বৈশাখী লক্ষী

বৈশাখী লক্ষী

বৈশাখী লক্ষী—–

 

বার অন্তরসত্তা জয়শ্রী, এই নিয়ে তৃতীয় বার। প্রথমবারের বেলায় বুঝতে পারেনি, সংসারের কাজের চাপে নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো বাচ্চাটা। দ্বিতীয়বার মেয়ে হয়েছে, এবার তৃতীয় বার অন্তরসত্তা সে।
মধ্যবিত্ত একটি যৌথপরিবারের মেজোবৌ জয়শ্রী। স্বামী সরকারি চাকুরে, রোজ সকাল ৮:২০মিনিটের বারাসাত লোকেলে কলকাতায় চলে আসে, আবার রাতে বাড়ি ফেরেন। বাড়ির সকল কাজ প্রায় একা হাতে সামলায় জয়শ্রী, এই ধুরুন-উঠোন ঝাড় দিয়ে গোবর নিকানো, বাড়ির সকলের রোজকার জামাকাপড় কাঁচা, তারপর রান্না ঘরের কাজ তো আছেই। বাড়ির সে মেজোবৌ হলেও ভাসুর যেহেতু বিয়ে করেননি তাই ওই বড়বৌ সুতরাং বুঝতেই পারছেন সব দায়িত্ব জয়শ্রী একা হাতেই সামলায়। ঘরের এতো কাজ সামলে নিজের বাচ্চার দেখাশুনা সম্ভব না বলে সে তার মেয়েকে তার বাপের বাড়িতেই রাখে। জয়শ্রীর বাপের বাড়ি কাছেই ৩ মিনিটের হাঁটা পথ, মাঝে মাঝে গিয়ে দেখে আসে মেয়েকে। কী করে নিজের কাছে রাখবে, এই বেড়ার ঘরে টিনের চালে গরমে যেমন গরম আবার ঠান্ডায় তেমন ঠান্ডা। মেয়েকে যদিও নিয়ে এসে রেখেছিলো কয়েকদিনের মধ্যে ভয়ঙ্কর নিমুনিয়া হয়ে মেয়ে এই যায় কী সেই যায় অবস্থা। অগত্যা বাপের বাড়িতেই রাখতে হয় মেয়েকে। সেখানে ভালোই যত্ন পায় সে দিদা, দাদু, মামা, মাসি মিলে খেয়াল রাখে তার। বুকের দুধ তাকে  জন্ম থেকেই খেতে দেওয়া হয়নি, কারণ জয়শ্রীর ভয়ঙ্কর হাঁপানি আছে তাই তার স্বামী না করেছে বুকের দুধ খাওয়াতে। আধা শহরে থাকা কাশীনাথ তখন হয়তো বুঝতে পারেননি বুকের দুধ খাওয়ার প্রয়োজনীয়তা। সে যাইহোক এবার আসি অন্য কথায়, চৈত্র মাস চলছে এখন গরমটাও খুব পড়েছে, যদিও মাঝে মাঝে সন্ধ্যার দিকে দক্ষিনা বাতাস সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয় জয়শ্রীর। জয়শ্রী এখন ৮মাসের অন্তরসত্তা, শরীর যেন আর চলেনা, তবুও কাজের শেষ নেই। কদিন একটু বিশ্রাম পেয়েছিলো যখন প্রথম প্রথম জানতে পারলো সে আবার অন্তরসত্তা। প্রথম দিকে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, তখন অনেকেই তাকে বলেছিলো বাচ্চাটা নষ্ট করে ফেলতে, কিন্তু মায়ের মন তা করতে পারেনি। তার স্বামীও তাকে একই কথা বলেছিলো কিন্তু জয়শ্রীর সিক্ত চোখ দেখে আর কথা বাড়াননি।
“হবে তো সেই মেয়ে এতো ফল, দুধ, ডিম,  খেয়ে কী হবে!” কথাটা যেন তীরের মতো বেঁধে জয়শ্রীর কানে, পিছন ফিরে দেখে তার ছোট দেবর দাঁড়িয়ে। কোন কথার উত্তর না দিয়ে দেবরের হাত থেকে ফল গুলো নিয়ে গুছিয়ে রাখতে রাখতে মিষ্টি ভাবে বললো —তুমি তোমার মেজদাদা কে বলতেই পারতে ফল আনতে পারবেনা, তাহলে তো তোমাকে কষ্ট করে আর যেতে হতোনা ভাই।




-না মানে তুমি কী কষ্ট পেলে মেজো বৌদি? আমি কিন্তু কথাটা এরকম ভাবে বলতে চায়নি!
-সত্যি কথা বলেছিস তাতে আবার কষ্ট পাওয়ার কী আছে!
পাশের ঘর থেকে বড় ননদের গলা পেল জয়শ্রী।
আজ সকাল থেকেই শরীরটা আনচান করছে তাও মুখ বুজে সব কাজ শেষ করছে জয়শ্রী ভোর থেকে। আজ রবিবার কাশীনাথের আজ অফিস ছুটি সে বাড়িতেই আছে, কাশীনাথ পাকা বাড়ি করবে বলে মিস্তিরি কাজে লাগিয়েছে। আজ ভিত উঠবে বাড়ির তাই সেও খুব ব্যাস্ত বাড়ির কাজে। সকালে টিফিনের পরে জিয়শ্রীর পেটটা চিনচিনে ব্যাথা শুরু হয়েছে, সে এসে কাশীনাথকে বলতেই কাশীনাথ একফোঁটাও দেরি না করে জয়শ্রীকে তৈরী হতে বলে নিজে তৈরী হতে শুরু করে। আজই ভর্তি করতে হবে, অনেকটা রাস্তায় যেতে হবে জয়শ্রীকে নিয়ে সেই কলকাতা। কাশীনাথ রেলের কর্মরত বলে বি. আর. সিং. হাসপাতালে ভর্তি করবেন তার স্ত্রীকে। খরচটাও চিন্তার কারণ তাই বি. আর. সিং. হাসপাতালে হলে কোন খরচই লাগবেনা রেল কর্মচারী বলে। লোকাল ট্রেনে করে জয়শ্রীকে নিয়ে বারাসাত থেকে ট্রেনেই গেলেন শিয়ালদাহ। নিরুপায় কাশীনাথ সামান্য কিছু মাস মাইনেতে অতবড় সংসারের সিংহ ভার বয়ে আর বাড়তি কোন কিছুই খরচ করতে পারেননা। তাই তার স্ত্রীকে গাড়িতে নিয়ে যাবেন ভেবেও পিছিয়ে গেলেন। লোকাল ট্রেনেই নিয়ে গিয়ে ভর্তি করলেন বি. আর. সিং. হাসপাতালে।
নতুন অতিথি আসছে, কাশীনাথ এবার ভেবেই রেখেছেন পাকা বাড়ি করবেনই করবেন। আর বাচ্চাকে আলাদা রাখবেনা। ওনার মেয়েকেও নিয়ে আসবেন মামাবাড়ি থেকে, তারপর চারজন একসাথেই থাকবেন। স্ত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি করে তাই এক মুহূর্ত দেরি করলেননা তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে বাড়িতে মিস্তিরি কাজ করছে।
বৈশাখ মাসের প্রখর তেজে স্টেশন থেকে বাড়ি ফিরতে বেশ কষ্টই হলো কাশীনাথের। দুপুর রোদে তখন কোন রিক্সা পর্যন্ত নেই। রাস্তার কুকুর গুলো গ্রীষ্মের উষ্ণতা থেকে বাঁচতে ছায়া খুঁজে নিচ্ছে একে একে। জয়ার যা অবস্থা দেখলো তাতে আজই সন্তানের জন্ম দেবে জয়া। কাশীনাথের আজ আর যাওয়া হবেনা। তার সন্তানের জন্মের খবরটা তাই কালকেই তাকে নিতে হবে। তারতো আর কেউ নেই যে বিকেলে গিয়ে খবর আনতে পারবে, তাছাড়া টেলিফোনের ব্যবস্থাও নেই আসে পাসে কোথাও। কপালে চিন্তার ভাজ নিয়ে বাড়ি ফিরলো কাশীনাথ।




দুপুর ১:৩৭মিনিটে গ্রীষ্মের প্রবল দাবদাহকে উপেক্ষা করে জন্ম হলো নতুন একটা প্রানের।
—মিসেস গাঙ্গুলী শুনতে পারছেন? মিসেস গাঙ্গুলী?
প্রসব যন্ত্রনায় কাতর জয়শ্রী প্রসবের পরে একটু নিস্তেজ হয়ে গিয়েছিল, ডাক্তারের ডাকে চোখটা অল্প খুললো
—এই যে দেখুন আপনার মেয়ে হয়েছে, কী খুশি তো?
আবার মেয়ে !!! মনে মনে ভাবলো জয়া, এতো আশা করেছিল ওর বাবা এবার ছেলে হবে! কিন্তু মুখে কিছু বললোনা, শুধু মাথাটা নাড়ালো।
ভোর হয়েছে অনেকক্ষণ, কিন্তু ঘুম আর কাটছেইনা কাশীনাথের চোখ থেকে। অফিসে গিয়ে সইটা করেই জয়ার কাছে আসবে সে ততক্ষণে ভিসিটিং আওয়ার্স শুরু হয়ে যাবে।
অফিসে পৌঁছে সবে নিজের টেবিলে বসতে যাবে কাশীনাথ পিওন এসে—গাঙ্গুলী সাব আপকো স্যারনে বুলায়া আভি। দুরু দুরু বুকে স্যারের চেম্বারের সামনে গিয়ে—আসবো স্যার?
মিস্টার রায়চৌধুরী চেয়ারে হেলান দিয়ে কিছু একটা ভাবছিলেন, কাশীনাথকে দেখেই লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে—আরে গাঙ্গুলী এসো এসো, তোমার চেয়ারটার একটু বদল হয়েছে।
—মানে
—মানে তুমি এখন থেকে হেড ক্লার্ক হলে তাই ঐ চেয়ারটায় তোমার আর বসা চলবেনা নতুন চেয়ারে বসতে হবে।
“জয়া এতো পুরো জুঁই ফুলের কুড়ি সাদা ধবধবে”, বলে এক দৃষ্টিতে দেখছে মেয়েকে কাশীনাথ।
—তোমার কোলে ছেলে দিতে পারলামনা। (আক্ষেপের সুর জয়ার গলায়)
কাশীনাথ জয়ার হাত দুটো ধরে একটু উষ্ণ চাপ দিয়ে
—ভালোই তো আমাদের ঘরে লক্ষী এসেছে গো, ও আসার সাথে সাথে আমার প্রমোশন হয়েছে, পাকা বাড়ি হচ্ছে, আর কী চাই, ও আমার বৈশাখী লক্ষী।
রাতে বাড়ি ফিরে কাশীনাথ দেখলো তার মা, ভাই, বোনেরা খুব খুশি, কাশীনাথ ঢুকতেই তার মা তাকে দেখে —বুঝলি কাশী তোর সেজোভাই আজ তার ব্যাবসায় একটা বড় অর্ডার পেয়েছে। কাশীনাথ তখন তার মাকে নিজের প্রমোশনের কথাটাও জানালো। সরলা দেবী ছেলেদের উন্নতিতে খুব খুশি, তার কষ্টের দিন এবার শেষ। মেজো ছেলেকে ডেকে —তুই তাড়াতাড়ি নিয়ে আয় আমার নাতনিকে যে আসার সাথে সাথে আমার সংসারে এতো উন্নতি, আমার ঘরের লক্ষী সে, আমার বৈশাখে লক্ষী।

সমাপ্ত

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 1   Average: 5/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।