মুখেভাত

মুখেভাত

#গল্প
#মুখেভাত
✍#ঝিলিক_মুখার্জী_গোস্বামী
🔶🔶🔶🔶🔶🔶🔶🔶🔶🔶

ভেলভেটের কাপড়ে মোড়া লাল রঙের অ্যালবাম টা আজও একইরকম ভাবে ঔজ্জ্বল্যতার সাথে সুখ স্মৃতি বহন করে চলেছে। ছবি গুলো বারবার দেখলেও যেন আশা মেটে না, সুরঞ্জনার। অ্যালবাম টা অনেক যত্নে রেখেছে সে। একটা কোথাও কাটাকুটির দাগ তো দূর কালো ছোপ ও ধরতে দেয়নি ছবি গুলোর ওপর। আলসে দুপুরের আলসেমিকে সঙ্গী করে অ্যালবাম টা দেরাজ থেকে টেনে নিয়ে ছবি গুলো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে। কখন স্মৃতির দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে নিজের অজান্তেই। হুঁশ ফিরল কলিং বেলের আওয়াজে। বেডরুম থেকে বেরিয়ে মূল দরজায় এসে দেখল, সুরঞ্জনার একমাত্র সন্তান বাবু ঘেমে-নেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গ্রীষ্মের দুপুরে বেজায় কাহিল সে। দ্রুত পদে চাবি খুলে বাবু কে নিমেষে ঘরে নিয়ে এল।

বাবুর বাবা মারা যাওয়ার পর, মা-ছেলে মিলে নিজেদের মতো করে একটা ছোট্ট দুনিয়া বানিয়ে নিয়েছে। না আছে কোনো অভাব। না আছে কোনো অভিযোগ। দু’টি হাস্যমুখ সর্বদা জ্বলজ্বল করছে। মনের গভীরের ক্ষত ঢেকেছে সদাহাস্য মুখ।

ফ্রেশ হয়ে, দুপুরে খাবার টা খেয়ে মা-ছেলে মিলে ঠান্ডা ঘরে গল্পগুজবে মত্ত। বাবুর চোখ গেল লাল অ্যালবামটার দিকে। নজর পড়তেই টেনে নিল সে। সুরঞ্জনাকে অনেকবার লক্ষ্য করেছে এই অ্যালবাম আঁকড়ে বসে থাকতে। কারণে -অকারণে অ্যালবামের পাতা ওল্টাতে দেখেছে, তার মা কে। সে ভালো মতো জানে অ্যালবামে কি আছে। ছোট্ট বেলায় তার মা তাকে অনেকবার দেখিয়েছে সে অ্যালবাম। তখন সে সদ্য ফোটা একটা কুঁড়ি। তারপরেও বার কয়েক দেখেছে। কিন্তু সেরকম গুরুত্ব দেয়নি।

একটার পর একটা পাতা ওল্টাচ্ছে। আর মুচকি মুচকি হাসছে। একটা ছবিতে দেখল, ফুটফুটে একটা বাচ্চার মাথায় টোপর লাগানো। পরনে ধুতি পাঞ্জাবী। ঠিক যেন বর বর। ছবিটা দেখেই মা’র দিকে তাকাল। সুরঞ্জনা বেশ বুঝতে পারল, ছেলের চোখের ভেসে ওঠা প্রশ্ন কে। অ্যালবাম টা টেনে নিয়েই সুরঞ্জনা বলে উঠল,

-‘কত কিউট ছিলি’।
-‘বেশ লাগছিল তোকে’।

বাবু অমনি বাচ্চার মতো বায়না করে উঠল,

-‘বলো না মা সেই গল্প’।

সুরঞ্জনা, ছেলের মাথায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে বলে ওঠে, ‘তোর সেই গল্প শোনার নেশা এখনো গেল না। শোন তবে সেই গল্প’।

বাবু,ছোট বেলার মতোই দু’গালে দু’টো হাত রেখে পরিপাটি হয়ে বসল। ছেলের ছেলেমানুষি দেখে ঠোঁটে একটা মুচকি হাসি টেনে সুরঞ্জনা ভাবল, এ ছেলে আর বড়ো হবে না। সারল্য যেন তার ছেলের মুখে এখনো স্পষ্ট। যদিও মনে মনে খুশিই হল সে।

ছেলের গল্প শোনার আব্দারে কখনও ই না করেনি সুরঞ্জনা। বেশ জানে এ তার ছেলের পুরোনো অভ্যাস। যখন প্রতিটি বাচ্চা মোবাইলে নানান রকম গেম নিয়ে সময় কাটাত। বাবু ছিল ঠিক তার উল্টো। মা’র কাছে আব্দার জুড়ত গল্প শোনার। পছন্দের তালিকায় সর্বোচ্চ স্থানে থাকত, ভূতের গল্প। রোজ বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলতে হত, সুরঞ্জনা কে। আজও ছেলের আব্দার পূরণ করতে,

-‘ তুই যখন জন্মালি আমি যেন পৃথিবীর সব সুখ পেয়ে গেলাম। ওটি তে অর্ধ অজ্ঞান অবস্থায় ও আমার মুখের হাসি দেখে ডাক্তার বাবু তারিফ করেছিলেন আমার সাহসের। আমার সমস্ত ব্যথায়, সমস্ত যন্ত্রণার ঔষুধ যে তোকে পেয়েছি তখন। পাঁচদিন পর বাড়ি ফিরলাম প্রাইভেট হাসপাতালে থেকে। ফুটফুটে এক রাজপুত্রের মা হয়ে। তোর দাদু, বাবা সবাই কতটা যে খুশি ছিল! বলে বোঝাতে পারব না। এরপর আস্তে আস্তে তুই বড়ো হতে থাকলি। সাত মাসে এসে পৌঁছোলি। আমাদের বাড়ির নিয়মকানুন অনুযায়ী তোর এবার ভাত খাবার পালা।’

এটুকু বলে থামল, সুরঞ্জনা। বোধহয় একটু ঢুলু ঢুলু চোখ। বাবু বলে উঠল, ‘তারপর বলো মা’। ছেলের কথায় সুরঞ্জনা,

-‘খুব মজা লাগছে না’!

-‘ আমাদের ফ্ল্যাটবাড়িতে বিস্তর জায়গার অভাবে একটা বাড়ি ভাড়া করা হ’ল। তারিখ ঠিক হ’ল ৭ই জুলাই তোকে ভাত খাওয়ানো হবে। সবকিছু ঠিকঠাক করতে করতে সেই দিন উপস্থিত হ’ল। বাড়ির সবাই প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে ভাড়া বাড়িতে চলে গেলাম। সাথে আমাদের রাজপুত্র’।

বাবু হঠাৎই বলে ওঠে,

-‘আমি রাজপুত্রই ছিলাম মা। চুলগুলো কি সুন্দর ঝাঁকড়া ছিল। কাল্পনিক নয় মা, বাস্তবের রাজপুত্র আমি’।

ছেলের কথায় সুরঞ্জনা এবার না হেসে পারলে না। হো হো করে হেসে উঠে ছেলের চুলে আঙ্গুলের বিলি কাটতে কাটতে বলল,

-‘তুই তো আমার রাজপুত্তুর ই’।

তারপর শোন বলে যোগ করল,

-‘ সারা বাড়ি নীল-সাদা বেলুন দিয়ে সাজানো হয়েছিল। মূখ্য দরজায় ফুল দিয়ে গেট বানিয়ে সেখানে লেখা ছিল, ‘কিগানের শুভ অন্নপ্রাসন’।

বাবু এবার একটু অন্যরকম প্রশ্ন করল, সুরঞ্জনাকে

-‘তোমার আর বাবার কি আর্জেন্টিনা ফুটবল ক্লাব খুব প্রিয় ছিল’?

ছেলের কথা প্রথমটা বুঝতে পারেনি সুরঞ্জনা। আবারও হো হো করে হেসে উঠে বলল,

-‘বেলুনের রঙের জন্য বলছিস’?
-‘তা তো প্রিয় ছিলই’।
-‘মেসিও আমাদের দু’জনের খুব পছন্দের ছিল’।
-‘তার কারণে অবশ্য তোর অন্নপ্রাশনের বেলুন নীল-সাদা করা হয়নি’।

বাবু একটু হেসেই বলল,

-‘তাই বলো’।
-‘আমি ভাবলাম……..’

স্নেহমাখা হালকা ধমকের সুরে সুরঞ্জনা ছেলেকে থামিয়ে বলে উঠল, ‘তুই শুনবি কি গল্প’?

বাবু মুখ চেপে ফোক্কড়ের মতো হাসতে হাসতে বলল,

-‘বলো বলো’।
-‘রাগ করেনা আমার সোনা মা’।

সুরঞ্জনা, ছেলের এহেন ব্যবহারে রীতিমতো একটু জোরেই হেসে উঠে বলতে শুরু করল,

-‘ শুরু হ’ল নানারকম পূজাচারের অনুষ্ঠান। নিমন্ত্রিত দের তালিকায় অনেকেই ছিল। সব থেকে মূল্য বান যারা ছিল……..’

সুরঞ্জনাকে খানিক থামিয়ে, বাবু অবাক চোখে জিজ্ঞেস করে, ‘ কারা ছিল মা’?

‘বলছি’ বলে সুরঞ্জনা বলে ওঠে, তার আগে এটা শোন।

-‘একটা থালায় বই-পেন-টাকা-মাটির ঢেলা সমেত একটা জিনিস তোর সামনে রাখা হয়েছিল। মজার ঘটনা হ’ল সেখান থেকে তুই কোন জিনিসটা তুললি জানিস’?

গালে হাত দিয়ে প্রশ্নচিহ্ন নিয়ে অবাক চোখে বসে আছে বাবু। সুরঞ্জনা বুঝতে পেরে বলে ওঠে,

-‘সবকিছু ছেড়ে মাটির ঢেলাটা তুললি। উপস্থিত সবাই বলে উঠল তুই নাকি ইঞ্জিনিয়ার হবি’।

-‘তুমিও কি তাই চেয়েছিলে মা’?

বাবুর কথায় সুরঞ্জনা বলে ওঠে,

-‘আমি চেয়েছিলাম তুই মাটির মতো মানুষ হো। আর তুই যেটা ভালোবেসে করবি, আমি মেনে নেব’।

সুরঞ্জনার গলা জড়িয়ে বাবু ব’লে ওঠে,

-‘তোমার মতো মা পেয়ে আমি ধন্য’।
-‘তোমার সাপোর্ট এর জন্য আজ আমি গানের সাথে ছবিতে, জীবনের ক্যানভাসে রঙ তুলি দিয়ে রঙিন করে তুলেছি’।

-‘আচ্ছা হয়েছে অনেক তত্ত্ব কথা। এবার একটু ঘুমোতে দে আমায়’।

মা’র কথায় বাবু বলে ওঠে,

-‘তুমি বললে না তো আমার অন্নপ্রাশনে বিশেষ কারা এসেছিল’!

-‘ও হো। আমি ভাবলাম ভুলে গেছিস’, বলে সুরঞ্জনা গল্পের শেষ অংশ যখন বলা শুরু করল বাবুর চোখের কোন চিকচিক করে উঠল।

-‘তোর ঠাকুরদা তোর মুখে প্রথম ভাতটা দিল। তুই বেশ চুকচুক শব্দ তুলে ফোকলা মুখে খাচ্ছিলি। মুখে নূতন স্বাদ লাগায় বেশ আনন্দ পেয়েছিলি। এরপর সেই বিশেষ জনদের তোর কাছে নিয়ে আসা হ’ল। আমার ইচ্ছেতে ওরাও তোর মুখে ভাত তুলে দেয়। একটা অনাথ আশ্রম থেকে গুটিকয়েক বাচ্চাকে আমন্ত্রিত করে এনেছিলাম। ওরা, তোর সাথে খুব আনন্দ করেছিল। অনেকে ভুলভাল কথা বলেছিল। আমি সে সব বিশেষ পাত্তা দিইনি। তুই ও বেশ ওদের সাথে খেলা করছিলি’।

সুরঞ্জনার কথা শেষ হ’লে বাবু ধরা গলায় বলে ওঠে,

-‘আমার কাছে তোমার মতো মা আছে। যাদের কাছে নেই তাদের জন্য আমি কিছু করতে চাই মা’।

ছেলের এরকম মন্তব্যে এক বিশেষ অনুভূতি অনুভূত হয়েছিল সুরঞ্জনার। গর্বিত মা। আনন্দিত মা। ছেলের মুখেভাতের দিন মনে মনে সুরঞ্জনা চেয়েছিল, ছেলে মাটির মানুষ হোক। সার্থক তার চাওয়া।
_______________________________________

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 0   Average: 0/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।