ভয়

ভয়
—————————————–
জি০সি০ভট্টাচার্য্য, বারাণসী, উত্তর প্রদেশ
===========================================
আমি ছোটবেলা থেকেই ছিলাম খুব লোভী জেদী আর অকুতোভয় প্রকৃতির…
আর তাই যখন যা আমার মনে চেয়েছে সেটা না পাওয়া অবধি আর আমার মন শান্ত হতো না…মা বাবা সবাই কতো বুঝিয়েছে কন….কতোভাবে কিন্তু আমি অনড়…..
তবে আমি নিজের ইচ্ছেপূরণের পথ আমি নিজেই করে নিতাম নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে আর কৌশল করে।
কারো সাহায্যের ধার ধারতাম না। এই যেমন যখন আমার বয়স দশ কি এগারো..তখন একদিন আমার
বন্ধু অনির্বাণ স্কুলে এলো একটা গোল্ড নিবের পেন পকেটে গুঁজে…
তখন ছিল ফাউন্টেন পেনের যুগ। আর সস্তা পেনের নিব তৈরী হতো সস্তা টিনের অ্যালোয় দিয়ে আর
তাড়াতাড়ি লিখলে সেই সব নিব ঘষে গিয়ে খারাপ ও হয়ে যেতো বলে দামী সব ঝর্ণা কলমের নিব সব সোনার তৈরী
করা হতো কেননা সোনার ক্ষয় হয় কম…আমি ঠিক করলুম ওই পেনটা আমার চাই…তাই লেগে পড়লুম কাজে।
অনেক দোকান ঘুরে ও ঠিক ওইরকমের একটা সস্তা পেন না পেয়ে গেলাম তখনকার বিখ্যাত দোকান পেনকোতে।
নগদ চারটাকা দিয়ে ঠিক অনির্বাণের মতন একটা কলম কেনা হয়ে গেলো যাতে ড্রপারটিউব আছে।
তখনকার দিনে চার টাকায় লোকের পনেরো দিনের বাজার হয়ে যেতো
তারপরে সুযোগের অপেক্ষা…অনির্বাণ তো আর বোকা ছেলে নয় যে মামার উপহারের দামী কলমটা সে
স্কুল ব্যাগে ফেলে রাখবে নিজের পকেটে না রেখে।
তবে ভাগ্য ভালো …একদিন ড্রিল পিরিয়ডে ওর বুক পকেট থেকে পেনটা হঠাৎ পড়ে গেলো আর ও সেটা টের পাবার আগেই
ওর পেছনে আঠার মতন আমি সেঁটে ছিলাম বলে দেখতে পেয়েই আমার বাঁ পা টা এগিয়ে দিয়ে আঙুলে চেপে ধরে পেনটা তুলে
নিয়ে জল খেতে যাবার ছুটি চাইলাম। তখন আর কি? আমার কাজের জন্য তো দু’মিনিটই যথেষ্ট…
শুধু নিবটা খুলে বদলে ফেলে খালি ক্লাশে ঢুকে পেনটাকে ওর ব্যাগে রেখে দিয়ে ভালোমানুষ সেজে চলে আসা..
ততক্ষণে অনির্বাণ টের পেয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে পেনটা খুঁজতে শুরু করলে ও লাইন ছেড়ে বেরোতে পারছে
না বলে খুব ছটফট করছে…অবশেষে ড্রিল শেষ হলো আর সে সারা স্কুল মাঠে ঘুরে পেন খোঁজা শুরু করলো… না পেয়ে সে
যখন কাঁদতে শুরু করলো আমি তখন ক্লাশে ঢুকে বললুম-‘আরেঃ…তুই তোর ব্যাগে তো দেখিসই নি আগে সব খুঁজে
দেখ ব্যাগের ভেতরে ভালো করে…’
বলাই বাহুল্য যে অনির্বাণ পেন পেলো… খুশী হলো আর গোল্ডফিনিসের নকল নিব সে ধরতেও পারলো না।
আমার সাহস বেড়ে গেলো আর দ্বিতীয় কান্ডটা ঘটালুম এক বছর পরে মামার হীরের আংটির লোভে পড়ে।
প্রথমে একটা পাতলা সরু তার দিয়ে আংটির মাপটা আমাকে নিতেই হলো মামার ঘুমের সুযোগে…
তারপরে ঝুটো আমেরিকান ডায়মন্ড বসানো একটা রোল্ড গোল্ডের নকল সেই মাপের আংটি কিনে ফেলে অপেক্ষা।
ধৈর্য থাকলে কি না হয়?একদিন মামা যখন নিজের শার্ট প্যান্ট কাচবে বলে সার্ফের জলে ভিজিয়ে রেখে বাথরুম থেকে বেরিয়ে
এসে চান করবার জন্য সাবান নিতে গেছে তখন আমি গিয়ে চট করে সেই সার্ফ জলে খানিকটা বিছুটি পাউডার ঢেলে দিলাম
আর কাপড় কাচতে গিয়ে মামার যে শুধু তিড়িং বিড়িং করে নাচ শুরু হলো তাই নয় গোটা হাতটাই ফুলে উঠতে শুরু করলো
আর আঙুলে আংটি এমন কেটে বসলো যে তেল লাগিয়ে টানা টানি করে মামাকে আংটি খুলে ফেলে তখন বাঁচতে হলো আর
সেইঁ সুযোগে হলো আংটি বদল
সে তো হবেই…
তবে আমি খুব সাবধানী ছিলুম বলে সবসময়এইসব কান্ড করতুম না
কিন্তু বছর চারেক ও কাটলো না … আমি আবার লোভে পড়ে গেলুম … এইবার হলো কি যে আমার মাসতুতো ভাইয়ের বিয়ের
ঠিক হলো আর বৌ যখন এলো তখন বৌভাতের নেমন্তন্ন খেতে গিয়ে সেই অষ্টাদশী সুগৌরী সুন্দরী মেয়েটার মুখ দেখেই
আমার মাথা ঘুরে গেল মানে আমি মাত্র সেই পনের কি ষোল বছর বয়স হতে না হতেই সেই অষ্টাদশোত্তীর্ণা পীন পয়োধরা
বৌদির প্রেমে পড়ে গেলুম আর তাইতেই আমার সর্বনাশ হয়ে গেলো … দেখতে আমাদের দুই ভাইয়ের চেহারায়
যথেষ্ট মিল থাকলে ও স্বভাব ভিন্ন আর দাদা তো ব্যাংকে কাজ পেয়েই বিয়ে করে বসেছিলো আর আমি তো বেকার …
হাইস্কুলের ছাত্র… কে দিচ্ছে তখন আমার বিয়ে? তাই তখনই ঠিক করে ফেললুম যে ওই ইন্দ্রাণী মেয়েটাকেই
আমার চাই …বৌদি না ছাই…
অতো সব দেখলে কি আর প্রেম করা চলে? তাইতো ইংরেজরা স্পষ্ট করে বলেই রেখেছে যে … এভরি থিং ইজ ফেয়ার ইন ওয়ার
অ্যান্ড লাভ…তবে করা কি যায়? অন্য কিছুই ঠিক করতে না পেরে বৌদির সেবা করে মন জয়ের চেষ্টায় লেগে পড়লুম আর
চেষ্টায় কি না হয়? ক্রমে বাজার হাট কেনা কাটা মানে শপিং আর ছোটখাটো অনেক কাজেই বৌদি আমার ওপরে নির্ভরশীল
হয়ে পড়লো কেননা আমার মাসির আর ছেলে ছিলো না… এক ছিলো বড়ো বোন আর তার ও বিয়ে হয়ে গিয়ে ছিলো …দিন যায়…
হঠাৎ একদিন ভগবান মুখ তুলে চাইলেন মনে হলো কেননা দাদা বদলী হয়ে গেলো মির্জাপুরে… একশো কি. মি. পথ ডেলী
প্যাসেঞ্জারী করে অফিস করা তো হয় না আর তার জন্য তো চাই লোকাল ট্রেন আর সে গুড়ে ও বালি… তাই বাধ্য হয়ে দাদাকে
বাড়ী ভাড়া করতেই হলো আর তখন সেই কাজটা যখন আমি যেচে গিয়ে করে দেব বললুম তখন আর কে না হাতে স্বর্গ পায়?
দাদা ও পেলো আর আমি আমার বন্ধু বান্ধবের সাহায্য নিয়ে সাত দিনের মধ্যে বেশ সস্তায় একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করে ফেলে
এক রবিবারে শুধু দাদাকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে ও আনলুম … দেখে দাদার পছন্দ ও হয়ে গেলো আর তখন আমার
শুরু হলো আসল কাজ..
.আমাদের এখানে তখন গরীব কাজের লোক অনেক পাওয়া যেতো সহজেই আর বেশী পয়সার লোভ দেখিয়ে বৌদির বয়সী
একটা কাজের মেয়ে খুঁজতে শুরু করলুম আমি …চেষ্টা করলুম যাতে দেখতে ও মেয়েটা যতোটা হয় বৌদির মতন একই রকম
দেখতে ও আর সেটা হলেই তো সোনায় সোহাগা … একটু স্বভাব আচরণ অনুকরণ অভ্যাস আর সামান্য কিছু মেক আপ… ব্যস
আমার প্ল্যান আবার সফল হলো আর নকল বৌদিকে যথাস্থানে পৌঁছে দিয়ে অন্য জায়গায় আর একটা বাড়ী ভাড়া করলুম
আমি আর বৌদিকে সেখানেই নিয়ে গিয়ে তুলে দিয়ে দাদাকে আর জিনিষপত্র নিয়ে আসছি বলে বেরিয়ে এলুম তবে বৌদির
চায়ের পাত্রে মানে টি পটে কড়া ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে রেখে দিয়ে কাজের মেয়েকে ততোক্ষণ বৌদিকে চা জল খাবার দিতে বলে
এলুম যাতে কাজ হয়…
তা ভালোই কাজ হলো… আর তাই আমি যখন এক ঘন্টা পরে ফিরে গেলুম তখন কাজের মেয়ে আর বৌদি থুড়ি ইন্দ্রাণী দুজনেই
গভীর ঘুমে হত চেতন হয়ে একজন মাটিত েআ রঅন্যজন বিছানায় পড়ে আছে… আমার প্ল্যান আবার সফল হলো
আর দাদা যেমন নকল বৌ নিয়ে রইলো তেমনি আমি ও সারা রাত ধরে একটানা মনের সুখে আশ মিটিয়ে আমার
বহুদিনের আশা পূর্ণ করতে চরম আনন্দ করা শুরু করলুম
ইন্দ্রাণীর সাথে … আমার প্রেম পূর্ণতা পেলো…
তবে এইবার একটা অসুবিধা শুরু হলো হঠাৎ তিন চার ঘন্টা আনন্দ করা হতে না
হতেই… তখন কি ছাই আমি জানি যে দাদা এরমধ্যেই মেয়েটাকে প্রেগন্যান্ট করে দিয়েছে…আমার বোঝা উচিৎ
ছিলো যে এতো সুন্দর একটা বৌ পেলে যে কোন ছেলেই এতোদিনে এসব তো করবেই … তবে আমি তো একটা গাধা তাই
ব্যাপারটা আন্দাজ করলুম যখন ততক্ষণে আমার অত্যাচারে ব্লিংডিং শুরু হয়ে গেছে ইন্দ্রাণীর… তবে সেই অপরিচিত টাউনে
সকাল না হলে তো কিছুই করবার ছিলো না … তাই তখন আর কিছুই করতে না পারলে ও সকালে কাজের মেয়েটার হুঁশ ফিরতেই
তাকে দিয়ে একজন লোকাল ডাক্তারকে ডাকিয়ে আনালুম … তিনি দেখে বললেন যে এতো রেপ কেস… আপনি নার্সিং হোমে
নিয়ে চলে যান এখনই আর যদি হাস পাতালে দেন তবে কিন্তু আপনার স্ত্রীকে অজ্ঞান করে তাকে এই ভাবে মাল্টিপল রেপ
করবার ঘটনাটা আর চাপা থাকবে না… কি করবেন বলুন… আমার জানা শোনা নার্সিং হোম আছে তবে আমাকে দশ
হাজার দিলে রেফার করে দিতে পারি …অন্য সব দরকারী ব্যবস্থা ও করে দেব আমি…
কি আর করি? মায়ের গয়না তো আগেই চুরী করেছিলাম আমার প্ল্যান সফল করতে এখন তাই দন্ড দিতে হবে… তাই রাজী
হতেই হলো ভয়ে ভয়ে কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ হলো আর ইনফেকসান হয়ে গিয়ে পরদিনই মেয়েটা মারা গেলো রাতে…তখন আরো
দশহাজার দিতে হলো ডেথ সার্টিফিকেট নিতে আর দাহ কার্য সব শেষ করতে যথা সর্বস্ব আমার গেলো…
খালি হাতে গিয়ে সেই ফ্ল্যাটে উঠলুম শেষরাতে…
আর ঘরে ঢুকে আলো জ্বেলেই চমকে উঠলুম একেবারে … বিছানায় একটা মেয়ে যেন শুয়ে রয়েছে বলে মনে হলো…
আঁৎকে উঠলুম আমি আর তখনি দেখলুম যে বিছানা তো খালি… কই কেউ তো নেই …তবে কি আমার দৃষ্টিবিভ্রম শুরু হলো?
সেই সাথে আরো একটা দারুণ ভয় এলো মনে…আজ হোক কাল হোক দাদা তো সব বুঝতে পারবেই আর তখন কি হবে?
আমি বাড়িতে যে ফিরবো সেই বা কি ভাবে? গয়না চুরী ও আমার অন্তর্ধান করবার রিপোর্ট হয়তো থানায় লেখানো ও হয়ে
গিয়েছে … তবে এখন উপায়? ভাড়া দেওয়া আছে বলে এক মাস এই ফ্ল্যাটে থাকতে পারলে ও আমি খাবোটা কি?
খালি পেটেই ক্লান্ত শরীরে আমি বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লুম আর তখনি কে যেন আমার ওপরে এসে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে
দু’হাতে চেপে ধরলো ….ভয়ে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো…লাফিয়ে উঠলুম আমি চিৎকার করে… স্পষ্ট মনে হলো সেই
দেহটা একটা মেয়ের তবে সে কি ঠান্ডা আর কঠিন সে দেহ আর তার ভয়ানক আলিঙ্গন… আমার আর বিছানায়
শোওয়া হলো না… ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে উঠে এসে একটা চেয়ারে গিয়ে বসে পড়লুম আমি…
নাঃ…এখন উপায়? কাল থেকে লোকের পকেট মারাই দেখছি শুরু করতে হবে আমাকে বেঁচে থাকতে হলে …
কেননা কাজ বা ভিক্ষের কোনটাই যে আমি পাবো না তা ঠিক … কিন্তু যদি আমি বিছানায় শুয়ে পড়লেই সে এসে চেপে ধরে
তখন কি হবে? সারা রাত যদি শুতে ও ঘুমোতে আমি আর কোনদিনই না পারি তবে আমি এইভাবে আর ক’দিন
বাঁচতে পারবো?
হে ভগবান রক্ষা করো…এ কি ভয়???????============================

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 5   Average: 2.2/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
close