মনের মাঝে তুমি – পর্ব 2

গল্পের নাম: মনের মাঝে তুমি

লেখিকার নাম― রূপাঞ্জনা দে “মেঘা”

 

(পর্ব 2)

বছর আগে
আজ মেঘলার বিয়ে। ওর আর আদিত‍্যর আট বছরের সম্পর্কের আজ শুভ পরিণতি হতে চলেছে। অনেক ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে আজকের এই আট বছরের আকাঙ্খিত অথচ পরিস্থিতির কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত দিনে এসে পৌঁছেছে ওরা। এক এক করে সব নিয়ম পালন করা হচ্ছে। বিয়ের লগ্ন রাত্রি নটায়। সন্ধ‍্যে সাড়ে ছটা থেকে সাতটার মধ্যে বরযাত্রী চলে আসবে। তাই সব নিয়ম তাড়াতাড়ি করে পালন করা হয়ে গেলে মেঘলাকে ওর রুমে নিয়ে গিয়ে একটু রেস্ট নিতে বলে ওর মা। তারপর আস্তে আস্তে ঘড়ির কাঁটা এগোতে থাকে। বিকেলের দিকে পার্লারের মেয়েরা মেঘলাকে সাজিয়ে দেয়। তারপর ওকে স্টেজে নিয়ে যাওয়া হয়। একে একে সবাই আসতে শুরু করে। সবাই মেঘলার প্রশংসা করছে।

 




 

কিন্তু মেঘলার মনে আনন্দ নেই। ওর মনে হচ্ছে আজ ওর জীবনের সবচেয়ে দুঃখের দিন। যদিও আট বছরের প্রতীক্ষার আজ অবসান, তবুও আজ ওর ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। এতদিন শুধু শুনেছে আর দেখেছে যে বিয়েতে সব মেয়েরাই কাঁদে। আজকে নিজে উপলব্ধি করতে পারছে কষ্টটা। ও মা মেয়ের মুখ দেখেই বুঝতে পারলো যে তার মন খারাপ। তাই মেঘলার বন্ধুদেরকে ওর পাঠিয়ে দিয়ে বললো একটু হাসিঠাট্টা করতে। এরকমভাবে আস্তে আস্তে আদিত‍্যর আসার সময় হয়ে গেল। এবার মেঘলা ওর আদি কে দেখার জন্য ছটফট করতে শুরু করলো।

সবাইকার মুখে চিন্তার ছাপ। সময় পেরিয়ে গেল, অথচ বরযাত্রীরা এসে পৌঁছালো না! রাস্তায় কোনো বিপদ হলো না তো আবার! মেঘলার মা বারবার ধরে ফোনে লাগাতে চেষ্টা করলো। কিন্তু ফোন যে নট রিচেবেল বলছে! এমন সময় হঠাৎ মেঘলার দাদা কানে ফোন নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এলো। বললো,” মা, মাসি আর পিসিমণি তোমরা তিনজনে আমার সঙ্গে এসো। আর বনু তুই তোর বন্ধুদের সঙ্গে থাক। ওরা এক্ষুনি চলে আসবে। আমরা আসছি একটু পরেই।” তারপর ওদের আড়ালে নিয়ে গিয়ে যা বললো তা শুনে ওরা হতভম্ব হয়ে গেল।

―এবার তাহলে কী হবে বাবা মৈনাক?
―মা তুমি চিন্তা কোরো না। ওরা এলে আমি বনুকে বুঝিয়ে বলবো। আর কোনোরকমে বুঝিয়ে সুঝিয়ে সাগরের সঙ্গে বিয়ে দেবো।
―কিন্তু ও কি সাগর কে বিয়ে করতে চাইবে? জানিসই তো আদিকে কতোটা ভালোবাসে!
―কিছু করার নেই মা। এবার তোমরা বরং যাও। নাহলে বনু আমাদের সন্দেহ করতে পারে। আর ওর সামনে কোনোরকম উত্তেজনা প্রকাশ করবে না।

আবার ওরা সবাই মেঘলার কাছে চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে নীচ থেকে মৈনাক ডাক দিয়ে বললো ওরা চলে এসেছে। সবাই ছুটলো নীচের দিকে। মেঘলাও উপরে বসে বসে অপেক্ষা করতে লাগলো। আর ভেবে ভেবে নিজের মনেই লজ্জা পেতে লাগলো। কিন্তু এ কি! উলুধ্বনি বদলে কান্নার রোল উঠলো কেন?মেঘলা উঠে গিয়ে জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করলো। দেখলো সবাই কোনো একটা কিছুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। কিন্তু জিনিসটা ঠিক বুঝতে পারলো না। তাই সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এসে সামনের ফাঁকা জায়গাটায় গিয়ে দাঁড়ালো। ওকে দেখে সবাই রাস্তা ছেড়ে দিলো। কেউ কেউ আবার কটু মন্তব্য করতে লাগলো।

কিন্তু মেঘলা কোনোকিছুরই অর্থ বুঝতে পারলো না। তাই কোনো কথায় কান না দিয়ে এগিয়ে গেলো। তারপর যা দেখলো তাতে আরেকটু হলেই মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে আদিত‍্যর দিকে এগিয়ে গেলো। তারপর আদিত‍্যর শরীরটাকে জড়িয়ে ধরলো দুহাত দিয়ে। কিন্তু চোখ দিয়ে একফোঁটাও জল বেরোলো না। শোকে পাথর হয়ে গেছে ও। একবার মুখ তুলে আদিত‍্যর দাদার দিকে তাকাল মেঘলা। তখন কাঁদতে কাঁদতেই কোনোভাবে তিনি বললেন,” বাড়ি থেকে বেরোলো মা কে প্রণাম করে। তারপর রাস্তায় একবার তোমাকে ফোন করার জন্য বললো। আমি ফোনটা জাস্ট বার করেছি। উল্টোদিক থেকে একটা ট্রাক খুব স্পিডে আসছিলো। ড্রাইভারটা মাতাল ছিলো। তাই সরাসরি আমাদের গাড়িতে ধাক্কা মারে। গাড়িটা উল্টে পড়ে পাশের হাইড্রেনে। আমি তার আগেই কোনোভাবে বেরিয়ে গেছিলাম। কিন্তু আদি আর গাড়ির ড্রাইভার একেবারে স্পট ডেড।”

 




 

মেঘলা আর কোনো কথা না বলে উঠে দাঁড়ালো। তারপর লজের গেট দিয়ে মেন রোডের দিকে হেঁটে গেল। হাঁটতে হাঁটতে একসময় রোডের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালো। এমন সময় কেউ একজন ওকে টেনে নিয়ে আসলো। মেঘলা ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখলো ওর দাদা। দাদার বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে শুরু করলো মেঘলা। এমন সময় হঠাৎ রাস্তার উল্টো দিকে চোখ গেলো। অশ্রুসিক্ত চোখে মেঘলা তাকিয়ে দেখলো অনেকটা আদিত‍্যর মতো দেখতে একটা আবছা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে আর সে বলছে,”দুঃখ পেও না মেঘা। আমি আছি তোমার সঙ্গে। হয়তো আমার শরীরটা আর নেই। কিন্তু আমার অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রেখো সারাজীবন। স্মৃতিতে নয়, তোমার হৃদয়ে থাকতে চাই। এ জন্মে হয়তো আমাদের মিল হোলো না। কিন্তু চিন্তা কোরো না, আমাদের মিল হবেই হবে। হয়তো পরের জন্মে, হয়তো তার পরের জন্মে, হয়তো তারও পরের জন্মে

…….।” বলেই কোথায় যেন মিলিয়ে গেল ছায়ামূ্র্তিটা। মেঘলা ওর দাদাকে ছেড়ে দিয়ে লজের দিকে এগিয়ে গেলো। তারপর লজে গিয়ে একটা রুমে ঢুকে দরজাটা লাগিয়ে দিলো। একে একে সব গয়না খুলতে শুরু করলো। একদম শেষে মাথায় মুকুট আর সিঁথিটা খুলে রেখে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো সে। তারপর কপালের চুলটা অল্প সরিয়ে আদিত‍্যর শেষ স্মৃতি চিহ্নটা বার করলো। ওর মনে পড়লো সেই এক বছর আগে দুর্গাপুজোয় সিঁদুরখেলার কথা। সেইবারে সিঁদুর খেলার সময় ও এক জায়গায় চুপচাপ দাঁড়িয়েছিলো। এমন সময় আদিত্য ওর হাত ধরে আড়ালে টেনে নিয়ে গিয়ে হাতে সিঁদুর নিয়ে ওর সিঁথি ভরিয়ে দিয়েছিলো। তখন থেকেই ও নিজেকে আদিত‍্যর স্ত্রী মনে করে। কিন্তু এই কথা ওরা ছাড়া আর কেউ জানেনা। এইসব ভাবতে ভাবতেই হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করে মেঘলা। এমন সময় মায়ের ডাকে ভাবনা ছেড়ে বাস্তবে ফিরে আসে মেঘলা। চোখের জলটা মুছে এগিয়ে যায় মায়ের দিকে।
―কিরে এখনও রেডি হোসনি? এদিকে তোর মাসিমণি  চলে এসেছে। তাড়াতাড়ি রেডি হবি যা।
―হ‍্যাঁ মা যাচ্ছি।

 




 

 

বলে দরজা বন্ধ করে দিয়ে রেডি হয়ে নীচে নেমে আসে মেঘলা। তারপর কিছুক্ষণ সবার সঙ্গে কথা হওয়ার পর একটু আসছি বলে ছাদে চলে যায়। ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর চাঁদের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে সে। দূরে কোথা থেকে যেন গান ভেসে আসছে― “ও কী ও বন্ধু কাজল ভ্রমরা রে
কোন দিন আসিবেন বন্ধু
কয়া যাও, কয়া যাও রে

যদি বন্ধু যাইবার চাও
ঘাড়ের গামছা থুইয়া যাও রে
ও বন্ধু কাজল ভ্রমরারে
কোন দিন আসিবেন বন্ধু
কয়া যাও, কয়া যাও রে।

বটবৃক্ষের ছায়া যেমন রে..
মোর বন্ধুর মায়া তেমন রে
বটবৃক্ষের ছায়া যেমন রে..
বন্ধুরে.. বন্ধুরে..
বটবৃক্ষের ছায়া যেমন রে..
মোর বন্ধুর মায়া তেমন রে
বন্ধু কাজল ভ্রমরারে
কোন দিন আসিবেন বন্ধু
কয়া যাও, কয়া যাও রে……….”

 *****সমাপ্ত******

 




গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total:    Average: /5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।