মা

মা

মা
১ম পর্ব
লেখক – AKKAS

হঠাৎ আবিরের চোখ দুটো আটকে গেল এক মহিলার দিকে। হাজার বিস্ময় আর অবিশ্বাস্য নিয়ে দেখতে লাগল মহিলাটিকে। মহিলাটি আর আবিরের দুরত্ব চৌরাস্তার এপাশ-ওপাশ। তার চোখের ভুল হবে এটা ভেবে শার্টের হাতা দিয়ে চোখজোড়া ভালভাবে কচলিয়ে কচলিয়ে ফের থাকাল সেদিকে। না ভুল না এটা তার পরিচিত। খুব পরিচিত মহিলা। না মহিলা বলা ভুল হচ্ছে এটা তার জন্মদায়িনী মা! যাঁর গর্ভে দশমাস দশদিন থাকার পর এই পৃথিবীর আলো দেখে আবির। যার মায়া-মমতায় আর পরম আদর-স্নেহে বড় হয়েছে আবির। না আর ভাবতে পারছেনা আবির এসব তার জন্মদাতা জননীকে এই অবস্থায় দেখে।

রিক্সাওয়ালাকে চৌরাস্তার সেই মুখে নিয়ে যেতে বলল যেখানে তার মাকে দেখল। হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল তার মায়ের সামনে মুখ দেখানো যাবেনা। কারণ মা শপথ করছিল আবিরের মুখ জীবনে কোনদিন দেখবেনা! কিন্তু মায়ের এ অবস্থা তাকে এতই ভাবিয়ে তুলল যে সেই কথা ভুলে যেতে যাচ্ছিল। এদিক-সেদিক থাকিয়ে রিক্সাওয়ালাকে থামাতে বলে পাশে হকারের দোকান থেকে মাস্ক নিয়ে আবার রিক্সায় উঠে বসল।

যতই কাছে যেতে লাগল মায়ের পরিবর্তন স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হতে লাগল। এই কয়েক বছর মাকে বাস্তবে দেখেনি কিন্তু মায়ের ছবি কখনো তো ভুলার নয়। তবুও তার বাড়ির শয়নকক্ষে মার বেশ কয়েকটা ছবি বর্তমান। ঐসব ছবি আর এখন বাস্তবে আকাশ-পাতাল তফাৎ। এমন অবস্থা যে মায়ের ছবিগুলো না থাকলে বুঝা যেতনা আর আবির হয়ত চিনতে ও পারতনা তাঁর মাকে।

বয়স নাকি বর্তমান পরিস্থিতি মার এই অবস্থা বুঝা যাচ্ছেনা। কপালে চিন্তার চাপ সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান।
পুরাতন আর নিন্মমানের একটা শাড়ি গায়ে জড়িয়ে আছে। পায়ে কোন জুতা বা সেন্ডেল নাই। উদুম খালি পায়ে মাকে বড্ড বেমানান লাগছে। মুখ দেখা না যায় মত শাড়ির আঁচল টেনে দিয়ে মা একটি জুয়েলার্সের দোকানের দোকানদারের সাথে কথা বলছে। আবির ঐ দোকান থেকে ৮-১০ হাত দুরত্বে দাড়িয়ে সুতীক্ষ্ম নজরে সব খেয়াল করছে আর দেখে যাচ্ছে। দোকানদারের সাথে মা কি কথা বলছে তা শুনার জন্য রিক্সাওয়ালাকে আরেকটু সামনে আগাতে বলবে এই মুহুর্তে ফোনটা বেজে উঠল।

আবিরের স্ত্রী শ্রুতির ফোন ছিল। প্রথমবার কেটে দিয়ে ফোনটা পকেটে রাখতে যাবে ঐ অবস্থায় আবার ফোন আসাতে রিসিভ করে পরে কথা বলবে বলে রেখে দিয়ে সামনে থাকাতে কলিজার মধ্যে কেমন যেন ধক করে উঠল!

আবির সামনে থাকিয়ে দেখল মা নেই! কোথায় যেন চলে গেল। এদিক-ওদিক খুঁজতে লাগল কিন্তু দোকান থেকে বের হয়ে কোথায় যেন চলে গেল বুঝতেই পারেনি। আপনা-আপনি শ্রুতির উপর রাগ হতে লাগল। ওর ফোন না আসলে কোথায় যাচ্ছে দেখতে পারত। কোথাও হারতে দিত না। রিক্সাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করতে সে খেয়াল ই করেনি বলে জানিয়ে দিল। আর কিছু না ভেবে সিদ্ধান্ত নিল ঐ জুয়েলার্সের দোকানে গিয়ে মার কথা জিজ্ঞেস করবে এটা ভেবে নিল আবির। চিন্তা করতে লাগল কিভাবে বলবে মার কথা দোকানদারকে।
কারণ হুট করে তো আর একটা মানুষের কথা জিজ্ঞেস করা যায়না। তাই একটু বুদ্ধি খাটিয়ে অবশেষে চিন্তা-ভাবনার অবসান ঘটিয়ে রিক্সা থেকে নেমে আবির দোকানে ডুকে বলল,

আপনাদের দোকানে নতুন কালেকশনের ভারী গহনা কি আছেন?

অনেক আছে নতুন মডেলের। আপনি বসুন দেখাচ্ছি।

আপনাদের দোকানে আজকাল তো খুব ভিড় মনে হচ্ছে। আমি দোকানের সামনে অনেক্ষণ ধরে অপেক্ষা করে ছিলাম। একটা মহিলা ছিল তাই ডুকিনি।

আর বলিয়েননা ভাই, কোত্থেকে যে আসে এরা।

কেন?

মহিলাটির কিছু পুরনো গয়না আছে সেগুলো নাকি বিক্রি করবে….

সেতো ভাল কথা। ওনার গয়না আছে বিক্রি করবে আপনি নিলে নিবেন না নিলে নাই…..

আরে মিয়া শুনেন ওই মহিলা বলছে কালকে সে গয়না গুলো আনবে আর আজ নাকি তার আগাম টাকা লাগবে। ১০০০ টাকা দিতে বলছে কাল গয়না এনে শোধ দিবে বলছে।

তো টাকা দিছেন?

আরে আমাকে কি পাগলা কুত্তা কামড়াইছে নকি যে এত পাগলামি করব? মহিলাকে সোজা বলে দিলাম গহনা ছাড়া টাকা পাবেনা।

তো ওনি কি বলল?

কাল গয়না নিয়ে আসবে বলছে।

ওহহ ভাল। কি হয় দেখেন।

আবিরের জন্য নতুন কালেকশনের গয়না বের করতে করতে উক্ত আলাপ তারা করল আর আবির তার মাকে ফিরে পাওয়ার একটা উপায় খুঁজে পেল মনে হয়।

গয়না দেখার ভান ধরে যে আবির তার মার খোঁজ নিতে আসল সেটার একটা সুরাহা করতে পেরে আবির তার সামনে মেলে দেওয়া গয়নাগুলো হালকা নেড়ে-ছেড়ে দেখে পরে আসবে বলে দোকান থেকে বেরিয়ে আসল আর সোজা রিক্সায় গিয়ে বাড়ির পথ ধরল। মাথায় আকাশ সমান ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে আবিরের।

মাকে এভাবে দেখলাম কেন?
মায়ের এ অবস্থা কেন?
মা, ভাই-ভাবি ভাল থাকার জন্য তো আমি আবিরের আজ এ অবস্থা। কত বছর মা ডাকতে পারিনি। আজ মায়ের চেহারাটা দেখে মনে হল সবকিছু ওলট-পালট হয়ে গেছে। মা কি তবে সুখী নেই? ভাইয়া-ভাবি কোথায়?

স্যার আপনার বাসার সামনে এসে পড়ছি নামেন।
ওহহ, বলে ভাড়া মিটিয়ে বাসার দিকে পা বাড়াল আবির।

কলিং বেলের শব্দ শুনে শ্রুতি দরজা খুলে আবিরের অবস্থা দেখে পুরো থ হয়ে গেল। কারণ তার স্বামীকে এই অবস্থায় কখনো দেখেনি শ্রুতি। চোখ মুখ লাল মনে হয় কান্না করছে অনেক। চেহারাটা শুকিয়ে খুব বাজে হয়ে গেল।

শ্রুতি কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবে এমত অবস্থায় হঠাৎ আবির শ্রুতিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হু-হু করে কান্না শুরু করে দিল। শ্রুতিও নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলনা সেও আবিরকে শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে কান্না করতে লাগল। আর কান্না মাখা আদুরে কন্ঠে “জিজ্ঞেস করল আমার বাবুটা কি হয়েছে?”

কিছু না বলাতে আরো দুবার বলার পর আবির মা বলে শব্দ করে আবার কান্না করে দিল।

মা মানে?কি হল আবির তোমার?

আমার মাকে দেখলাম আজ!

কি?

মাকে দেখলাম খুব বাজে ভাবে। তারপর আবির সব ঘটনা খুলে বলতে লাগল।

সব শুনে শ্রুতি বলল আচ্ছা কাল তো আসবে বলছে মা তাহলে কাল চল আমি ও যাব তোমার সাথে গিয়ে ওনি কোথায় থাকে সব বিস্তারিত জেনে নেব। আর সম্ভব হলে এখানে নিয়ে আসব।

এখানে আসবেনা মা। মা তো আামকে তার সামনে মুখ না দেখাতে বলছিল। আমি বাড়ির সবার শত্রু হয়ে গেছিলাম।

চলুন ফিরে দেখা যাক সে সময় যখন আবির তার বড় ভাই নিবিড় আর মা শাহিনা বেগমের পরিবারের।

আবির তার বাবাকে দেখেনি। আবির জন্মের আগে তার বাবা মারা যান এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায়! শাহিনা বেগমের পেটে তখন তার দ্বিতীয় সন্তান আবির। আর বড় সন্তান সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। তাদের আর্থিক সচ্ছলতা বেশ ভাল ছিল। অনেক সম্পত্তি ছিল আর শাহিনা বেগম সরকারি চাকরিজীবি ছিল বিধায় সেদিকে কোন চিন্তা ছিলনা। সম্পত্তির লোভে অনেকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল কিন্তু এক বাক্যে শাহিনা বেগম না বলে দিয়েছিল। তার শুধু একটা শ্বপ্ন ছিল আবির আর নিবিড়কে মানুষের মত মানুষ করে গড়ে তুলবে।

দিন, মাস, বছর করে করে বেশ কয়েক বছর পেরিয়ে যায়। কর্মস্থল থেকে শাহিনা বেগম অবসর গ্রহণ করেন। বড় ছেলে নিবিড় ডাক্তারিতে এমবিবিএস করে বের হয়ে সরকারি মেডিকেলে সেবা দিতে থাকে। ছোট ছেলে আবির এইচএসসি পাশ করে রেজাল্টের জন্য অপেক্ষায় আছে।

বড় ছেলের বিয়ের জন্য ইতিমধ্যে তোড়জোড় শুরু হয়। এটা নিবিড়ের কানে যেতে সে জানিয়ে দেয় তার পছন্দের একজন আছে এবং তারা বিয়ে কটতে চাই।

পরবর্তীতে দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে হয়ে যায় নিবিড় আর তার পছন্দ করা মেয়ের সাথে।

বিয়ের পর থেকে আবিরের সাথে নিবিড়ের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ঝগড়া শুরু হতে থাকে।
বিয়ের পরে কিছুদিন ভাল সম্পর্ক ছিল কিন্তু তার পরে সব বিষয় নিয়ে ঝগড়া লেগে থাকত।
মা কাছে থাকলে ভাল ব্যবহার করত আর মা যখন থাকত না তখন ঝগড়া হত। এই ঝগড়া আস্তে আস্তে সর্বগ্রাসীতে রুপ নিল। তার প্রধান কারণ হলো সম্পত্তির লালসা। নিবিড় সব সম্পত্তি একা পেতে চাইত। আর তার সদ্য বিয়ে করা বউ এতে শামিল হল।

উভয়ই সিদ্ধান্ত নিল চরম খারাপ ভাবে ফাঁদে ফেলতে হবে আবিরকে। সেমতে ওরা প্লান সাজাল।

তার কয়েকদিন পরের ঘটনা,
সন্ধ্যে বেলা শাহিনা বেগম বড় ছেলের রুম থেকে বড়-সড় আওয়াজ শুনতে পেয়ে তারাতাড়ি ওর রুমে গিয়ে দেখে আবিদকে মেঝেতে ফেলে লাথি মারছে নিবিড়। আর আবির জোরে জোরে কান্না করে বলতেছে “না ভাইয়া তোমরা আমাকে ভুল বুঝতেছ, খারাপ ভেবোনা আমাকে। আমি ভাবিকে সম্মানের চোখে দেখি, খারাপ নজরে কখনো দেখিনি, তাকে আমি বোনের জায়গায় স্থান দিছি”!

শাহিনা বেগমকে দেখে ততক্ষণে মারা বন্ধ করে নিবিড় মাকে বলল “এই বেয়াদব টা আমার ভাই নই। এ কি করছে জান? তোমার বউমাকে কু-প্রস্তাব দিছে। ওকে বেশ কয়েকদিন ধরে খারাপ কথা বলে আসছে, নানা রকম খারাপ আচরণ করে, আর খারাপ-প্রস্তাব দে।
আকার ইঙ্গিতে এতদিন বুঝাতে চেয়েছিল তোমার বউমা আমাকে কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি। আজ দেখলাম হঠাৎ ও আমার রুমে ডুকে তোমার বউমাকে জড়িয়ে ধরে,,,,,, মা আর বলতে পারবনা আমি”

সব শুনে শাহিনা বেগম যেন থ-মেরে গেল!
তারপর বউমাকে ডেকে নাম বিড়ের বলা সব কথার সত্যতা যাচাই করে আর দেরি করেনি, সময় দেয়নি কিছু জিজ্ঞেস করার আবিদকে। তার ছেলে এরকম কাজ করবে শ্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি।
মার দুহাতে, দুপায়ে যা শক্তি ছিল যতক্ষণ শক্তি ছিল এমন মাইর দিল যে তা ভাবতে এখনো আবিদের ভয়ে সারা শরীর শিউরে ওঠে।

সেদিন ই আবিরকে ওই ঘর ছাড়তে হয়েছিল। মা তাকে ১ ঘন্টা ও সময় দেয়নি। সমস্ত কাপড়-চোপড় রুম থেকে এনে উঠোনে ফেলে দিল, তার সামনে তার সব কিছু ফেলে দেওয়া হল। আর মা ঘোষণা দিল “আবির যেন জীবনে আর কখনো তার সামনে মুখ না দেখায়।”

সেদিন আবির ওই বাড়ি থেকে চলে এসেছিল। করেনি কোন অভিযোগ। কার বিরুদ্ধে করবে অভিযোগ?
এরা যে তার রক্তের অংশ!

বাসে উঠেছিল কিছুটা ভয় শিহরণ আর অজানা গন্তব্যে নিজেকে নতুনরূপে আবিষ্কার করতে। সবার কথা মনে করে বাসে কান্না করার এক পর্যায়ে তার পাশের সিটে থাকা ভদ্রলোক তার থেকে সব কথা শুনেন। তারপর ঐ ভদ্রলোক আবিরকে তাদের বাড়িতে নিয়ে যায়, এবং তার মেয়েকে পড়াতে বলেন বিনিময়ে তার সব খরচ ওই ভদ্রলোক বহন করেন।

ভদ্রলোক নিজের ছেলের মত মানুষ করে আবিরকে। পরে ভদ্রলোকের একমাত্র কন্যা শ্রুতির সাথে বিয়ে দেন আবিরের।

পরেরদিন খুব ভোরে আবিরকে ডেকে দিল শ্রুতি আর বলল নাস্তা তৈরি ফ্রেশ হয়ে খেতে আসতে। খাওয়ার পর রেডি হয়ে মোটামুটি ৮.৩০ এর দিকে দুইজনে বের হল আর কালকে দেখা সে চৌরাস্তার মোড়ে চলে গিয়ে দেখল দোকান সবেমাত্র খুলতেছে ওই দোকানদার।

ঐ জুয়েলার্সের দোকানের পাশে একটা চায়ের দোকানের টঙ এর উপর বসে চা খেল। তারপর অপেক্ষা করতে লাগল।

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলনা।

শ্রুতি দেখ ওই যে মা বলে দৌড়ে সেদিকে যাচ্ছিল আবির। কিন্তু শ্রুতি বাঁধা দিয়ে বলল দাড়াও কি করে দেখ মা আর ফলো কর। মা কোথায় যায় দেখ।

বেশ কয়েক মিনিট পর মা বের হল আর ওনার পিছু পিছু রিক্সা নিয়ে দেখতে লাগল কি করে কোথায় যাচ্ছে তার মা।

প্রায় ১৫-২০ মিনিট হাটার পর মা যেখানে গেল তা দেখে ঝর-ঝর করে দু-চোখ বেয়ে শ্রাবণের দ্বারা নামতে লাগল! সাথে সাথে শ্রুতিও কান্না জুড়ে দিল!
আর,,,

লেখক – Akkas Khan [AKKAS]

(ফোনের সমস্যার কারণে বানান ভুল থাকতে পারে। আশা করি বানান ভুল গুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন)

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 1   Average: 5/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।