মেমসাহেব

গল্পের নাম মেমসাহেব

লেখক—ভিক্টর ব্যানার্জী

 

 

বিদিশা বলল—“আজ কলেজ যাবে না?”
—“নাহ্ মুড নেই।”
—“অনেক কষ্ট করে আবার চাকরিটা জোগাড় করেছ। এভাবে কামাই কোরো না। আমি ভাত বেড়ে দিচ্ছি খেয়ে বেরিয়ে পড়ো।”
অগত্যা ভাত খেয়ে বেরিয়ে পড়ল প্রফেসর।
আয়নার সামনে চুল বাঁধতে বাঁধতে বিদিশার মনে পড়ে গেল সেদিনের কথা……..

বিদিশা তখন পিসির বাড়ি এলাহাবাদ থেকে ফিরে এসে দেখল,বাড়িতে নতুন ড্রাইভার রাখা হয়েছে। নাম—সঞ্জু, বয়েস এই তিরিশের কাছাকাছি, ফর্সা,লম্বা,স্বাস্থ্যবান চেহারার যুবক।
বিদিশা তাকে সরাসরি বলল—“তুমি বুঝি এ সপ্তাহে জয়েন করেছ?”
সে মাথানিচু করে ঘাড় নেড়ে বলল—“হ্যাঁ মেমসাহেব।”
—“আমার কথা শুনেছ নিশ্চয়ই?”
—“হুম,সাহেব বলেছেন।”

 




 

—“বেশ তাহলে এবার থেকে তুমিই আমায় কলেজে পৌঁছে দেবে।”এই বলে সে ভেতরে চলে গেল।
ডাক্তার নীলাদ্রি শেখর তলাপাত্রের একমাত্র কন্যা বিদিশা তলাপাত্র। সময়টা ষাটের দশক। আজকের মতো সে সময় মেয়েদের জিন্স-টপ পরে কলেজে যাবার রীতি ছিল না। হয় শাড়ি, নয়তো চুড়িদার। তার ওপর বিদিশার বাবা ডাঃ তলাপাত্র সেইসময়কার নামী ডাক্তার। যাইহোক, তাকে রোজই অ্যাম্বাসাডার গাড়ি করে কলেজে পৌঁছে দিয়ে আসা,নিয়ে আসার কাজ করতে লাগল সঞ্জু।
সে সবসময়ই ড্রাইভারের পাশের সিটে বসত। সামনে বসে যাওয়ার মজাটাই আলাদা।
একদিন কথায় কথায় সে সঞ্জুকে বলল—“আচ্ছা সঞ্জু, তুমি বিয়ে করেছ?”
সে বলল—“না মেমসাহেব।”
ড্রাইভারদের ব্যাপারে মালিকদের জানার কোনো আগ্রহই ছিল না। তারা বিয়ে করল, না নিকে করল, তাতে মালিকের বয়ে গেল। বিদিশা তাদের দলে পড়ত না। সে কিন্তু বাড়ির সমস্ত কাজের লোকের নাড়ি নক্ষত্র ভালো করে জেনে নিত। তার ওপর আবার স্বভাবটা ছিল একটু জেদী প্রকৃতির, কোনো কিছুর প্রতি আকৃষ্ট হলে,সেটা চাই তো চাই। বাবার কাছ থেকে ছোটবেলায় আদর পেয়ে আরো এইরকম হয়ে গিয়েছিল।
বিদিশা বলল—“থাকো কোথায়?”
সে গাড়ি চালাতে চালাতে বলল—“30 নং অম্বিকা ঘোষাল লেনে ভাড়া থাকি মেমসাহেব।”
—“এই কথায় কথায় বার বার মেমসাহেব বলবে না তো।”
সঞ্জু হকচকিয় বলল—“তাহলে কি বলব?”
—“বিদিশা বলে ডাকবে।”
—“মালিকের নাম ধরে ডাকাটা উচিত না। ”
—“আমায় উচিত অনুচিত শিখিও না। যা বলছি তাই শোনো।”
সঞ্জু চুপ করে রইল। সে জানে মালিকের মেয়ের সাথে তর্ক করলে হয়তো চাকরিটাই চলে যাবে। ওর চুপ করে থাকার ফলে বিদিশা বলল—“কি হল, কথা বলছ না যে?”
সে এবার একটু বুদ্ধি খাটিয়ে নাম উহ্য রেখে কথা বলতে লাগল। বলল—“বলুন কি বলব?”
—“বাড়িতে কে কে আছে?”
—“কেউ না, আমি একা থাকি।”
—“কেন? মা বাবা নেই?”
—“তারা গ্রামের বাড়ি থাকে মেমসাহেব।”
—“আবার মেমসাহেব! উফ্ বলছি না বিদিশা বলে ডাকতে। আচ্ছা চলো, তোমার বাড়িটা আজকে দেখে আসব।”
—“আমার বাড়ি!”
—“হ্যাঁ যেখানে এখন থাকো। চলো,গাড়ি তোমার বাড়ির রাস্তায় নিয়ে চলো।”
সঞ্জু চুপচাপ স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে অম্বিকা ঘোষাল লেনের দিকে যেতে শুরু করল। মনের মধ্যে ভয়। একে নতুন জায়গায় ভাড়া এসেছে, তার ওপর মেয়ে নিয়ে বাড়ি ঢুকবে এটা ভালো দেখায় না।
যাইহোক, সঞ্জু নিজের ভাড়া বাড়িতেই বিদিশাকে নিয়ে গেল। সে একখানা চেয়ার টেনে বসে বলল—“তুমি নিজেই রান্নাবান্না করো।”
সে মাথা নেড়ে বলল—“হুম। নিজেকেই করতে হয়।”
—“আচ্ছা।”

 




 

বিদিশা ভাবে,কতটা কষ্ট করে দিন কাটায় তার ড্রাইভার। মুখ দেখে বোঝাই যায় না। কত সুপুরুষ দেখতে—কে বলবে তাকে ড্রাইভার! দেখেই মনে হয় কোনো বড় ঘরের ছেলে। অথচ নিজের হাতে সমস্ত কিছু সামলে ডিউটি আসছে। এই সব ভাবতে ভাবতে সে বলে—“আচ্ছা সঞ্জু, বাবা যা মাইনে দিচ্ছে তাতে তোমার পোষায়?”
—“হ্যাঁ মেমসাহেব।”
—“আবার সেই শুরু করলে তো! বলছি না মেমসাহেব বলবে না। এবার থেকে আমি তোমায় আলাদা পঞ্চাশ টাকা করে প্রতিমাসে দেবো কেমন?”
সে বলে—“এটা করবেন না। সাহেব জানলে ভীষণ রাগ করবেন।”
বিদিশা ব্যাগ থেকে পঞ্চাশ টাকা তার হাতে দিয়ে বলে—“এটা এ মাসের। আর হ্যাঁ, কাউকে বলার দরকার নেই, বুঝলে।”
যাইহোক,সঞ্জুর প্রতি বিদিশার মনে একটা দুর্বলতা তৈরী হতে থাকল। কলেজের কত ছেলে বন্ধুরা তাকে পছন্দ করে। শ্যামলা রং হলে কি হবে, মুখশ্রীতে একটা আলাদাই লাবণ্য রয়েছে তার। ও রকম সুন্দরী মুখ কলেজে আর একটাও নেই। যখন পিন আপ করা শাড়িখানা পরে ক্লাসে ঢোকে। অসম্ভব সুন্দরী দেখতে লাগে তাকে। আর সে কিনা বাড়ির সামান্য ড্রাইভার সঞ্জুর প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছে ! এই ভাবেই দিন কাটতে লাগল।
একদিন সে তার বাবাকে সোজাসুজি বলল—“বাবা,আজ পর্যন্ত আমি যা চেয়েছি তুমি তাই দিয়েছো।”
তিনি বললেন—“এবার লাগবে বল মা?”
—“যা চাইবো তুমি দেবে বাবা?”
—“আহা বেশ তো, কি চাই একবার মুখ ফুটে বলেই দেখ না।”
বিদিশা অকপটে বলে ফেলল—“বাবা আমি সঞ্জুকে বিয়ে করতে চাই।”
এই শুনে তিনি অগ্নিশর্মা হয়ে বললেন—“কি ! এতদূর,তোর স্পর্ধা দেখে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি! আদর পেতে পেতে তুই যে এভাবে বিগড়ে যাবি,আমি ভাবতেও পারছি না।”
সে চোখে চোখ রেখে বলল—“বাবা,ওকে আমি ভালোবাসি।”
তিনি বললেন—“আমার স্টেটাস তুমি ভালো করেই জানো। আর সেখানে ওর মতো সামান্য একটা ড্রাইভার বেমানান।”
—“বাবা, সারাজীবন শুধু অর্থই দেখলে, মন বোঝার শক্তি তোমার হারিয়ে গেছে বাবা।”
তিনি ভ্রু কুঁচকে বললেন—“কোথায় সেই ড্রাইভার। আজ তার একদিন, কি আমার একদিন!”
বিদিশা বলল—“বাবা! সে কিচ্ছু জানেনা বাবা। তাকে কিছু বলবে না তুমি।”
তিনি বললেন—“দাঁড়াও এক্ষুণি তাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বার করে দিচ্ছি।”
—“প্লিজ বাবা,তোমার পায়ে পড়ি,তাকে কিছু বোলো না।”
কে শোনে কার কথা। রেগে গেলে তিনি অন্য মানুষ। রাগে বিদিশার বাবার মাথার ঠিক ছিল না। তিনি বললেন—“ওই ড্রাইভারকে বিয়ে করতে হলে এক্ষুণি এ বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাও। জানবো আমার মেয়ে মরে গেছে।”
এ কথা শুনে বিদিশা বলল—“বেশ তাই হবে। জেনে রেখো আজ থেকে তোমার কাছে আমি মৃত।”
এই বলে এক কাপড়ে সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। হাঁটতে হাঁটতে সোজা গিয়ে পৌঁছোলো 30 নং অম্বিকা ঘোষাল লেনে। সঞ্জুর ঘরের দরজায় তালা ঝুলছে। বিদিশার চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। হঠাৎ চোখে পড়ল একটা চিঠি দরজার নিচে ছোট্ট পাথর চাপা দিয়ে রাখা আছে। সে সঙ্গে সঙ্গে সেটা কুড়িয়ে খুলতেই দেখল তাতে লেখা—

 




 

মেমসাহেব,

আমি জানতাম,আপনি আসবেন। আজ কিছু না বলা কথা আপনাকে বলে যেতে চাই। এই হতভাগ্য গাড়ি চালকের নাম—শ্রী সঞ্জয় রায়। নিবাস বৈদ্যবাটী।এক সময়ের নাম করা বাংলার অধ্যাপক। জানেন, কলেজে পড়ানোর সময় হঠাৎই অনামিকা নামের একটি সুন্দরী মেয়ে আমায় ভালোবাসতে শুরু করে। তার মনের এই কথা আমার অজানা ছিল। একটা সময় ধীরে ধীরে কলেজের সকলে তাকে আমার সাথে জড়িয়ে কুৎসা রটিয়ে দিল। ক্লাসে গুঞ্জন ! ফলে নিন্দায় কলেজের চাকরিটা ছাড়তে বাধ্য হলাম। নিরুপায় হয়ে বৈদ্যবাটি ছেড়ে কলকাতায় এসে চাকরি নিলাম ড্রাইভারের। অধ্যাপক হয়ে গেল বাড়ির উপেক্ষিত এক সামান্য ড্রাইভার! কোনোরকমে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু ভাগ্যের কি নিষ্ঠুর পরিহাস! আবার সেই একই ঘটনা। আপনি আমায় ভালোবাসলেন। আজ আপনার বাবার কথাগুলো শুনে নিদারুণ লজ্জায় এ অঞ্চল ছেড়ে চলে যাচ্ছি। আপনি দয়া করে বাড়ি ফিরে যান। মেমসাহেব, আপনার উজ্জ্বল ভবিষ্যত পড়ে আছে। আর হ্যাঁ, আপনার দেওয়া সেই পঞ্চাশ টাকার নোটটি খামের মধ্যে রইল।

বিনীত—
হতভাগ্য সঞ্জু

দিকভ্রান্তের মতো ছুটতে ছুটতে বিদিশা পৌঁছোলো হাওড়া স্টেশনে। ঠিক করেই নিল, সে নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে। বিনা টিকিটেই না দেখে উঠে পড়ল একটা লোকাল ট্রেনে। চুপচাপ জানলার দিকে মুখ করে চোখের জল ফেলতে ফেলতে সেই চিঠিখানা হাতে নিয়ে বসে রইল। ট্রেন তখন ছাড়েনি। এমন সময় প্ল্যাটফর্মে তাকিয়ে দেখল—স্টেশনের সিমেন্টের চেয়ারে চুপচাপ মুখ নিচু করে বসে আছে সঞ্জয়! সঙ্গে সঙ্গে ট্রেন থেকে নেমে সেদিকে ছুটে গেল। তারপর তার কাছে এসে বলল—“স্বার্থপর শুধু নিজেরটাই বুঝলে!”
সঞ্জয় উদাস হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। বিদিশা তার হাতে চিঠিটা দিয়ে বলল—“আজ সমস্ত ঐশ্বর্য ছেড়ে শুধু তোমার কাছে ছুটে এসেছিলাম। আর তুমি! মেমসাহেব আমি নই সঞ্জয় ! শুধু তোমার বিদিশা।”
সঞ্জয় চেয়ার ছেড়ে উঠে শান্তগলায় বলল—“বিদিশা!”

____

১৬ই বৈশাখ ১৪২৭
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ©ভিক্টর ব্যানার্জী

 




গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total:    Average: /5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।