মেরী ক্রিসমাস

মেরী ক্রিসমাস

🔶#পঞ্চপান্ডব_সিরিজ(দুই)
🔶#গল্প
🔶#মেরী_ক্রিসমাস
✍#ঝিলিক_মুখার্জী_গোস্বামী
☠☠☠☠☠☠☠☠☠☠☠☠☠☠☠☠☠☠☠☠

পুরুলিয়া থেকে ফেরার পর বেশ কিছুদিন আমরা যে যার ব্যস্ত জীবনে নিজেদের মতো করে ব্যস্ত ছিলাম। কাটিয়েও দিয়েছি নয় নয় করে সাত সাতটি মাস। পুজোর সময় কালে প্যান্ডাল হপিং ছাড়া সেইভাবে আর বেরোনো হয়ে ওঠেনি। পুজো ক’টা দিন বেশ আনন্দদায়ক ভাবে কাটিয়ে, ফিরে গিয়েছিলাম নিজ নিজ কর্মজীবনে। রুটিন মাফিক জীবনে দীর্ঘদিনের বদ্ধ জীবন থেকে একটু রিলিফ চাইছিলাম, প্রত্যকেই।

পাঁচজনই ব্যজার মুখ নিয়ে সন্ধ্যায় বসে আছি। কুড়মুড় আওয়াজ তুলে মশালা চিঁড়ে ভাজা চিবোচ্ছি। সব কটি মুখমন্ডলের চিবুকের তলদেশে দক্ষিণ হস্তটিকে স্ট্যান্ড আকারে প্রতিস্থাপন করে, কবি সুকান্তের মতো পোজে সবাই বসে আছি। শহুরে ব্যস্ত জীবনে কার্যত হাঁফিয়ে উঠেছি সক্কলেই। বাড়িমুখো ও হইনি কেউই, বেশ কিছুদিন।

ঘরের মধ্যে পিন ড্রপ সাইলেন্ট অবস্থা দেখে ভগবানও লজ্জা পেলেন। আমারা কস্মিন কালেও এরকম প্রকৃতির নই কিনা! এরই মাঝে রান্নার মাসি এসে জানান দিল, রাতের খাবারের প্রস্তুতির ব্যপারে। ডিসেম্বর মাসের প্রথম দিক চলছে, রাতের দিকে তাই রুটির ব্যবস্থা। সাথে যা হোক একটা ‘সুস্বাদু’ সবজি। মাঝে মধ্যে পাতে একটা আধটা মিষ্টি পড়ে।

রাতের খাবারের পর্ব শেষ করে, বিছানা ঠিকঠাক করে; চারকোনে চারটি পেরকে চারটি দড়ি লাগিয়ে প্রতিদিনের বিরক্তিকর কাজটি করে, ঘরের মধ্যে ছোট্ট ঘরটিতে প্রবেশের উপক্রম করছি… রাকা বলে উঠল,

–“গরমের ছুটির মতো শীতের দিকেও কোথাও একটা ঘুরতে যাবার প্ল্যান করলে কেমন হয়”!

রাকার কথায় সবাই যেন একটু প্রাণবায়ু ফিরে পেলাম। ঘুমোনোর পরিকল্পনা বাতিল করে, ঘুরতে যাবার পরিকল্পনা শুরু করলাম। গতবারের মতো আর লুকিয়ে যাওয়ার উপায় ছিল না। বাড়িতে পরে কোনো কারণে জানাজানি হওয়ায় ভীষণ ধমক জুটেছিল সবার কপালে। এমন জায়গা পরিকল্পনা করার কথা ভাবতে হবে, খরচ -খরচা বিন্দু মাত্র হয়।

প্রায় ঘন্টা তিনেকের আলোচনায় একটা জায়গা ঠিক হ’ল। অবশ্যই সবার সহমত অনুযায়ী। ডিসেম্বরে শেষের দিকে আমার বাড়ি যাবার পরিকল্পনা হ’ল। বিষন্ন বদন ত্যাগ করে প্রসন্ন চিত্তে সবাই, সেই রাতে ঘুমোতে গেলাম।

শীতের সকালগুলো সবাইকে আরও বেশী পরিমাণে অলস করে দেয়। আলসেমি যেন তীব্রতর ভাবে আঁকড়ে ধরে শরীরটাকে। গরম বিছানায়, গরম কম্বলটিকে বপুর উপর চাপিয়ে শুয়ে থাকতে ইচ্ছে হয়, যতক্ষণ না পর্যন্ত অম্বল আমাদের বপুর মধ্যে জায়গা দখল করে।

বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে না করলেও উঠতে হ’ল। ইয়ে চেপে কতক্ষণ আর বিছানা আঁকড়ে পড়ে থাকা যায়। ইয়ে ত্যাগ করে, ফ্রেশ হয়ে, রান্নার মাসির হাতের কড়া পাকের মিষ্টি সহযোগে; হাতল ভাঙা কাপের এক কাপ চা পাণ করে; বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটু ভিটামিন -ডি সংগ্রহ করার চেষ্টা করছি। বেশ কষ্ট সাধ্য করতে হচ্ছে তার জন্য। শহরের এমন জায়গায় আমাদের মেসবাড়ি, সেখানে দেবী গঙ্গার আশিসে প্রাণবায়ু যথেচ্ছভাবে পাওয়া গেলেও! সূর্য দেব, কি জানি কি কারণে বিমুখ আমাদের প্রতি। তাই ভিটামিন -ডি এর সংগ্রহের জন্য কষ্টসাধ্য করা ছাড়া, অন্য উপায় আর ছিল না।

মুঠোফোন টা নিয়ে ‘স্নেক গেম’ টা খেলছি। তখনকার দিনে নোকিয়া মোবাইলে এই গেমটি খুব জনপ্রিয় ছিল। সাপ টা নিয়ে খেলায় মেতেছি বেশ…

–“কিরে বাড়িতে ফোন করে বলেছিস”?

অর্নার কথায়, সাপ খেলা বিরত রেখে মাথা চুলকোতে চুলকোতে ভাবছি। কি ভুলে গেলাম আবার! আমার আবার বড্ড ভুলো মন কিনা।

–“তোর এই ভুলো মনের জন্য, আমরা একদিন বড়ো কোনো বিপদে পড়ব দেখিস”!

অর্নার কথায় আমি কাঁচুমাচু মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। ব্রেনে চাপ দিচ্ছি মনে করার। অনেক কষ্টে মনে করতে পেরেছি, অবশেষে। মনে পড়তেই বাড়িতে, বাবা কে ফোন করে সব জানিয়ে দিলাম।

পূর্ব পরিকল্পিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ডিসেম্বরের চব্বিশে দুপুর দুপুর রওনা দিলাম, আমরা পাঁচজন। ওদিকে আবার সন্ধ্যায় পৌঁছানো খুব মুস্কিল হয়ে পড়বে। তখনও, যাতায়াত ব্যবস্থায় এত উন্নতি হয়নি। তাই চান্স না নিয়েই বেরিয়ে পড়েছিলাম। ঠিক মতো ট্রেন, বাস পেয়ে যাওয়ার কারণে সন্ধ্যের আগেই আমরা পৌঁছে গেলাম।

এতদিন পর বাড়িতে আসায়, খুব আদর যত্ন করা হচ্ছে যা প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশীই। আমার সাথে, বাকি চারজনেরও পুরোদমে খাতির চলছে। গরমের সাথে শীত দু’টোই জাঁকিয়ে পড়ে, আমাদের গ্রামে। এবছরও কোনো পরিবর্তন হয়নি। প্রবল শীত যেন জ্যাকেটের মধ্যে দিয়েও কামড় বসিয়ে দিচ্ছে। আমাদের গরম করার জন্য, পিতলের বড়ো গ্লাসে; গ্লাস ভর্তি গরম গরম ধোঁয়া ওঠা; জার্সি গোরুর দুধ পরিবেশন করা হ’ল। পরম পরিতৃপ্তির সাথে সেটি আমরা পাণ করলাম।

বাড়ির সবার সাথে পরিচয়পর্ব সেরে ভাই-বোনেদের সাথে, লেপ মুড়ি দিয়ে আড্ডা জমিয়েছি। চলছে নানা রকমের গল্পকথন। গ্রামের কোথায় কি ঘটেছে, সেইসব কথাও প্রচারিত হল আমার বোন কর্তৃক। সব কিছুর মধ্যেও একটি গল্প খুব মুখোরোচক লাগায় সেটির ধারা বিবরণী শুনতে চাইলাম। বোন বলতে শুরু করতে যাবে,

শর্মী বলে উঠল,
–“কাল তো পঁচিশে ডিসেম্বর। একটা চড়ুইভাতির পরিকল্পনা করলে কেমন হয়”!

আমার সবাই উৎফুল্ল ভাবে সমস্বরে বলে উঠলাম, “হোক হোক”।

বাণী বলল, ” রাতের দিকে পরিকল্পনা করা হোক। লাইট লাগিয়ে, মিউজিক দিয়ে……..”

কথা শেষ হ’ল না বাণীর। আমার বোন বলে উঠল,
“রাতের দিকে”!

এবার অর্না প্রশ্ন ছুঁড়ল, “কেন রাতের দিকে কি সমস্যা”?

বোনের নির্লীপ্ত উত্তর, “কিছু না। বাইরে খুব ঠান্ডা “।

সবাই মতামত দিচ্ছিল। আমি চুপচাপ শুনছিলাম। ভাবলাম, কিছু মতামত আমার ও দেওয়া কর্তব্য। কারণ আমি স্বাধীন দেশের নাগরিক। মতামত না দিলে নিজের মৌলিক অধিকার খোয়ানোর সাথে সাথে, সংবিধানের অপমান করা হবে। সেটি হতে দিতে পারিনে। আমি বেশ কন্ফিডেন্সের সাথে বলললাম, কাকা কে বলব চারিদিকে ত্রিপল দিয়ে ঢেকে দিতে। কোনো অসুবিধা হবে না।

কিছু একটা ঘটনা বোনকে ভাবিয়ে তুলেছিল বোধহয়। আগের থেকে আরও ঠান্ডা গলায় বলল,

–“তোরা যখন চাইছিস। তাই হোক”।

আমাদের আড্ডার পরিসমাপ্তি ঘোষণা করা হ’ল কাকিমাদের ডাকে। রাতের খাবার প্রস্তুত। যা শীত পড়েছে খেয়ে, লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়াই শ্রেয় মনে করে; আমাদের খাবার সময়ের অনেক আগেই রাতের খাবার খাওয়া শেষ করলাম। জলে হাত দিচ্ছি, মনে হচ্ছে বরফ গুলো রেগে আমাদের হাতগুলো কামড় দিচ্ছে। ঠান্ডা জলের সাথে অদৃশ্য যুদ্ধ ঘোষিত হ’ল একপ্রকার। বলা বাহুল্য সে যুদ্ধে মনের জোরে আমাদের কপালেই বিজয় তিলক অঙ্কিত হ’ল।

একটি ঘর বরাদ্দ করা হয়েছিল, আমাদের পঞ্চপান্ডবের জন্য। মেসে স্থায়ী বাসিন্দা হবার দরুন, আমার ঘরটি বর্তমানে বোনের দখলে। মাঝে মধ্যে আসলে, সে ঘরে আমার ঠাঁই মেলে।
ক্লান্তি আমাদের সবার শরীরকে গ্রাস করেছিল। কেউ কোনো কথা না বলে, মিনিট দশেকের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লাম।

একঘুমে সকাল। ক্লান্তিকর অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়েছে শরীর। সবাই উঠে পড়লাম। ফ্রেশ হয়ে বাড়ির ছাদে বসে রোদ পিঠ করে রাতের চড়ুইভাতির পরিকল্পনা চলছে। মেনু ঠিক করছে, রন্ধ পটিয়সী বাণী। বেশী কিছু না, ফ্রয়েড রাইস, কষা মাংস; পাপড়; চাটনি। শেষ পাতে জোড়া নলেন গুড়ের রাজভোগ।

আমাদের রাতের চড়ুইভাতিতে বাড়ির লোকেরা প্রথমে বিরুদ্ধাচরণ করেছিলেন। অযৌক্তিক কারণ বলে আমরা উড়িয়ে দিই। অবশেষে তর্ক পাল্টা তর্কের পর আমাদের চড়ুইভাতিতে ‘ইয়েস’ স্ট্যাম্প লাগে।

চড়ুইভাতি করার জায়গাটা পরিপাটি করে গোছানো চলছে। পরিষ্করণের কাজের পর চারিদিকে খুঁটি পুঁতে ত্রিপল লাগিয়ে একটি অস্থায়ী ঘর বানানো সম্ভব হয়েছে। এই অস্থায়ী ঘর বানাতে, কাকা যথেষ্ট সাহায্য করেছেন। ওদিকে ভাই এর উপর বর্তেছিল বাজারের দায়িত্ব।

সন্ধ্যায় আমারা, আমাদের সরঞ্জাম সমেত চড়ুইভাতি করার জায়গায় পৌঁছে গেলাম। ঘন তমিস্রাকে ভেদ করতে উজ্জ্বল আলো লাগানো হয়েছে। চড়ুইভাতির মেজাজ কে নবাবি মেজাজে পরিণত করতে মিউজিক চালানো হয়েছে। ত্রিপলের নিচে বসেও মনে হচ্ছে ঠান্ডার কামড়। শীতলতম দিন।

রান্নার আয়োজন করা চলছে। তার আগে ক্রিসমাস উপলক্ষে কেক কাটা হ’ল। সেই কেক নিমেষে সবার মধ্যপ্রদেশে চলে গেল। বাড়ি থেকে বানিয়ে আনা ফ্লাস্কের মধ্যে থাকা চা এরও পরিসমাপ্তি ঘোষিত হ’ল একসময়। প্রচন্ড ঠান্ডায় আমাদের একমাত্র ভরসা। সবাই ব্যস্ত, মশলা পেষা, কুটনো কাটার কাজে। হঠাৎই দেখলাম…

বোনের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। জিজ্ঞেস করায় উত্তর দিল,

–“বাইরে কেউ আছে। যে আমাদের দিকে দেখছে”।

রাকা, বোনের মনের জোর বাড়াতে বলে উঠল,

–“ওটা তোর মনের ভুল, সোনা”।
–“আমরা ছাড়া কেউ নেই”।

আমি কিন্তু লক্ষ্য করছি। বোনের মুখ চোখ পাল্টে যাচ্ছে। ওর মধ্যে একটা ভয়ের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছি আমি। আমিও বোনকে সাহস দিয়ে, ওর মনটা অন্য দিকে ঘোরানোর উদ্দেশ্যে নানারকম অহেতুক কথা বলে গেলাম।

ইট দিয়ে উনুন বানানো হয়েছে। শুকনো কাঠের সাহায্যে আগুন জ্বালানোর প্রস্তুতি চলছে। আগুন টা জ্বললেও একটু স্বস্তি, এই ঠান্ডা থেকে। একটু পর উনুন এ আগুন সংযোগ করা হ’ল। সবই প্রস্তুত। শুধু রান্নার কাজ বাকি। সেটাও খুব দ্রুত শুরু করা হ’ল।

রান্না চলছে। আমার সকলেই গল্পে ব্যস্ত। বাইরের একটা বিকট আওয়াজে আমরা সবাই রীতিমতো চমকে উঠি। প্রথমে ভেবেছিলাম, কিছু ফেটেছে বোধহয়। এমন সময় বোনে চিৎকার…

–“বলেছিলাম কেউ বাইরে আছে। আমাদের দেখছে। আমি দেখেছি………..”

ওই ঠান্ডায় বোনের চোখে মুখে জল দিয়ে ওকে ঠান্ডা করা হল। বাইরে আমরা পাঁচজন সাহস করে বেরোলাম। কোথাও কিছু নেই। চারিদিকে অন্ধকার গ্রাস করে আছে। হাতের টর্চ জ্বালিয়ে অনেকক্ষণ এদিক ওদিক ফেলে দেখলাম। অগত্যা ফিরে এলাম। এসে বোনকে সবাই মিলে সান্ত্বনা দিয়ে শান্ত করলাম।

নিভে যাওয়া উনুনে আবারও অগ্নিসংযোগ করা হ’ল। আবার রান্নার কাজ শুরু হ’ল। কড়াইয়ে তেল গরম করে সবে পেঁয়াজ ভাজা শুরু হয়েছে………

সবার কান খাড়া, একটা কান্নার আওয়াজ কোথা থেকে যেন ভেসে আসছে। আওয়াজ শুনে মনে হচ্ছে কাছে পিঠেই কোথাও কেউ কাঁদছে। আমরা পঞ্চপান্ডব এত সহজে ভয় পাইনা। যতটা সাহস সঞ্চয় করা প্রয়োজন, তার চেয়েও বেশী সাহস সঞ্চয় করে আবারও বেরোলাম। হাতের টর্চের আলো ফেলে সন্ধান চালালাম, কান্নার আওয়াজের। এবারও কিছু চোখে পড়ল না। ফিরে এলাম। ভাবলাম হয়তো কুকুরের কান্না।

বোনের মুখমন্ডল আগের থেকে আরও ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে। একদম কাঠ হয়ে বসে আছে। বলেই চলেছে….

–” আমাদের চড়ুইভাতি পন্ড করতে এসেছে”।
–“করতে দেবে না”।
–“এর আগেও এসেছে”।

আমি, নিজের চিরাচরিত, অতি পরিচিত স্বভাবের খোলস থেকে বেরিয়ে এসে বোন কে ধমক দিয়ে বলললাম…..

তুই কি সব যা তা বকছিস। কার কথা বলছিস?
কে এসেছে? কে করতে দেবে না চড়ুইভাতি? কেন এরকম করছিস তুই? কি হয়েছে তোর?

এরকম আরও কিছু টুকরো কথার সাথে হাজারো প্রশ্ন ছুঁড়ে হাঁফাতে থাকলাম। এই প্রচন্ড শীতেও প্রথমবার খুব গরম লাগতে শুরু করেছিল।

বাণী, শর্মী; রাকা; অর্না। আমার ওই রূপ দেখে প্রথমটা একটু ঘাবড়ে গিয়েছিল। এতক্ষণ ওরা চুপচাপ ছিল। আমি একাই বক্তা ছিলাম। অনেক্ষণ চুপ থাকা অবস্থার মৌনতা ভাঙল বোনের কথায়।

বোন বলে উঠল,

–“তুই তো বাড়ি আসিস না। জানবি কি করে? এখানে বিগত কয়েক মাসে কত কি ঘটে গেছে। ঘটছে”।

তুই ঠিক কি বলতে চাইছিস! পরিষ্কার করে বল। আমি রীতিমতো উত্তেজিত কন্ঠে বলে উঠলাম। আবারও বোন শুরু করল,

–“ছোটকা কবে মারা গিয়েছিল, তোর মনে আছে”?

জানুয়ারীর দিকে। আমি উত্তর দেওয়ার সাথে সাথে প্রশ্ন ছুঁড়লাম, ছোটকা এখানে আসছে কোথা থেকে?

–“কেন মারা গিয়েছিল, ভুলে যাসনি নিশ্চয়ই “?

বোনের প্রশ্নের উত্তরে, শুধুমাত্র না বলে চুপ করে গেলাম।

শর্মী এবার বলে উঠল,

–“তোদের কথোপকথন থামিয়ে, একটু পরিষ্কার করে বলবি ব্যপারটা ঠিক কি”?

বাণী, রাকা; অর্না মাথা নাড়িয়ে সহমত জ্ঞাপন করল। মানে ওরাও জানতে চায় ব্যপারটা আসলে কি!

আমার বোন বলা শুরু করল,

–” ছোটকার অতৃপ্ত আত্মা ঘুরে বেড়াচ্ছে। মাঝে আমাদের বাড়ির সবাইকে খুব জ্বালিয়েছে। ওঝা ডেকে সেই অত্যাচার থেকে মুক্তি পেলেও সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বেরোনো কঠিন হয়ে পড়েছিল”।

প্রশ্নকারী রাকা বোনকে তাক করে প্রশ্ন ছোঁড়ে,

–“অতৃপ্ত আত্মা কেন”?

বোন আবারও বলা শুরু করে,

–“জানোতো লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু “।
–” ছোটকার ও ঠিক সেই অবস্থা হয়েছিল”।
–” ছোটকার একটাই লোভ ছিল। খাবার”।
–” একদিন না বুঝে প্রচুরপরিমাণ উল্টো পাল্টা খাওয়াতে হার্ট অ্যাটাকে মারা যায়”।

অর্না এবার বলে ওঠে,

–“অনেক গল্প দিয়েছিস। এবার থাম। বাণী রান্না শেষ কর। খেয়ে বাড়ি গিয়ে………”

কথা শেষ হয় না অর্নার। সেই কান্নার আওয়াজ একদম কানের কাছে যেন ভেসে ওঠে। আওয়াজটা ক্রমাগত তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে। একটা নাকি সুরে কান্না।

পঞ্চপান্ডব এবার কি একটু ভয় পেল! ভয় পেলে চলবে না। যথেষ্ট পরিমাণ সাহস সঞ্চয় করে হাতে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছি। বোন একটা কোনে দাঁড়িয়ে আছে বিবর্ণ মুখটা নিয়ে। একটা বিশালাকৃতি বপু আমাদের দিকে প্রায় কাছাকাছি এসে, ত্রিপল দিয়ে বানানো অস্থায়ী ঘরের প্রবেশ পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে। একদম মানুষের আকৃতিযুক্ত একটা চেহারা। সেই দেখে সাহসী অর্না বলে ওঠে,

–“কে আপনি মশাই”?
–“এত রাতে খালি গায়ে দাঁড়িয়ে আছেন”?

মানুষ ভেবেই অর্না এতগুলি কথা এক নিমেষে বলে গেল। বাড়ির দিক থেকে একটা আলো হঠাৎই আমাদের চোখে পড়ল। সেদিকে চোখ যেতেই দেখি বাড়ি থেকে বাবা, কাকা আর ভাই এর আগমন। ওদিকে মন দিতে গিয়ে খেয়ালই করিনি সেই স্ফীতকায় বপু টা কখন ভ্যানিশ হয়ে গেছে। ওরা আসতে মনে একটু সাহস ফিরল মনে হ’ল।

ভাই এসে দিগ্বজের মতো বলে উঠল,

–“এখনো তোদের রান্না হয়নি”?
–“কি করছিলি”?

বিরক্ত অথচ কৌতুক স্বরে বলে উঠলাম, ছোটকা এসেছিল মাংস খেতে। কথা বলতে গিয়ে রান্না হয়নি রে!

রাগান্বিত স্বরে বাবা বললেন,

–“তোদের আর রান্না করতে হবে না”।
–“বাড়ি গিয়ে খাবি চল”।

মাংসগুলো কি হবে? আমার প্রশ্নে কাকা বলে ওঠেন,

–“বাইরের জিনিসগুলো আর ভেতরে নিয়ে যাবার দরকার নেই”।
–“থাক পড়ে। কাল দেখা যাবে”।
–“রাত দশটা বাজে। বাড়ি চল”।

এতটা রাত কোনটা দিয়ে গড়িয়ে গিয়েছে বুঝতেও পারিনি। সবার কথামতো বাড়ি ফিরে গেলাম। গরম জলে হাত-পা-মুখ ধুয়ে দুধ-ভাত খেয়ে লেপের নীচে শরীরটা মুড়িয়ে দিলাম। পাঁচ জোড়া চোখ অনিদ্রায় কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে আছে। অর্না ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,

–“চল তিথি, তোর ছোটকা কে দেখে আসি”।

পাগল নাকি? আমি যাব না। তোরা যা। মনেমনে এটা বললেও, বন্ধুদের কাছে অপমানিত হবার ভয়ে সেই কথায় সায় দিলাম।

শীতের রাতে সবাই নিদ্রাচ্ছন্ন। দরজা -জানলা সব বন্ধ। কেউ টেরও পাবে না, আমাদের অভিযানের খবর। বোনকে নেওয়া যাবে না। তাই ওকে নিলাম না। আমরা পাঁচজন, নিজেদের ভালো করে আবৃত করে টর্চ নিয়ে রাম নাম জপতে জপতে বেরিয়ে পড়লাম।

আস্তে আস্তে এগোচ্ছি। টর্চের আলোটা একটা জায়গায় পড়তেই…….

পাঁচজনেই এ ওর মুখ চাওয়াচায়ি করছি। স্ফীতকায় বপু টা, এই ঠান্ডায় অর্ধ নগ্নাবস্থায় নিজের স্মৃতির উদ্দেশ্যে বানানো স্মৃতি মন্দিরে বসে পরম তৃপ্তিতে বীভৎস আওয়াজ তুলে, আমাদের দ্বারা পরিত্যক্ত কাঁচা মাংসগুলি চিবিয়ে চলেছে। মুখের মধ্যে একটা তৃপ্তিকর হাসি ফুটে উঠেছে।

সেই দৃশ্য দেখে আমরা পাঁচজন স্থির অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছি। ন যযৌ ন তস্থৌ অবস্থা। মনেমনে সবাই বোনের বলা কথা গুলো বিশ্বাস করতে শুরু করেছি। বোন সহ বাড়ির সবাই কেন রাতের চড়ুইভাতির প্ল্যানে আপত্তি করেছিল সেটাও বুঝতে দেরী হ’ল না কারোর। এমতাবস্থায় ভীষণ ঠাণ্ডাও আমাদের গায়ে লাগছে না। গরম হাওয়া বইছে আমাদের প্রত্যেকের শরীরে।

শরীরটা আস্তে আস্তে উঠল, নিজের সমাধি থেকে। উঠেই ধীর পায়ে নিজের গন্তব্যস্থল, যেখানে দাহ করা হয়েছিল সেইদিকে এগিয়ে যেতে থাকল। হঠাৎ কি মনে হতেই থমকে গেল তার পা জোড়া। একটু দূর থেকেই মনে হ’ল যেন আমাদের দিকে ঘুরে তাকিয়ে আছে। প্রচণ্ড অন্ধকারেও তার মুখের ওপর কোথা থেকে যেন অকৃত্রিম আলো এসে পড়েছে মনে হল। মুখে তখনও প্রশান্তির হাসি। সে হাসি, স্বর্গীয় হাসি কেও হার মানায়। হাসত হাসতে সামনের দিকে তাকেই ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে এক সময় অদৃশ্য হয়ে গেল।

আমরা তখনও দাঁড়িয়ে আছি। ঘোর কাটল। শ্মশান থেকে ভেসে আসছে হরেকরকমের কান্নার আওয়াজ। সেই শুনে কাঁহাতক দাঁড়িয়ে থাকা যায়! পড়ি কি মরি করে পাঁচজন দৌড়ে সোজা বাড়ির মধ্যে। সেই রাতে আমরা পাঁচজন চোখের পাতা এক করতে পারিনি। সকাল হতেই উঠে পড়ি।

সকালে উঠেই চড়ুইভাতি করার জায়গায় হানা দিই। গিয়ে দেখি মাংসের হাড় গুলো শুধু এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। পাঁচজনের চোখেই নীরব প্রশ্ন, সমাধিতে বসে যদি খেল এখানে হাড়গুলো কি করে এল?

সেখান থেকে ফিরে বাড়ি আসি। পাঁচজনের মনের অবস্থা ভালো নয়। এক তো ক্রিসমাস এর ষষ্ঠী পূজো হয়েছে। কোলকাতায় থাকলে এটা হত না। দ্বিতীয়ত, মাংসের হাড়ের বিচ্ছিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকার উত্তর মেলেনি।

বাবা বোধহয় আমাদের মনের অবস্থা বুঝতে পেরেছিলেন। আমাদের ডেকে বসালেন, ওনার কাছে। সবটা বিস্তারিত বললেন।

ছোটকা নাকি রাতের দিকে, সমাধিকৃত মন্দিরে এসে বসে থাকেন এখনও। রাতবিরেতে কান্নাকাটিও শোনা যায় শ্মশান থেকে। গয়া গিয়ে পিন্ড দান না করলে এরকম চলতেই থাকবে। অতৃপ্ত আত্মা ঘুরে বেড়াবেই। শুনে বললাম, দিয়েই এসো পিন্ড টা।

বাবা ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে শুধুমাত্র ‘হ্যাঁ’ বললেন।

একদিন দুপুরে যেমন কোলকাতা থেকে একরাশ উত্তেজনা নিয়ে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম ! এবার একরাশ উৎকন্ঠা আর বিরক্তি নিয়ে কোলকাতায় ফিরলাম। ক্রিসমাস টা যে এরকম করে কাটবে কেউ কল্পনাও করিনি। ট্রেনের জার্নিতে কেউ একটাও কথা বলিনি। মেসে ফেরার পারে ও কার্যত চুপ সবাই।

এরপর কয়েকটি মাস কেটে গেছে আরও। নূতন বছরের আগমন ঘটেছে। তারপর থেকে অনেকদিন বাড়ি যাইনি। ফোনে যোগাযোগের সাথে নিত্য খবরাখবর নিই। সেই সূত্রেই জানতে পারি, ছোটকার পিন্ডদানের কাজ সম্পূর্ণ। সেটা শুনে একটু স্বস্তি পেয়েছিলাম।

ভুলটা ভাঙলো। বোন যখন জানাল, পিন্ড দানের পর ছোটকা তার রাতের অবসরের জায়গা, তার নাম খোদাই করা মন্দির ত্যাগ করলেও শ্মশান থেকে তার করুণ কান্নার আওয়াজ এখনো ভেসে আসে। যা নিদারুণ মর্মান্তিক।
__________________________________________

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 0   Average: 0/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।