বিচার

বিচার
পিয়াসা

 

অফিস থেকে বেরাতে বেরাতে প্রায় ন-টা বেজে গেল স্মিতার। আজ অফিসে কাজের চাপ একটু বেশি ছিল তাই কখন যে সময় পেরিয়ে গেছে একদম খেয়াল করতে পারে নি ও। শহর থেকে একটু বাইরের দিকেই ওর অফিস। নেহাত সরকারি চাকরি বলে ও এখনো করছে আর এখানে করছে। নাহলে জীবনে এই অঞ্চলে চাকরি করতে ও আসতো না। তারমধ্যে বেশ কয়েকদিন ধরে ও লক্ষ্য করছে অফিস আর স্টেশনে আসার মাঝে যে রাস্তাটা পড়ে,,, সেই খানে একটা বন্ধ চায়ের দোকানে একটা ঠেক বসে। এমনিতে ওর অফিস বিকেল পাঁচটার মধ্যে শেষ হয়ে যায়। ওর সাথে আরো অনেক অফিস কলিগ থাকে তাই অতোটা কখনো সমস্যা হয় নি। কিন্তু সেদিন,,,,,

– রাইমা! আজ একটু দেরি হয়ে গেল রে,,,,
স্মিতা একটু চিন্তিত হয়েই বলে।
অফিস থেকে বেরিয়ে এটাই হাঁটা পথ। এদিক দিয়ে কোনো রিক্সা_ বা ভ্যান যায় না। অটো বাসের তো প্রশ্ন-ই ওঠে না।
– তা যা বলেছিস। কি করবি বল_? আজ এতগুলো ফাইল সামলাতে হয়েছিল,,, সেগুলো চেক করে পাস করা,,,,, ধুর!
– সত্যি রে। কাজ যেন জোঁকের মতো জীবনে আটকে রয়েছে।
দুজনেই হেসে উঠলো। রাতের অন্ধকারটা বেশ ঘনিয়ে এসেছে। এদিকে না কোনো রাস্তার আলো আছে না দোকানের। আসলে সন্ধ্যার পর থেকেই এখানে যত রকম বেআইনি কাজকারবার আর চোলাইয়ের ঠেক বসে। তাই লোকজন যতটা সম্ভব সন্ধ্যার মধ্যেই কাজ শেষ করে ঘরে ঢুকে পরে। আর সেখান থেকে দাঁড়িয়ে মেয়েরা তো বিকেলের পর থেকেই আর এ অঞ্চলে বাইরে বেরায় না। সুতরাং এত রাতে বেরানোটা যে স্মিতা আর রাইমার কাছে বিপদযুক্ত তা ওরা জানে। কিন্তু ওদের কিছুই যে করার নেই। কি করবে,,,,  পেটের দায়ে চাকরি করতেই হবে। তারপর আবার সরকারি চাকরি। একটা ছাড়লে যে দশটা পেয়ে যাবে তা-তো নয়।

স্মিতা রাইমা দুজনেই একদম মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে।  রাইমা, ভীষণ মিষ্টি আর প্রাণবন্ত মেয়ে। সামনেই ওর বিয়ে। ছেলেটা ভাল চাকরি করে তবে অনাথ। ছোট থেকেই অনাথ আশ্রমে বড় হয়েছে। কিন্তু ও নিয়ে রাইমা বা ওর পরিবারের কোনো সমস্যা নেই। একদম সাধারণ ঘরের হলেও বিবেচনা ওদের অনেক উঁচু ছিল। মানুষের পরিচয় নয়,, ওরা প্রথম যেটা দেখতো তা হল বিবেক আর মনুষ্যত্ব। রাইমা-ও সবসময় এই কথাটাই বলে,,,, মানুষের ভালত্ব দেখতে হয়,,,, এসব ধর্ম _ জাত_ পরিচয় তো পরের কথা। তাই একমাত্র মেয়ের ভালবাসাতে ওর মা বাবার কোনো আপত্তি ছিল না। খুব শীঘ্রই বিনয় আর রাইমার বিয়ে।

স্মিতারা দুই বোন। দিদির বিয়ে হয়ে গেছে,,, এখন শুধু স্মিতা। দিদির বিয়ের বেশ কয়েক মাস পরেই মা আর বাবা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পরে। বাবা আর কাজেও যেতে পারে না। সুতরাং অভাবের এই সংসারে স্মিতা যখন চাকরিটা পায় যেন হাতে স্বর্গ পায়। সেই থেকেই চলছে,,, তখন অবশ্য কাজের জায়গা নিয়ে অত মাথা ব্যথা ছিল না,, তবে এখন হয়। কারণ জায়গাটার নাম প্রায়-ই খবরের কাগজে উঠে আসে। আগে খুন_সন্ত্রাস_ ধর্ষণ_চোরাকারবার আর অবৈধ মদ হাতিয়ারের ঠেক চলতো তার জন্য খবরের কাগজে নাম থাকতো। কিন্তু গত কয়েকমাস যাবত শুধুই রহস্যময় আত্মহত্যার জন্য এই অঞ্চলের নাম খবরের কাগজে উঠে আসছে।

তবে এখন অবশ্য ওইসব চোরাকারবার বন্ধ হয়ে গেছে, কিন্তু শুনেছে,, স্থানীয় বিধায়কদের ছেলেরা আজকাল বড্ড উৎপাত করে। এবারের নির্বাচনে জিতে আরো বেশি দম্ভ বেড়ে গেছে।

– রাইমা! অনেকটা রাত হয়ে গেছে রে,,, একটু জোরে পা চালা।
– সত্যি! কত রাত হয়ে গেল। হুম! তোর তো আবার ট্রেনের ব্যপার আছে। না পেলে মুশকিল। শেষ ট্রেন কিন্তু এটা,,,,,
– হ্যাঁ! তার জন্যই তো।
স্মিতা আর রাইমা অফিস জয়েনিংয়ের শুরু থেকেই বন্ধু। এতদিনে হয়ে গেছে খুব ভাল বন্ধু!

স্টেশনের কাছে আসতে বেশি দেরি নেই। ট্রেনের শব্দ-ও শোনা যাচ্ছে। তবে এখনো ওরা অন্ধকার পেরাতে পারে নি । মোবাইলের টর্চ ওদের সহায় সম্বল। অবশ্য স্টেশনের দিকটায় আলো রয়েছে।
কথা বলতে বলতেই হাঁটছিল ওরা হঠাৎ দু_তিনটে বাইককে সামনে থেকে আসতে দেখে ওরা।
বাইকে যারা ছিল তারা যে বীভৎসভাবে মদ্যপ তা বুঝতেও ওদের বাকি ছিল না।
হেডলাইটের আলোটা এসে একেবারে পরলো স্মিতার চোখে।
থেমে যায় বাইক কটা।
– একি রে_? এই রাত বিরেতে এলাকায় মেয়েছেলে_?
একটা পুরুষ কন্ঠ হিসহিসিয়ে বলে ওঠে,,,
সাথে সাথে বাইকের পিছনে বসে থাকা আরো একজন মোবাইলের টর্চের আলোটা ঠিক স্মিতার মুখে ফেলে,,,
– ওমা! এতো খাসা মাল আছে,,,,
– দাদা! এ যে মেঘ না চাইতেই জল!!
সকলেই খ্যাকখ্যাক করে হেসে ফেলে,,,,

ভয়ার্ত হয়ে স্মিতা আর রাইমা দুজনেই দুজনের দিকে তাকায়,,,,
ভয় জড়ানো কন্ঠেই স্মিতা বলে ওঠে,,
– দেখুন,,, আপনারা যেটা ভাবছেন তা নয়,,, সামনের অফিসে চাকরি করি। ওই যে ডি ব্লকে। কাজের চাপে একটু রাত হয়ে গেছিল তাই ফিরতে দেরি হচ্ছে। প্লিজ যেতে দিন,,, নাহলে শেষ ট্রেন-টাও মিস হয়ে যাবে।
স্মিতার কন্ঠে হতে আকুতি ঝরে পরলো।

একটা কর্কশ গলা বেজে উঠলো,,,
– ও ম্যাডাম! আমাদের কি দেখে বুর্বক মনে হয়_? এত রাতে কিসের কাজ হয় শুনি_?
আরো একজন বলে ওঠে,,,
– আমরা কিন্তু জানি কিসের কাজ হয়,,, তোদের মতো মেয়েছেলেদের আমরা ভাল চিনি। চল আর নখরা না করে চল,,,,, আজকের রাতটা না হয় আমাদের জন্য-ই,,,,
বলেই একজন বাইক থেকে নেমে ওর হাতটা খপ করে ধরে,,,,,
কঁকিয়ে উঠে স্মিতা,,,, আর্দ্র স্বরে বলে,,,
– দেখুন! আপনারা ভুল ভাবছেন,,, প্লিজ!
– ওই সালি! বেশি নাটক না মাড়িয়ে চল। না হলে কিভাবে নিয়ে যেতে হয় আমাদের জানা আছে,,, গুষ্টির সবাইকেই তো দিয়ে বেরাচ্ছিস রাত-বিরেতে,, আমাদের কেন দিবি না _? সালি চল!
আরেকজন ফুট কাটলো বাইক থেকেই,,,,
– সালিকে টেনে বাইকে তোল। মুখটা আগে কিছু দিয়ে বাঁধ,,,, রাত বিরেতে বেরিয়েছিস কেন_? কোন ভদ্র বাড়ির মেয়ে সন্ধ্যার পর বেরায়_? তোরা এর-ই যোগ্য!! নিজেরাই বেরিয়ে হিন্ট দিস আর বলিস পুরুষদের সংযম শিখতে_? পুরুষরা কি করে আটকাবে নিজেদের, তোরা এরকম নাটক মাড়ালে_?
ততক্ষণে হাতটা শক্ত করে চেপে ধরেছে একটা ছেলে,,,
চেঁচিয়ে ওঠে স্মিতা,,,
– প্লিজ! হেল্প! হেল্প! বাঁচাও_______,,,,
মুহূর্তে একটা শক্ত হাত ওর মুখ চেপে ধরে,,,
– এই এই,,, বাইকে ওঠাতে হবে না,,, এখানেই সালির ভবলীলা সাঙ্গ করে দিই,,,,, আরেকজন-ও নেমে আসে বাইক থেকে। বাকি দুজন বাইকে বসেই বিকৃত হাসি হাসে।
– পাল! সালিকে সামনের ইঁট-ভাটার ওদিকটায় নিয়ে চল,,, জলদি!
স্মিতা অবাক হয়ে যাচ্ছে এদের থেকে। কতখানি অশিক্ষিত এরা_? একটা স্বাধীন শিক্ষিত চাকরি করে খাওয়া মেয়েকে এরা অশ্লীলতায় আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে দিয়ে মন্তব্য শুরু করেছে। কেন_? কারণ সে রাত করে বাড়ি ফিরছে তাই। তার মানে সে এরকম-ই_ ওই-রকমই,,, এ ধরণের মন্তব্য। এরকম সমাজের চিন্তা-ধারা হলে কোন মেয়ে চাকরি করতে সাহস পাবে_? স্বাধীনভাবে রাস্তায় চলাফেরা করতে ভয় পেলে মেয়েরা কি করে স্বাধীন _ কিংবা স্বাবলম্বী হতে পারবে_? কেন এরা পুরুষতান্ত্রিকতায় আবদ্ধ রাখতে চায় মেয়েদের_? আজ এত পড়াশোনা করে_ এতটা শিক্ষা নিয়ে এই সমাজে মাথা তুলে বাঁচার ইচ্ছেটাই মরে যাচ্ছে স্মিতার মন থেকে। যে সমাজ নিজেই অন্ধতায় বিশ্বাসী__ সে শিক্ষার আলোকে বুঝবে কি করে _? নারীদের ওপর প্রভাব খাটিয়ে তাদের স্বাভাবিক অধিকারটুকুকেও এরা কেড়ে নিতে চাইছে,,,,, এদের মতো কিছু কিছু বিকৃত মানসিকতার মানুষদের জন্যই সমাজ এতটা পিছিয়ে,,, এদের মনস্তত্ত্বটুকুও বোধহয় বিকৃতপ্রায়।
রাত করে বাড়ি ফেরা চলবে না_ ছোট পোশাক পরলেই বিকৃত নজর_ পুরুষ বন্ধু মানেই চরিত্রের বড়সর আঁচড় কাটা এগুলোই এদের মানসিকতা। একটা মেয়ের এরকম বৈশিষ্ট্য থাকা মানেই সে অশ্লীল। আহ! কি বিচার সমাজের।
স্মিতাকে টেনে হিঁচড়ে ওরা নিয়ে যাচ্ছে ইঁট-ভাটার ওদিকে,,, মুখে আটকানো ওর-ই সম্মান রক্ষায় অংশ নেওয়া _ শরীরে থাকা সালোয়ারের ওড়নাটা,,,,,
চোখ ফেটে জল আসে স্মিতার,,,, কি বিচার ,, একা রাতে একটা মেয়ে হাঁটছে,, তারমানে এ নিশ্চয়ই পণ্য। ভেবেই নেয় যে মেয়েটি পতিতা। তবুও __ তবুও সাধারণ নারী হোক_ কিংবা পতিতা প্রত্যেকের নিজস্ব সম্মান আছে। নারীর ‘হ্যাঁ’ মানে তবেই হ্যাঁ আর না মানে ব্যস! ‘ না’। একজন পতিতার শরীরেও তার অনুমতিক্রমে স্পর্শ করা উচিত সেটাই বোধহয় এরা ভুলে যায়,,, বা জানেই না। আই-পি-সি থ্রি সেভেন্টি ফাইভ অনুযায়ী কোনো পুরুষ কোনো নারীকে তখন-ই স্পর্শ করতে পারবে যখন সেই নারী তা করতে সম্পূর্ণ সম্মতি এবং অনুমতি দেবে।
কিন্তু এরা______?? পশুদের-ও অধম।
নির্দিষ্ট জায়গায় এনে ওরা ছুড়ে মাটিতে ফেলে স্মিতাকে।
দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে ওর,,, কাউকে ডাকতে পারছে না__ চিৎকার করে কাঁদতেও পারছে না। প্রচন্ড রাগ হচ্ছে এই নিষ্ঠুর সমাজের ওপর। মাটিতে আছড়ে পড়াতে পিঠে দারুণ লেগেছে স্মিতার,,,,কঁকিয়ে উঠে ও চোখটা বুজে নিল। শুনতে পেল কয়েকটা পায়ের আওয়াজ দ্রুত ওর দিকেই আসতে থাকে_________

ফোনটা সশব্দে বেজে উঠলো স্মিতার। ঘুমচোখেই হাতড়ে পাশের টেবিল থেকে ফোনটা নিল ও। জড়ানো গলায় বলে,,
– হ্যালো!!
– ওই! স্মিতা! খবরটা দেখছিস_? আমাদের অফিসের রাস্তায় চারটে খুন হয়েছে,, না না,,, তিনটে খুন আর একটা আত্মহত্যা!
তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বসে স্মিতা,,,,
– কি_??
– হ্যাঁ! নিউজ দ্যাখ এখুনি।
ফোনটা রেখে দেয় অমিত। স্মিতার অফিসের সহকর্মী।
হুড়মুড়িয়ে বিছানা থেকে উঠে স্মিতা বাইরে এসে টিভি চালায়। খবরের চ্যানেলে এসে ওর চোখ স্থির হয়ে যায়,,, গতকাল রাতের দিকে স্থানীয় বিধায়কের চারজন পার্টির ছেলে স্টেশন থেকে খানিক দূরের রাস্তায় মারা যায়। কারণ অজ্ঞাত,,,, তবে পুলিশ সূত্রানুযায়ী,, তিনজনকে ভোজালি দিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করেই চতুর্থজন হত্যার ধারালো অস্ত্র দিয়েই নিজের গলা কেটে আত্মহত্যা করে। অস্ত্রে থাকা ফিঙ্গার প্রিন্টস রিপোর্ট-ও তাই বলছে,,, স্থানীয় থানার যিনি কেসের ইনচার্জ তিনি এটাকে ওপেন এন্ড কেস বলেছেন,,, মৃতরা সকলেই প্রচন্ড মদ্যপ ছিল,, কোনোকিছুতে বচসার কারণেই এই হত্যা এবং পরে হতাশার ফলে চতুর্থ ব্যক্তির আত্মহত্যা।
স্মিতা বোঝে কেসের সমাধান কোনোকিছুই পরিষ্কার নয়,, তবে পুলিশ চেয়েছে বলেই অত্যন্ত দ্রুত কোনোক্রমে কেসের সমাধান হচ্ছে। বেশ বোঝা যাচ্ছে পুলিশের ওপর রাজনৈতিক চাপ রয়েছে,, এবং তারা চাইছে কেসের দ্রুত রফা-দফা। সত্যিই রাজনীতি মুহূর্তে মানুষকে আলোর ঝলকে এনে দিতে পারে_ আবার মুহূর্তে মানুষকে অন্ধকারে ডুবিয়ে দিতে পারে।
টিভির সুইচটা অফ করে স্মিতা চেয়ারটায় বসে। মা মনে হয় রান্নাঘরে _ আর বাবা এখনো হয়তো বাজার থেকে ফেরে নি। ঘড়িতে বেলা এগারোটা।
ফোনটা এনে স্মিতা গ্যালারিটা খোলে। ভর্তি হয়ে রয়েছে একবছর আগে মৃতা ওর প্রিয় বান্ধবী রাইমার ছবি। কি ঝকঝকে হাসি। কিন্তু এক বছর আগে,,,
গত রাতের মতো-ই একদিন রাইমার-ও অফিস থেকে বেরাতে দেরি হয়ে যায়। সেদিন স্মিতা অফিস যেতে পারে নি। বাবার অসুস্থতার কারণে হসপিটাল নিয়ে যেতে হয়েছিল।
অনেকটা রাত হয়ে যেতে রাইমা জোরে পা চালাচ্ছিল। অন্ধকারময় ওই রাস্তায় আশেপাশে বাড়ি-ও নেই। সোজা রাস্তা চলে গেছে স্টেশন পর্যন্ত। একটা আলো নেই কিচ্ছু নেই। কোনো উন্নতি নেই,,, বা হয়তো ইচ্ছে করেই করে না। অবৈধ কাজ চালাতে সুবিধার জন্য। সেদিন-ও গত রাতের মতো মাঝরাস্তায় ওর পথ আটকে ছিল কিছু লোক। ঠেক বসিয়েছিল তারা মদের। টিমটিমে আলোর মাঝেই ওদের হাত ছুঁয়ে গেছিল রাইমার সারা শরীরে। পারে নি ও সেদিন চিৎকার করতে,,, হাত-মুখ শক্তভাবে চেপে রাখা হয়েছিল। ভেতরের ছটফটানি হলেও বাইরের দেহাঙ্গ কোনো ক্রিয়া করতে পারে নি। শিকার হয় গ্যাং রেপের। ততক্ষণ পর্যন্ত নরকীটগুলো ওকে ছাড়েনি যতক্ষণ না ওর শরীরের শেষ নিঃশ্বাসটুকু শুষে না নেওয়া হয়।
সামনে ছিল মেয়েটার উজ্বল ভবিষ্যত্__ বাঁধা পরতো বিবাহের পবিত্র বন্ধনে। সবটাই রয়ে গেছিল অলীক কল্পনা হয়ে। রাইমার বাবা মৃত মেয়ের জন্য কত ছোটাছুটি করেছিল বিচার পাওয়ার আশায়।মা মেয়ের মৃতদেহ বুকে আগলে নিয়ে কেঁদেছিল। আদালতে কম টানা-ঘেঁষা চলে নি ওকে_ ওর চরিত্রকে নিয়ে। বিনয় নিজের ভালবাসাকে বিচার পাওয়ার আশায় দিনরাত এক করে দিয়েছিল,,, না পারে নি। কেউ পারেনি বিচার দিতে। ট্রায়ালের_ পর ট্রায়াল চলতে থাকে। আর এগাতে থাকে তারিখ। উকিল পক্ষের সুচারুতায় জামিন হয় অভিযুক্তদের।
স্মিতা-ও বিচারব্যবস্থার এরকম মেরুদণ্ডহীনতায় আহত হয়েছিল। প্রার্থনা করেছিল একমাত্র বান্ধবীর সুবিচারের জন্য। হয় নি কিছুই,,,,,
অথচ একদিন হঠাৎ খবর আসে সেই অভিযুক্ত দুই আসামী আচমকাই আত্মহত্যা করে। আর একজনের গাড়ি চালাতে গিয়ে পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়। মারা যাওয়ার আগে হসপিটালে নাকি বিড়বিড় করে বলছিল লোকটা ও ‘কাকে’ দেখেছে। কোন একটা মেয়েকে। গাড়ির সামনে চলে এসেছিল_ আর গাড়ি ঘোরাতে গিয়েই বিপত্তি। ফলস্বরূপ অ্যাক্সিডেন্টটা হয়।
ফোনে ছবিটা দেখতে দেখতে স্মিতা মৃদু হেসে ওঠে,,, যখনই ওর অফিস থেকে বেরাতে দেরি হয় ওকে রাইমা-ই সঙ্গ দেয়। এখন এটা কাউকে বললে ওকে কেউ বিশ্বাস করবে না। সুতরাং কাউকে বলে লাভ নেই। সকলেই বলবে তোর কোনো রোগ আছে। মানসিক রোগ। মৃত মানুষকে দেখা সম্ভব নাকি_? তবে ওই রাস্তায় এই একবছরে হওয়া আত্মহত্যা গুলো-ও বড় অদ্ভুত! একটিও সচ্চরিত্র মানুষের মৃত্যু ঘটেনি। তবে ধর্ষক _ গুন্ডা কিংবা অবৈধ কাজে জড়িত কয়েকজন ব্যক্তির আত্মহত্যা ঘটেছে। তলিয়ে গেছে তারা সকলেই অনন্ত নিদ্রায়।
চমকে স্মিতা উঠে দাঁড়ায়,,,
‘ আরে কালকের তারিখটা তো এক। ঠিক একবছর আগে কালকের তারিখেই তো রাইমার সাথে,,,,,,

চোখটা ভিজে আসে স্মিতার। রাইমা ঠিক করে_ সেইসব লোকেদের সাথে যারা অন্যায় করেও ঘুরে বেরাচ্ছে খোলা বাতাসে,,,,,,,,,,,,

রাইমা আছে___ ও আমাদের মধ্যেই আছে। ও প্রতিটা নারীর মধ্যেই বেঁচে আছে। তবে সে-রাতে স্মিতা কি করে, কিভাবে ওই শয়তানগুলোর থেকে বেঁচে ফিরে এসেছিল সেটা আজ-ও ও নিজে ঠিকঠাক স্পষ্ট মনে করতে পারে না।
শুধু আজ-ও স্মিতার সে রাতে যখন নরপিশাচগুলো ওর ওপর চেপে বসেছিল অন্ধকারকে ভেদ করে ওদের পিছন হতে আসা রাইমার হাসিমুখ-টা মনে পরে যায়। আজ-ও ও ভুলতে পারে নি রাইমার দেবী-মা স্বরূপ ক্রোধমাখা হাসিমুখটা!!

আমাদের এ সমাজে দুঃশাসন-তো অনেক আছে,,, কিন্তু শ্রী-কৃষ্ন স্বরূপ মানসিকতার মানুষের বড় অভাব। তাই
প্রতি রক্তবীজকে মারতে মা-কালী কিংবা প্রতি অসুর-কে বধ করার জন্য দেবী দুর্গার রূপকে এ সমাজে প্রস্ফুটিত  করা উচিত।

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 2   Average: 4.5/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
close