মেসবাড়ি

মেসবাড়ি

🏚#মেসবাড়ি
✍#ঝিলিক_মুখার্জী_গোস্বামী।
☠☠☠☠☠☠☠☠☠☠☠☠☠☠☠

__সময়টা ঠিক প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে শুরু হয়, মেসবাড়ি কালচার। কাজের জন্য কোলকাতায় আগত হয় বহু মানুষ, দূর দূরান্ত থেকে। তাদের তখন মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসাবে ছিল, মেসবাড়ি। মেসবাড়ি অতীতে যা অর্থবহন করত তা এইরূপ, ইট এর তৈরী বিশাল দোতালা বা তেতলা বাড়ি। কোনোটার বারান্দা আছে বা নেই। সেই অর্থে বিশেষ চাকচিক্য ছিল না। ঘর জুড়ে পাতা থাকত, তক্তপোশ। এক একটি ঘর দখল করে থাকত প্রায় দশ থেকে বারো জন।

__মেসবাড়ির প্রধান ঠিকানা ছিল উত্তর কোলকাতা। চল্লিশ -পঞ্চাশ দশকের দিকে প্রধাণত আমহার্স্ট স্ট্রিট, মুক্তারাম বাবু স্ট্রিট; কলুটা স্ট্রিট; কলেজ স্ট্রিট; মানিকতলা; শিয়ালদহ চত্বরে ছিল মেসবাড়ির রমরমা। কারন ছিল একটাই। মেসবাড়ির দূরত্ব থেকে স্কুল-কলেজ-অফিস-আদালত এসবের দূরত্ব ছিল পায়ে হাঁটা।

__ট্রাম, কফি হাউস; বইপাড়া এসবের মতোই পুরোনো কোলকাতার একচেটিয়া ঐতিহ্য দখল করেছিল, মেসবাড়ি। মেসবাড়ি গুলির বৈশিষ্ট্য ছিল অন্যরকম। ব্যক্তি বিশেষে চারিত্রিক বৈষম্য, পছন্দ -অপছন্দের মিল না হলেও একছাদের নীচে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কাটিয়ে দিতেন মেসবাড়িতে থাকা বাসিন্দারা।এক সুরে বাঁধা পড়তেন সক্কলে।

___ কতরকমের বিশিষ্ট তথা জ্ঞানী মানুষের সাথে আমাদের পরিচয় ঘটে, মেসবাড়িতে। শরদিন্দুর ব্যোমকেশ এর সাথে আমাদের সবার সাক্ষাৎ ঘটে হ্যারিসন স্ট্রিট, যার বর্তমান নাম মহাত্মা গান্ধী রোড এর মেস বাড়িতে। শুধু আমাদের সাথে কেন! ব্যোমকেশ-অজিতের আমরণের বন্ধুত্বের সাক্ষী ও ছিল এই মেসবাড়ি। দুঁদে গোয়েন্দার ছদ্মবেশে আত্মগোপনের জায়গা ছিল এই মেসবাড়ি।

__আবার জীবনানন্দ দাশের কথাই ধরুন। তাঁর নেশা ছিল ‘প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং’ এর জানালা দিয়ে ট্রাম দেখা। তিনি তো এই মেসবাড়িতেই তাঁর ‘বনলতা সেন’ কে খুঁজে পান।

__যাঁর কথা না বললেই নয়। মেসবাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই ভদ্রলোক। তিনি তো মেসবাড়িকে আরামের জায়গা বানিয়ে দিয়েছিলেন। মেসবাড়ি সম্পর্কে তাঁর উক্তি,
–” মুক্তারামে থেকে, তক্তারামে শুয়ে; শুক্তারাম খেয়েই তিনি শিবরাম চক্রবর্তী হয়েছেন”।

__এরকমও শোনা যায় তিনি নাকি মেসবাড়ির দেওয়াল রঙ করতে দিতেন না। তাঁর আস্তানা ছিল ঠনঠনিয়া কালী বাড়ির একটি মেসবাড়ি।

__’সাড়ে চুয়াত্তর’ থেকে ‘বসন্ত বিলাপ’ বাংলা সিনেমার বিশেষ জায়গা দখল করেছিল, মেসবাড়ি। খেলাধূলা, রাজনৈতিক তরজা এমনকি বিপ্লবীদের লুকিয়ে থাকার ঘাঁটিও ছিল এই মেসবাড়ি।

__কালচক্রে বয়সের ভারে এবং সঠিক তত্ত্বাবধানের অভাবে মেসবাড়ির অস্তিত্ব আজ বিলুপ্ত প্রায়। মেসবাড়ির জায়গা দখল করেছে, ‘পি জি’। হারিয়ে যাচ্ছে সেই নস্টালজিয়া। হয়তো কিছু জায়গায় ধুঁকছে এই মেসবাড়ি।

__আজ বিংশ শতাব্দীর দোরগোড়ায় এসে পড়েছি আমরা। সৌভাগ্যক্রমে আমার এই মেসবাড়িতে থাকার একটা অভিজ্ঞতা হয়েছিল বটে। অতীতে মেসবাড়ি দখলে থাকত শুধুমাত্র পুরুষের। কিন্তু না। এই বিংশ শতকে অনেক পাল্টেছে পুরোনো কোলকাতা। মহিলা মেসবাড়ির অস্তিত্বের দেখা মিলবে উত্তর কোলকাতায়।

__উচ্চ শিক্ষার গন্ডি টপকে একরাশ ভবিষ্যৎ স্বপ্ন চোখে নিয়ে কোলকাতায় পাড়ি দিলাম। চাকুরীর সন্ধানে। তার আগে অবশ্য মাথা গোঁজার ঠাঁই ঠিক করে গেছি। আজ পাকাপাকি ভাবে বাক্স -প্যাঁটরা, তলপিতল্লা নিয়ে হাজির হয়েছি মেসবাড়িতে।

__দ্বিতলে উঠে বারান্দা টপকে একটি ঘরে জায়গা দখল করলাম। জানালার পাশে, কোনের দিকে। তিনটি চৌকি, এ ঘরে। অপর ঘরে রয়েছে ছয়টি। দুটি ঘর এবং বারান্দা জুড়ে আমাদের মেসবাড়ি। শ্যামবাজার থেকে এগিয়ে বাগবাজার বাটার ঠিক অপরদিকে অবস্থান করছে আমাদের মেসবাড়ি।

__সন্ধ্যায় মেসের বাকি সদস্যাদের সাথে অভিবাদন ও প্রত্যভিবাদন হল। সর্বমোট আমরা আটজন। আমি ছাড়া বাকি সাতজন ছিল আমার সিনিয়র এবং কর্মরতা। আমিই ছিলাম একমাত্র বেকার।

__আস্তে আস্তে মেসের সবার সাথে বেশ সখ্যতা হয়ে গেছে। আমিও এখন চাকুরীর প্রস্তুতির সাথে কয়েকটি টিউশন করি। হাত খরচ উঠে যায়।

__মেসের অনেক নিয়মকানুন ছিল। মেস মালকিন ছিলেন বেশ শক্ত মহিলা। তাঁর নিয়মের বাইরে কেউ চলতে পারত না। খাবার পছন্দ না হলেও নষ্ট করা যেত না।

__আমরাও ছিলাম সেরকমই বদমাইস। প্রথম প্রথম আমার ঘরের জানলার কার্নিশে খাবারের স্তূপ করে রাখতাম। বিড়াল বা কাক এসে সেই খাবারে ভাগ বসাত। সেই রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মেসের রাঁধুনি, মেস মালকিন কাকিমার চামচা, শিখা দির কারণে। কাকিমার কানে সে খবর যেতেই, আমাদের সবার তলব পড়েছিল। সেটির উদ্ধৃতি নিষ্প্রয়োজন এখানে।

___একদিন সন্ধ্যায় সবাই বারান্দায় বসে আড্ডা দিচ্ছি। সবথেকে সিনিয়র, রমাদি বলে উঠল…
–“শিখাদিকে একটু জব্দ না করলে হবে না।”
–“খুব চামচাগিরি করে, কাকিমার “।

___আমরা সবাই একসাথে বলে উঠলাম,
–“কিভাবে”?

___শোভনা দি হঠাৎই বলে উঠল,
–“শিখাদির ভুতের ভয় আছে”।

___আবারও একসাথে,
–“তুমি কি করে জানলে”?

___শোভনা দি জানাল,
–“রাতে ও সচরাচর বাথরুমে ওঠে না। বারন্দায় মাঝে মাঝে…. সাথে রাম নাম জপে”।
–“আমি একদিন বারান্দায় পায়চারি করতে গিয়ে ব্যপারটা লক্ষ্য করেছি”।

___আমি তোতলে গিয়ে ঢোঁক গিলে বললাম,
–“ভুউউউউউত”।

___ওটিতে আমার বেশ ভয়।

___রুমাদি বলে উঠল। পেশায় ডাক্তার।
–“তুই ভয় পাস বা ভয় পাচ্ছিস। মনে হচ্ছে”।

___লজ্জায় পড়ে গিয়ে বললাম,
–“না মানে ইয়ে। মানে বলছিলাম কি……”

__কথা আমার শেষ হল না। শম্পা দি এবার বলে উঠল,
–“কি তোতলামি করছিস তখন থেকে”!
–“আমাদের সাথে থাকবি তো নাকি”!
–“একটা কাউন্টার টেনে নিস। ঠিক হয়ে যাবি”।

___কাউন্টার কথাটা শুনেছিলাম, কলেজে ছিলাম যখন। তাই মানে বুঝতে অসুবিধা হয়নি। আমি বলে উঠলাম,
–“আমি ওসব খাই টাই না”।

__মেসের সবথেকে ডেসপারেট দিদি। পেশার আই.টি সেক্টরে কর্মরতা। রশ্মি দি,
–“ওরে আমার চাঁদ”।
–“মেসবাড়ির জীবন টা এখন উপভোগ না করলে, পরে যে পস্তাতে হবে”।

__মনে মনে ভাবছি কোথায় এসে পড়লাম। বুঝলাম এখান থেকে নিস্তার নেই।

___বাকি দুই দিদি, মনামী আর সৌমী। এতক্ষণ চুপচাপ ছিল। বলে উঠল,
–“প্ল্যানটা কি তাহলে”?

__ শোভনা দি বলল,
–“আজ রাতেই মিশন শিখা দি”।

__সবাই ঘুমিয়ে পড়লে, প্ল্যান মাফিক আমি আর সৌমী দি আমাদের ঘর থেকে বেরিয়ে যাই। কারন এই ঘরের একটি চৌকি তার জন্য বরাদ্দ ছিল।

__মাঝরাতে আমাদের পরিকল্পিত পরিকল্পনার পরিসমাপ্তি ঘোষনা করা হয়। শিখা দিকে সেই রাতে মারাত্মক ভাবে ভুতের ভয় দেখানো হয়েছিল। মনামী দিকে ভুতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখা গিয়েছিল। তার অবিশ্বাস্য অভিনয় শিখাদির সাথে আমাকেও ভয় পাইয়ে দিয়েছিল।

__পরদিন সকালে। কাকিমার কাছে সব ব্যক্ত করলে কাকিমা, শিখাদি কে এক ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দেয়। শিখাদি কি একটা বলতে যাচ্ছিল, আমরা খাবার আনতে যাওয়ায় চুপ করে গেল।

__এরপর থেকে শিখাদি একটু চুপচাপ হয়ে যায়। আপন মনে কি যেন চিন্তা করে। আমরাও ব্যস্ত হয়ে পড়ি যে যার কাজে। এরমাঝে আমিও কয়েকটি চাকুরীর পরীক্ষা দিয়ে ফেলেছি।

___সেই রাতের পর বেশ কিছু দিন কেটে গেছে। আড্ডাও অনেকটা স্তিমিত হয়ে গেছে। তবে খুব বেশী দিন সেই আড্ডা স্তিমিত থাকল না।

__এক শনিবারের দিকে সন্ধ্যায় আবার আড্ডার আয়োজন হল। তার উপর আজ আবার ডাক্তার রুমাদি র জন্মদিন। আড্ডায় ঠিক হল রাতে পার্টি হবে। শিখাদিকেও সাথে নেব। রুমাদি এও বলল,
–“তোদের জন্য আজ একটা সারপ্রাইজ আছে”।
–“রাতে”।

__রাতে কাকিমার দেওয়া অখাদ্য রুটির সাথে দেওয়া ঢেড়শ আলুর তরকারির বিদায় জানালাম সেই জানলার কার্নিশে রেখে। তার আগে রাতের জন্য আমাদের খাবার মজুত করা হয়েছিল পরিকল্পনা মতো। কাকিমা ঘুমিয়ে পড়লেই শুরু হবে আমাদের তান্ডব।

__যথাসময়ে কাকিমা ঘুমিয়ে পড়লে, মেসবাড়ির দু’টি ঘরের সবচেয়ে বড় ঘরে পার্টির আয়োজন হল। কে. এফ.সি থেকে আনা খাবার আর ঠান্ডা পানিয় সহযোগে উদর পূর্ণ করল সবাই।

__শিখাদি কে হঠাৎই রশ্মি দি চেপে ধরল,
–“যেদিন ভুতে তোমাকে ভয় দেখিয়েছিল। পরদিন সকালে কাকিমাকে কি বলছিলে তুমি”?
–“আমাদের দেখে চেপে গিয়েছিলে যে বড়ো “।

___আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম সে কথা। রশ্মিদি’র কথায় সবাই নড়ে চড়ে বসল। সবাই একসঙ্গে চেপে ধরলাম। একা শিখাদি’র পক্ষে আমাদের আটজনকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হ’ল না। যা শুনেছিলাম! আট জোড়া চক্ষু বিস্ফারিত হয়েছিল বৈকি। সেটি ছিল এরকম….

__এই মেসবাড়ির একটি ঘরেই একজন সিলিং ফ্যানে ঝুলে আত্মহত্যা করেছিল। সে অনেকদিন আগের কথা। মেসেই ভাড়া থাকত। কারণ আজও অজানা। তবে সেই মৃত্যুর কারণ যে যার নিজের মতো করে ধারণা করে নিয়েছিল। তার অতৃপ্ত আত্মা এই মেসে নাকি এখনও ঘোরে।

__কাকিমাকে শিখা দি এটাই বলতে চেয়েছিল,
–“অনেকবছর পর সে এসেছিল’।

__রুমা আর রশ্মি দি অবস্থাটা হাল্কা করে বলল,
–“ওটা আমরা তোমাকে ভয় দেখিয়েছিলাম’

__বলেই হো হো করে হেসে ওঠে।

__শিখাদি তখনও চুপ। শুধু বলল,
–“সে আছে এই মেসবাড়িতেই”।

__রুমা দি বলল,
–“আছে যদি, প্রমাণ হোক”।

__আমি একটু ভয় খেয়েই বললাম,
–“প্রমাণ”!
–“কি কি করে”?

__”প্ল্যানচেট”
রুমাদি বলল,
–“প্ল্যানচেট করে তার আত্মাকে ডাকাব আমরা। যদি সে থাকে তো আসবে। জবাব দেবে আমাদের প্রশ্নের”।

__আমি না পারছি সেই জায়গা ছেড়ে উঠতে। না পারছি ভয়ে ঘরে যেতে।

___ যেই না বলা অপনি শুরু। সবাই গোল করে বসলাম। এখানে বলে রাখি শিখাদি অনেক আগেই চলে গেছে। এখন আমরা আটজন একটা বৃত্ত বানিয়ে বসেছি। মাঝে একটা বড়ো মোমবাতি। সবাই আত্মসংযম করছি। অন্যমনা হলে আত্মা আসবে না। ভয়ে আমি শোভনাদি’র হাত খুব জোরে চেপে বসে আছি। স্নেহের কারনে শোভনা দি সেটি মেনে নিয়েছে।

__অনেকক্ষণ সময় অতিক্রম করল। আত্মার দেখা নেই। আমারও আশাহত হয়ে বৃত্ত ভেঙে উঠে পড়লাম। রাত ভোর হতে চলল। ক্লান্তি গ্রাস করেছে সকলকেই। বিছানায় পড়লেই ঘুম। সবাইকে শুভরাত্রী জানিয়ে বিছানায় এসেই শরীরটা এলিয়ে দিলাম।

__শিখাদি নাসিকা গর্জনে ব্যস্ত। বিষম আওয়াজে ঘুম আসতে দেরী করছিল। এদিক ওদিক ছটফট করতে করতে চোখের পাতা এক হয়েছে….

___মেসবাড়ির নীচ থেকে রজনী গন্ধার মিষ্টি সুবাস ভেসে আসছে। আধঘুমে মনে পড়ল, মেসের নীচে অনেকগুলো দোকান আছে। সারি বেঁধে। যেখানে সারিবদ্ধ ভাবে সাজানো আছে মড়ার খাট। প্রতিটি দোকানে রয়েছে মড়া সাজানোর বিস্তর সরঞ্জাম। সেখান থেকেই আসছে রজনী গন্ধার গন্ধ। দোকান গুলির সাথে দোকানিদের ও ছুটি নেই। ‘কার কখন ডাক আসে’ !

____গাঢ় ঘুমে আচ্ছন্ন পুরো মেসবাড়ি। এমনসময়….

___আমি যে চৌকিটি দখল করেছিলাম। তার মাথার ওপর ছিল একটি সিলিং ফ্যান। সবার চৌকির জন্য একই ব্যবস্থা। সিলিং ফ্যানের ওপর থেকে কি একটা নেমে এসে আমাকে বারবার বিরক্ত করছে। বারবার হাত দিয়ে সরানোর চেষ্টা করছি। বিরক্ত হয়ে চোখ জোড়া হালকা ভাবে খুলেছি…..

__একটি নারী মূর্তি। সিলিং এর ওপর থেকে আমার দিক বরাবর ঝুলে আছে। তার চুলগুলো আমাকে বারবার বিরক্ত করছে। আমি উঠতে চেয়েও পারছি না। অদৃশ্য শক্তি আমাকে চেপে ধরে রেখেছে।

___ অনেক কষ্টের মধ্যেই বলে উঠলাম,

–“কে তুমি”?
–“কি চাও”?

___নারী মূর্তি টি খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। যত হাসছে তত তার গা থেকে মাংস – চামড়া খসে গিয়ে একটা কঙ্কাল মূর্তি ধারণ করছে সে। এলো চুল উড়ে চলেছে অনবরত। এবার একটা অট্টহাসি হেসে উঠল। মুখের ভিতরে চোখ যেতেই, জিহ্বা বিহীন মূলোর মতো দাঁত ওয়ালা একটা মুখমন্ডল দর্শন করলাম। যা ছিল অর্জুনের বিশ্বরূপ দর্শনের থেকেও বীভৎস।

___আমাকে আরও জোরে চেপে ধরেছে যেন। চাইলেও সে বন্ধন মুক্ত করা আমার সাধ্যি নেই। হঠাৎই কর্কশকণ্ঠ বলে উঠল,

–“তোরা আমাকে প্ল্যানচেট করে ডেকেছিলি।”
–“আমি এসেছি”।

__আমি কাঁপা কাঁপা গলায় বলতে চেষ্টা করলাম,

–“আমি তোমায় ডাকিনি, রুমা দি……”

__কর্কশ গলা বলে উঠল,

–“তুই সাথে ছিলি”।

—“নরম মনের মানুষকে আমার বেশী পছন্দ “।

___বলেই আমাকে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরল।

___আমি প্রাণপণে চেষ্টা করছি তার বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করতে। বিফল হচ্ছি। নারী মূর্তি আর এখন আগের সেই নারী মূর্তি নেই। একটা আস্ত কঙ্কালের রূপ ধারন করেছে। সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলছে তার সেই কঙ্কাল মূর্তি।

___আমি সেই দৃশ্য আর সহ্য করতে পারছি না। এদিকে আমার শরীরের সাথে পুরো বিছানা ঘামের কারণে ভিজে জবজব করছে। মনে হচ্ছে সদ্য স্নান করেছি। বিছানা ছেড়ে ওঠার ক্ষমতা আমার হচ্ছে না। সেই কঙ্কাল সিলিং থেকে ঝুলে আমার বুকের ওপর এসে সংযোগ স্থাপন করেছে, মাংস বিহীন লম্বা আঙ্গুলের দ্বারা। আজ আমার ‘রাম নাম সত্য হ্যায়’। এমন সময়…..

___কাকিমা সমেত আটটি মুখমন্ডল আমার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। জল ঝাপটান চলেছে আমার উপর। চোখ মেলেই এইসব দেখি এবং শুনি প্রায় এক ঘন্টা টাক আমি অজ্ঞান।

___জ্ঞান ফিরতে একটু ধাতস্থ হয়ে ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ননা করি। সাথে এও জানাই,

–“এই ভুতুড়ে মেসে আমি আর থাকব না”।

___হঠাৎ শিখাদি সবাই কে অবাক করে দিয়ে বলে,

__আমার জায়গাটি আগে দখলে ছিল ওই অতৃপ্ত আত্মার। এই জায়গা কেউ বেশীদিন দখল করে থাকতে পারে না। যেই আসে, সে বেশীদিন টিকতে পারে না।

___শিখাদি’র কথা শোনার পর আর থাকার কোন কারণ খুঁজে পাইনি আমি। সেইদিন ই ভুতুড়ে মেসবাড়ি ত্যাগ করি। পরে শুনেছিলাম, আস্তে আস্তে সেই মেসবাড়ি সবাই ত্যাগ করেছে। শিখাদি ও বাড়ি চলে গেছে। মেসবাড়ির বারান্দা ভেঙে পড়েছে। সেটি এখন ভুতুড়ে মেসবাড়িতে পরিণত হয়েছে। রাতের দিকে অনেকরকম আওয়াজ কানে আসে মেসের নীচের দোকানিদের।

__মেসবাড়ি ভগ্নপ্রায় হলেও, মেসবাড়ির নীচে মড়া সাজানোর দোকানগুলি আজও বতর্মান। ‘কখন কার ডাক আসে’!

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 3   Average: 4.7/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।