একটু ঘেটে দিয়ে নিশ্চই আনবো সোনা…আবার দুজনের চুপ…শ্যাম বলে ভুলে যাবে নাতো? না না কখনোই না, আচ্ছা শ্যাম তুমি খেলা ধুলা করোনা কেন ঐ যে ঐ বাচ্ছা গুলো যেমন খেলছে…!! শ্যাম গম্ভীর হয়ে বলে -“না ওরা সবাই আমাকে বলে আমি নাকি আমার মা কে মেরে ফেলেছি…তাই আর ওদের সাথে মিশিনা… আমি কি সত্যি আমার মা কে মেরে ফেলেছি!!!না না কে বললো!!!তোমার মায়ের খুব অসুখ করেছিল  তাছাড়া ঈশ্বরের ভালো মানুষদের প্রয়োজন কিছু বিশেষ কাজের জন্য তাই তোমার মাকে নিয়ে গেছেন…। শ্যাম অবাক হয়ে ইন্দ্রানীর কথা গুলো শুনে ঈষৎ হেসে…তাই সত্যি!!!ইন্দ্রানী সম্মতি সূচক মাথা নাড়ালো, তারপর শামকে জিজ্ঞাসা করলো তুমি পুজো প্যান্ডেলে যাওনা? না ভালো লাগেনা, সবাই মা এর সাথে নতুন জমা পরে যায়, আমার তো মা নেই তাই ভালো লাগেনা। ইন্দ্রানী গলার কাছে একটা দলা পাকা কান্না উঠে আসে সেটাকে সামলে নিয়ে শ্যাম কে বলে “আচ্ছা কাল তো অষ্টমী তুমি কাল সকালে স্নান করে নতুন জামা পরে তৈরী হয়ে চলে এসো আমি আর তুমি কাল প্যান্ডেলে গিয়ে অঞ্জলি দেবো…শ্যাম  গোল গোল চোখ পাকিয়ে বলে “তাই সত্যি…!!!” ইন্দ্রানী হেসে ওকে কাছে টেনে নিয়ে বলে “সত্যি সত্যি সত্যি”…তারপর দুজনের হাত ধরে বট গাছতলা থেকে বাড়ির দিকে এগোয়।

মেয়ে ঘুমানোর পরে খাওয়া শেষ করে অরিজিৎ রেড ওয়াইনের বোতলটা নিয়ে বারান্দায় এসে বসলো। ইন্দ্রানী আগে থেকেই বসে ফোনে কি যেন খুঁজছে। ইন্দ্রানীর হাতে একটা গ্লাস দিয়ে নিজে একটা নিলো অরিজিৎ, ফোন থেকে চোখ সড়িয়ে রেড ওয়াইনটার দিকে তাকিয়ে হেসে বললো  তুমি এনোছো!আমি তো ভাবলাম ভুলে গিয়েছো  হয়তো…অরিজিৎ বিজয়ের হাসি হেসে…ভুললে হয়, আমার সাতটা না পাঁচটা না একটা বৌ একটু রেড ওয়াইন খেতে ভালোবাসে…ইন্দ্রানী আর কোনো কথা না বলে এক চুমুক দিয়ে ফোনে মনোনিবেশ করলো। তারপর উচ্ছাস প্রকাশ করে বললো “এই তো পেয়েছি…”অরিজিৎ চমকে উঠে কি!কি পেয়েছো? এই যে ফলমতির একটা ছবি…কেন কি হবে? শ্যাম কে দেখাবো ও দেখতে চেয়েছে… অরিজিৎ কোন  কথা বলেনা, সে জানে এখন কিছু বললেও কিছুই  লাভ হবেনা…তার ইন্দু বরাবর একটু আবেগ প্রবন, যখন যেটা ভাবে সেটাই করে। খানিক ক্ষণ বসে থেকে ইন্দ্রানী অরিজিৎ কে বলে “অরি আমি ঘুমাতে গেলাম কাল সকাল সকাল উঠতে হবে কাজ আছে”। ঘরে ঢুকে পোশাক বদলে শুতে চলে যায় ইন্দ্রানী, তার কিছুক্ষন পর অরিজিৎ এসে শুয়ে পরে। অরিজিৎ শুলে ইন্দ্রানী অরিজিতের বুকে মাথা রাখে…অরিজিৎ ইন্দ্রানীর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে “ইন্দু ও ইন্দু…” ইন্দ্রানী চোখ বন্ধ করে উত্তর দেয়…হুম…
-কি হয়েছে তোমার? তুমি কি ফুলমতিকে দেওয়া কথা না রাখতে পারার জন্য আজও কষ্ট পাচ্ছ?
ইন্দ্রানী চুপ করেই থাকে…
-কষ্ট পাওয়াটা কি ঠিক? তুমিতো ইচ্ছা করে কিছু করোনি…ওটা তো পরিস্তিতিটাই তখন অন্যরকম ছিলো…
-অরি আমি জানিনা কেন মনে হয় ঐ সময়টা আমাকে ফুলমতির হয়তো খুব প্রয়োজন ছিলো…আমি থাকলে হয়তো ওর লেবার পেন ওঠা মাত্র হসপিটালে নিয়ে যেতে পারতাম…
-দুর পাগলী,  ওদের গ্রামে সব মহিলারাই বাড়িতেই সন্তানের জন্ম দেয়…ফুলমতির বেলাতেও সেটাই হয়েছে…তাছাড়া পরেশতো ছিলো ওর কাছে!
-না অরি আমি থাকলে পরেশকে বোঝালে ওর সন্তানটা হসপিটালেই হতো, আর ফুলমতি বেঁচেও থাকতো, শ্যামকেও এখন এতো কষ্ট পেতে হতোনা…কথা শেষ করে অরিজিৎকে আঁকড়ে ধরে ইন্দ্রানী…অরিজিতের বুকের মধ্যে মুখটা গুঁজে নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে…অরিজিৎও আরো নিবিড় করে ধরে ইন্দ্রানীকে।

৫ম পর্ব-
স্বপ্ন দেখে চমকে উঠে ঘুম ভাঙলো ইন্দ্রানীর, পুরো শরীর ঘামে ভিজে গেছে, বাইরে আলো ফুটেছে, পাখিদের কিচির মিচির আর হাঁসেদের প্যাক প্যাক শোনা যাচ্ছে। দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকাতে দেখলো সাড়ে ছটা বাজে, বিছানা ছেড়ে উঠে বারান্দায় এসে দেখলো কুসুমদি হাঁসেদের ঘর থেকে বার করছে আর মাধব কাকা গাছে জল দিচ্ছে। ইন্দ্রানীকে দেখে কুসুম জিজ্ঞাসা করলো-“বৌদি চা দেবো?? ইন্দ্রানী সম্মতি সূচক মাথা নাড়ালো, কুসুম চা করতে গেলো। ইন্দ্রানী বারান্দা থেকে নেমে উঠোনে শিউলি তলায় এসে দাঁড়ালো, মাটিতে কত ফুল পরে, ফুলের গন্ধে ভরে গিয়েছে সারা বাড়ি…কুসুম চা নিয়ে এসে ইন্দ্রানীর হাতে দিয়ে রান্না ঘরের দিকে চলে গেলো। চা টা শেষ করে রান্না ঘরে এসে কুসুমের হাতে কাপটা দিয়ে ইন্দ্রানী বললো -“কুসুমদি শ্যাম আসলে বসতে বলো আমি স্নান সেরে তৈরী হয়ে আসি।
আজ দুর্গা অষ্টমী, গ্রামের পুজো প্যান্ডেল থেকে ঢাকের আওয়াজ ভেসে আসছে। ইন্দ্রানী তৈরী হতে গেলো, এরমধ্যেই শ্যাম এসে ইন্দ্রানীকে খুঁজতে লাগলো…কুসুম রান্না ঘর থেকে শ্যামকে দেখতে পেয়ে বেড়িয়ে এসে…”বাঃ শ্যাম তোকে তো রাজপুত্তরের মতো লাগছে… তুই এই বারান্দায় বোস বৌদি তৈরী হয়ে আসছে…”

খানিকক্ষণের মধ্যেই ইন্দ্রানী তৈরী হয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে এলো, লাল পেড়ে সাদা শাড়ি, চুলটা নিচু করে খোঁপা বাধা, সিঁথিতে সিঁদুর, কপালে লাল টিপ, সাথে মানানসই অক্সিডাইসের গয়না, চোখে স্ম্যাচ করে কাজল পরা ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক। বারান্দায় এসেই দেখলো শ্যাম তার জন্যই অপেক্ষা করেছে, তার পরনে হলুদ পাঞ্জাবী আর সাদা পায়জামা.. পাট পাট করে চুল আঁচড়ানো…ভারী মিষ্টি লাগছে। ইন্দ্রানীকে দেখে শ্যাম দাঁড়িয়ে পড়ল, চোখ দুটো বড়ো বড়ো করে কি যেন দেখছে এক দৃষ্টে ইন্দ্রানীর দিকে… ইন্দ্রানী চোখ বড়ো বড়ো করে ভুরু তুলে ঈষৎ হেসে বললো “কি হলো? ” শ্যাম একটু হেসে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বললো..”কিছুনা”। ইন্দ্রানীর আওয়াজ পেয়ে কুসুম রান্না ঘর থেকে বেড়িয়ে ইন্দ্রানীকে দেখে বললো “বৌদি তোমাকে তো পুরো দুগ্গা মা লাগছে”। ইন্দ্রানী হেসে বললো “কুসুমদি দাদা উঠলে বলো আমি প্যান্ডেলে গিয়েছি অঞ্জলি দিতে”, শ্যামকে নিয়ে হাত ধরে প্যান্ডেলের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো…প্যান্ডেলে তখন অঞ্জলির তোড়জোড় হচ্ছে, শ্যামের সঙ্গে ইন্দ্রানীকে দেখে অনেকেই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলো…ওদের দেখে পরেশলাল এগিয়ে আসলো…ইন্দ্রানী-“পরেশ দাদা দেখা করতে বলেছে কাকা বলেননি?
…হ্যাঁ বৌদি আমি কাল রাতে শুনেছি আপনারা কাল সকালে এসেছেন, যদিও দাদা আগেই বলেছিলেন ফোন করে আপনারা আসবেন, আমি দাদাকে ফোন করে কথা বলেছি, আজ যাবো একটু বেলা হলে, তারপর দাদাকে নিয়ে বেড়োবো।
-আচ্ছা…ইতিমধ্যে শ্যাম ইন্দ্রানীর ও নিজের দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করে ইন্দ্রানীর হাত ধরে নিয়ে যেতে আসে। ইন্দ্রানী পরেশকে বলে “তোমার সাথে আমারো কিছু কথা আছে এই দুদিন শ্যাম আমার কাছেই থাকবে…” পরেশ হাসি মুখে মাথা নাড়ায়, ইন্দ্রানী শ্যামকে নিয়ে অঞ্জলি দিতে দাঁড়ায়…

ইন্দ্রানী শ্যামকে নিয়ে বাড়ি ফেরে, ততক্ষণে অরিজিৎ উঠে বারান্দায় বসে চা খাচ্ছে, ইন্দ্রানীকে দেখে অরিজিৎ এক দৃষ্টে তাকিয়ে থেকে বলে “দিব্য লাগছে কিন্তু তোমায়…” তারপর শ্যামের দিকে নজর যেতেই বলে “ওরে বাবা সঙ্গে দেখি কার্তিককেও নিয়ে এসেছো…”ইন্দ্রানী মৃদু হেসে -“মাম্মাম ওঠেনি? ”
-না সে এখনো ঘুমের দেশে…
শ্যামকে বসতে বলে ঘরে মেয়ের ঘুম ভাঙাতে চলে যায় ইন্দ্রানী, মেয়েকে ঘুম থেকে তুলে পোশাক বদলিয়ে, মুখ ধুইয়ে বাইরে এনে দেখে শ্যাম বারান্দায় নেই। অরিজিৎকে জিজ্ঞাসা করতে অরিজিৎ ফোন দেখতে দেখতে আঙ্গুল তুলে বাইরের দিকে দেখালো, দিঠিকে খাওয়ার টেবিলে বসিয়ে শ্যামকে ডাকতে গিয়ে দেখলো ও শিউলি ফুল কুঁড়াছে… ইন্দ্রানী শ্যামকে ডাকতেই শ্যাম দুহাত ভর্তি করে ফুল নিয়ে ইন্দ্রানীর দিকে এগিয়ে আসলো। হালকা ধমকের সুরে -“এখন আবার ফুলে হাত দিলি বাবা…হাত ধুয়ে দিঠির সঙ্গে খেতে বসবি আয়…” শ্যামকে ডেকে বারান্দায় চলে এলো ইন্দ্রানী, শ্যাম দুহাত ভর্তি ফুল নিয়ে ইন্দ্রানীর পায়ের উপর দিতেই ইন্দ্রানী দুপা পিছিয়ে…”এটা কি করলি শ্যাম !!!”
-কেন আমার দুগ্গা মা কে অঞ্জলি দিলাম….
ইন্দ্রানীর চোখের কোনটা চিক চিক করে উঠলো…অরিজিৎ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো… ইন্দ্রানী শ্যামকে বুকে টেনে নিলো….

বাকি দুটোদিন ভালোই কাটলো ওদের…ইন্দ্রানী, অরিজিৎ, দিঠি আর শ্যাম একদিন ঘুরতেও বেরিয়েছিল সঙ্গে অবশ্য পরেশ ছিলো। একদিন আবার সামনের সায়রে ছিপ দিয়ে মাছও ধরেছে অরিজিৎ পরেশ আর শ্যাম মিলে… ইন্দ্রানী আর দিঠি ছাদের উপর থেকে দেখেছে, শ্যাম যতবার মাছ ধরেছে ততবার দুগ্গামা এই দেখো বলে দেখিয়েছে ইন্দ্রানীকে, ভারী মজা লেগেছে ইন্দ্রানীর। এরমধ্যে পরেশ অরিজিৎ কে নিয়ে কাছেই একটা জমি দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলো। অরিজিৎ আর ইন্দ্রানীর অনেক দিনের স্বপ্ন বীরভূমে একটা বাড়ির…কথাবার্তা মোটামুটি হয়েছে দ্বিতীয়বার গিয়ে ফাইনাল করবে সব ওরা। শ্যাম ইন্দ্রানীর ফোনে ফুলমতির ছবি দেখেছে, ইন্দ্রানী তাকে কথা দিয়েছে একটা ছবি ডেভলপ করে দেবে। দিঠিকে অনেক মাটির পুতুল বানিয়ে দিয়েছে শ্যাম, বাঁশি বাজিয়েও শুনিয়েছে। এই বয়সেই খুব সুন্দর বাঁশি বাজায় শ্যাম, মাধবলালের কাছ থেকে শিখেছে। মাধবলাল কে বুড়া বলে ডাকে শ্যাম, তার দেখাদেখি দিঠিও তাই বলে ডাকছে মাধব কাকাকে। শ্যাম তার দুগ্গামা কে কথা দিয়েছে মন দিয়ে লেখাপড়া করবে, আশ্রমে ভালোভাবে থাকবে… দিনে একবার পরেশের ফোনে ফোন করে কথা বলবে ওর সাথে ইন্দ্রানী… শ্যাম এটাও কথা দিয়েছে আর ও মন খারাপ করে থাকবে না…সব সময় হাসি খুশি থাকবে। লেখাপড়ার সাথে সাথে  বাঁশিটাও মন দিয়ে বাজাবে। আসার আগের দিনে অনেক রাত পর্যন্ত শ্যাম ইন্দ্রানীর সাথে ছিলো, অনেক আদর খেয়ে, দিঠির সাথে খেলা করে তবে বাড়ি ফিরেছে।

পরদিন ভোরে ইন্দ্রানীরা বেড়িয়ে যাবে বলে সব তৈরী হচ্ছে… অরিজিৎ পরেশকে আগেই গাড়ির কথা বলেছিলো গাড়ি চলে এসেছে…সব ব্যাগ গাড়িতে উঠিয়ে পরেশ অরিজিতের সাথে কথা বলছে। ইন্দ্রানী আর দিঠি তৈরী হয়ে কুসুমদি আর মাধব কাকার সাথে দেখা করে গাড়ির কাছে এসে পরেশকে শ্যামের কথা জিজ্ঞাসা করলো…
পরেশ—“উঠেছেতো অনেকক্ষণ কোথাও আছে কাছে পিঠে…বৌদি আপনারা গাড়িতে উঠুন নাহলে দেরী হয়ে যাবে…”
ইন্দ্রানী এদিক ওদিক চেয়ে শ্যামকে না দেখতে পেয়ে গাড়িতে গিয়ে উঠলো। গাড়ি চলতে শুরু করেছে, ইন্দ্রানী গাড়ির বাইরে শামকে খুঁজতে থাকলো…হঠাৎ লুকিং গ্লাস দিয়ে শ্যামকে দেখতে পেয়ে গাড়ি থামাতে বললো। গাড়ি থেকে নেমে শ্যামের দিকে ফিরে দুহাত বাড়িয়ে দিলো.শ্যাম ছুটে এসে দুহাতে ইন্দ্রানীকে জড়িয়ে ধরলো, দুচোখ তার জলে ভরা। ইন্দ্রানী চোখ দুটো মুছিয়ে দিতে দিতে -“রোজ কথা বলবো, মাঝে মাঝে আসবো, এমন করে কাঁদলে আমার কষ্ট হয়না বল??? শ্যাম চুপ করে থেকে খানিকপরে বলে-“আমায় কিন্তু ভুলে যেয়োনা দুগ্গামা। ” ইন্দ্রানী শ্যামের মাথায় একটা চুমু খেয়ে -“কখনোই না…আজ আসি??? ” শ্যাম হাসি মুখে বিদায় দেয়…।

৬ষ্ঠ পর্ব –
সময় কারো জন্য থেমে থাকেনা তেমনি জীবনটাও সময়য়ের মতো গতিশীল, অরিজিৎ আর ইন্দ্রানীর জীবনেও তাই ঘটলো।সময় আর জীবন এগিয়ে চললো তার নিজের লহমায়। দিঠি আর শ্যামও সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেড়ে উঠলো, এই ১৪বছরে অরিজিৎ আর ইন্দ্রানী বীরভূমে নিজেদের একটা বাড়ি করেছে, সঙ্গে বাগান, একটা সিরামিক্স এর ওয়ার্কশপ আর অরিজিতের নিজস্ব একটা স্টুডিও। ইন্দ্রানী শ্যামের দেওয়া কথা রেখে প্রতিদিন শ্যামকে ফোন করেছে, মাঝে মাঝে গিয়ে থেকেছে,  তবে ইন্দ্রানীর থেকে অরিজিৎ বেশী সময় বীরভূমে কাটিয়েছে। ইন্দ্রানীকে দিঠির পড়াশুনার জন্য কলকাতাতেই থাকতে হয়েছে। বছরে একবার করে যেত। দূর্গা পুজোতে প্রীতি বছর যাওয়া হয়নি ইন্দ্রানীর কারণ দিঠি বড়ো হওয়ার পর সে কলকাতার পুজো আর বন্ধুদের ছেড়ে যেতে চাইতোনা।

শ্যাম কলাভবন থেকে ফাইন আর্টস নিয়ে ব্যাচেলার ডিগ্রি পাস করে আবার মাস্টার্ড করতে কলাভবনেই ভর্তি হয়েছে। দিঠি উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে কলাভবনেই ফাইন আর্টস নিয়ে ব্যাচেলার ডিগ্রি করতে ভর্তি হয়েছে। কলকাতা থেকে ইন্দ্রানী এখন বীরভূমেই থাকে কারণ অরিজিৎ অনেকদিন ধরেই বীরভূমে, আর এখন দিঠিও পড়াশুনার জন্য বীরভূমে থাকতে শুরু করছে। ওদের বীরভূমের বাড়িটা পরেশ আর মাধব কাকা দাঁড়িয়ে থেকে তৈরী করিয়েছে, মাঝেমধ্যে অরিজিৎ আসতো তখন। এই বাড়ির বাগানটাও মাধব কাকার হাতে গড়া, সুন্দর সুন্দর ফুলের গাছ সব ইন্দ্রানীর পছন্দের মতো-চাঁপা ফুলের গাছ, রক্তকরবী, জুঁই, বেল, শিউলি, ছাতিম, বকুল ইত্যাদি সঙ্গে নারকেল, তাল, কামরাঙ্গা…এই সমস্ত গাছ মাধব কাকার হাতের যত্নে বড়ো হওয়া, ভারী সুন্দর দেখতে লাগে বাড়িটা।

শ্যাম স্কলারশিপ নিয়ে ব্যাচেলার ডিগ্রি শেষ করেছে, বিশ্বভারতীতে শ্যামের মতো স্টুডেন্ট খুব কমই আছে। হাতের কাজ খুব নিপুন, সকল প্রফেসর শ্যামকে খুব স্নেহ করেন। কেউ কেউ তো আবার শ্যামকে স্বরস্বতীর বর পুত্র বলে আখ্যায়িত করেছে। এতো গুন তবু যেন মাটির মানুষ শ্যাম। দিঠি সদ্য ইউনিভার্সিটিতে ঢুকেছে, তার ভালোই লাগছে ক্লাস করতে, প্রথম প্রথম একটু ভয়ে ভয়ে ছিলো কিন্তু এখন সবার সাথে বেশ মিশে গিয়েছে। শ্যাম ওকে অনেকটা সাহায্য করেছে প্রথম দিকে, সব প্রফেসরদের সাথে আলাপ করিয়েছে, তাছাড়া অরিজিতের কিছু বন্ধু প্রফেসর তাই অসুবিধা খুব একটা হচ্ছেনা দিঠির, তাছাড়া কিছু বন্ধু হয়েছে দিঠির তাদের মধ্যে কিছু আবার কলকাতা থেকেও গিয়েছে যারা দিঠির পূর্ব পরিচিত, সব মিলিয়ে ভালোই লাগছে। প্রতিদিন সকালে শ্যাম এবং দিঠি একসাথেই ইউনিভার্সিটিতে ঢোকে। শ্যাম দিঠিদের বাড়িতেই থাকে, স্টুডিওর পাশে একটা ঘর আর বাথরুম করে দেওয়া হয়েছে শ্যামের জন্য, পুরো পাকাপাকি ব্যবস্থা। এতো বছর পর ইন্দ্রানী শ্যামকে কাছে পেয়ে আর কাছ ছাড়া করতে চায়নি। তাছাড়া অরিজিতের কাজেও বেশ খানিকটা সাহায্য করে শ্যাম। প্রথম প্রথম অরিজিতের আপত্তি থাকলেও ইন্দ্রানীর স্নেহ ও মমতার কাছে তাঁকে হার মানতে হয়েছে। মাধব কাকা, কুসুমদি সবাই এখন ইন্দ্রানীর বাড়িতেই কাজ করে। সব মিলিয়ে ভালোই আছে ইন্দ্রানী, ঠিক যেমনটা স্বপ্ন দেখতো তা সব যেন মিলে গিয়েছে ইন্দ্রানীর জীবনের সাথে। এই সবটা হয়েছে অরিজিতের জন্যই, অরিজিৎ ইন্দ্রানীকে খুব ভালোবাসে, তাই তার কোন কথাই ফেলতে পারেনা।ইন্দ্রানী মনে মনে অরিজিৎকে ধন্যবাদ দেয়,অরিজিৎও জানে তার ইন্দু না থাকলে এসব কিছুই হতোনা।আসলে ওরা একে অপরের পরিপূরক।

প্রথম ক্লাসটা শেষ করে ক্যান্টিনে বসে চা খাচ্ছিলো শ্যাম, কিছুক্ষন পর দিঠিও দিঠির বন্ধুদের সঙ্গে ঢুকলো, শ্যাম দেখেও যেন না দেখার ভান করলো দিঠিকে।শ্যামের এই ব্যবহারটা একদম ভালো লাগেনা দিঠির, কিন্তু মুখে কিছু বলেনা দিঠি, শ্যাম কেন জানিনা সবসময় কেমন একটা অহংকার দেখায় দিঠিকে, যাইহোক ও ওর বন্ধুদের সাথে কথা বলতে থাকে, শ্যামের যে দিঠিকে ভালো লাগে সেটা কখনোই বুঝতে দিতে চায়না শ্যাম, কিন্তু দিঠিকে দেখলেই হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় শ্যামের।দিঠিকে দেখতে শ্যামের দুগ্গা মার মতোই লাগে, কিছুই সাজেনা শুধু বড়ো বড়ো টানা টানা চোখে স্ম্যাচ করা কাজল, আর কেন জানি দিঠির গায়ের গন্ধটা মাতাল করে দেয় শ্যামকে। বিপরীত দিকে দিঠিরও এক অবস্থা,   শ্যামকে দেখলেই জোরে জোরে নিশ্বাস পরা শুরু হয়ে যায়, ৬ফুটের শ্যামকে দেখলে দক্ষিণী হিরোদের মতো মনে হয়, ব্যাক ব্রাশ করা চুল, গজ দাঁতের হাসি দিঠির যেন কেমন পাগল পাগল লাগে। সুঠাম গড়ন শ্যামের, আর সব থেকে ভালো লাগে শ্যাম বেশী ভাগ সময় পাঞ্জাবী পরে, কিন্তু দিঠিও কিছু বুঝতে দিতে চায়না। ওরা একই সঙ্গে যাওয়া আসা করে, একই বাড়িতে থাকে তবু যেন কত দূরত্ব দুজনের মধ্যে। শ্যাম যখন বাঁশি বাজায় দিঠির মনের ভিতরটা উথাল পাথাল করে। এই ভাবেই অব্যাক্ত প্রেম চলতে থাকে দুজনের মনে, কেউ কিছু বলেনা এমনকি বেশী কথাও বলেনা দুজন দুজনের সাথে। দিঠি মাঝেমধ্যে যদিও কথা বলার চেষ্টা করে কিন্তু শ্যাম এড়িয়ে যায়, দিঠি মনে খুব কষ্ট পেলেও মুখে কিছু বলেনা।

এর মধ্যে এক রবিবার ইন্দ্রানী আর অরিজিৎ বোলপুর গিয়েছে অরিজিতের এক বন্ধুর বাড়িতে,  দিঠিকেও বলেছিলো কিন্তু দিঠি যায়নি। বাড়িতে কুসুম, মাধব কাকা, দিঠি, আর শ্যাম ছিলো। কুসুমকে রাতের রান্না আর সন্ধ্যের জলখাবার করতে বলে ইন্দ্রানীরা বেড়িয়েছে, সন্ধ্যা সন্ধ্যা নাগাদ ঝড় উঠেছে, দিঠি  ঘরে বসে ল্যাপটপে কিছু কাজ করছিলো, কুসুম রান্না ঘরে, মাধব কাকা উঠোনে বসে হুকা খাচ্ছিলো, আর শ্যাম স্টুডিওতে বসে কাজ করছিলো। শ্যামের কাজ শেষ হতেই বাঁশিটা নিয়ে স্টুডিওতেই বাজাতে শুরু করেছে…”ভালোবাসি ভালোবাসি” গানটা… দিঠির কানে সেই বাঁশি সুর যেতেই ও নিজের ঘরের থেকে বেড়িয়ে স্টুডিওতে এসে ঢুকেছে, শ্যাম দিঠিকে খেয়াল করেনি, দিঠি জানলার ধারে বৃষ্টি দেখতে দেখতে শ্যামের বাঁশি শুনছে, হঠাৎ দিঠিকে দেখতে পেয়ে বাঁশি থামিয়ে দিয়েছে শ্যাম, দিঠি চোখ বন্ধ করে জানলার বাইরে হাত দিয়ে বৃষ্টির জল লাগছিলো হাতে, বাঁশি থেমে যেতেই চোখ খুলে শ্যামের দিকে তাকাতেই দেখলো শ্যামও ওর দিকেই অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, অস্ফুট স্বরে-থামলে কেন!!!ভালো লাগছিলো শুনতে। শ্যাম নিজেকে সামলে নিয়ে-তুই এখানে কি করছিস!!!তুমিই তো আমায় ডেকে আনলে, তোমার বাঁশি আমায় ঘরে থাকতে দিলো কই! টেনে আনলো তোমার কাছে…শ্যাম একটু গম্ভীর হয়ে- ঘরে যা আমার কাজ আছে…দিঠি একটু অবাক হয়ে- কি কাজ তোমার এই তো বেশ বাঁশি বাজাচ্ছিলে!আর আমি তো তোমাকে বিরক্ত করিনি!!!শ্যাম আরো গম্ভীর হয়ে, ঘরে যা দিঠি এইভাবে ভিজিসনা জ্বর হবে, শ্যাম এগিয়ে আসে জানলা গুলো দেওয়ার জন্য, হঠাৎ দিঠি শ্যামকে জিজ্ঞাসা করে, ভালোবাসো আমায়? শ্যাম যেন আকাশ থেকে পরে, কি বলছে কি মেয়েটা!!!তবে কি কিছু বুঝতে পেরেছে নাকি ও!!!চুপ করে থাকে শ্যাম, দিঠি শ্যামের পাঞ্জাবীর কলার টা ধরে আরো কাছে গিয়ে…বলোনা সুন্দরদা ভালোবাসো আমায়? এবার শ্যাম চোয়াল শক্ত করে বলে “না”। দিঠি শ্যামের বুকে মাথা রেখে, মিথ্যে মিথ্যে বলছো তুমি, আমি জানি। শ্যামের বুকে তখন আগুন জ্বলছে। দিঠিকে ধাক্কা দিয়ে সড়িয়ে বলে “বলছিতো না তুই ঘরে যা। “দিঠি কাঁদতে কাঁদতে স্টুডিও থেকে বেড়িয়ে দেখে বুড়া ছাতা নিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, এক ছুটে নিজের ঘরে চলে যায় দিঠি।

(ক্রমশ )

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 1   Average: 5/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।