মনের মাঝে তুমি (পর্ব ১)

মনের মাঝে তুমি (পর্ব ১)

গল্পের নাম: মনের মাঝে তুমি

লেখিকার নাম― রূপাঞ্জনা দে “মেঘা”

 

 

(পর্ব ১)

 

জানালার ধারে আকাশের দিকে তাকিয়ে বসে আছে মেঘলা। বাইরে দেখা যাচ্ছে নীল নির্জন সমুদ্র। কিছুক্ষণ আগেই সূর্য অস্ত গেছে। কাঁচের শার্সির ফাঁক দিয়ে গোধূলির হালকা লাল আলো এসে পড়েছে মেঘলার মুখে। সমুদ্রের ধারে লোকজনের আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে। দোকানপাটও বসে গেছে। দূর থেকে ভেসে আসছে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর “ভরা থাক স্মৃতি সুধায়”।

হঠাৎ পাশে খুব চেনা কারোর উপস্থিতি টের পেল মেঘলা। আর সঙ্গে একটা কড়া পারফিউমের গন্ধ নাকে এল। আর ওর শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। এ কি! এটা কিভাবে সম্ভব! এটা, এটা তো সেই পারফিউমটা, যেটা আদিত‍্যর ২৫ বছরের জন্মদিনে ও গিফ্ট করেছিল! ভয়ে ঘামতে শুরু করল মেঘলা। এক পা এক পা করে পিছিয়ে যেতে থাকল সে। এবার ঘাড়ের কাছে কারোর গরম নিশ্বাস টের পেল মেঘলা। ভয়ে ওর শরীর কাঁপতে শুরু করল। ঐ জায়গা থেকে সরে যেতে চাইল, কিন্তু পারল না। শেষ পর্যন্ত অনেক কষ্ট করে পিছন ফিরল। আর যা দেখল, তাতে প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেল।

 




 

মেঘলা দেখল ওর সামনে আদিত্য দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ের চোটে মেঘলা চিৎকার করতে গেল। কিন্তু তার আগেই আদিত্য এক হাত দিয়ে ওর মুখটা চেপে ধরল। আর আরেক হাত দিয়ে মেঘলাকে জড়িয়ে ধরল। এবার মেঘলাও আদিত‍্যকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করল। তারপর হঠাৎ করে আদিত‍্যকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,” তুমি…. তুমি আমাকে ঠকিয়েছ। তুমি একদম আমার সামনে আসবে না, এই আমি বলে দিলাম।”

―কেন তুমি খুশি নও বুঝি?

“না আমি খুশি নই। আমি খুশি নই। এক্ষুনি আমার ঘর থেকে বেরিয়ে যাও।” চিৎকার করে কথাগুলো বলেই মেঘলা পিছন ঘুরে হাতদুটো শক্ত করে মুঠো করে দাঁড়িয়ে নিরবে চোখের জল ফেলতে লাগল। এবার আদিত‍্য এগিয়ে এসে মেঘলাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে ওর চোখের জল আলতো করে মুছিয়ে দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। মুহূর্তের মধ্যে মেঘলার অভিমান গলে জল হয়ে গেল। মেঘলাও এবার আদিত‍্যকে জড়িয়ে ধরল। তারপর আবার আদিত‍্যকে ছেড়ে দিয়ে জানালায় গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,”জানো আদি, সবাই ভাবে আমি বোধহয় খুব ভালো আছি। কিন্তু কেউ জানে না, কেউ বোঝে না আমার মনের অবস্থা। সবাই শুধু রঙ করা আমিটাকে দেখে। কিন্তু কেউ তো জং ধরা, ভাঙা কাঁচের মতো টুকরো হওয়া আমিটাকে দেখেনা বা বোঝেনা। এক বুঝতে তুমি। কিন্তু এখন(দীর্ঘশ্বাস ফেলে)।” কথাগুলো শেষ করে মেঘলা চোখের কোণে জমে থাকা জলগুলোকে মুছে নিল। তারপর এগিয়ে গিয়ে আদিকে জড়িয়ে ধরল।

―আমার একটা আর্জি রাখবে মেঘা?
―হ‍্যাঁ, বলো না। অবশ্যই রাখব।

―একটা গান শোনাবে? সেই কতকাল আগে তোমার গলায় গান শুনেছি……..(দীর্ঘশ্বাস ফেলে)
―               স্বরলিপি নেই কোনো কান্নার
ঠিকানা নেই কোনো বেদনার,
এজীবন শুধু ভালোবাসা শুধু
কান্নারই নাম কেনো কান্নারই নাম

যে জীবনে ছিড়ে গছে আজ সব সুর
সে জীবন হয়ে যায় বেদনা বিধুর।
সেই আশাহীন জীবনের নেই কোনো দাম।

 

 




 

 

এজীবন শুধু ভালোবাসা শুধু
কান্নারই নাম কেনো কান্নারই নাম।

এ আকাশে নেই আজ পূর্ণিমা চাঁদ
দুচোখের সিমানাতে তমোসার রাত।
তাই দুনয়নে ব্যথা শুধু কাঁদে অবিরাম।
এজীবন শুধু ভালোবাসা শুধু
কান্নারই নাম কেনো কান্নারই নাম

স্বরলিপি নেই কোনো কান্নার
ঠিকানা নেই কোনো বেদনার,
এজীবন শুধু ভালোবাসা শুধু
কান্নারই নাম কেনো কান্নারই নাম,
কান্নারই নাম কেনো কান্নারই নাম
কেনো কান্নারই নাম।

গান শেষ হওয়ার পর আদিত্য উঠে দাঁড়িয়ে বলে,” আমি তাহলে আসি মেঘা।” বলেই আদিত্য দরজার দিকে এগিয়ে গেল। মেঘলাও ওর পিছন পিছন ছুটে গেল আদিত‍্যকে আটকানোর জন্য। কিন্তু তার আগেই আদিত‍্য দরজা দিয়ে বেরিয়ে মিলিয়ে গেল। মেঘলা চেঁচিয়ে বলল,” আদি তুমি কোথাও যেওনা আমাকে ছেড়ে। আদিইইইইইইইই……….”

“মেঘলা, এই মেঘলা, চোখটা এবার খোল মা।” মেঘলার মা ছায়াদেবী মেয়ের মুখে জল ছিটিয়ে দিতে দিতে বললেন। মেঘলা আস্তে আস্তে চোখদুটো খুলে দেখল ও বিছানায় শুয়ে রয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ওর মনে পড়ে গেল আদিত‍্যর কথা। চোখ থেকে একফোঁটা নোনা জল গড়িয়ে পড়ল বিছানার ওপর। ছায়াদেবী মেঘলাকে রেস্ট নিতে বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। মেঘলা ফোনের লক খুলে ওর প্রিয় গানটা চালালো “তুমি কি কেবলই ছবি।” তারপর গায়ে চাদরটা টেনে নিয়ে নিজের ভয়ঙ্কর অতীত মনে করতে শুরু করল।

 




গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 1   Average: 1/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।