মলয়ের কন্যাদায়

মলয়ের কন্যাদায়

— আমিনুল ইসলাম

 

 

গোবরা; নড়াইল জেলার চিত্রা নদীর পাড়ের একটি গ্রামের নাম। এখানকার বেশির ভাগ মানুষ সনাতন ধর্মাবলম্বী এবং তারা জেলে। মলয় কুমার দে তাদেরই একজন।মলয় সাত সকালে ঘুম থেকে উঠে একটি বদনা হাতে নিয়ে বাড়ির পিছনে টয়লেটের দিকে যাচ্ছে। টয়লেটি ঝুলন্ত। চারিদিকে চটের বস্তা দিয়ে বেড়া দেওয়া হয়েছে। একটু এগোতেই সে হোঁচট খেয়ে মাটিতে পড়ে যায়। বদনাটি ছিটকে পড়ে গেলো। সে বলে উঠলো, ‘হায়, বগবান, আমার কোমরটা গেল রে।’সুচিত্রা দৌড়ে এসে বললো, ‘বাবা, তুমি দেখে চলতে পারো না?’‘মা, আমার জন্য এক বদনা জল এনে দে তো।’সুচিত্রা বদনাটি হাতে নিয়ে টিউবওয়েল থেকে এক বদনা জল এনে দিলো। তরপর মলয় তা হাতে নিয়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে টয়লেটে গেলো।মলয় টয়লেট সেরে ঘরে এসে মাছ ধরার জালটি খুঁটিতে খুঁটিয়ে দেখছে। গতকাল মাছ ধরার সময় জালটি সামান্য ছিঁড়ে গেছে।

আজ মাছ ধরতে যাওয়ার আগেই জালটি সেলাই কওে নিতে হবে।সুচিত্রা মলয়ের বড় মেয়ে। সংসারে বড় মেয়েদের অনেক দায়িত্ব নিতে হয়। সেও তাই করছে। সারাদিন একের পর এক কাজ করে যায়। সে একটি বাটিতে গুড় মুড়ি নিয়ে ওর বাবাকে এনে দিলো। এটা তার সকালের নাস্তা হলেও মাছ ধরার জাল নিয়ে বের হয়ে নদীর পাড়ের দোকানে বসে প্রতিদিন একটি বনরুটি ও এক কাপ চা খায়।সুচিত্রা ওর বাবার সামনে অনেকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। মলয় ঘাড় ফিরিয়ে বললো, ‘মা, কিছু বলবি?’সুচিত্রা বললো, ‘বাবা, আমার খুব পেট ব্যথা করিছে।’‘কেনো?’‘জানি নে বাবা।’‘গ্যাস্টিকের ব্যথা হতি পারে। আদার রস খেয়ে দেখ্ দেখি। ব্যথা কমি যাবি।’‘আচ্ছা, দেখবানে।’মলয়ের আরেক মেয়ের নাম সুমিতা। সুচিত্রা আর সুমিতা দু’জন পিঠাপিঠি। সুচিত্রার স্বাস্থ্য খুব ভালো হওয়ায় এখনই অনেক বিয়ের প্রস্তাব আসছে। এদেশের গ্রাম অঞ্চলে এখনো শতভাগ বাল্য বিয়ে বন্ধ করা সম্ভব হয় নি। তাছাড়া প্রান্তিক মানুষদের মধ্যে এর প্রভাব একটু বেশি। মেয়েদের বাবা-মা এখনো মেয়েদের বোঝা মনে করেন। বিয়ে দিতে পারলেই যেন দায়মুক্ত হন।

 




 

মলয়ও তার ব্যতিক্রম নয়। তার ইচ্ছা সুচিত্রাকে একটি ভালো ছেলের হাতে তুলে দিবে, কিন্তু সমস্যা হলো সবাই বড় অঙ্কের যৌতুক চায়। তার কাছে যৌতুক দেওয়ার মতো টাকা নেই। থাকবেই-বা কেমন করেÑসে একজন সাধারণ জেলে, অনেকটা দিনে আনে দিনে খায়। তার বাড়ি-ঘরের অবস্থাও তেমন ভালো নয়। কোনো রকমে দিন পার করছে। বাড়ি মেরামত করার টাকাও নেই। এই বাড়িটি তার বাবার বানানো। পুরানো টিনের চাল। চালে অসংখ্য ছিদ্র হয়ে গেছে। সামান্য একটু বৃষ্টি এলেই চাল দিয়ে জল ঢুকে, তখন সুচিত্রা ও সুমিতাকে ব্যস্ত থাকতে হয় ঘরের বিভিন্ন জায়গায় জগ, মগ, বালতি, পাতিল রাখতে, তা নাহলে পুরো ঘর জলে ভেসে যায়।গতবছর বর্ষাকালে মলয়ের স্ত্রী মারা গেছে। সেদিন আকাশে কালো মেঘ ছিল। মলয়ের স্ত্রী গোরুটি খুঁজতে বের হয়েছিল। কিছুক্ষণ পর ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো। সুচিত্রা ও সুমিতা বাড়ির দুই দিকে গোরু খুঁজতে বের হলো।

আর ওদের মা পশ্চিম দিকের বিস্তীর্ণ মাঠের দিকে গেলো। একসময় সে পশ্চিমের দূরের কোনো এক জায়গায় একটি গোরু দেখতে পায়, তারপর ক্ষেতের আইল ধরে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে গোরুটির দিকে যায়। হঠাৎ একটি বজ্রপাতে তার জীবন অবসান ঘটে।মলয়ের স্ত্রী বিয়োগের পর সে দু’মেয়েকে নিয়ে দিন কাটিয়ে দিচ্ছে। দুই মেয়ে মিলেমিশে থাকে, ওদের সম্পর্ক খুব ভালো।মলয় মাছ ধরার জাল ও দুটি ভোঁদড় নিয়ে চিত্রা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে গৌতম ও উত্তমের জন্য অপেক্ষা করছে। তারা তিনজন একসাথে মাছ ধরে।মলয়ের কাকা কমল দে এই পথ দিয়ে মন্দিরের দিকে যাচ্ছিলেন এবং মলয়কে দেখে বলে উঠলেন, ‘মলয়, কেমন আছিস?’‘ভালো। আপনি কেমন আছেন?’‘ভালো না।’‘কেন?’‘পাইলসের সমস্যাটা খুব বেড়েছে, এখনো রক্ত পড়ছে।’‘ভগবানের আশীর্বাদে ভালো হয়ে যাবেন, কাকা।’‘মলয়, তোকে আরেকটা বিয়ে করতে বলেছি। তুই তো শুনছিস না।

তবে বাকি জীবন একা একা কাটিয়ে দিবি নাকি?’মলয় উত্তর দিলো, ‘কাকা, আমাদের চৌদ্দ পুরুষের কেউ কী দ্বিতীয় বিয়ে করিছে?’‘না।’‘আমি নিয়ম ভাংতি পারবো না। আমাদের সনাতন ধর্মে দ্বিতীয় বিয়ের রীতি নেই।’‘তোর বউ মরিছে, তোর বিয়ে করতে সমস্যা নেই।’মলয়ের দ্বিতীয় বিয়ে করার কোনো ইচ্ছা নেই। সে এখন শুধু সুচিত্রা ও সুমিতার বিয়ে কথা ভাবছে। তাদের ভালো পাত্রস্থ করতে পারলে বাকি জীবন একা একা কাটিয়ে দিবে।গৌতম ও উত্তম চিত্রা নদীর পাড়ে চলে এলো। তারা মলয়ের খুড়তুতো ভাই। এক সাথে অনেকদিন মাছ ধরছে। তারা এখন বন্ধুর মতো, এক সাথে যেমনি মাছ ধরে, তেমনি পান-বিড়িও খায়। তিনজন নৌকা নিয়ে বের হলে একজন নৌকা বায়, বাকি দু’জন জাল দিয়ে মাছ ধরে। তাদের সাথে দুটি ভোঁদড় থাকে। ভোঁদড় দুটি মাছ ধরতে সাহায্য করে। ভোঁদড়ের গলায় সবসময় রশি বাঁধা থাকে।

পানিতে জাল ফেলার পর ভোঁদড়দের পানিতে ছেড়ে দেওয়া হয়। ভোঁদড় পানিতে ডুব দিয়ে মাছদের জালের কাছে তাড়িয়ে আনে। এরা এ কাজে প্রশিক্ষিত। ভোঁদড় দেখতে কিছুটা বিড়ালের মতো হলেও আকারে তাদের চেয়ে অনেক ছোট। এরা পানির নিচে ডুব দিয়ে মাছ ধরে খায়। ভোঁদড়ের প্রিয় খাবার হলো মাছ। চিত্রা নদী ও সুন্দরবনের কিছু জেলে এভাবে ভোঁদড় দিয়ে মাছ ধরে। ভোঁদড় দিয়ে মাছ ধরার পদ্ধতি পৃথিবীর আর কোন দেশে নেই। এ পদ্ধতিতে মাছ ধরা হয়তো অচিরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কারণ ভোঁদড় লালন-পালন করে তা দিয়ে মাছ ধরা জেলেদের আর পোষাচ্ছে না। তারা ইদানীং পেশা বদল করে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে।মলয় বলে উঠলো, ‘কিরে তোদের আসতি দেরি হলো কেন?’গৌতম বললো, ‘দাদা, বলো না। বাড়ি থেকে আসছিলাম, হঠাৎ রাস্তায় গুয়ের মধ্যে পা পড়লো। কোন শালা যে রাস্তার উপর হাগু করেছে?’‘শালীও হতি পারে।’‘শালা-শালী যেই হোক না কেন, আমার পায়ে লাগলে কিন্তু স্নান করতে হয়।’মলয় বললো, ‘আমি সেই কখন থেকে ভোঁদড় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। এখন গল্প করে আর দেরি করিস নে, মাছ ধরতে চল।’‘চলো, দাদা।’

 




 

সুচিত্রা ও সুমিতা বাড়িতে একা থাকে। ওরা অবসর সময়ে লুডু-সাপ খেলে সময় কাটায়। বিকাল বেলায় মলয় ভোঁদড় দুটি নিয়ে বাড়ি ফিরে। দু’বোন ভোঁদড়ের দেখাশোনা করে। একটি কাঠের বাক্সের ভেতরে তাদের রাখতে হয়। সারাদিন যে মাছ ধরা হয় তার এক তৃতীয়াংশ ভোঁদড় খায়। মাছগুলোকে ছোট ছোট পিস করে বক্সের ভিতরে দিতে হয়।মলয় সারাদিন মাছ ধরে সন্ধ্যাবেলায় বাড়ি আসে। একদিন মলয় মাছ ধরে সন্ধ্যায় বাড়ি এলো। সুচিতা ওর বাবাকে বললো, ‘বাবা, আজ এতো দেরি হলো যে?’‘বলিস না মা, আজ গোতম আর উত্তম মারামারি করেছে। তাদের ঝামেলা মিটাতে গিয়ে দেরি হয়ে গেলো।’‘এ আর নতুন কি, তারা তো কয়দিন পরপরই মারামারি করে।’‘ঘরে খাবার কিছু আছে?’‘দিচ্ছি, তবে আমার শরীরটা খরাপ, বাবা।’‘কি হয়েছে?’‘ক’দিন ধরে আমার বমি আসতিছে, সমস্যা বুঝতে পারছি নে।’কথাটি শুনে মলয় ভয় পেয়ে গেলো। সারাদিন বাড়িতে কে কে আসা-যাওয়া করে, তা জানা দরকার। মেয়েরা বাড়িতে একা থাকে। সে বিষয়টি খতিয়ে দেখবে বলে পরের দিন মাছ ধরতে না গিয়ে বাড়িতে থাকার সিদ্ধান্ত নিলো। উত্তম ও গৌতম সকালে এসে মলয়কে বলল, ‘কি, দাদা, এখনো ঘুমিয়ে আছো?’‘আজ, মাছ ধরতি যাতি পারবো না।

শরীরটা খুব খারাপ।’‘তাহলে আমরাও বাড়ি চলে যাই?’‘চলে যা-আগামীকাল সকালে চলে আসবি কিন্তু।’‘ঠিক আছে, দাদা।’গৌতম ও উত্তম চলে যাওয়ার পর মলয় সারাক্ষণ সুচিত্রাকে চোখে চোখে রাখছে। সে দুপুরে খাওয়ার পর বিড়িতে আগুন ধরিয়ে টানছে আর জানালা দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ছে, এমন সময় বলাইকে দেখতে পেলো। সে বাড়ির পিছনের জঙ্গলের দিকে যাচ্ছে। একটু পওে সুচিত্রাও বাড়ির পিছনের দরজা দিয়ে ওদিকে যাচ্ছে। মলয় চুপিসারে জঙ্গলের দিকে যেতেই বলাই ও সুচিত্রাকে এক সাথে দেখতে পেয়েছে। সে সুচিত্রাকে ডাক দেওয়ার সাথে সাথে বলাই এক দৌড়ে পালিয়ে গেলো। বলাই হলো সুচিত্রার দূরসম্পর্কের মাসতুতো দাদা। তার বয়স পঁচিশ বছর। কৃষিকাজ করে। তাদের আর্থিক অবস্থা ভালো ।মলয় সুচিত্রার বমি হওয়ার কারণ বুঝতে পারে।সে সুচিত্রাকে বললো, ‘বলাই কি তোকে বিয়ে করবি বলিছে?’‘জি, বাবা।’‘তাহলে আমি তাদের বাড়িতে তোর বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাচ্ছি।’পরের দিনই সুচিত্রার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে বলাইদের বাড়িতে গেলো মলয়। বলাই’র মা-বাবা সুচিত্রার সাথে বলাইকে বিয়ে দিতে রাজি আছে, তবে পঁচিশ হাজার টাকা যৌতুক দিতে হবে। মেয়ের চরিত্রে দাগ পড়তে পারে ভেবে সে বলাই’র অনৈতিক বিষয়টি তার মা-বাবার কাছে বলেনি, বরং সে যৌতুকের টাকা দিতে রাজি হয়ে তাদের বাড়ি থেকে ফিরে এলো।মলয় পঁচিশ হাজার টাকা জোগাড় করা নিয়ে ভাবছে।

তার দুটি ভোঁদড় আছে-প্রতিটি তিন হাজার টাকা বিক্রি করা যাবে। দুটি ভোঁদড় বিক্রি করলে ছয় হাজার টাকা হবে। একটি মাছ ধরার নৌকা আছে যা বিক্রি করলে হয়তো আরো দশ হাজার টাকা পাওয়া যাবে। সব মিলিয়ে ষোল হাজার টাকা জোগাড় করা যাবে, কিন্তু তার আরো টাকা লাগবে।মলয় সুচিত্রাকে দ্রুত বিয়ে দিতে চায়, কারণ ওর লক্ষণ ভালো নয়। সবাই জানাজানি হওয়ার আগে ওকে বিয়ে দিতে হবে, অন্যথায় মেয়ের সর্বনাশ হয়ে যাবে। সমাজে নাক কাটা যাবে। গরীব মানুষদের ইজ্জতটাই সব, আর তা হারালে আর কিছুই থাকে না।বাড়ি বন্ধক দিয়ে মলয় পনেরো হাজার টাকা নিলো এলাকার পয়সাওয়ালা অপূর্ব সাহা থেকে। যতদিন টাকা শোধ করা হবে না ততোদিন প্রতি হাজারে একশো করে সুদ দিতে হবে। টাকা পরিশোধ করতে না পারলে বাড়ির মালিক হবেন অপূর্ব সাহা।মলয় বাড়ি এলো। তার চেহারা বিমর্ষ। সুচিত্রা বললো, ‘বাবা, তুমি আমাকে বিয়ে দিতে এতো তাড়াহুড়ো করতিছো কেন?’‘আমি চাই আজই তোর বিয়ে হোক, টাকা জোগাড় হয়ে গেছে।’‘বাবা, তুমি ভোঁদড় ও নৌকা বেচে দিলে মাছ ধরবে কীভাবে?’‘এসব তোকে ভাবতে হবে না।’‘বাড়িও নাকি বন্ধক দিচ্ছো?’‘হ্যাঁ। বাড়ি বন্ধক দিয়ে আইছি।

’‘কী বলো বাবা?’‘হ্যাঁ, তোর বিয়েতে পঁচিশ হাজার টাকা যৌতুক দিতে হবি।’‘ওরা যৌতুক চাইছে নাকি?’‘হুঁ।’‘তাহলে আমি বলাইকে বিয়ে করতি পারবো না।’সুচিত্রার উপর মলয়ের খুব রাগ উঠলো, কিন্তু রাগ প্রকাশ করছে না। সে ভাবছে বউটা বেঁচে থাকলে আজ হয়তো তার এমন হতো না। বলাই তার মেয়ের এতো বড় ক্ষতি করতে পারতো না। সুচিত্রা বিষয়টি হয়তো জানেই না। কিন্তু সব লক্ষণেই বুঝা যাচ্ছে ওর পেটে বাচ্চা আছে।সুচিত্রা বলে উঠলো, ‘আমাকে বিয়ে দিলে তোমাদের কী হবি? তোমাকে কে দেখবি?’মলয় উচ্চস্বরে বলে উঠলো, ‘বলাইয়ের সাথে ফষ্টিনষ্টি করার সময় এসব মনে ছিলো না? তুই কি জানিস তোর পেটে বাচ্চা আসিছে?’‘তোমার কথা বুঝতে পারতিছি না, বাবা।’‘বলাই’র সাথে তোর কি শারীরিক সম্পর্ক হইছে?’সুচিত্রা মাথা নিচু করে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলো। মলয় কাছে এসে মেয়ের গালে কষে একটা চড় বসিয়ে দিয়ে বললো, ‘তোর বমি হচ্ছে, মাথা ঘুরাচ্ছে। এসব কথা কেউ জানলে আমাদের ইজ্জত থাকবি না। এ জন্যেই তাড়াতাড়ি বিয়ে দিচ্ছি।’মলয় রাগ দেখিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো। তার বাড়ির খুব কাছেই কালী মন্দির। সে কালী মন্দিরে ঢুকে মা কালীর কাছে মেয়ের মঙ্গল কামনা করছে। অসময়ে মন্দিরে আসায় মলয়ের এক কাকা বললো, ‘কিরে মলয়, এই অসময়ে মন্দিরে কেন?’‘তেমন কিছু না কাকা, একটু পূজা দিতে এলাম আরকি।’‘তা, মেয়েকে নাকি বিয়ে দিচ্ছো?’‘জি, কাকা।

 




 

পুরহিতকে বলেছি একটি শুভদিন বের করে দিতে। দিন-তারিখ ঠিক হলে আপনাকে নিমন্ত্রণ করবো।’‘তাহলে মলয়, যাই। আমার আবার মেলা কাজ আছে।’মন্দির থেকে বের হয়ে মলয় চিত্রা নদীর পাড়ে এলো। নদীর জলের দিকে তাকিয়ে সে আনমনে ভাবছে তার নৌকার কথা, ভোঁদড়দের কথা। এসব ভাবতেই তার চোখে জল টলমল করছে। নদীর স্রোতে কিছু কচুরিপানা ভেসে যাচ্ছে। পৃথিবীতে কিছু মানুষ কচুরিপানার মতো, সারাজীবন ভাসতে থাকে। মলয়ও তেমনই ভাসছে। ভাসতে ভাসতে কোনো এক সময় হয়তো জলে ডুবে যাবে। সুমিতা দৌড়ে এসে বললো, ‘বাবা, দিদি গলায় দড়ি দিছে। তাড়াতাড়ি বাড়ি চলো।’মলয় এক দৌড়ে বাড়ি এলো। বাড়ির পিছনের আম গাছের ডালে একটি রশিতে সুচিত্রা ঝুলে আছে।

মলয় ও সুমিতা গলা ফাটিয়ে কাঁদছে। তাদের কান্না শুনে গ্রামের অনেক মানুষ দৌড়ে এলো। মলয় জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যায়। ইউনিয়নের মেম্বার সাহেব পুলিশকে খবর দিলেন।সুচিত্রার আত্মহত্যা কারণ মলয় ছাড়া আর কেউ জানে না। কিন্তু এটি সে কাউকে প্রকাশ করলো না। সুচিত্রার আত্মহত্যার জন্য দায়ী হলো বলাই। এসব কথা বলে এখন আর লাভ নাই। মেয়ে ওপারে চলে গেছে। তাকে তো আর ফিরে পাওয়া যাবে না। তাছাড়া কারণটি সবাই জানলে পরে ছোট মেয়েকেও বিয়ে দিতে কষ্ট হবে।মলয়কে আর কিছু বেচতে হলো না, বাড়িও বন্ধক রাখতে হলো না। সুচিত্রা আত্মহত্যা করে ওর বাবা ও সুমিতার জীবন বাঁচিয়ে দিলো। এখন মলয় সুমিতাকে নিয়ে ভয় পাচ্ছে। ওকে বিয়ে দেয়ার আগ পর্যন্ত এই ভয় নিয়েই চলতে হবে।দুই বছর পর,বলাই’র বাবা-মা মলয়ের বাড়ি এলো। তারা বলাই’র সাথে সুমিতাকে বিয়ে দিতে চায়। বরাই’র বাবা মলয়কে বললো, ‘মলয়, এখন কোনো যৌতুক লাগবি না নে। তোমার তো আর কোনো ছেলে পুলে নাই। বিয়ের পর তোমার সবকিছুর মালিক তো বলাই-ই হচ্ছে, তাই নে? তাহলে যৌতুক দিতে হবি কেন?’‘দাদা, তা ঠিক বলিছেন।’‘তাহলে তুমি রাজি?’‘না, আমি সুমিতাকে বলাই’র কাছে বিয়ে দিবো না।’‘কেন মলয়?’‘দাদা, সব প্রশ্নের উত্তর বলতে নেই।’মলয় তাদের প্রস্তাবে রাজি হলো না, কিন্তু কারণও বললো না। সে মনে করে-কিছু কথা সবার জানা উচিত নয়। যে ছেলের জন্য সুচিত্রা আত্নহত্যা করেছে, সে ওর কাছে সুমিতাকে বিয়ে দিতে চায় না।

 




 

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total:    Average: /5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।